আমার অরুণেশ

শুভদীপ আইচ on

amar_arunesh

সঙ্গম শেষে একলা হয় চাদর
জেগে থাকে জলজ অভিমান
এ জাতীয় প্রত্যাশা তীব্র হলে ছুঁড়ে ফেলি উদাসী ঢেঁকুর
নতজানু হয়ে বসে পড়ি দেহজ ভোরের কাছে
কিছু যাপন কাঙ্ক্ষিত নয় জেনে
ভ্রমণ করে চলি লুকোনো সিন্দুকে ।

কক্ষপথ জুড়ে নগ্ন গণিকার দল কুশল সংবাদ চেয়ে বসে –
প্রত্যুত্তরে আমি নিশ্চুপ থাকি শহুরে রিক্সাওয়ালার মতো , হাতড়ে বেড়াই তার আচমকা বেকারত্বের ইতিহাস ।

আলো নিভে গেলে
পোকারা ঘুমিয়ে পড়ে
একইভাবে সম্পর্কেরাও

আর
আগুনের তলা জুড়ে

শুধু

পড়ে

থাকে

ছাই ।

কোন এক রাতে কিভাবে এই লেখাটা এসেছিল জানি না , তবে আমাকে দিয়ে এই লেখাটা লিখিয়ে নিয়েছিল কেউ । সে ঈশ্বর না শয়তান , রাক্ষস না ভগবান তা জানি না । তবে আমি তখন আচ্ছন্ন , আচ্ছন্ন এক প্রবল চুম্বকে । চুম্বক আসলে একটা বই – ” সন্তদের রাত ” । বইটি হাতে এসেছিল তেমন কোনো রেফারেন্স ছাড়াই । দৈবাৎ বা কাকতলীয় যাই বলি বইটি হাতে এসেছিল হটাৎ করেই । তার পূর্বে বইটির সাথে জড়িত ইতিহাস , প্রেক্ষাপট বা বাংলা সাহিত্যে তার গুরুত্ব এসব বিবেচনা করার কোনো অবকাশ বা সুযোগ সেসময় ছিল না ।

” সন্তদের রাত ” পড়তে গিয়ে বুঝতে পারি এই বোধ হয় সেই কলম যার প্রতীক্ষায় এতদিন ধরে জেগে রয়েছি । পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছি নিজস্ব খাদ্য । আসলে নিজের জন্য কোনটা পড়বো আর কোনটা পড়বো না তা যত তাড়াতাড়ি বুঝে নেয়া যায় ততই মঙ্গল , ওতেই লেখায় গতি বাড়ে । এর পর থেকে শুরু হলো তাঁকে আরো বেশি বেশি করে পড়তে চাওয়ার খোঁজ । কোচবিহার লিটল ম্যাগ মেলায় ভাগ্যক্রমে হাতে এল ” শব ও সন্ন্যাসী ” র সর্বশেষ একটি মাত্র কপি । অরুনেশ এর প্রথম বই (১৯৮১)। ততদিনে সেই বই নিয়ে কিছু কথা কানে এসেছে । পড়তে শুরু করলাম সেই অমোঘ উচ্চারণ । জলজ্যান্ত রক্ত-মাংসের কবিতা । শরীরের কবিতা থেকে খুলে পড়তে লাগলো কবিতার শরীর –

হেমন্তকাল

দড়িতে শাড়ি মেলে দেওয়া থাকে
এরকম তাে থাকে গেরস্থদের বাড়িতেও তবুও বেশ্যার উঠোনে হেমন্তকালের দুপুরবেলার
হাওয়ায় ফুলে ওঠা শাড়ি
ছাদের ওপরে পেয়ারা গাছের ছায়া
আর মােড়ায় বসে থাকা অন্ধ বৃদ্ধার হাই
এক ঘর থেকে আর-এক ঘরে যাওয়ার পথে একটি লাল শায়ার কমবয়সি কিশােরীর
উঠোনে দাঁড়ানাে, সারা শরীর ভাসিয়ে নেয় হেমন্তকালের রােদ ও হাওয়া
আর ফুলে ওঠা শাড়ি
তাহলে এখানেও আসে হেমন্তকাল?
দড়ি থেকে ঝুলতে থাকা শাড়ি
কালাে ব্রেসিয়ারের পাশে দুধের বাচ্চার জাঙ্গিয়া
পাটাতনের ওমে ঘুমােয় দুপুরবেলা মাতাল ও বেড়াল
একহাতে খুচরাে, অন্যহাতে দিশির বােতল নিয়ে
বিশাল দাঁড়ায় – ওই ন’বছরের ছেলে
ওই তো বেঞ্চির কোণায় বসে নখ কাটছে মা
পায়ের কাছে তারই শিশু একটি কাঁঠাল পাতা মুখে পুরে হেসে ওঠে কোথায় তফাত – কোন কালো কুয়াশা থেকে
বয়ে আসছে হু হু গাঢ় বাতাস
কোন কোন গভীরে সে নড়ে ওঠে
কোন গভীরতম লালে ? কোন গোধূলিতে ?
আর তাই দল বেঁধে শায়া আর ব্রেসিয়ার পরা মেয়েরা
নেমে আসে ঘর থেকে উঠোনে
উঠোন থেকে রাস্তায়
ভয়ঙ্কর হাসিতে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে দেয়
হেমন্তকালের নক্ষত্রে-ভরা ঠান্ডা কালো আকাশ
তীব্র হাতগুলি ডুবে যায় রক্তে-রক্তের ভেতরে – আর তুলে আনে
তুলে আনে মুঠো মুঠো সিফিলিস জীবাণু
ছড়িয়ে দেয় হেমন্ত-রাত্রিতে – আকাশে , হাওয়ায়
অনন্তকালের মানুষী ফসলে
সৌরজগতে রজ্জু হয়েছে দিব্য রাত্রির ছায়াপথ
সেখানেও থেমে আছে নক্ষত্র খচিত খন্ড খন্ড মাংস বহনকারী রথ
সেখানেও মেলে রাখা হয়েছে অধিভৌতিক শাড়ি
কোন নগ্নতার ? হাঁটুতে মুখ গুঁজে আমাদের দিকে চোখ
এ কোন ঈশ্বরী …

