এক যে আছে জঙ্গল

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

jungle
ek j chilo jongol

দুপুরের দিকে দুটো আস্ত কলাগাছ আর এককাদি সােনা রঙের কুলপাই কলা সাবাড় করে বটগাছের ছায়ায় ঝিমুচ্ছিল মতি হাতি। এমন সময় হঠাৎ তার শুঁড়ের ওপর এসে বসল একটা হলুদ পাখি। মতি চোখ না খুলেই বলল, ‘কে রে তুই? অযথা ঘুমের মধ্যে ডিসটার্ব করছিস! দেখছিস তো বিশ্রাম করছি।’

হলুদপাখি অবাক চোখে বলল,’ডিস্টার্ব কই আমি তাে তােমায় একটা খবর দিতে এলাম মতিদা!’
মতি গেল রেগে, ‘এই দাদা, দাদা করবি না। কী বলতে এসেছিস বল?’
হলুদ পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে এসে মতির ডান কানে বসে ফিসফিস করে বলল,’ বিষয়টা সিরিয়াস মতিদা, খবরটা হল…।’
মতি ডানকান ঝাপটা দিয়ে বলল, ‘ডান কানে ধাপ্পা মত লেগেছে। তুই বরং বাঁ কানে বসে বল বিষয়টা।’
‘তােমায় নিয়ে আর পারা যায় না মতিদা।কতবার বলি কবিরাজ হনুর কাছে মাঝে মধ্যে যাও, সে কত কিছুর ওষুধ জানে।’
‘মেলা ফ্যাচফ্যাচ না করে বিষয়টা বলতো  দেখি।’

হলুদ পাখি তিড়িং বিড়িং করে চারপাশটা দেখে নিল। নাহ্, চারপাশে এখন কেউ নেই। এখন বলা যায় ভেবে যেই শুরু করতে যাবে এমন সময় বটগাছ বলে উঠল, ‘কী হয়েছে রে হলুদ?ফিসফিস করে কী কথা হচ্ছে দুজনের?’

হলুদ পাখি একটু মিচকি হাসল, ‘কই কিছু না তাে। মতিদার সঙ্গে একটু সুখ-দুঃখের কথা হচ্ছিল।’

বট বিরক্ত গলায় বলল, ‘তা অমন কানের ওপর চড়ে ফিসফিস করার মানে কী ? এভাবে আমায় অপমান না করলে চলছিল না? আমি কি তোদের শত্রু?’
তা শুনে মতি ঘাবড়ে গেল।সে মিনমিন করে উত্তর দিল, ‘সে কী কথা বটুকদা, আপনি শত্তুর হতে যাবেন কেন?’
‘বলি এই হলদে, বিষয়টি ঝেড়ে কাশ তো!’
বট এটুকু বলেই থামল না, ‘বিষয়টা খােলসা কর দিকিনি। আর খিদে পেলে আমার পুবদিকের ঝাঁকড়া ডালটায় লাল টুকটুকে ফল
ভরে আছে, খেয়ে নিস বুঝলি!’

‘তুমি কি ভালো বটুকদা’ বলেই হলুদ পাখি সাঁ করে উড়ে গেল বটগাছের পুবদিকের বড় ডালটার দিকে।

মতি চোখ পিটপিট করে বট গাছের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কবে কান্ডজ্ঞান হবে বলাে তাে বটুকদা! কেবল শুরু করবে কথাটা এই সময় তুমি খাবার লোভ দেখালে। এখন নাও দ্যাখো কতক্ষনে ফিরে আসে। আমার তাে চিন্তায় চিন্তায় সব হজম হয়ে
গেল। চার পা, শুঁড় সব ঠান্ডা হয়ে আসছে। কী যে খবর! বড্ড টেনশন হচ্ছে!’

