স্যানিটোরিয়াম

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় on

[১]

পাহাড়ের গায়ে বহুদিনের পুরোনো স্যানিটোরিয়াম। সেই সাহেবদের আমলে বানানো। মিশনারীদের হাতে ছিলো কিছুদিন। স্বাধীনতার পর, কোনও একটি গান্ধীবাদী মহিলাগোষ্ঠী এর পরিচালন-ভার গ্রহণ করেন। সেই থেকেই চলে এসেছে এতবছর। শ্রীময়ীই এখন এই আশ্রমের সর্বেসর্বা। স্যানিটোরিয়ামের ধারণাটা উঠে যেতে পেরেছে। এখন এই আশ্রমের সম্পূর্ণ চত্বরটিকে দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। দুটি ভাগের একটিতে একটি অনাথাশ্রম, অন্যভাগে একটি বৃদ্ধাবাস। উত্তরপূর্বাংশের কোনও একটি শৈলশহর। এখানে আকাশ নীল। মেঘেদের অনবরত আসা-যাওয়া চলে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কুয়াশারা গড়িয়ে যায়।

কাছাকাছির মধ্যে উপজাতি এলাকার খান ত্রিশেক ছেলেমেয়ে, আশ্রমের বোর্ডার। সকলেই যে অনাথ তা নয়। মূলত বেশীরভাগেরই বাড়িতে তাদের বাপমায়েদের সাধ্য নেই তাদের ছেলেমেয়েদেরকে পয়সা খরচ করে লেখাপড়া শেখানোর। কাজেই, এই একটি মাত্র অনাথাশ্রমেই তারা এসে ভর্তি হয়। ক্রমে ক্রমে বড়ো হতে হতে একদিন, তারা আশ্রম ছেড়েও যায়। দুটি-একটি করে ছেলে প্রত্যেকবারেই জেলা সদরের বড় ইস্কুলে পড়তে যায়। বাকিরা এখানেই কোথাও ছোটোখাটো কোনও কাজ জুটিয়ে নেয়। ছোট্ট শহর, আধা-মফস্বল বলা চলে। শান্ত সমাহিত পরিবেশ। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি, কাছের দুটি উপজাতি গ্রামকে মডেল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রীময়ীর ভালো লাগে এখানকার সবকিছুই। শ্রীময়ীর আর কলকাতায় ফেরা হয়ে ওঠেনি। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে যেন সময় পেরিয়ে যেতে পেরেছে। একটা একটা করে, দীর্ঘ তেইশটা বছর …

-“তোমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না দিদি ?” শিরিং একগাল হেসে জিজ্ঞেস করে।
-“এই প্রশ্নটা এই নিয়ে তুই আমাকে বোধহয় একশো কোটিবার করলি শিরিং”, শ্রীময়ী জবাব দেয়, “যবে থেকে তুই পাশ করে বড় ইস্কুলে যাবি ঠিক করেছিলিস, সেই তবে থেকে আজ অবধি। উত্তরটা মনে থাকে না তোর ?”
-“তোমার তো সেই একটাই উত্তর গো দিদি, ‘এটাই বাড়ি আমার’ – বললেই হলো বুঝি ?” শিরিং নাছোড়বান্দা, “তোমার বাপ মা ভাই বোন কেউ কোত্থাও নেই ?”

শ্রীময়ী উত্তর না দিয়ে রেজিষ্টার খাতা মেলাতে থাকে। ভারী কথা বলে এই শিরিং ছেলেটা। আজ পাঁচ বছর হলো সে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে এই আশ্রমেই বেয়ারা কাম পিওনের চাকরিতে ঢুকেছে। ভারী ভদ্র ছেলেটি, মুখে সবসময় একটা হাসি লেগেই থাকবে। কিন্তু ওই যে, দোষের মধ্যে একটিই বলতে হয় – একবার কথা বলতে শুরু করলে আর রক্ষে নেই।

শ্রীময়ী গম্ভীর ভাবে রেজিষ্টার খাতাটা মেলানো শেষ করে। তারপর শিরিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “যা তো, গিয়ে দেখে আয় চট করে – মালতী ম্যাডামের ক্লাস নেওয়া শেষ হলো নাকি। মিসেস স্কটের তো আসবার সময় হয়ে এলো।” মিসেস স্কট, নিঃসন্তান। স্বামী গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর। আজ প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেলো তিনি এই আশ্রমের সাথে যুক্ত; শ্রীময়ীর অনেক আগে থেকেই। মালতী মিত্রের স্বামী এই শহরের নামী একটি ব্যাঙ্কের ডেপুটি ম্যানেজার। তাঁরাও এখানে আছেন প্রায় দশ বছর। এঁরা দুজন ছাড়া আরও দুজন পুরুষ শিক্ষক রয়েছেন, এই আশ্রমের সঙ্গে। বৃদ্ধাবাসের আবাসিকদের দেখাশোনার জন্যও দুজন কাজের মহিলা রয়েছেন। তাদের আয়ার কাজও জানা আছে। শহরের ডাক্তার মাসে দুবার করে এসে আবাসিকদের রুটিন চেকআপ করে দিয়ে যান। কলকাতা থেকে আশ্রমের খরচ নির্বাহের জন্য মোটা অঙ্কের একটা টাকা এসে জমা পড়ে শহরের ব্যাঙ্কে, প্রত্যেক মাসেই। কাগজপত্র সব শ্রীময়ীর নামে করা আছে। কোনোরকমেরই কোনও অসুবিধের জায়গা নেই। শিরিং কি একটা যেন বলবো বলবো করেও উঠে গেলো। শ্রীময়ীর একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস পড়ে। গৌহাটি এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িটা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। শ্রীময়ী টেবলের খাতাপত্রগুলোকে গুছিয়ে তুলতে শুরু করে। তার এখনও কাজ অনেক বাকি।

