গোলাপমোহিনী মল্লিক বালিকা বিদ্যালয়

রণিত দাশগুপ্ত on

golapmohini_balika_bidyalay

‘গোলাপ, বলি ও গোলাপ, তুই কি তোর বাবার সঙ্গে যাচ্ছিস?’ গোলাপের মা বিরক্ত হয়েই জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ গো মা। যাচ্ছি।’
‘কোথায় আমায় একটু কাজে সাহায্য করবি, তা না…’ কথা শেষ হবার আগেই, গোলাপকে তার বাবা হাত নেড়ে ডেকে নিল। দুজনে বেরিয়ে পড়ল।
কিছুদূর গিয়েই শিমুলবাবুর বাড়ি। উঠোনে শিমুলবাবুর সঙ্গে গ্রামের আরও জনা পাঁচেক লোক বসে আছে। এই সময় আর বিকেলে এনারা প্রায় রোজই এখানে থাকেন। তাঁদের মধ্যে থেকে অধোরবাবু ডেকে জিগ্যেস করেন। ‘কী হে হারাণ? মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কোথা চললে?’
‘আজ্ঞে বাবু, আমি যাচ্ছি ক্ষেতের দিকে। আর মেয়ে চলেছে ইস্টেশনের কাছে যে নতুন ইস্কুল বাড়ি হয়েছে তা দেখতে।’
‘ও আচ্ছা, সুরেনবাবুর নতুন স্কুল। কাল থেকেই তো চালু হবার কথা। উনিও তো এখন সিঙ্গুরেই থাকছেন।’ অধোরবাবু বললেন।
‘সুরেনবাবুর কথা যত ভাবি, তত অবাক হয়ে যাই। ভালোও লাগে। ভাবুন আপনারা, কলকাতায় অত নাম-ডাক, বিলেত পর্যন্ত গেলেন, কিন্তু কোনোদিন তার গ্রাম সিঙ্গুরকে ভোলেননি। বছর তিনেক আগে সিঙ্গুরে নিজের বাবার নামে রাজেন্দ্রনাথ মেমোরিয়াল হাসপাতাল বানালেন। তারপর এখন স্কুল বানাচ্ছেন।’ শিমুলবাবু বললেন।
কথা শেষ হওয়ামাত্র ঘোষবাবু বেশ উত্তেজিত হয়েই বললেন, ‘ভাবা যায় কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম বেসরকারি চেয়ারম্যান ছিলেন কিনা আমাদের এই সিঙ্গুরের সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক।’
ঠিক তখনই ওইখান দিয়ে যাচ্ছিল শিবনাথ। সে সিঙ্গুরেই থাকে। কয়েক বছর আগে কলকাতায় ছিল পড়াশোনা করার জন্য। এখন সিঙ্গুরের মহামায়া ইন্সটিটিউশনে পড়ায়। গ্রামে সবাই তাকে শিবু মাষ্টার বলেই ডাকে। ঘোষবাবুর কথা শুনে সে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘শুধু এটুকু বলছেন কেন ঘোষবাবু? ওনার আগে ওই পদে শুধুই বিদেশিরা সুযোগ পেত। আমাদের দেশের মানুষ যে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারে সে ধারণাই অনেকের ছিল না। কিন্তু সুরেনবাবু এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে বদলে দেন। এটাও বলুন ঘোষবাবু। ভুলে গেলে হবে না যে সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক একজন নামি উকিলও। ওনাকে নিয়ে কি আমাদের গর্ব করার বিষয় কম আছে? ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ তিনি Secretary of State-এর সদস্য নিযুক্ত হয়ে বিলেতে যান। সেই মানুষ দেশে ফিরে তার গ্রামের শিক্ষার, চিকিৎসা্র উন্নতি করার জন্য কাজ করছেন। রাজেন্দ্র মেমোরিয়াল হাসপাতালের মতো এত উন্নতমানের হাসপাতাল এই সময়ে কোনো গ্রামে আছে কি না আমার জানা নেই।’
‘ঠিকই বলেছ শিবু মাষ্টার। এরকম একজন মানুষ আমাদের সিঙ্গুরের গর্ব।’