বট গলা নামিয়ে বলল, ‘এখনই হলুদ যে ডালটায় বসে আছে সেখানে ঝাঁকুনি দিতে পারি, কিন্তু ভয় হয় হলদের অতটুকু শরীরে যদি ডালের ঝাপটা-টাপটা লাগে। তবে তো জঙ্গলে আর মুখ দেখাতে পারব না।’

তার কথা শুনে মতি বিড়বিড় করল, ‘এই হল তোমায় নিয়ে সমস্যা। অন্য গাছ হলে এখনই তা করত।’
বট দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘ না রে মতি, লম্বা গাছেদের মন মেজাজ ব্যবহার বেশ নরম হয়। সব্বাইকে বন্ধু মনে হয়।কাল রাতের কথাই বলি, তখন অনেক রাত। তা ধর নয় ঘটি, দশ ঘটি। ঘটি বুঝিস তো?’
মতি মাথা দুলিয়ে বলল, ‘কী যে বল! ঘটি বুঝবো না, সে তাে আমার ছ-মাসের ছেলে রিন্টুও জানে। আমরা বলি ঘটি আর
মানুষ বলে ঘন্টা।’
বট হেসে বলল, ‘তাের মাথাতো বেশ শার্প। তা তাের ছেলেটাকে সকাল-সন্ধ্যে একটু আধটু বুদ্ধি- টুদ্ধি দিচ্ছিস তাে?’
প্রশংসা শুনে মতির মস্ত কান লাল হয়ে গেল।সে শুঁড় দুলিয়ে লজ্জা মাখা মুখে উত্তর দিল, ‘তা আর বলতে, যা দিনকাল পড়েছে চারিদিকে শুধু ফাঁদ। শিক্ষা দীক্ষার বড়ই অভাব। তা কাল রাতের কথা কী বলছিলে সেটাই যে ভুলে মেরে দিলে কথায়-কথায়, এই তােমার সমস্যা বটুকদা।’
আহা সেটা তো বলছি রে, ‘এত কথা জমে থাকে। কে শােনে বল?’
‘নাও আর দেরি করো না তুমি শুরু কর।’

‘শোন তবে, কাল রাতে যখন সে চাঁদ আলো ছেড়েছে। খাঁটি ঝকঝকে আলো। সেসময় দেখি আমাদের পল্টু প্যাঁচা এসে বসল আমার পশ্চিমের সরু ডালটায়। আমি তাকে দেখে একটু আনন্দই পেলাম। ডালটায় একটু দোলা দিলাম। ছােটোবেলায় ওর বাবা আমার কোঠরে  ওকে রেখে খাবার খুঁজতে কোথায় কোথায় না যেত। মাঝে মধ্যে বেশ ছিল্লি দিয়ে সে  কাঁদত। তখন আমি দোল দিতাম। দোল দিলেই সে হাসত খিলখিল করে। তা সেই দিনগুলোর কথা ভেবে আমি গতরাতে দোল দিলাম। ভাবলাম পন্টু খিলখিল করে হেসে উঠবে। উলটে পন্টু রাগরাগ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, অযথা ইয়ার্কি করো না তাে, মন মেজাজ ভালো  নাই। তা শুনে আমি বললাম কেন রে? সে বলল, আর বলাে না, বনখালির ওপারে তেরঙ্গা নদীর ধারে এক টিয়া বন্ধু থাকে আমার। তার নাম টেটিয়া। সে আমায় দিনের খবর দেয়। কদিন আগে দেখা হতেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলেছিল, পল্টুরে চারিদিকে ফাঁদ। এখন আর যখন যেদিক খুশি ওড়া যায় না। একটু-আধটু ভুল হলেই জালে আটকে পড়তে হয়। এই তাে সেদিন অল্পের জন্যে বেঁচে গেলাম। জানিসই তাে বাজারে খাঁচা ভর্তি করে নিয়ে বসে মানুষেরা। ভাগ্যে যে কী আছে! তাে সেই বন্ধু আজ সকাল থেকে বেপাত্তা। বনখালির সংবাদদাতা খরগােস
বাচ্চু বলল, নিশ্চয় ধরা পড়েছে। আমি ওকে অনেকদিন নিষেধ করেছি কে শোনে কার কথা। এত চঞ্চল টিয়ে হলে চলে! টিয়ে হবে
শান্ত। দুপুরের দিকে লাল লঙ্কা ডাঁসা পেয়ারা খেয়ে দু-এক কলি গান করবে, তা না করে যখন তখন ঘােরাঘুরি! গােটা সন্ধ্যে আজ টেটিয়া-টেটিয়া করে বড় চেঁচালাম। নাহ, কোথাও সে নেই। সেই থেকে বড্ড় মন খারাপ। আমি দিনে দেখি না তাই সে দিনে ঘুরে ঘুরে আমায় খাবারের খোঁজ দিত। আমার জন্যেই কি সে ফাঁদে পড়ল? এই বলে পন্টু প্যাঁচা কাঁদতে শুরু করল।  সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখ ভিজে গেল। জানিসই তো আমার সামনে কেউ কাঁদলে আমার খুব কান্না পায়!’
একটু থেমে আবার বট বলতে লাগল, ‘এর জন্য একদিন হনু কবিরাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম,এই হনু এইটা রােগ নাকি রে? তা হনু তখন আরামসে আমার ডালে পা ঝুলিয়ে খাসা এক ছড়ি কলা খাচ্ছিল। আমার কথা শুনে লেজ নাড়িয়ে সে বলল, কোন ব্যাপারটা বটুকদা। আমি বললাম, এই যে কেউ
কাঁদলেই আমার কান্না পায় এই অসুখটার নাম কি?
হনু  মস্ত এক কলায় কামড় দিয়ে উত্তর দিল, এটাতো বিরাট রোগ। তেরঙ্গা নদীর দুটো
কুমিরের এই রোগ আছে। কুমির জলে থাকে, তাই তাদেরকান্না জলে দেখা যায় না। তবু
চিকিৎসা করেছিলাম, দুদিনেই ঠিক। তখন আমি বললাম, তা বাপ আমার একটু চিকিৎসা করা যায় না? আমার যে যখন-তখন চোখ
ঝাপশা হয়ে ওঠে। সে বলল, অবশ্যই চিকিৎসা করব, তার আগে বল তাে পুব দিকের কলা বাগানের চাপা কলা কী খাবার মত হল?’

