পূজোর সেই পরিচিত স্মৃতি, আর কিছু কথা

দেবজিৎ সাহা on

pujur_smriti

ছোটবেলা পুজোর দুটো পর্ব ছিল।
কাঠামো তৈরি থেকে ঠিক পঞ্চমীর রাত পর্যন্ত ছিল প্রথম পর্ব। তারপর ষষ্টি থেকে দশমী ঠিক যেন ভোর থেকে গোধূলি অতিক্রম। মনে হতো নিমেষে পুজোটা শেষ হয়ে গেল।

তাই প্রথম পর্বটা ছিল খুব কাছের। সেখানে মুহূর্ত গুলো নিঃশব্দে আস্তে আস্তে হেটে যেত । প্রতিদিন একটু একটু করে পরিণত হওয়ার আনন্দ । প্রথমে কাঠামো তৈরি ; তারপর খড় আর দড়ি দিয়ে প্রতিটা মূর্তির দৈহিক অবয়ব।তারপর শুরু মাটি লাগানো। খড়ের সেই মুর্তিগুলি আস্তে আস্তে জীবন্ত হতে শুরু করে। সময় আস্তে আস্তে নিঃশব্দে হেঁটে যায়। ঠিক সন্ধ্যে বেলা হলুদ বাল্বের আলোয় মায়ের মুখটার ওপর কোনো এক শিল্পী কাজ করে চলেছে । তার দুজন সহকারীর কেউ হয়তো মহিষের মাথাটায় আরেকটু মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন। আরেকজন হয়তো গণেশের ভুঁড়ির গঠনটা নিয়ে ব্যাস্ত। চারিদিকে নিঃস্তব্ধতা । কয়েকটা ঝিঝি পোকা রাত্রির গতিবেগ আরো ধীর করে দেয়। ঠিক সেই সময়ের থপ করে একটা কুনো ব্যাঙ মন্দিরে ঢুকে পড়ে। কেউ তাকে আটকায় না। মন্দিরের সামনে রাখা বেঞ্চিতে পাড়ার বিমল জেঠু লুঙ্গি পরে বসে আছেন । এক হাতে বিড়ি আর অন্য হাতে গামছা দিয়ে মশা তাড়াচ্ছেন। বিড়িটা নিভে গেছে অনেক্ষণ। একশো ওয়াটের বাল্বের চারপাশে একটা মথ বিরামহীন ঘুরছে । বোধ হয় আলোর সাথে ওর ঝগড়া চলছে।আর কিছুক্ষন পর কাজ বন্ধ হবে। বিমল জেঠুও উঠে দাঁড়িয়েছেন । বাড়ি যাবেন। আর সতেরো দিন পর ষষ্টি। থাক সেকথা। বাকি এই কয়েকটা দিন ধৈর্য্য উপভোগ করার দিন । সে ভারী মজার । এই কয়দিন না থাকবে কোলাহল , না থাকবে ভিড়। না থাকবে ব্যাস্ততা। শুধু স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া শেষ করে মন্দিরের সামনে এসে বসে থাকা । সন্ধ্যে একটু পড়াশুনো সেরে আবার মন্দিরের সামনে বসে অফুরান চেয়ে থাকা যতক্ষণ না দিদা নিয়ে যেতে আসবেন ।

এইভাবে সময় আস্তে আস্তে নিঃশব্দে এগিয়ে যায় । ইচ্ছে হয় এই শিল্পসৃষ্টির খেলা যেন চলতে থাকে অবিরাম । আমরণ চলতে থাকুক শিল্পীর কাজ ; আমার বসে থাকা ; সন্ধ্যেবেলা হলুদ বাল্বের আলো ; ঝিঁঝিঁপোকার নিস্তব্ধতা ; জল কাদামাটি আর বুড়ো আঙ্গুলের দক্ষতা । দিনের পর দিন মাটির মূর্তি গুলো অস্তিত্ব আরো ঘনীভূত হয়ে আসে । তখনতো পরিপাটি রং নেই । তবে মাটির তো রং রয়েছে । পৃথিবীতে তো সব কিছুরই রং রয়েছে । মাটির রং হয় তো সেই সব অভিজাত রং এর মধ্যে পড়ে না । কিন্তু সেই রঙে রয়েছে সময়কে হার মানাবার শক্তি । সেই রং মিশে যায় স্মৃতিতে । যা মুছে যাওয়ার নয় । যে রঙে রয়েছে অদ্ভুত আলো ; অনেক প্রত্যাশা ; একটা ভালো কিছুর সংকেত ; হাজার হাজার শৈশবের গল্প মিশে থাকে শুধু এই রঙেই । কাঁচা মাটির রঙে উদীয়মান শান্ত মূর্তিগুলোকে তাই হঠাৎ আজ দেখলে সময় ও দূরত্বের ব্যবধান মিশে যায় । স্মৃতির ব্ল্যাকহোল দিয়ে মনটা পৌছে যায় শৈশবে ফেলে আসা সেই মহাকাশে যেখানে নেই কোন অভিকর্ষ ; যেখানে নেই কোন ঘড়ি ; শুধু আছে আস্তে আস্তে ভাসতে থাকা আর সামনে উদ্ভাসিত মুহূর্তের বিচ্ছুরণ । তারা শেষ হয়েও শেষ হয়না ।

এগিয়ে আসে মহালায়া। সেদিন ফোটানো হবে চোখ । সকলে আবার তাকাবে আনন্দ উল্লাস উন্মাদনা দুঃখ-দুর্দশা উন্নতি সবকিছুর মিলিয়ে এক অদ্ভুত সমাজ সভ্যতার ওপর । হাজার হাজার বছর ধরে তারা এভাবেই সব দেখছে । হঠাৎ প্রস্তুতি শুরু হবে জোর কদমে । আস্তে আস্তে সব হয়ে উঠবে রঙিন ; পালিয়ে যাবে নিস্তব্ধতা ; এগিয়ে আসবে মাইকের আওয়াজ ; প্রচুর প্রচুর মানুষ । তারা তখন আর মাটির মূর্তি নয় । বহুল অলঙ্কারে ভূষিত সৌন্দর্যের অদ্ভুত অস্তিত্ব । তারা তখন জীবন্ত । একটা অদ্ভুত উল্লাস মানুষের মজ্জায় মজ্জায় প্রবেশ করে । একটা অদ্ভুত মিল। মানুষের উপচেপড়া কৌতুহল উল্লাস দেখে মনে হয় এইতো মানুষ জীবনে অভিমুখে ছুটে চলেছে। সে তো হার মানেনি এত কিছুর পর । তার মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা শুধু ছিল সুপ্ত ।সেই প্রাণবন্ত মূর্তিগুলো ; সেই ঘনঘটা ; সেই আয়োজন , শঙ্খ ,ঢাক , ফুল , অঞ্জলি —এসব তো আমাদেরকে জায়গাতেই । এই চারটে দিন আমরা ভেসে যাবো অদ্ভুত এক জীবনীশক্তির স্রোতে। হতাশা কে ভুলে আপন করে নেবো মুহূর্তের আনন্দ। নতুন করে আবার শিখবো জীবন দর্শন। শুরু এবং শেষ , সৃস্টি ও ধ্বংসের আবর্তনের সূত্র ।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


দেবজিৎ সাহা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভারসিটি থেকে স্নাতক ও গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি থেকে স্নাওকত্তর । সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই লেখা লেখির জগতে প্রবেশ। কলেজ জীবন থেকেই লেখা লেখি শুরু করেন। পেশায় শিক্ষক। এছাড়াও ফটোগ্রাফি তে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।