রাঢ় বাংলার কাব্যঃ রূপরামের ধর্মমঙ্গল-এ বাস্তব চরিত্র

ঝিলিক কর্মকার on

dhormomongol

সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে রাঢ় বাংলার লোককথা ও লোকশ্রুতি থেকে জন্ম হয়েছে ধর্মমঙ্গল কাব্যের। বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা এবং অবিশ্বাস্য কর্মকান্ড বর্ণিত হলেও কবির কল্পনা লোকজীবন ও লোকচরিত্রকে অতিক্রম করে যায়নি। কাব্যের চরিত্ররা যে রাঢ়বাংলার জনসমাজের বাস্তব চরিত্রের আদলে চিত্রিত সে বিষয়ে কোনো সংশয় থাকে না। বৃহত্তর রাঢ় জনগোষ্ঠীর আশা-কামনা-বাসনা-ধর্মবিশ্বাসকে অস্বীকার করে গড়ে ওঠেনি রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্য।

   মঙ্গলকাব্য ধারার সর্বকনিষ্ঠ কাব্য হল ধর্মমঙ্গল। মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গলের পর যার স্থান। সুতরাং ধর্মমঙ্গলের কাহিনি রচনায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ, ভাগবত, নাথ সাহিত্য নানান কাব্যের প্রভাব লক্ষণীয়। অনুরূপভাবে চরিত্রগুলিতেও উক্ত কাব্যসকলের প্রভাব পড়েছে।

     কাব্যের নায়ক লাউসেন। চরিত্রটি শাপভ্রষ্ট দেবচরিত্র। রামচরিত্র ও গোরক্ষনাথ চরিত্রের আদর্শের ছায়াপাত ঘটেছে লাউসেন চরিত্রে। তার মধ্যে বাস্তবতা ও কর্তব্যপরায়ণতা লক্ষ্য করা গেলেও, লাউসেন দৈবানুগ্রহীত সর্বত্রজয়ী নায়ক চরিত্র। মূলত ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে চরিত্রটির মধ্যে অলৌকিকতার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। লাউসেন ধর্মপরায়ণ, সংযমী এক পুরুষ চরিত্র। সমালোচক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘লাউসেনের বাহুবল অপেক্ষা তাঁর চরিত্রবল ও নৈতিক শুদ্ধাচার অধিকতর প্রশংসা দাবী করিতে পারে।‘ [‘ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’/৩য় খন্ড/২য় পর্ব/ পৃঃ ১০৫] পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা চরিত্রটিকে সাধারণ মানবতার মাত্রা দান করেছে। রূপকথামিশ্রিত বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্র হলেও কোথাও কোথাও লাউসেন মানবিক হয়ে উঠেছে। যেমন সামুলা লাউসেনের মস্তকছেদন করে নবখন্ড সাধনার কথা বললে, লাউসেন জানায়-

“আপনি কাটিব যদি আপনার মাথা                                      

কারে দেখা দিবে তবে শ্রীধর্ম দেবতা।”

বীরত্ব, অলৌকিকতা ও মানবতায় মধ্যযুগের চরিত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে নায়ক লাউসেন চরিত্রটি।

  রঞ্জাবতীর মানসজাত পুত্র কর্পূরধবল খাঁটি বাঙালি লোকচরিত্র। ধর্মপ্রাণ, বাক্যবীর, ভীরু বাঙালি চরিত্রটিকে সে প্রতিফলিত করেছে। সমালোচক দীনেশচন্দ্র সেনের কথায়, ‘একমাত্র কর্পূরের চরিত্র বাঙ্গালীর খাঁটি নকসা বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে।’ [‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’/২য় খন্ড/ পৃঃ ৪৮১]

  লাউসেনের মামা মহামদ বা মাহুত্তা খলচরিত্র। ভাগবতের কংস প্রভাবিত চরিত্র সে। লাউসেনের যাবতীয় দুর্গতির জন্য দায়ী সে। তবে তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বোধের পরিচয় আছে। বোনের প্রতি ভালোবাসা প্রবল শত্রুতায় পর্যবসিত হয়েছে। লাউসেন তাকে কুষ্ঠ রোগের অভিশাপ দিলে তার ক্রন্দন মানবিক হয়ে উঠেছে ।

   বীরত্বব্যঞ্জক নারীচরিত্র মধ্যযুগের সাহিত্যে ধর্মমঙ্গল ব্যতীত অন্য কোনো মঙ্গলকাব্যে নেই। রঞ্জাবতী আবেগব্যাকুল রমণী। তার চরিত্রের তিনটি মাত্রা-