[২]

গাড়িটা এসে পড়েছে। কলকাতা থেকেই ফোনে বলা ছিলো শ্রীময়ীকে। বৃদ্ধাবাসের নতুন ইনমেট আসবেন। এনার বয়স প্রায় পঁচাত্তর। টকটকে রঙ, সুন্দর চেহারা। কলকাতায় নাকি বড়ো ব্যবসা ছিলো ইলেকট্রনিক্সের। ছেলে বিদেশে, স্ত্রী গত হয়েছেন অনেকদিন। সম্প্রতি চোখের কি একটা জটিল রোগের কারণে দৃষ্টিশক্তি প্রায় খুইয়ে ফেলেছেন। ছেলের কাছে গিয়ে থাকতে রাজি নন, কাজেই – ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম। এসবে শ্রীময়ীর আর কিছু মনে হয় না আজকাল। এতবছর থাকতে থাকতে এসব তার কাছে এখন পুরোনো হয়ে গেছে। বৃদ্ধাবাসের প্রায় প্রত্যেক আবাসিকেরই মোটামুটি একই রকমের ইতিহাস; এবং ঘটনা হলো যে এঁরা প্রত্যেকেই অবস্থাপন্ন ঘরের। আশ্রমে থাকার জন্য এঁরা, প্রত্যেকে একটা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে থাকেন প্রতিবছর। অনাথাশ্রমের ব্যয় মেটাতে সেই ফান্ডকে ব্যবহার করা হয়। শ্রীময়ী এবারে পোর্টিকোতে নেমে এসে দাঁড়ায়। সাহেবী আমলের বাড়ি হলে যেমনটা হয়। গাড়িটা একদম সিঁড়ির সামনেটায় এসে দাঁড়ালো।

দৃষ্টি খোয়ালেও শরীরটা ভাঙেনি তেমন। লাঠি ঠুকে ঠুকে চলাফেরা করেন। ভদ্রলোককে দেখে সমীহ করতে ইচ্ছে হয়। বোঝাই যায় যে এককালে কতখানি দাপটের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন, অথচ আজ … “আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো ?” কেজো-ভদ্রতায় শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করে। ভদ্রলোক ইশারায় বুঝিয়ে দেন, অসুবিধে হয়নি। শ্রীময়ী রেজিষ্টারের কাজ সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

দিন পনেরো কেটে গেছে। নতুন ভদ্রলোক বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন। রোজ বিকেলেই একটু করে হাঁটেন আশ্রম চত্বরটায়। শ্রীময়ীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। শ্রীময়ীও দু’চারটে কথা জিজ্ঞেস করে। ভদ্রলোকও জবাব দেন। তবে এই’কদিনেই শ্রীময়ীর মনে হয়েছে যে, উনি বেশ কম কথার মানুষ। একদিন শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করেছিল, এখানকার খাওয়াদাওয়াতে ভদ্রলোকের কোনওরকম কোনও অসুবিধে হচ্ছে কি না। হাত নেড়ে অল্প হেসে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। বৃদ্ধাবাসের অধিকাংশ আবাসিকেরই এই সমস্যাটা হয় অবশ্য প্রথম প্রথম। তাঁরা যেন কেমন একটা হীনমন্যতায় ভোগেন। হয়তো বা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, সত্যি সত্যিই আজ তাঁরা এইখানে এসে পড়েছেন। সত্যি সত্যিই আর তাঁরা কোনোদিন, নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবেন না। আশ্চর্য এটাই যে – অধিকাংশেরই অর্থের অভাব নেই, কেবলমাত্র শারীরিক অক্ষমতার কারণে এভাবে অচ্ছ্যুৎ হয়ে থাকা … শ্রীময়ীও প্রথম প্রথম প্রচুর এ্যানালিসিস করতে চেয়েছে। পরে নিজের মনকে এভাবে বুঝিয়েছে যে, এই আবাসিকদের কারণেই তো ওই ত্রিশজন অনাথের অন্তত ভরণপোষণের ব্যবস্থা হচ্ছে। আবার কচিকাঁচাদের দুএকজন থাকবার ফলে, বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদেরও সময়টা কেটে যায় একরকম। কেউ কেউ তাঁদের একেকজনকে ধরে নিয়ে যায়। গল্প শুনবে বলে ঘিরে ধরে তাঁদের। ভাঙা ভাঙা হিন্দী-ইংরেজী, এমনকি কখনও কখনও বাংলাতেও; একেকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বসে পড়েন, তাঁদের নতুন পাওয়া সংসারকে নিয়েই। স্যানিটোরিয়ামের বিকেল নরম হয়ে রোদ পড়ে আসে। পাহাড়ের ছায়াগুলো আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়। শ্রীময়ী তখন জেনারেটার চালায়। সন্ধে হয়ে আসে হঠাৎ।