উঠোনে যারা বসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন দেবব্রতবাবুও। তাঁর বয়েস পঁচাত্তর পেরিয়ে গেছে। এখনো দুবেলা তিনি শিমুলবাবুদের বাড়ির আড্ডায় আসেন। তিনি বললেন, ‘তোমাদের কারো মনে আছি কি না জানিনা। বা, তোমরা কেউ দেখছ কি না তাও জানিনা। এই সুরেন যখন লেখাপড়া করত, তখন সে সিঙ্গুরেই এক নৈশ বিদ্যালয় শুরু করেছিল। গ্রামের গরীব ছেলেরা রাতে সেখানে পড়তে যেত। আর সে নিজেও তাদের পড়াত।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি। আমার এক খুড়তুতো দাদা সেখানে পড়তে যেত। তবে ভুলে গেছিলাম। আপনার কথায় মনে পড়ল।’ বললেন অধোরবাবু।
‘এটা আমারও জানা ছিল না। আচ্ছা, আমি এবার স্কুলে চললাম। পরে দেখা হবে। আর এরকম আরও অনেক গল্প দেবুজ্যাঠামশাইয়ের থেকে শুনতে হবে।’ শিবনাথ এগিয়ে গেল।
‘শিবুদাদা, তুমি কি এখন নতুন স্কুলে যাবে?’ গোলাপ পিছন থেকে ডাকল।
‘হ্যাঁ, দেখি, যাব। একবার নিজের স্কুলেও যাব।’
শিবনাথকে যেতে দেখে হারাণও বলল, ‘বাবু, আমিও তাহলে এগোই।’ শিমুলবাবু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
যেতে যেতে হারাণ বলল, ‘বুঝলি গোলাপ, একবার তোর দাদুর, মানে আমার বাবার খুব জ্বর হয়েছিল। সে দু-তিন দিন জ্বর আর কিছুতেই কমে না। ভাগ্যে তখন গ্রামে রাজেন ডাক্তারবাবু ছিলেন। উনি তো আর সবসময় এখানে থাকতেন না। উনি থাকতেন কলকাতায়। এই রাজেন ডাক্তারবাবু হলেন সুরেনবাবুর বাবা। যার নামে ওই হাসপাতাল করেছেন সুরেনবাবু। তা সেই ডাক্তারবাবুকে খবর পাঠানোয় তিনি এলেন। দেখলেন। নিজের থেকেই ওষুধ দিলেন। একটা পয়সাও নিলেন না। সেই ওষুধ খেয়ে বাবা দুদিনে ভালো হয়ে গেলেন।’
‘ডাক্তারবাবু তাহলে খুব ভালো ডাক্তার, তাই না বাবা?’
‘হ্যাঁ রে। এনারা বড় ভালো মানুষ। বড় মানুষ। যেমন ছিলেন রাজেন ডাক্তারবাবু। তেমন সুরেনবাবু। ভগবান ওনাদের মঙ্গল করুন।’
‘আমিও লেখাপড়া করব। আমিও বড় হব বাবা। হব না?’
হবি, হবি, নিশ্চয়ই হবি। হতেই হবে।’
‘শিবুদাদা বলেছে, এই নতুন স্কুলে আমায় ভর্তি করে দেবে। ’
‘শিবু মাষ্টার তোকে বলেছে?’
‘হ্যাঁ গো বাবা। শিবুদাদাই তো বলে, মেয়েদের পড়াশোনা করা উচিৎ। তোকে লেখাপড়া শিখতে হবে। লেখাপড়া শিখে কলকাতায় যেতে হবে। সেখানে গিয়ে আরও পড়তে হবে।’
মেয়ের কথা শুনে হারাণের ভালো লাগে।
চৈত্র মাস সবে কদিন হল পড়েছে। রোদ্দুরের তেজও আসতে আসতে বাড়ছে। ওরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের কাছে পৌঁছে গেল। নতুন স্কুল বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। গোলাপ এক দৌড়ে চলে গেল সেখানে।
দরজার কাছে পৌঁছিয়ে দেখল, ভিতরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। একজন মানুষকে ঘিরে সবাই কথা বলছেন। ওমা, ওই তো, ওখানে শিবুদাদাও আছে। শিবুদাদা বলে ডাকতে গিয়েও ডাকল না গোলাপ। অতজন ওখানে আছেন। গোলাপ মন দিয়ে ইস্কুলবাড়িটা আর সেখানের লোকজনকে দেখতে লাগল।
গোলাপ শুনল, শিবনাথ বলছে, ‘গ্রামের সব মানুষ কিন্তু এখনও মেয়েদের লেখাপড়া করার সমর্থন করেন না।’
