পরম্পরা

অভীক চন্দ্র on

parampara

পূর্বপল্লীতে যে নতুন হাউসিং কমপ্লেক্সটা গড়ে উঠেছে, তারই প্রকান্ড গেটের উল্টোদিকে একটা ছাউনি বানিয়ে থাকে বুড়ো আর বুড়ি, তাও প্রায় বছর কুড়ি হয়ে গেল। ওরা নিঃসন্তান দম্পতি, বয়সের ভারে শরীর ভেঙে গেলেও একটুও অসহায় মনে করে না নিজেদের। উল্টে এতগুলো বছর বেশ স্বাবলম্বী আত্মনির্ভর জীবন যাপন করে, জীবনের অপরাহ্নে চারটে ইটের দেওয়াল তুলে আর কোরোগেট টিনের চালা দিয়ে বাসস্থানটিও পাকা করে ফেলেছে। অদম্য মনের জোর আর জমানো কিছু খুচরো টাকা পুঁজি করে রুটি তরকারির দোকানও খুলেছে। বুড়ো আগে রিক্সা আর ভ্যান চালাতো। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে গেলো। রোজগার কম হতো, বুড়ো হাড়ে বেশি ট্রিপ খাটতে পারতো না, রিক্সার মালিক তাই বাধ্য হয়েই বুড়োকে বসিয়ে এক জোয়ান ছোকরাকে কাজে নিলো। বুড়ো অবশ্য গাড়ির মালিককে দোষ দেয় না, সে ভাড়ায় খাটিয়ে ব্যবসা করার জন্যই রিকশা কিনেছে। কপ্লেক্সটা তৈরি হওয়ার পর বুড়ো বুড়ির মাথায় এক বুদ্ধি চাপলো। কমপ্লেক্সে যারা এসে উঠলো তাদের প্রায় প্রত্যেকেই অল্প বয়সী স্বামী এবং স্ত্রী, উভয়েই রোজগারে ব্যস্ত। বুড়ি মনে ভাবে আজকাল মেয়েদের ঘরকন্না, রান্নাবাড়ার দিকে মন দিলে চলে না। এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে পুরুষের একার রোজগারে সংসার চালানো বড়ই দায়, তাই মেয়েরাও ছেলেদের পাশাপাশি রোজগারের পথ দেখছে, নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থই লক্ষ্মী, বুড়ি মনে ভাবে মেয়েরা নাই বা করলো ঘরকন্না, স্বাবলম্বী হওয়াও তো একরকম লক্ষ্মীমন্ত।

