সবচে বড় ঠাকুর

দেবাশিস মহন্ত on

রবি ঠাকুর। চাট্টিখানি কথা। ঠাকুরও মে বড়া ঠাকুর, ও হ্যায় রবি ঠাকুর। তাঁর লেখা তো সিন্ধুসমান। ভাবছি, সন তারিখ দিয়ে এই লেখাটা ভারী করব না।তারচে যা মনে আসে তাই লিখি।
ছোটোবেলায় রবি ঠাকুরের গান বিশেষ পছন্দ করতাম না।ভালও লাগত না।হয়তো গানের কথা কোনও অভিঘাত তৈরি করতো না ভেতরে।আধুনিক বা লারেলাপ্পা শুনতাম। বাড়ির লোক খিঁচিয়ে উঠতো।এখন বুঝি — তাঁর গান কি জিনিস। তিনি অভিভাবকের মতো ছুঁয়ে আছেন জন্যে বেঁচে -বর্তে আছি। এহেন মানুষের সাহিত্য ভাবনা নিয়ে কোনও কতা হবে না।কতা হবে শুধু অনুভব, অনুভূতি, অভিঘাত আর কেমন করে তিনি থুড়ি আমরা ছুঁয়ে আছি তাকে…
সত্যজিৎ রায় খুব ভেবে -চিন্তে চলচ্চিত্র বিষয়টিকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি দেখলেন যে– ছড়া কবিতা অনুগল্প ছোটগল্প বড়োগল্প উপন্যাস নাটক কাব্যনাট্য নৃত্যনাট্য ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি কোনও বিষয়ই রবি ঠাকুর বাদ রাখেননি বিচরণ করতে। একমাত্র পথ হলো ঐ ফিলিম।যদি কিছু করতে হয় তাহলে ঐ পথেই এগোতে হবে…
কোথায় মাথা রাখব আর কোথায় রাখব না ভেবেই আকুল। আচ্ছা, ‘তোতা কাহিনি ‘-র কথাই ভাবি। সেই কবে, কতোদিন আগে লিখে গ্যাছেন এখনও একশ দশ শতাংশ প্রাসঙ্গিক, ভাবা যায়!নতুন নতুন দালানবাড়ি…ঝাঁ চকচকে রঙ…ইস্ত্রি করা ড্রেস… সজানো গোছানো অথচ খাঁচা অন্তঃসারশূন্য। পাখি যে ডানা ঝাপটিয়ে মরে।পাখি রোজ তিরিশ কিলোমিটার স্কুলভ্যানে স্কুল যায়।ভ্যানে উঠেই হাই- ওঠে পাখির। পাখির ঘুম পায়।ঘুমের মধ্যে পাখি তার স্বপ্নের জাল বোনে।সবুজ মাঠ।ধানখেত। খেলনাবাটি।ব্রেকের আওয়াজে পাখি ককিয়ে ওঠে।ভালও লাগে না।পুরোনো বাঁধন সে ভাঙতে চায়।কিন্তু হয়ে ওঠে না।কাঁচি আমাদের মতো স্মার্ট মা-বাবা। বেশি উড়লেই ডানা ঘচাং।পাখি গুমরে মরে …আজও মরে …ভবিষ্যতে…!
ছাড়ুন তো পাখির কথা। আরে মশাই, দু’দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত রবি ঠাকুরের লেখা। তাঁর বেশিরভাগ গানে,কবিতায় প্রকৃতির স্নিগ্ধরূপের কথা এসেছে বিভিন্ন ভাবে।গল্পে উপন্যাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধের কালো ছায়া ধরা পড়েছে। আর বাদ রাখেননি তাঁর ঈশ্বর চেতনার কথা। তাঁর চেতনায় জীবই শিব।মানুষের মধ্যেই তিনি ঈশ্বরের রূপ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি চিরকাল মানুষের পূজারী। এমন মানব জমিন রইল পতিত…
এই দেখুন, কী আস্পর্ধা আমার। তাঁর গুনাগুন গাইতে বসেছি। বেলা যে বয়ে যায় গো…।উপনিষদের ভাবনা কী দারুণ খেলা করে তাঁর লেখায়।বেলাশেষে ঘাটে এসে কার না শুনতে ইচ্ছে করে রবি ঠাকুরকে।সাধে বলে– হরি দিন তো গেল…
এই বৈশাখে — শুধু কী বৈশাখে ; বর্ষায়ও দারুণ মনে পড়ে আপনাকে। জানালার ধারে, রেলিং -এ মাথা ঠেকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে — আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে…। আহা…আহা…।বৃষ্টি দেখতে দেখতে ইতিহাস চেতনা কাজ করছে গো।সেই যে ‘আফ্রিকা ‘।শোষিত নিপীড়িত মানুষের কথা। কালো চামড়ার দূরের মানুষের কথা। আফ্রিকার মানুষেরা কিভাবে সর্বজনীন হয়ে ওঠে — এই বর্ষাতেও।
এই যা!বৃষ্টি নেমে গেল…। আপাতত আপনাকে এই বৈশাখে দু’একটা নুড়ির মতো কুড়িয়ে রাখলাম। কপালে ঠেকালাম পরমপুণ্যে…


দেবাশিস মহন্ত

জন্ম- ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯। পশ্চিমবঙ্গ-এর দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের কাছে একটি প্রান্তিক গ্রাম তিওড়-এ। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় স্কুল ম্যাগাজিনে। সিরিয়াসলি লেখালেখির শুরু শূন্য দশকের শুরুতে। বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কবিতার বই – ‘আলো নিভে গেলে’। তিনি বলেন – “ কবিতাই একমাত্র সাধনা। কবিতাই শিহরিত করে জানিয়ে দেয় এই চরাচরকে, চারিদিকে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে। এখনও লিখে চলেছি নিরন্তর। যা লিখতে চাই তা আর পারলাম কই। শুধু অতৃপ্তি …অতৃপ্তি … অতৃপ্তি …। শুধু অপেক্ষা সেই নিরাকারের। তাকে আকার দেব বলে পারে বসে আছি একা। বিশ্বাস করি - কবিতাতেই একমাত্র মুক্তি ...।“ বর্তমানে স্বাস্থ্যদপ্তরে কর্মরত।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।