বটের কথার মাঝখানে মতি বলল, ‘আমারও না মাঝে মধ্যে চোখ ভিজে ওঠে। তােমার কথা শুনে তাে টেনশনে পড়ে গেলাম। আচ্ছা বটুকদা এটা কী সাংঘাতিক কোনো রোগ?’
বট মতির কথার উত্তর দিতে যাবে এমন সময় ফুড়ুৎ করে মতির মাথার উপর এসে বসল হলুদ পাখি। তাকে দেখে শুড় দুলিয়ে গম্ভীর গলায় মতি বলল, ‘তুই এমন পাজি না! টেনশনে ফেলে রাখিস কেন বলতাে!’
হলুদ পাখি বলল, ‘বলছি বাবা বলছি। বিষয়টি সত্যি সিরিয়াস। শোনো তাহলে, আমাদের জঙ্গলের শুরুতেই যে বড় সুন্দরী গাছটা আছে তার একটা ডালে বসে সাদা একটা মেঘের সঙ্গে গল্প করছিলাম। মেঘকে জিজ্ঞাসা করলাম, মেঘভাই খবর কী? মেঘ উত্তর দিল, চলে যাচ্ছে। আমি বললাম, চলে যাচ্ছে মানে? মেঘ গােমড়া মুখে উত্তর দিল কতদিন রামধনু দেখি না, কত কে জিজ্ঞেস করে,উত্তর দিতে পারি না। বল হলুদ, রামধনু কী আমরা বানাই? আমরা কী রামধনু উঠলে মজা পাই না?’
‘শুধু শুধু আবোল-তাবোল বলে যাচ্ছিস হলদে…’ বলে চেঁচিয়ে উঠল বট।