কারুর ফ্ল্যাটে কাজের মাসি একবেলা রান্না করে ফ্রিজে গুছিয়ে রেখে যায়, কেউ বা রাতে অফিস থেকে ফিরে মাইক্রো ওভেনে সেসব গরম করে নেয়, কেউ বা মোবাইল খুটখাট করে অনলাইনে খাবার অর্ডার করে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ধোঁয়া ওঠা নরম তুলতুলে গরম রুটি, তেঁতুলের টক দিয়ে আলুরদম, ভুনা ডিম দেওয়া তড়কা, এসবের স্বাদ থেকে এরা এক্কেবারে বঞ্চিত। বুড়োবুড়ি ঠিক করে রুটির দোকান দেবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, গুলের আঁচে শুরু হলো রুটি। সারাদিন ধরে বুড়ি জোগাড় করে, গমকলে ভাঙানো আটা চেলে ভুষি বাদ দিয়ে মেখে ফেলে, গোল গোল লেচি কেটে কাপড় চাপা দিয়ে রাখে। রুটির সাথে কোনোদিন হয় আলুরদম, কোনোদিন তড়কা, তো কোনোদিন কুমড়োর ছক্কা। প্রথম প্রথম হাতে গোনা খদ্দের হলেও, দিনে দিনে দোকানের পসার বাড়তে শুরু করলো। বুড়ি কাঠ বাঙালের মাইয়া, রান্নার হাতখানা খাসা! বুড়ো হাড়েও হেঁসেলের বিদ্যে এখনো ষোলোয়ানা বজায় আছে। মাস তিনেক দোকান চালাতেই বুড়ির হাতের স্বাদে আর বুড়োর মিষ্টি ব্যবহারে পিল পিল করে খদ্দের জুটতে শুরু করলো তাদের ছোট্ট দোকানে। বেশিরভাগই অফিস ফিরতি ছোকরা, রাতের খাবার নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকে। তাই রাত আটটা থেকে দশটা বুড়োবুড়ির দম ফেলার সময় থাকে না, তারই মাঝে দুজনে হাসিমুখে সুখ দুঃখের গল্পও করে সবার সাথে। সারাদিন কর্পোরেটের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ছেলে মেয়ে গুলো যখন বাড়িমুখো হয়, রাতের খাবারের অপেক্ষায় রুটির দোকানে মিনিট দশেক নিয়ম করে দাঁড়ায়, কেউ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলি ছড়িয়ে দেয় তো কেউ পকেট থেকে স্মার্টফোন বার করে জমে থাকা নোটিফিকেশনে ক্লান্ত চোখদুটো বুলিয়ে নেয়, ফেসবুকটা একবার দায়সারা স্ক্রল করে বুড়োর দিকে চোখ তুলে তাকায়, বুড়োর হাতে গরম রুটি তরকারির প্যাকেট। তাদের ঘামে ভেজা মুখ, কোটরগত পরিশ্রান্ত দুটো চোখে কৃতজ্ঞতার ভাষা ফুটে ওঠে, হাতে খুচরো পয়সা, রুটির দাম। বুড়োর মনে হয় ওরা বড় অসহায়, বাপ মা, সুখের ঘরবাড়ি ছেড়ে জীবনযুদ্ধে সামিল একাকী! কেউ কেউ কিছুদিন হলো সংসারও পেতেছে। দিন শেষে বুড়োর হাসিমুখ দেখে ওদের মন ভরে ওঠে, পেট ভরে বুড়ির হাতে গড়া রুটি আর তরকারি খেয়ে, তাতে মিশে আছে মায়ের আদর। বুড়ি এক বুক মমতা নিয়ে বানায় খাবারগুলো, দিন শেষে সেগুলো ওদের ক্ষুধার্ত মুখে তুলে দেওয়ার মধ্যে যে তৃপ্তি আছে, তা বোধয় আর কিছুতে নেই, হলোই বা চাট্টি পয়সার বিনিময়ে, তবুও মায়ের মমতা কি কেনা যায়? এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এতই মিশুখে যে গল্প জুড়ে দেয় বুড়োবুড়ির সঙ্গে, ফেলে আসা দেশের বাড়ির গল্প, মায়ের কথা, ছেলেবেলার কথা, বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প, কী খেতে ভালোবাসতো সেই কথা।

