নূর হিন্দি-র কবিতা

সোহেল ইসলাম on

Noor_hindi_songs
noor hindi 1

নূর প্যালেস্তানীয় বাবা ও আমেরিকান মায়ের সন্তান। তাঁর বেড়ে ওঠা আমেরিকায় হলেও পিতৃভূমি প্যালেস্তাইন নিয়ে নূর সবসময়ই সচেতন এবং প্রতিবাদী। একজায়গায় নূর বলেছিলেন, “আমি কোনওদিন প্যালেস্তাইন যাইনি, কিন্তু আমার সবসময়ের ভাবনায়, লেখায় প্যালেস্তাইন উঠে আসে। আমি মাহমুদ দারবিশের লেখাকে ভালোবাসি। আমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শুধু ছুটে বেড়িয়েছি। যেভাবে প্রত্যেক প্যালেস্তানীয় নিজের বাড়ির জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ায়। দারীন তাতুরের গ্রেফতার আমাকে কবিতার প্রতি, প্যালেস্তাইনের প্রতি আরও আকৃষ্ট করে তোলে। দারীন আর আমার মধ্যে পার্থক্য, আমরা দুনিয়ার দুই প্রান্তে থাকি, দারিন আরবিতে লেখেন, আমি লিখি ইংরেজিতে, কিন্তু মনের দিকে আমাদের কোনও পার্থক্য নেই। আমরা দু’জনেই আরবের মেয়ে। দু’জনেই প্যালেস্তাইনের মুক্তি চাই। আমি যখন প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন রাজনীতি আমার কবিতার বিষয় ছিল না, কিন্তু আমার বাবার জীবন, আমার পূর্বপুরুষ যেখানে রাজনীতির অংশ, সেখানে আমার লেখা রাজনৈতিক না হয়ে কীকরে একা থাকে। এখন আমার একটাই উদ্দেশ্য, প্যালেস্তাইনের মুক্তি। আমি একজন প্যালেস্তানীয়-আমেরিকান কবি। আমি কানাফানিকে পড়াশোনা করি। ইজরায়েলের অত্যাচার নিয়ে লিখি, প্যালেস্তাইন নিয়ে লিখি, হামাস আর আমেরিকার সম্পর্ক নিয়ে লিখি। আমার বাবাও ছিলেন প্যালেস্তাইনের সংগ্রামী। ইজরায়েল আদালতের নির্দেশে প্যালেস্তাইন ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। ৪০ বছরের নির্বাসন তাঁর জীবন, লড়াই বদলে দেয়। আমি সেই পিতার সন্তান, আমি প্যালেস্তাইনের সন্তান, আমার কলম তো প্যালেস্তাইনের কথা লিখবেই”।

নূর শুধুমাত্র একজন কবি নন, সঙ্গে সাংবাদিকও। নূর দ্য ডেভিল স্ট্রিপ ম্যাগাজিনের সিনিয়র রিপোর্টার। তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধগুলো নিয়মিতভাবে পোয়েট্রি ম্যাগাজিন, হোবার্ট, জুবিলার্ট, আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ, লিটেলারি হাব, অ্যাড্রয়েট জার্নালে প্রকাশিত হয়ে আসছে। নূর কবিতা লেখার জন্য পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন থেকে রুথ লিলি এবং ডরোথি সার্জেন্ট রোজেনবার্গ ফেলোশিপ পেয়েছেন। তিনি আকরণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ফাইন আর্টসের উপরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর একমাত্র কাব্য সংগ্রহের নাম ‘ Dear God, Dear Bones, Dear Yellow’।

তিনটি কবিতাঃ

আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না

এক জনশূন্য
ইতিহাস আর কান্না বহন করা
দেশের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া
আমার আর অন্য কোনওকিছুই করার নেই

যেখানে আমি একা দাঁড়িয়ে
প্যালেস্তাইনের মানচিত্র আঁকছে বাবা
হাতে সবুজ রঙ

যদি আমার বাবার জিভে অলিভ গাছের জন্মই না হয়
তবে কেমন এই প্যালেস্তাইন
যদি অলিভ গাছ বেড়ে উঠতেই না পারল
তবে কিসের প্যালেস্তাইন

ঠিক এমন মুহূর্তে
দেওয়ালের ঘড়ি থেকে
চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে সময়


