রবির পাঠশালায়

তিস্তা চক্রবর্তী on

(১) যেতে যেতে নদীর সাথে দেখা

আঁকেবাঁকে চলা কোন ছোট নদীর দেখা পাইনি তখনো।প্রায় শুকিয়ে যাওয়া সরস্বতীর কাছে নিয়ে যেত বাবা । হাঁটুজলেডোবা স্রোতে পার হয়ে যেত মৃত পশুদের ভগ্নাবশেষ,শুকনো ফুল, শোলার মুকুট থেকে খসে যাওয়া ভাঙাচোরা কত মুহূর্তের সাক্ষীরা। দুর্গন্ধে নাকে হাতচাপা দিলেই বাবা বলে উঠতো,
“জানিস, এ নদীতে একসময় বাণিজ্যতরী ভাসতো।”

বাণিজ্যতরী!
মানে সেই চাঁদ সদাগর!জেঠু বলেছিল বেহুলার কথা।না না, গাঙুরের জল চিনিনি তখনও। তবু ভেলায় ভাসা জীবন্মৃতের যাত্রায় কেন জানি চোখ উপচে গালে নোনা জল আঁকিবুকি কাটতো।বাবা সেই জল ছুঁয়ে নিয়ে বলতো,
-“এইত্তো পেয়েছি!”

-“কি পেয়েছো!”
আকাশ তখন কৃষ্ণকলি মেঘের খামারবাড়ি।ঝড় এল বলে!
গালে ফুটে ওঠা শুকনো জলের রেখায় আদর বুলিয়ে মুচকি হেসে বাবা বলতো,

“আমাদের ছোট নদী।”

(২) রোব্বারের রবি

মুঠোফোনে তখনও বাঁধা পড়েনি ঝড়ঝঞ্ঝার কাল।’টেলিভিশন ‘রচনা লিখতে দিলে তখনও গম্ভীর কলমে লিখে দিতে পারতাম ‘ইহারে বোকাবাক্স বলাই শ্রেয়!’
বোকার হদ্দ সেই আমি রবিবারের আলসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কার্ণিশে বসে থাকা শালিকের সংখ্যা গুনতাম।সবাই জোড় সংখ্যার অপেক্ষায় থাকে।আমি বরাবর বিজোড়ে হাঁটাই সমীচিন মনে করেছি।অবশ্য তিনটে হলেই যে তারা ঝগড়া করবে এরকম কোনো সূত্র মেলেনি শেষ অব্দি!

এইসব হাবিজাবি ভাবনার তারে আচমকাই টান দেন ‘তিনি’।’তিনি’ অর্থাৎ যাঁর শুভাগমন নিয়ে আমাদের রবিসন্ধ্যার চন্ডীমন্ডপ জমজমাট হয়ে উঠতো চৈত্রের প্রথম প্রহর থেকেই।

হারমোনিয়ামের প্যাঁকপোঁক, আধকাঁচা সুরে “এসো হে বৈশাখ ” বা “পোস্তদের ডাক দিয়েছে “,সুর করে দুলেদুলে বলতে বলতে হঠাৎই ভুলে যাওয়া ‘প্রশ্ন ‘ বা লিকপিকে ‘বীরপুরুষ ‘দের ছাপিয়ে যা আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াতো তা হল নাটক।হ্যাঁ জানি এই জীবন একটা রঙ্গমঞ্চ আর আমরা প্রত্যেকেই সেখানে কুশীলব মাত্র, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি সেই বৃহত্তর মঞ্চের বাইরে একটিবারই মেকাপ চড়িয়ে সংলাপ আওড়ানোর মহান সুযোগ ঘটেছিল জীবনে।

‘জুতা আবিষ্কার’!শিশির কাকার অকৃত্রিম ভালবাসায় এইশর্মাও হবুরাজার গবুমন্ত্রী সেজে কলার উঁচিয়ে রেলা দেখিয়েছিলাম বেশ কিছুদিন।তখন তো বুঝিনি প্রভু, হবুগবুরা এভাবে শাসক নাশক বুদ্ধিজীবী নাম নিয়ে আমাদেরই মাথায় চড়ে বসে থ্যাটার করে যাবে আজন্মকাল!

আজকাল মাঝে মাঝে তিনি শিয়রে এসে বসেন।জেগে উঠি। আলোআঁধারিতে হাঁটু গেড়ে বসে প্রায় ভুলে যাওয়া সংলাপ আউড়ে বলি,

-“মহারাজ, বিচারটা সেরে ফেলা যাক ঝটপট।”

(৩) আমরা চঞ্চল আমরা অদ্ভুত

সে ছিল গুরুমস্তিষ্কে রাসায়নিক গোলযোগ ঘটার আদর্শ সময়।চারপাশে যাই ঘটে মনে হয় বুঝি এ অচলায়তন !অতএব ভেঙে দাও,গুঁড়িয়ে দাও।স্লোগানে স্লোগানে উষ্ণশোনিতজোয়ার –

“দেড়ে বুড়োর তাসের দেশ
ভাঙ্গবো আইন, মুছব লেশ।”

তা সেই নিয়ম ভাঙার খেলা খেলতে খেলতেই বেয়াক্কেলে দক্ষিণখোলা জানলা জানান দিচ্ছিল যে সেথায় আরেক খেলা বেশ জাঁকিয়ে তার সাম্রাজ্য স্থাপন করতে চলেছে। ঠিক করলাম সদর দরজায় কড়া এঁটে রাখব কষে।দেখি সে ক্যামনে আসে!