সেই মানুষটি বললেন, ‘জানি।’
আরেকজন বললেন, ‘এই যে আইন করে মেয়েদের বিয়ের বয়েস বাড়িয়ে ১৪ করা হয়েছে, তার সেরকম প্রভাব নেই গ্রামে। বাল্যবিবাহ কিন্তু এখনো হয়ে চলেছে।’
সেই মানুষটি আবার বললেন, ‘জানি।’ একটু থেমে বললেন, ‘এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার সঠিক উদ্যোগ নিচ্ছে না।’
সেই মানুষটি কথা বলতে বলতে হঠাৎই দরজার দিকে ফিরলেন। আর ফিরেই গোলাপকে দেখে বেশ অবাক হলেন। সবাইকে ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে শুরু করলেন গোলাপের দিকে। গোল চশমার ভিতরে তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
গোলাপ শুনতে পেল পিছন থেকে শিবুদাদা বলছে, ‘সুরেনবাবু, এই হলো আমাদের হারাণ কাকার মেয়ে।’
গোলাপ বুঝল, ইনিই হলেন সুরেনবাবু। সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক। এই ইস্কুল যিনি বানিয়েছেন। যার এত্ত গল্প সে শুনেছে।
শিবুদাদা পিছন থেকে আরও কী যেন বলে যাচ্ছিল। সেকথা যেন পৌঁছলোই না সুরেনবাবুর কানে। তিনি এগিয়ে আসছিলেন গোলাপের দিকে।
গোলাপের যেন একটু ভয়েই লাগল। একবার মনে হল ছুটে পালিয়ে যায়। স্কুলের গেটের কাছে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য উনি কী তাকে বকবেন?
গোলাপ দেখল, সুরেনাবাবুর মুখে অল্প হাসি। তিনি এসে দাঁড়ালেন গোলাপের একদম সামনে। তারপর তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে হাসিমাখা মুখেই জিগ্যেস করলেন, ‘কী নাম তোমার?’
‘গোলাপ।’
‘গোলাপ!’ অবাক হয়ে তাকালেন সুরেনবাবু।
মাথা নাড়ল গোলাপ।
‘আমার মায়ের নামও ছিল গোলাপ। গোলাপমোহিনী। এই স্কুলের নাম জানো?’
দুপাশে মাথা নাড়ল গোলাপ। সে জানে না।
‘গোলাপমোহিনী মল্লিক বালিকা বিদ্যালয়। এই স্কুল আমার মায়ের নামে। এই স্কুল বানিয়েছি যাতে তোমরা লেখাপড়া শিখতে পারো।’ কথাটা বলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক। ‘কী? তুমি আসবে তো স্কুলে পড়াশোনা করতে? লেখাপড়া শিখবে তো?’
গোলাপ আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা।
গোলাপ দেখল, বাবা হাসিমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।



রণিত দাশগুপ্ত

অনিয়মিত লেখালিখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। যেমন - আজকাল, তথ্যকেন্দ্র, দৈনিক স্টেটসম্যান, একদিন, কয়েকটি ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্ম।

1 Comment

সুকান্ত দে · সেপ্টেম্বর 18, 2020 at 7:37 অপরাহ্ন

সবিনয়ে জানাই গল্পটির মধ্যে বেশ পজটিভ এনার্জি থাকলেও বাঁধুনি বেশ আলগা লাগলো। যদিও একজন মানুষ এর বিশেষ কিছু কাজ ও তার ইতিহাস প্রকাশের স্বার্থেই এমনটা করা হয়েছে বলে মনে হল। অনেকজন এর কথোপকথন এর বদলে দু-একজনের বা প্রবীন মানুষটিকে দিয়েই দরকারি তথ্যগুলো দিয়ে দিলে ভালো হতো।
তবে এমন ইতিবাচক উদাহরণ বা গল্পগুলো থাকাটা সমাজের জন্য খুব প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।