হলুদপাখি বলল, ‘আরে সে কথাই তো বলছি। মেঘের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে, এমন সময় তেরঙ্গা নদীর মধ্যে দেখি কী একটা ভাসছে। মেঘ সেদিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, এ মা, এ যে একরত্তি হাতির বাচ্চা গো! এ যে ভেসে যাবে। বলেই মেঘ ভাসতে ভাসতে সেদিকে চলে গেল। আমি পড়লাম সমস্যায়। আমি হলাম এইটুকু পাখি, আমি তাে আর সাঁতার কেটে তুলে নিতে পারি না।’
বট, মতি একসাথে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ঠিক ঠিক, তাইতো-তাইতো।’
হলুদ পাখি বলল, ‘তারপর শােনো আমি মেঘের পিছু পিছু উড়ে মাঝ নদীতে গিয়ে ছােট্ট হাতিটার কানে কানে বললাম,
কে রে তুই? সাহসতাে কম নয়। একা একা নদীতে নেমেছিস। তাের বাবা মা কই। শিক্ষা দীক্ষা তাে মােটেই দেয়নি। ছােট্ট হাতিটা তখন
বলল, আমার বড় বিপদ। বাবা মাকে আটকে রেখেছে একটা সার্কাসে, আমি কোনােরকমে পালিয়ে এসেছি। তােমরা আমায় একটু সাহায্য
করবে? মা বলত তোমাদের এই জঙ্গল নাকি খুব ভালো।’
মতি সব শুনে হলুদ পাখিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এরপর কী হল?’
হলুদ পাখি আবার শুরু করল, ‘তােমার যে আর তর সয় না! ছােট্ট হাতিকে বললাম, সাহায্য করব মানে আলবাত করব।অনেক চোরাবালি, গর্ত সামলে তাকে আমাদের জঙ্গলে নিয়ে এলাম। টেটিয়া টিয়াকে ওর ঘর থেকে ডেকে নিয়ে এসে বললাম, আমি না ফেরা অব্দি ওকে  গান শােনা। আমি চারিদিকে খবরটা দিয়ে আসি।’
‘এইটা তুই কি করলি? খবরটা দিতে এসে খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লি? এর মধ্যে সার্কাসের লােক যদি খুঁজতে-খুঁজতে চলে আসে? ‘কথা শেষ করে মতি হাঁফ ছাড়ল।

হলুদ পাখি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘আমায় অত বােকা পেয়েছ? সব ব্যবস্থা করে এসেছি। মেঘকে বলেছি, ওকে মুড়ে চুপটি করে বসে থাকতে। সার্কাসের লােক এলে খুঁজেই পাবে না।’

মতি আর বট একসঙ্গে বলে উঠল, ‘বাহ্। তোর তাে দারুণ বুদ্ধি।’
বট আরও বলল, ‘আয় তােকে আরও কটা লাল ফলের খোঁজ দিই।’
মতি বলল,’ মাটিতে বস অনেক কাজ করেছিস। তােকে হাওয়া দিই, বলেই কান নাড়িয়ে সে হাওয়া দিতে লাগল।’
হলুদপাখি মাথা নিচু করে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘এমন করাে না তাে আমার লজ্জা লাগে। তার চেয়ে সবাই মিলে ঠিক করো কী করা যায়?

বট বলল, ‘ছেলেটাকে আমার কাছে নিয়ে আয়। আর মতি তুই গিয়ে সবাইকে খবরটা দে।’

বটের কথা শেষ হওয়া মাত্র মতি উঠে বসল।হলুদপাখির দিকে তাকিয়ে হুকুম করল, ‘যা হলুদ আর দেরি করিস না।’
বট সমস্ত ডালপালা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, ‘কে কোথায় আছো? বিপদ-বিপদ!’