দোকানের পসার জমে উঠেছিল রীতিমত, সারাদিন কাজে কম্মে মেতে থেকে ভালোই চলে যাচ্ছিল বুড়ো বুড়ির খেয়াপারের দিনগুলো, রোজগারও মন্দ হচ্ছিলো না। প্রতিদিনের লাভ থেকে অল্প কিছু টাকা আলাদা সরিয়ে রাখতো বুড়ো, ঠিক করেছিল একটা রান্নার গ্যাস নেবে। কিন্তু বিধি বাম, হটাৎ বাঁধ সাধলো লকডাউন। দেশে রাতারাতি ছড়িয়ে পড়লো এক অজানা ভাইরাস, বিপুল সংক্রমণের আশঙ্কায় দেশ জুড়ে স্বাভাবিক জনজীবনের উপর সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ জারি হলো, পুরোপুরি সিল করে দেওয়া হলো অনেক জায়গা। বন্ধ হলো যানবাহন, দোকানপাট, কল কারখানা, অফিস কাছারি, স্কুল কলেজ। ঘরবন্দি হলো লোকজন, শুনশান হলো পথঘাট। কমপ্লেক্স থেকে আর কেউ বেরোয় না, অফিস যায় না, রাস্তায় খাবারের দোকানগুলোতে খদ্দেরও নেই আর, সকলেই মারণ ভাইরাসের ভয় কাঁটা! বুড়োবুড়িকেও তাদের ফুলে ফেঁপে ওঠা ব্যাবসা অচিরেই গুটিয়ে আনতে হলো, ফের শুরু হলো অভাবের সাথে যুঝে চলা, নিত্যদিন অস্তিত্বের লড়াই! সামান্য যেটুকু টাকা গ্যাস নেওয়ার জন্য এদ্দিন ধরে জমিয়েছিল, তাও পেটের দায়ে গলগল করে বেরিয়ে গেল। কতদিন চলবে এই লকডাউন সেও অনিশ্চিত, কিভাবে দুটো পেট চলবে, কিভাবে সামনের দিনগুলো কাটবে, ভেবে কূল পেলো না বৃদ্ধ দম্পতি। কিছুদিন বাদে স্থানীয় ক্লাব থেকে ত্রাণ দেওয়া শুরু হলো, রান্না করা ভাত আর ডিম, আলুর ঝোল, তাও দু তিনদিন ছাড়া ছাড়া। বুড়ো বুড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিলো, মাথার উপর ঠাঠা রোদ, এই ভেঙে পড়া শরীরে এত ধকল সহ্য হয় না। কোনোমতে এক বেলা খাবার জুটলেও, রাতে জুটলো না দানাপানি। প্রথম প্রথম কিছুদিন শুকনো মুড়ি চিবিয়ে কাটলো, তারপর একসময় তাও ফুরিয়ে এলো। অগত্যা এক ঢোক জল খেয়ে শুয়ে পড়া! দিনের বেলা ঘরের সামনে মুখ ভর্তি পাকা দাড়ি নিয়ে বুড়ো ঠায় বসে থাকে, বুড়ি দুর্বল, উপোষী শরীরে ঘরের ভিতর মেঝেয় পড়ে থাকে। আচমকাই  থেমে গেছে জীবন।

একদিন সন্ধ্যার দিকে দরজায় আগল দিয়ে বুড়োবুড়ি শুয়েছিল, খাবারের অভাবে শরীর বেশ দুর্বল। হটাৎ টিনের দরজায় টোকা পড়ল, বুড়ো পাশ ফিরে দরজার দিকে তাকালো। দুবার টোকা পড়ার পর জড়ানো গলায় শুয়ে শুয়েই শুধল “কে?” 

“দরজাটা খুলবে দাদু? একটু অসুবিধায় পড়েছি,” ভেসে এলো পুরুষের কণ্ঠস্বর, গলাটা বুড়োর চেনা ঠেকলো, কোনোরকমে শরীরটাকে টেনে তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো, আগল খুলে বেরিয়ে এলো ইটের ছোট্ট খুপরির বাইরে। ছেলেটাকে চিনতে পারলো বুড়ো, সামনের কমপ্লেক্সেই থাকে, সল্টলেকে অফিস, রোজ রুটি নিতে আসতো, নামটা ঠিক মনে করতে পারলো না চট করে। চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো ছেলেটার মুখের দিকে।

“আমি অনিকেত। ভিতরের ফ্ল্যাটে থাকি, রোজ রুটি নিতাম তোমার থেকে, মনে পড়ছে?” গড়গড় করে কথাগুলো বলে একটু থামল ছেলেটা। 

-“সেই তো বলি, চেনা চেনা ঠেকছে, কিন্তু রুটি তো আর করছি না বাবা, খদ্দের কই?” 

-“দিদাকে একটু ডেকে দাও না,” ফস করে বলেই বসলো ছেলেটা।

এতক্ষণে বুড়ি মাদুর ছেড়ে উঠে, পরনের ন্যাকড়াপানা কাপড়টা ঠিকঠাক করে গায়ে জড়িয়ে, পায়ে পায়ে দরজার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেই জিগাইল “কী হয়েছে বাপ?” 