অগ্রজ দেবাশিস( মোহন্ত ) দা , সুরজ দাশ , বন্ধু সোহেল ইসলাম এর মুখে তাঁর অনেক গল্প শুনেছি । ‘উত্তর- দক্ষিণে’র সেই উত্তাল সময়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসাধারণ জীবন আলেখ্য ” আমার কবিতাযাত্রা ” ( পৌষ-মাঘ ১৪১৪ : সংখ্যা ৭৩,৭৪,৭৫ )

সেই সময় শুভম ভট্টাচার্য এর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে সেই সব দুর্বার পংক্তি –

” আসলে বুঝল্যা বয়স তো অনেক হইল .. এই সব নষ্ট শশা, পচা চালকুমড়ার মধ্যে …

দ্যাখাে, মদ্যপান আর যৌনতায় আমার কোনও লুকাচুরি নাই। আসলে ভদ্দরলােকরা গোপনে ওই কামটাই করে .. সব ভন্ড। এই লেখালেখির মধ্যেও ওই একইরকম ভন্ডামি দেখতে পাই “

সুদূর কোচবিহার এ থেকেও তিনি বাংলা কবিতাকে শাসন করে গেছেন । তাঁকে চাইলেও শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গের কবি বলে সরিয়ে রাখা যায় নি । একবার তাঁর লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে এক প্রশ্নকর্তার বেশ করুন পরিণতি হয়েছিল –

” আপনি লেখেন কেন? অনেককাল আগে এই ক্লিশে প্রশ্নটি আমাকেও করা হয়েছিল। করেছিল যে, সে আবার কোন এক সংবাদপত্রের সহ-সম্পাদকদের একজন। সময়টা প্রায় মধ্যরাত্রি, কাজের শেষে হাই তুলতে তুলতে ভেবেছিল, পাওয়া গেছে এক বােকা গেঁয়াে অর্ধশিক্ষিত লিখিয়েকে, কলকাতাইয়া স্টাইলে হাতের সুখ না হােক কথার সুখ ঝেড়ে নেওয়া যাক।
সঙ্গে সঙ্গে চপেটাঘাত আপনি চো * -ন কেন ?
না । আমি তাকে ইংরেজিতে বলিনি , ইন্টারকোর্স ( intercourse ) করেন কেন । বরং খাঁটি ও পবিত্র বাংলা ভাষার ‘ চ ‘ অক্ষর দিয়ে শুরু যে শব্দটি – তার চোখে চোখ রেখে তাই উচ্চারণ করেছি । সে একবারে ভেঙে পড়ে । হতাশ । কী আর বলব আপনাকে , বলে অন্য দিকে তাকায় । পরে অভিধানে দেখি, ইন্টারকোর্সের তিনটি অর্থ “আদান-প্রদান, ঈশ্বরের সঙ্গে ভাব বিনিময় আর যৌনসহবাস। “

আসলে তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলে এক সমুদ্র কম পড়ে যায় । যেমন রহস্যময় তাঁর কবিতা , উপন্যাস , গল্প তেমনই রহস্যময় তাঁর জীবন ও মৃত্যু । তাঁর পিতা গঙ্গেশ ঘোষ বেছে নিয়েছিলেন আত্মহণন এর পথ । তিনিও কি তেমনই কিছু ভেবেছিলেন ? সাঁতার জানা মানুষ যদি ডুবে যেতে পারে তবে বাংলাভাষায় তাঁর অবগাহন কতদূর গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল তা পাঠক মাত্রেই অনুধাবন করতে পারেন ।
পরিশেষে অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় এর ” বঙ্কিমচন্দ্র ” উপন্যাস থেকে তাঁর মুখনিসৃত কল্পিত বানী গুলি আরো একবার উচ্চারণ করি – ” আপনি তাে শুনেছি খুব ভালাে সাঁতার জানেন। জলে ডুবলেন কীভাবে – “

-“দ্যাহেন, আত্মহনন হইতেআসে একডা ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। উইল পাওয়ার আর সেলফ কন্ট্রোল। যে সন্তরণ জানে না, তার নিজের হাতে তো কিসুই নাই। ডুইবা যাওন তার নিয়তি নির্ধারিত। ভাইসা থাকন তার দ্বারা সম্ভব না। আমি সন্তরণ বিদ্যা জানি। যহন আমার ডুইবা যাওন দরকার তহন সন্তরণ বিদ্যার কৌশল প্রয়ােগ না কইরা ডুইবা যাওনের ইচ্ছাশক্তি আমার আছে। মাইনষে খালি ইচ্ছাধারী দ্যাহে। তার পিছনে
থাকা শক্তিডারে দ্যাহে না।”


ঋণ :

১. কবিতীর্থ / মাঘ ১৪১৮ / অরুনেশ ঘোষ স্মরণ সংখ্যা।

২. আমার কবিতা যাত্রা – অরুনেশ ঘোষ / উত্তর-দক্ষিণ পত্রিকা / নাটমন্দির প্রকাশনা।

৩. শব ও সন্ন্যাসী – অরুনেশ ঘোষ।



শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

1 Comment

Debashis Mohanta · আগস্ট 25, 2020 at 2:12 অপরাহ্ন

valo laglo…poribeshonao durdarto…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।