দুই

কিছুক্ষণের মধ্যে বটগাছের তলায় সিংহ, বাঘ, হরিণ, শেয়াল, মতি, মতির ছেলে, কাঠবেড়ালী, বাদুড় সবাই এসে ভিড় জমালো। সবাই বলল, ‘কী হয়েছে মালিক?’
বট  রাগরাগ গলায় বলল, ‘মালিক মালিক করবি না তাে, অসহ্য লাগে। ‘
বাদুড় বলল, ‘আমরা হলাম তোমার বিনা পয়সার ভাড়াটে। কতদিন হল বাস করছি।

একটা প্রজাপতি উড়ে এসে বলল, ‘বাদুড় তাে  ঠিকই বলেছে। আপনি সত্যিই আমাদের মালিক। আপনার কচি, গোলাপী নরম পাতায় আমি নিশ্চিন্তে ডিম রেখে চলে যাই।’
কাঠবেড়ালী বলল, ‘ আপনার পাতার
গায়ে চকচকে মধুর মত যা থাকে তা খেয়েই তাে বেঁচে বর্তে আছি মশাই। আহা তার কি স্বাদ!’ ভিড়ের মধ্যে একটা পিঁপড়ে ছিল।সে বলল, এত বড় গাছ মশাই এক ডাল ঘুরতেই হাঁপিয়ে উঠি!’

বট বলল, ‘থাক আর প্রশংসা না করে সবাই শােনাে। একজন একটা সমস্যায় পড়েছে। আমাদের তাকে সাহায্য করতে হবে।’

ঠিক সেসময় হলুদ পাখি, টেটিয়া আর ছােট্ট হাতিটা এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। বট সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওই দ্যাখো , যার কথা বলবো বলে তোমাদের ডেকেছি সে চলে এসেছে!এই ছােট্ট হাতিটিই বিপদে পড়েছে । ওর বাবা মাকে সার্কাসে আটকা পড়েছে। আমাদের ওকে সাহায্য করতে হবে।তোমাদের সবার কি মত?’
সিংহের দিকে তাকিয়ে বট আবার বলল, ‘আপনার কি মত?’

সিংহ বলল, ‘আপনি গুরুজন, যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাতেই আমার সায়।’
বাঘের নাম পটু। সে সব কাজ পারে বলে নিজেই নিজেকে এই নাম দিয়েছে। সেই পটু বাঘ বলল, ‘যুদ্ধ বিগ্রহের কোনও চান্স নেই তাে? রক্তে টক্তে আবার আমার ভীষণ ভয় করে। ‘

এই কথা শুনে় পাখিদের মধ্যে
অনেকেই হেসে উঠল।

পটু বাঘ  নাকি গলায় বলল, ‘দুষ্ট পাখি, তোরা এমন করছিস কেন? এতে আমার আজকের কথা নয় রে, বহুদিন থেকে বলে আসছি।’

হলুদ পাখি খিলখিল করে হেসে বলল, ‘প্রধানমন্ত্রী মাননীয় পটুবাঘ মহাশয়,  বাচ্চাটিকে আমরা কথা দিয়েছি। এবার যুদ্ধের কথা বলে পিছিয়ে এলে জঙ্গলের মাথা নিচু হয়ে যাবে।’

মতি বলল, ‘প্রধানমন্ত্রী আপনি একবার যদি সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে ওঠেন। তবে আমি নিশ্চিত সার্কাসের সবাই ভয় পেয়ে দৌড় দেবে।

মহারাজ সিংহ বলল, ‘এ আবার কেমন কথা। ভয় পাওয়া মানুষজন দৌড়তে গিয়ে যদি এদিক ওদিক, হুটোপাটি করে নদী নালায় পড়ে যায় তবে তো রক্তারক্তি হতে পারে! ‘ 
প্রধানমন্ত্রী পটুবাঘ অনেকক্ষণ মাথা চুলকে লাজুক গলায় বলল, ‘আসলে মতি ভাই আমি গর্জনটাই ভুলে গেছি!’
ছােট্ট হাতি ছলছল চোখে বলল, ‘তবে কি আমার বাবা মাকে উদ্ধার করতে পারব না?’

টেটিয়া তাকে শান্ত করে বলল,’ যাও তুমি রিন্টু হাতির সঙ্গে খেলাধুলো করো। ততক্ষণে আমরা সবাই মিলে ঠিক করি কি করা যায়!’