“মল্লিকা ইউটিউব দেখে রুটি বানানোর চেষ্টা করছিল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার, এখন হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছে, আমার মাথায় কিছু আসছে না। তোমাকে একটিবার যেতে হবে আমার ফ্ল্যাটে, সব ঠিক করে দাও না প্লিজ,” গলায় আকুতি ঢেলে বলল অনিকেত।

অবাক বুড়ো বুড়ির মুখের দিকে তাকালো। কী ছেলেমানুষের মতো সরল আবদার! সংসারের কানাকড়িও বোঝে না, এদিকে ঘর বাঁধা চাই! বুড়ো ফিক করে হালকা রসিকতার হাসি হাসলো। বুড়ি বললো “রোসো, কাপড়টা পাল্টে আসি।” বুড়ি ঘরের ভিতর গেল, চুল বাঁধলো, ছেঁড়া কাপড় ছেড়ে চলনসই একটা কাপড় পড়লো, বেরিয়ে এসে বললো “চল বাপ, কোনদিকে তোমার ঘর?” 

অনিকেত পথ দেখিয়ে বুড়িকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো। কমপ্লেক্সের ঈশান কোণের বিল্ডিংটার একেবারে ছয় তলায় ওর ফ্লাট। লিফটে করে উঠে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। বেল টিপতেই দরজা খুলে দিল মল্লিকা। ছিমছাম গড়নের মেয়েটা বেশ মিষ্টি দেখতে, পরনে গেঞ্জির রঙিন টপ আর থ্রি কোয়ার্টার ট্রাউজার, ফর্সা পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক গোছা ঘন কালো চুল, নিষ্পাপ চোখে শিশুর সারল্য। ওদের কথাবার্তা শুনে বুড়ির মনে হলো বরের সোহাগে ওদের দাম্পত্য বেশ মাখমাখ, শুধু আটার বেলাতেই মাখচাক যা ঠিকঠাক হয় নি। অনলাইনে কেনা শখের রুটি মেকারে আটা মেখেছে, জলের পরিমান ঠিক রাখতে পারেনি, ফলে আটা চিটচিটে হয়ে জড়িয়ে গেছে মেশিনে। বুড়ি ল্যাতল্যাতে আটার মণ্ডটা মেশিন থেকে বার করে আরো কিছুটা গুঁড়ো আটা মিশিয়ে বেশ ময়াম দিয়ে মাখল, লেচি কেটে থালায় সাজিয়ে নিলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল রুটি বেলতে গিয়ে, এদের সংসারে চাকি-বেলুন নেই, আর বুড়িরও রুটি মেকারে অভ্যাস নেই! অগত্যা বুড়ির কথামতো অনিকেত চলে গেল বুড়ির ইটের ঘরে, চাকি-বেলুন নিয়ে আসতে। সেই ফাঁকে মল্লিকা গল্প জুড়ে দিলো বুড়ির সাথে। মেয়েটা খুব মিশুখে, এতক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঠায় লক্ষ্য করছিল দিদার কার্য্যকলাপ, এই প্রথম মুখ খুলল “খুব ঘাবড়ে গেছিলাম গো দিদা, কাল থেকে ইউটিউবে এত্তো ভিডিও দেখলাম, তাও পারলাম না! খুব রাগ আর আফসোস হচ্ছিল। তুমি এত সুন্দর রান্না শিখলে কার কাছে? জানো তো মা আমাকে কোনোদিন রান্নাঘরে ঢুকতে দিত না, খালি বলতো তুই যা এখান থেকে, লেখাপড়া কর, রান্নাবাড়া শিখে কি আমার মতো সংসারের জোয়াল টানবি?”

“সে তো বটেই, কিন্তু কি জানো তো মা, বেটাছেলে হোক বা মেয়েছেলে, টুকটাক চালিয়ে নেওয়ার মতো সব কাজই জানা দরকার,” আলতো হেসে উত্তর দিলো বুড়ি। 

-“ঠিক বলেছ দিদা, একদম ঠিক, আই সেকন্ড ইউ, আচ্ছা তোমার কথা বলো, তোমায় রান্না শেখালো কে?”