ক। স্নেহশীলা মাতা

খ। পতিপ্রাণা স্ত্রী

গ। ধর্মভীরু লৌকিক নারী। 

সন্তানলাভের আশায় আচার সংস্কার পালনে ও কৃচ্ছ্রসাধনায় সে রাঢ়বাংলার বাঙালি জননীর রূপ পরিগ্রহ করেছে। তবে পুত্রস্নেহের জন্য মাতৃত্বের বিকৃত ভালোবাসা দেখতে পায় যখন সে লাউসেনকে যুদ্ধে যেতে দেবে না বলে মল্লদের দ্বারা পা ভাঙার পরিকল্পনা করে।  এ যেন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ভালবাসার অত্যাচার’ প্রবন্ধের জননীর প্রতিরূপ।

    লাউসেনের পত্নী কানোড়া ও কলিঙ্গা স্বাভাবিক ও জীবন্ত চরিত্র। সামুলা ভূত-ভবিষ্যত দ্রষ্টা নারী পুরোহিত। জাতিস্মরা নারী রূপে গণ্যা। সুরিক্ষাও এক নারী পুরোহিত।

   ধর্মমঙ্গল কাব্যে ডোম সমাজের চরিত্র বৈশিষ্ট্য কাব্যটিকে আরো প্রাঞ্জলতা দান করেছে। জীবন্ত ও প্রাণাবেগে পূর্ণ ডোমজাতির চরিত্রগুলি রাঢ়বাংলার নিজস্বতাকে ধারণ করে রেখেছে। শৌর্যে, বীর্যে, সাহসিকতা, কর্তব্যকর্মে, ধর্মবিশ্বাসে ডোমচরিত্রগুলি অনবদ্য। কালুডোম সৎ,সাহসী, প্রভুভক্ত ও ভোগলিপ্সু চরিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’ -এ সুর অনেক পূর্বেই ধ্বনিত হয়েছে কালুডোম চরিত্রটিতে। লাউসেনের প্রধান সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত হবার পূর্বে অসহনীয় দারিদ্র্য সহ্য করেছে কালুডোম।  যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুভয়হীন ডোমজাতির বীরত্ব ফুটে উঠেছে কালুডোমের চরিত্রে। সে মর্ত্যসুখভোগে বেশ স্বাভাবিক চরিত্র। কাব্যশেষে লাউসেন তাকে স্বর্গের সহযাত্রী হিসাবে পেতে চাইলে কালুডোম জানায়-

“মদ মাংস নাহি তথা বলে দুবরাজ।                 

কালুডোম বলে তবে স্বর্গে নাহি কাজ।”

আধ্যাত্মভাবনার বিপরীতে কালুডোম প্রকৃত জীবনরসিক। তার এই জীবনপিপাসা ও মর্ত্যপ্রেম আসলে রাঢ়বাংলার নিম্নবর্গের লোকসমাজেরই বৈশিষ্ট্য। কালুর স্ত্রী লখ্যা ডুমনী কর্তব্যনিষ্ঠা, তীক্ষ্ণ বিচারবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হয়ে উঠেছে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে এক আদর্শ রমণী। মদের নেশায় বিভোর কালু ডোমকে সে যুদ্ধে যেতে অণুপ্রাণিত করেছে। এমনকি দুই পুত্র শাখা ও শুখাকেও যুদ্ধে অংশ নিতে বলেছে সে। এছাড়া কালুর দুই পুত্রবধূ মউরা-মউরীরও বীরত্বের প্রকাশ ঘটেছে। মউরা স্বামী শাখাকে বলেছে-

‘সমর সমুখে কভু না হবে বিমুখ

রণ যুঝ্যা মরিলে গোলোকে পাবে সুখ।’

এভাবে নিম্নবর্গ এবং নিম্নবর্ণের মানুষের চরিত্রগুলির বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে ধর্মমঙ্গল কাব্যে। সমালোচক গোপাল হালদারের মন্তব্য যথাযথ- ‘এই অসাধারণ সাহসী ডোম চরিত্রের ওপর বীরত্বের রঙ ফলানো হলেও তা মাত্রাতিরিক্ত হয়নি। তার লোভ আছে, কিন্তু সত্যবোধও আছে।’ [‘বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা’/১ম খন্ড/পৃঃ ১২৭]

  বলা বাহুল্য চরিত্রগুলি অলৌকিকতার পাশাপাশি বাস্তবতারও নিদর্শনরূপে চিহ্নিত। রাঢ় বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশ ও লোকজীবনের উপাদানের সংমিশ্রণে পুষ্ট রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের চরিত্রেরা। 



ঝিলিক কর্মকার

বাড়ি প্রান্তিক, শান্তিনিকেতন। বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে বিশ্বভারতীর বিনয় ভবনের ছাত্রী।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।