ছােট্ট হাতি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ইনিয়েবিনিয়ে বলতে লাগল,’সে খেলবে না, খেলবে না, কিছুতেই খেলবে না।’

সবাই মহা সমস্যায় পড়ে গেল। ঠিক এইসময় বটের কোটর  থেকে চেঁচিয়ে উঠল পন্টু পেঁচা, ‘এই টেটিয়া আমায় একটু ডানা ধরে বাইরে নিয়ে আয় তাে, দিনে তাে আর কিছুই দেখি না। মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে।’
টেটিয়া তাকে বাইরে নিয়ে আসতেই সে উড়ে এসে বসল মতির মাথায়। বলল, ‘তবে শােনাে, টেটিয়া গান করে এইটা সবাই যেমন জানে,
তেমনি এটা জেনে রাখবে সে সবার গলা নকল করতে জানে। সে সব্বাইকে সবার ডাকটা শিখিয়ে দেবে। ডাক ভুলে যাওয়া তাে সমস্যার
কিছু নয়!’
টেটিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, ‘তাইতাে এটা তাে মাথায় আসেনি। ‘
সব পশু পাখি একত্রে বলে উঠল, ‘পন্টু পেঁচা কি জয়।’
কবিরাজ হনু বলল, ‘আহা, তাের কি বুদ্ধি পল্টুু! তােকে একটা প্রাইজ দেওয়া উচিত।’ কথা শেষ করেই সে ঝাঁপ দিয়ে মতির পিঠে উঠে পল্টুকে একটা মস্ত কলা এনে দিল।

এরপর সবাই গোল হয়ে বসল। সবার মাঝখানে বসল মতি, তার মাথায় টেটিয়া আর পল্টু। টেটিয়া শুরু করল, ‘আমরা ক’জন
মিলে হঠাৎ করে সার্কাসে হানা দেব। আমাদের এই দলে থাকবেন মহারাজ সিংহ।’

মহারাজ সিংহ মিনমিন করে বলল, ‘আমাকে থাকতেই হবে?’

সবাই চেঁচিয়ে উঠল, ‘অবশ্যই অবশ্যই।’

‘দলে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী বাঘ, সবার মাস্টারমশায় শ্রী শেয়াল… ‘কথা শেষ করতে পারল না টেটিয়া।
পটুবাঘ বলল, ‘যেতে পারি কিন্তু রক্তারক্তির মধ্যে আমি নেই বলে দিলাম।’
শেয়াল তার সঙ্গে গলা মেলালাে, ‘এই বুড়ো বয়সে দুম করে যুদ্ধে যাওয়া কি ঠিক কাজ হবে?’
আবার সবাই চেঁচিয়ে উঠল,’ অবশ্যই অবশ্যই।’

টেটিয়া চিৎকার  করে উঠল, ‘সবাই চুপ করুন এক্ষুণি  ক্লাস শুরু হবে।’

চুপ করে গেল সবাই। টেটিয়া মহারাজ সিংহের দিকে তাকিয়ে মাস্টারমশায়ের মত গলায় বলল, ‘আপনি একটা গর্জন দিন।’
মহারাজ মাথা নিচু করে বলল, ‘সেটাই তাে অনেকক্ষণ থেকে মনে করার চেষ্টা করছি রে টেটিয়া, পারছি না।’
বাঘ বলল, ‘আমারও মনে নেই।’
শেয়াল বলল, ‘আমারও।’

টেটিয়া সবাইকে সাহস দিয়ে বলল, চিন্তা নেই, আমার মনে আছে, ‘আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।’

বট বিড়বিড় করে বলল, ‘ভাগ্যিস টেটিয়া ছিল!’