-“ওমা! এ কেমন কথা! শেখাবে আবার কে? বরিশালের মাইয়া আমি, রান্না মোর হাড় মজ্জায়, তাও বাপের ঘরে থাকতে বড় জ্যাঠাইমা শিখিয়েছিলেন বাঙাল রান্নার কয়েখান পদ, চিতল মাছের মুইঠা তেনার কাছেই শেখা।”

এর মধ্যেই চাকি-বেলুন নিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো অনিকেত। বুড়ি চটপট রুটি বেলে, চাটুতে দিয়ে, গ্যাসের গনগনে আঁচে রুটি গুলো সেঁকে নিলো। রুটি তো হলো, কিন্তু খাবে কী দিয়ে? খুব অল্প বয়স থেকেই হেঁসেলে আনাগোনা ছিল বুড়ির, মায়ের সাথে রান্নাবাড়া করার সময় একটা কথা শিখেছিল, এরকম সময় ঘাবড়াতে নেই, বরং মাথা ঠান্ডা করে উপায় বাতলাতে পারলেই সংসারের কাজ হাসিল হয়। এ ছাড়াও ঘরকন্নার টুকিটাকি অনেক কিছুই শিখে নিয়েছিল মা, জেঠিমা, ঠাকুমার কাছে, সেসব তার আইবুড়োবেলার যখের ধন। এদের ঘরে সোয়াবিন আর আলু মজুত ছিল, আর ছিল টুকটাক মশলাপাতি। ডুমো ডুমো করে আলু কেটে, আদা রসুন বেটে, কড়াইয়ে তেল গরম করে তেজপাতা, জিরে মৌরি ফোড়ন দিয়ে খানিক্ষণ মশলা কষিয়ে সোয়াবিন আর আলুর ডালনা রেঁধে ফেললো। কড়াইয়ে ঢাকনা চাপা দিয়ে তরকারি ফুটতে দিল বুড়ি, এর ফাঁকে দেদার গল্প চলল মল্লিকা আর অনিকেতের সাথে। বুড়ি একের পর এক গল্প বলে আর ওরা দুজন অবাক হয়ে শোনে, ছেলেবেলায় খাটো শাড়ির আঁচলে করে কাঁচা আম কুড়োনোর গল্প, টক ঝাল মিষ্টি সইদের গল্প, দেশভাগের গল্প, কনের মুকুট পরে বিয়ের গল্প, তারপর বুড়োর সাথে সুখ দুঃখে কাটিয়ে দেওয়া এতগুলো বছরের গল্প। কথায় কথায় তরকারি সেদ্ধ হয়ে আসে, বুড়ি ঢাকনাটা অল্প ফাঁক করে কাঠের খুন্তি দিয়ে আলুর টুকরোয় খোঁচা দিয়ে দেখে নেয়, তারপর নন স্টিক কড়াইটা গ্যাস থেকে নামিয়ে বাটিতে তরকারি ঢেলে রাখে। মল্লিকা উঠে গিয়ে ওর টিফিন ক্যারিয়ারটা কাবার্ড থেকে নামিয়ে আনে। অনেকদিন অফিস যায়নি, তাই অব্যবহৃত পড়ে আছে। তোয়ালে দিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারটা পরম যত্নে মুছে তাতে আগে ভরে দেয় বুড়োবুড়ির জন্য রুটি আর তরকারি। বুড়ি বাঁধা দিয়ে বলে, “তোমরা আগে খেয়ে নাও না মা, যদি কম পরে যায়!”

মল্লিকা হেঁসে উত্তর দেয় “সে আমরা ভাগাভাগি করে খেয়ে নেবো, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না দিদা। স্কুলে থাকতেই আমরা এর ওর খাবার ছোঁ মেরে তুলে খেয়েছি কত, এখনো খাই, কিরে অনিকেত, বল?”