শিল্প নিয়ে জ্ঞান ঝাড়বেন না,
আমাদের লোকেরা মারা যাচ্ছে

ঔপনিবেশিকেরা ফুল নিয়ে লিখে থাকে
আমি বরং জানাই
কীভাবে ফুল হয়ে ওঠার কয়েক মুহূর্ত আগেও
প্যালেস্তানীয় শিশুরা ইজরায়েলি ট্রাংকে পাথর ছুড়ে মারে

আমিও সেই কবির মতো হতে চাই
যে আজও চাঁদ নিয়ে আবেগী
জেলবন্দি প্যালেস্তানীয়রা
চাঁদ দেখতে পায় না
চাঁদ খুব সুন্দর
ফুলও খুব সুন্দর নিশ্চয়
মৃত বাবার জন্য মনখারাপ হলে
আমিও ফুল তুলি
তিনি সারাদিন টিভিতে আল-জাজিরা খুলে বসে থাকেন

জেসিকা এবার ‘শুভ রমজান’ লেখা
মেসেজ গুলো পাঠানো বন্ধ করুক
আমি জানি,
আমি আমেরিকান, কেননা
যখনই কোনও ঘরে আমার প্রবেশ ঘটে
অমনি কিছু না কিছু ধ্বংস হয়ে যায়

মৃত্যুর রূপকগুলোর
ভূত হয়ে যাওয়া কবিদের জন্য
শব্দের জন্য তাঁদের কত না ভাবনা
আমি যদি মরে যাই
কথা দিচ্ছি, আজীবন তাড়া করে বেড়াবো ওদের

একদিন আমিও ফুল নিয়ে লিখব কতকিছু
যেভাবে প্রিয়জনকে নিয়ে লেখে সবাই


দিদা

নিশ্বাসে বারুদের গন্ধ নিয়ে
মুখে, শরীরে রক্তের ছিটে নিয়ে
অস্ত্রের মুখে নতুন নতুন মৃত্যুর গল্প শুনে বেড়ে ওঠা
দিদা আমার
রাতের পর রাত বোমার শব্দ ঘুমোতে পারেনি
১৯৪৬’র আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের আগে
জন্ম বলে
তার কোনও নাম ছিল না
কোনও ঘর ছিল না
মায়ের কাঁধ ছিল শেষ আশ্রয়
কিন্তু ৭০০,০০০ শরণার্থী
আত্মীয় ছিল তার

দাদু ২৫ দিন ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও
কোনও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে
দিদাকে এনে দিতে পারেনি আমাদের কাছে
১৮ মাস পর এক খ্রিষ্টান দম্পতির চেষ্টায়
তার নিথর দেহ খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা

এতকিছু ঘটে গেছে
আপনাদের আড়ালে
তবুও আমি চাই
একটাই দেশ হোক পৃথিবী জুড়ে
যেখানে মানুষ হানাহানির জন্য
মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেবে না


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


সোহেল ইসলাম

জন্মঃ ১৯৮৫ সালের ১লা মে । ২০০১ থেকে লেখা শুরু। প্রথম লেখা ব্যাক্তিগত না পাওয়া থেকে।তারপর দেখেছেন শুধু নিজে নয় হাজার হাজার মানুষ না পাওয়ার পুকুরে গলা জলে ডুবে যাচ্ছে,ডুবে আছে, তাদের কাছে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য লেখা। কবির মতে লিখলে ,না বলা গুলো, না বোঝাতে পারা গুলো বলতে পারেন। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "সবাই প্রতিরোধ শিখুক,প্রতিবাদ শিখুক,নিজের দাবি নিজেরাই জানাতে শিখুক।কেউ কারুর কান্না কেঁদে দেয় না।রাজস্থানের গ্রামে রুদালি ভাড়া পাওয়া যায়,কিন্তু আমাদের রুদালি আমরাই হব।কাউকেই এক ছটাক জমি ছাড়বো না।" প্রিয় কবিঃ রঞ্জন আচার্য, রানা রায়চৌধুরী। প্রিয় বই : সম্পর্ক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - আব্বাচরিত। উত্তর দক্ষিণ , নাটমন্দির , কবিসম্মেলন , কৃত্তিবাস ও ছোট বড় বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

1 Comment

Nargis Begam · অক্টোবর 17, 2021 at 2:00 অপরাহ্ন

সাবলীল অনুবাদ। খুব ভালো লাগলো সোহেল

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।