একটা ক্লাসেই সবাই সবার ডাক শিখে গেল। সব শেষে টেটিয়া একটা ছোট্ট ভাষণ দিল, ‘ মনে রাখবেন আপনার ভয় দেখাতে যাচ্ছেন।তাই মুখ হাসি হাসি রাখবেন না। গর্জনের সময় মুখটা গম্ভীর করে রাখবেন।’
সিংহ মিনমিন করে বলল, ‘আসলে টেটিয়া অনেকদিন পরে ডাকটা ফিরে পেলাম তাে, তাই নিজের ডাকে নিজেরই কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে।’
বাঘ বলল, ‘আমারটা হচ্ছে?’
শেয়াল বলল, ‘হুক্কা হুয়াটা পরপর
তিনবার করব?’
টেটিয়া আবার ভাষণ শুরু করল, ‘হ্যাঁ তিনবার পরপর ডাক দিলে তা যতই কাঁচা হােক, তা গর্জনের রূপ নেবে। আপনারা মনে রাখবেন, মহারাজ, প্রধামমন্ত্রী ও শ্রী শেয়াল মাস্টারমহাশয় এটা একটা বড় পরীক্ষা শুধু নয়, আমাদের জঙ্গলের মান সম্মানের সঙ্গে একটা বাচ্চার মা- বাবা ফিরে পাবার লড়াই।’

তিনজনেই মিনমিন করে উঠল,’ঠিক -ঠিক -ঠিক।’
টেটিয়া সব শেষে বলল, ‘কাল রাত ঠিক দশ ঘটিকায় প্রতিবেশী খরগােশ বাচ্চু রিপাের্টারকে নিয়ে আমরা সবাই মিলে বেরিয়ে পড়ব। এখনকার মত সভা শেষ।’

তিন

ঠিক রাত দশ ঘটিকায় তারা রওনা দিল। সবার আগে রিপাের্টার খরগােশ বাচ্চু তারপর মহারাজ সিংহ, প্রধানমন্ত্রী বাঘ,
শিক্ষক শ্রী শেয়াল আর সবশেষে ছােট্ট হাতি, তার পিঠে হলুদ পাখি আর টেটিয়া।

যেতে যেতে টেটিয়া গান ধরল, ‘আমরা করব জয়… আমরা করব জয়।’
সবাই গলা মেলালাে। আরও অনেক গান হল। একসময় বিপাের্টার বাচ্চু খিলখিল করে হেসে বলল, ‘গান থামাও। এই এসে গেছি।’

মহারাজ সিংহ বলল, ‘সেই তো কখন থেকে শুনছি, এই এসে গেছি, এই এসে গেছি। আমার যে হাই উঠছে।’
প্রধানমন্ত্রী বাঘ বলল, ‘আমারও। খুব ঘুম পাচ্ছে।’
শ্ৰী শেয়াল যেই তাদের সাথে গলা মেলাতে যাবে, এমন সময় বাচ্চা হাতি চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই দ্যাখো সার্কাসের তাঁবু। ‘
টেটিয়া সব্বাইকে চুপ করতে বলে যুদ্ধ শুরুর ভাষণ দিতে লাগল, ‘আর দেরি নয়। সবাই নিজের নিজের পার্ট মনে রাখবেন।
সংগ্রামী পশুদের আমার অভিনন্দন। চলুন বীরদর্পে এগিয়ে যাই।’

গভীর রাত।সার্কাসের মানুষজন তখন সবাই ঘুমে। এমন সময় টেটিয়া ফিসফিস করে মহারাজ সিংহের কানে কানে বলল, ‘আপনি
লাফিয়ে ভিতরে ঢুকে প্রথম হুঙ্কার দেবেন।

মহারাজ সিংহ এদিক ওদিক তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ভিতরে ঢুকতে পারব তাে?’
টেটিয়া বলল, ‘অবশ্যই পারবেন।’
যা থাকে কপালে, জয় মা, জয় মা বলতে বলতে  মহারাজ সিংহ ঝাঁপ দিয়ে তাবুর ভিতরে ঢুকে পড়ল। ধড়মড় শব্দ হল। দু-একজন
মানুষ জেগে উঠল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে তারা বিশাল কেশরের হাসি হাসি মুখের সিংহ দেখে ঘাবড়ে গেল।
টেটিয়া উড়ে গিয়ে মহারাজ সিংহের
কানে কানে বলল, ‘আওয়াজ দিন, মানে গর্জনটা দিন মহারাজ, তিনবার।’
মহারাজ সিংহ জিভ কামড়ে বলে উঠল, ‘ভুলেই গেছি, এই বলে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘হক্কা হুয়া-হক্কা হুয়া-হুক্কা হুয়া। ‘
টেটিয়া থামানাের অনেক চেষ্টা করল, পারল না।