অনিকেত সলজ্জ হাসি হেসে সম্মতি জানায়। বুড়ি সস্নেহে মল্লিকার চিবুকটা ধরে নেড়ে দেয়। ওদের খুনসুটিতে বেশ গাঢ় দাম্পত্য রসের হদিস পায় বুড়ি। কাঁচা বয়স, ভালোবেসে বিয়ে করেছে, এখনো ডানা পোক্ত হয় নি, তাতেই সংসারের ভার তুলে নিয়েছে নিজেদের অজান্তেই। ওরা খেতে বসে, বুড়ি নিজের হাতে খাবার বেড়ে দেয়। ওরা খুব তৃপ্তি করে খায়, বুড়ি ঠায় চেয়ে থাকে স্নেহভরা চোখে, মাঝে মাঝে জিগেস করে আর কিছু লাগবে কিনা, একদম মায়ের মতো করে। ওদের খাওয়া হয়ে গেলে বুড়ি বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়ায়, গেটের কাছে এসে মল্লিকা জড়িয়ে ধরে বুড়িকে, জিগেস করে “কাল আবার আসবে তো? রান্না শেখাবে তো আমাকে? কিভাবে ময়াম দিয়ে ময়দা মাখে… কিভাবে রুটি একদম গোল করে বেলতে হয় দেখিয়ে দেবে? কিভাবে হাঁড়ির ফ্যান গেলে ভাত ঝরায়? শেখাবে কিভাবে তরকারিতে ফোড়ন দেয় আর কিভাবে ডাল সাঁতলায়?” মেয়েটার উপর মায়া পরে যায়, পরম মমতায় ওর গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বুড়ি, ওর হাতটা ধরে বলে “আসবো রে আসবো…” 

খাবার ভর্তি টিফিন ক্যারিয়ারটা সাথে করে বুড়িকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে যায় অনিকেত। রাত হয়েছে, বুড়োবুড়ি একসাথে খেতে বসে। আজ অনেকদিন পর রান্নাটা বড্ড ভালো হয়েছিল। চেটেপুটে খেয়ে, আঁচিয়ে উঠে বুড়ো একটা বিড়ি ধরায়, বুড়ি কাছ ঘেঁষে বসে, আজ বহুদিন বাদে পেটভরে খেয়ে দুজনেই বেশ সুখী। গল্প শুরু করে, এতগুলো দিন দুজনে একসাথে চলা জীবনের আঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা কত সুখস্মৃতি রোমন্থন করে দুজনে অনেকক্ষণ। নিজের প্রৌঢ়ত্বের মাঝেই বুড়ি টের পায় আর একটা চারা গাছ নরম পাতা মেলে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কচি মেয়েটার নিপুণ গৃহিণী হয়ে ওঠার তীব্র আকাঙ্খা অনুভব করে নিজের বুকের ভিতর। কাল থেকে মল্লিকাকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে বুড়ি, গড়ে পিঠে নেবে একদম নিজের মত করে। 


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


অভীক চন্দ্র

জন্ম ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৯২, কলকাতায়। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বেহালায় নিবাস। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালিখির প্রতি প্রবল ঝোঁক। ছোট থেকেই নানান সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা, গল্প সংকলন পড়ার প্রবল নেশা। মূলত ছোটগল্প, সামাজিক ছোটগল্পই পছন্দের বিষয়। ইতিমধ্যে ছোট মাঝারি কয়েকটি পত্র পত্রিকায় কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে।ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, পরে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা। বর্তমানে B. Ed ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত। ছাত্রছাত্রী পড়ানোর হেতু সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত বহু মানুষের সাথে আলাপ, পরিচয়। এই কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে জীবন, জীবিকা, জীবনের স্রোত, জীবনের ওঠা পড়া ইত্যাদি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ ও অনুভব সম্ভব হয়েছে। সেই রসদ পাথেয় করেই ছোটগল্প রচনার অনুপ্রেরণা। এ ছাড়াও আগ্রহের বিষয় ছবি আঁকা, মূর্তি নির্মাণ, গান বাজনা, ও হিন্দুশাস্ত্র ও দর্শন নিয়ে পড়াশোনা।

1 Comment

Biswarup Mandal · নভেম্বর 28, 2021 at 7:53 অপরাহ্ন

বেশ লাগলো। বেশ প্রাঞ্জল ঝরঝরে লেখা। লেখাতে গতি আছে। রূপকথার কাহিনীর মতো। একটানা পড়ে ফেললাম। বাস্তব যতই রূঢ় হোক, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে থাক এরকম কোমল অনুভূতি সমৃদ্ধ একটা গল্প। ঘুচে যাক সকল ব্যবধান। কন্ঠে থাকুক গান, হৃদয়ে থাকুক আশা, দুচোখে থাক এক আকাশ স্বপ্ন, বুকে সবুজ ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।