কিন্তু দমকা হাওয়ার মতো সব জানলাকপাট ভেঙ্গে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করলেন, “আমি অতিথি তোমারই দ্বারে …”
অতএব অতিথি সৎকারে প্রাণমন ঢেলে দেওয়াই নির্ধারিত হল।কিন্তু অতিথি কি আর চিরকাল বসত করে…ভিতরঘরে!অতিথি যায়, নতুন অতিথি আসে।ওই সেই “হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় এখন নতুনের খেলা আরম্ভ হবে ” গোছের থিওরি আর কী!

তা সে যাই হোক, এইসব ধুলোখেলার মাঝেই হঠাৎ কানে এসে বাজল এক নতুন মন্ত্র ,”নমো যন্ত্র …নমো যন্ত্র….নমো যন্ত্র…”
যন্ত্র বলল, “আহা ব্যস্ত কেন হও, আমি আছি কী করতে!বলো কি চাও…অর্থ? কীর্তি? যশ? নাকি প্রেম, প্রীতি …প্রাণের উৎসব?”

এ যে সবপেয়েছির আসর!এবার বুঝি মহামহিমের দর্শন মিলবেই মিলবে!
যন্ত্রের দাস হলাম।চাঞ্চল্য গেল, উচ্ছ্বলতাও।
এখন আমরা অদ্ভুত নই, বড্ড স্বাভাবিক।নিয়মমতে চলি।খাইদাই, ঘুমাই। ব্যাঙের সংসার বেড়ে চলে।
চক্রবৎ এখানে ফিরে আসে অচলায়তন … চিড়েতন রুহিতন হরতন আর ইস্কাবন!

(৪) আমাদের গেছে যে দিন

“ঘরেতে এল না সে তো,মনে তার নিত্য আসা যাওয়া
পরণে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।”

হাফসোল খাওয়া খোঁচাখোঁচা দাড়িওয়ালা প্রেমিকের দেওয়ালে টাঙানো ছবির ক্যাপশনে দীর্ঘকাল থিতু হয়ে বসে থাকা এই শব্দগুলো হাঁপিয়ে উঠলেও মন কিন্তু সেই কিনু গোয়ালার গলিতেই অক্লান্ত ঘুরপাক খেতে খেতে বৃদ্ধ হয়।কালের যাত্রাধ্বনি কানে ভেসে আসে বৈকি!

কলম বাগিয়ে যখন হাবিজাবি অক্ষরে ভরিয়ে তুলি সাদা পাতা, মৃণালের চিঠিখানা বড় উত্যক্ত করে।মৃণালকে মনে আছে নিশ্চয়ই!জট ছাড়িয়ে মুক্ত হতে চাই তো সবাই, হতে পারি ক’জন তার মতো করে!

প্রায়ই ভাবি একটা দীর্ঘ চিঠি লিখে চলে যাব অনির্দিষ্টে। কিন্তু লিখব যে কাকে তা নিয়ে একটা বেশ ধোঁয়াশা আছে মনে। চিঠি নাকি মৃত শিল্প এখন!লাল ডাকবাক্সে আর কোনো রসিকের পদাবলী ঠাঁই পায় না। বাসি হয়ে যাওয়া কবিতাগুলো সেকারণেই রাতের শেষে ছিঁড়ে কুটিপাটি করে ফেলি।

ব্যবহৃত হতে হতে দিন প্রতিদিন ভুলতে বসেছি আমার আধার …ঘড়া, নাকি দীঘি?তা সেই ঘড়া উল্টে বা দীঘি সাঁতরে যে সাগরে পৌঁছানো যায় না, তা বলাই বাহুল্য।তাই খাবি খেতে খেতে বাঁচাই ভবিতব্য।

শুধু অন্ধের যষ্ঠির মতো তিনি আছেন,যাঁর দীর্ঘ আচকানের খুঁট ধরে বড় নির্ভরতায় শেষের কবিতাখানা বিড়বিড়িয়ে উঠে বলি – “মরণরে, তুঁহু মম শ্যাম সমান”।

ঘুম না আসা দীর্ঘ কালো রাতগুলোয় যিনি আজও চুলে বিলি কেটে দিয়ে কানে কানে বলে যান,
“ওগো দুখজাগানীয়া, তোমায় গান শোনাবো।”


তিস্তা চক্রবর্তী

জন্মঃ হাওড়ার আন্দুলে। বর্তমানে গড়িয়ায় বসবাস। শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে এম.এ (২০০৪) পেশাঃ স্কুল শিক্ষিকা লেখালেখি শুরু লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরে। 'উৎসব ','সাপলুডো ','অপদার্থের আদ্যক্ষর' ইত্যাদি ম্যাগাজিনের পাশাপাশি 'নতুন কৃত্তিবাস ' ও 'দেশ ' পত্রিকাতে কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।