সার্কাসের মালিক ঘুম ভেঙে দেখল তার
বিছানায় ঘুমঘুম চোখে একটা বাঘ বসে আছে।তিনি  ভাবলেন স্বপ্ন। যেই নিজের গায়ে চিমটি কাটতে যাবেন, এমন সময় বাঘটা বলল, ‘আগে গর্জন দেব, তারপর আপনি দৌড় দেবেন এমনটাই আমরা ঠিক করেছি।’
বাঘ গর্জন দিল, ‘হুক্কা হুয়া-হুক্কা হুয়া-হুক্কা হুয়া।’

সার্কাসের মালিক  চিৎকার করতে লাগলেন,’কে কোথায় আছিস, পালা সবাই, তাবুতে পাগলা বাঘ পড়েছে… ‘। তারপর উদ্ধশ্বাসে দৌড়তে় লাগল। আর কয়েকজন চিৎকার করল, ‘ বাঘ নয় কর্তা, পাগলা সিংহ।
শ্রী শেয়াল এইসব দেখেশুনে বড্ড বিরক্ত হল। 
মহারাজ সিংহ ও প্রধানমন্ত্রী বাঘের ডাকের প্রতিশােধ নিতে নিজে হালুম হালুম বলে চেঁচিয়ে
উঠল কয়েকবার।
এইসব দেখে টেটিয়ার মাথা লাল হয়ে গেল লজ্জায়। ছােট্ট হাতির বাবা মা বিশাল একটা কাঠের গুড়ি ফেলে আর শেকল ছিঁড়ে
ততক্ষণে দৌড়ে চলে এসেছে।
সিংহ জিভে কামড় দিয়ে টেটিয়ার কাছে এসে বলল, ‘ওরে ভুল হয়ে গেল যে!’
বাঘ বলল, ‘আমারও, স্যরি।’
শেয়াল বলল, ‘আমারও।’
 
হলুদ পাখি কোথা থেকে ফুড়ুৎ করে উড়ে এসে বলল,’ যাই হােক কাজ তাে হয়েছে, এবার জঙ্গলে ফেরা যাক।’
জঙ্গলের কথা শুনে সার্কাসের একটা গাধা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে সে বলল, ‘আপনাদের দলে আমাকে নেবেন?
রাজহাঁস,  হরিণ,  বানর তাদের খাঁচা থেকে গলা মেলাল, ‘আমাদেরও নিয়ে চলুন না আপনাদের জঙ্গলে! কতদিন জঙ্গল দেখি না!’
জঙ্গলের কথা শুনে দুটো ময়ূর পেখম টেখম মেলে একাকার কান্ড করল।

টেটিয়া মহারাজ সিংহের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কি করা যায় এখন মহারাজ?’
সিংহ সত্যি রাজার মত উত্তর দিল, ‘বেশতো, আমাদের জঙ্গলে কি জায়গার অভাব? ‘

সবাই চেঁচিয়ে উঠল,
‘জয় মহারাজ সিংহের জয়।’

সেই ঘটনার পর অনেক দিন কেটে গেছে। শিক্ষক শ্ৰী শেয়াল এখন একটু চোখে কম দেখেন। তাই পড়ানাের ফাঁকে ফাঁকে
চোখ পিটপিট করতে করতে সবাইকে সেই গল্পটা শােনান়। গল্প শুনে তার ছাত্র- পশু পাখির দল হাসতে থাকে। হাসতেই থাকে। তবে
সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা হাসতে হাসতে বট, কবিরাজ হনু আর টেটিয়ার চোখ ভিজে ওঠে। তারা সবাই আড়ালে চোখের জল মুছে আবার
করে হেসে ওঠে।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।