[৩]

ভদ্রলোক কিছু একটা খুঁজছিলেন। আজ বিকেলে ভদ্রলোককে হাঁটতে না দেখে শ্রীময়ী তাঁর ঘরে এলো। উনি তখন টেবিলে ভর দিয়ে নীচু হয়ে কিছু একটা দেখবার চেষ্টা করছেন।

-“কিছু খুঁজছেন আপনি ?” শ্রীময়ী জিজ্ঞেস করে।
-“হ্যাঁ মানে ওই,” ভদ্রলোক আরও একটু ঝুঁকে দেখবার চেষ্টা করেন।
-“আমাকে বলুন না, আমি দেখছি,” শ্রীময়ী ঘরে ঢুকে আসে, “কি জিনিস খুঁজছেন আমাকে বলুন।” ভদ্রলোক সোজা হয়ে দাঁড়ান। তারপর আস্তে আস্তে হাতে ভর দিয়ে চেয়ারে বসে পড়েন।

-“একটা ছবি, ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট – পুরোনো হয়ে গেছে, কোথায় যে ফেললাম,” ভদ্রলোক আস্তে আস্তে বলেন।
-“আপনার ছবি ?” অসচেতন ভাবেই জিজ্ঞেস করে শ্রীময়ী।
-“একটি মেয়ের ছবি,” ভদ্রলোক জবাব দেন, “যদিও…”, ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। শ্রীময়ী অতটাও খেয়াল করে না। সেও হাঁটু গেড়ে মেঝের উপরটায় বসে পড়ে। সন্ধানী চোখে এদিক ওদিক তাকায়।

ঘরটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে এসেছে। বিকেল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। শ্রীময়ী খাটের তলাটায় উঁকি মারে । টেবলের নীচটায় অন্তত কিছু পড়ে নেই। এরমধ্যেই দেখে নিয়েছে সে। আলমারির তলায় …

-“ছবিটাকে শেষ কখন দেখেছেন ?”
-“এই তো, কিছুক্ষণ আগেই,” জবাব দেন ভদ্রলোক, “আজ – আসলে”
-“কি ?”
-“যতদূর জানতাম – আজ ওর জন্মদিন, তাই ভাবলুম ছবিটা …”

শ্রীময়ী উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে। সময় কেটে যাচ্ছে।

-“আসুন না একটু বেড়িয়ে আসি, ঘরের মধ্যে তো কোথাও চোখে পড়ছে না,” শ্রীময়ী সাবধান হয়। একফালি একটি ঘর। একখানি আলমারি, একটি টেবল, একখানি চেয়ার আর একটি তক্তপোশ। আসবাব বলতে এই। বিছানার উপরে অন্তত কিছু নেই, খাটের তলাতে বা আলমারির তলায়ও না। “ঝাঁট পড়লেই বেরিয়ে আসবে হয়তো, না হলে দিনের বেলা একবার ভালো করে খুঁজে দেখবেন,” শ্রীময়ী ভদ্রলোকের চিন্তাটাকে কাটাতে চেষ্টা করে।

অন্ধকার হয়ে আসছে আস্তে আস্তে। স্যানিটোরিয়ামের একটা দিকে ঘাসজমি ঢালু হয়ে খাদে নেমে গেছে। তার ওপাশে আরও অনেকগুলি পাহাড়। নভেম্বর-ডিসেম্বরে আকাশ পরিষ্কার থাকলে নাকি আরও আরও দূরের হিমালয়ের দুটো-একটা শৃঙ্গও স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়। শ্রীময়ী নিজেই দেখেছে বেশ কয়েকবার। গতবারের শীতেও গোরিচেন সামিটটাকে দেখা গেছে খালি চোখেই। অরুণাচল প্রদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এই গোরিচেন, উচ্চতায় ৬৮৫৮মিটার। পাহাড় আর বরফ, বড় প্রিয় শ্রীময়ীর। পাইন বন, অঝোরধারায় চারিদিক ভরিয়ে দেওয়া কুয়াশার ভিড়। বৃষ্টির পরে একেকটা শিলের টুকরো। কচি সবুজ ঘাস।

-“পাহাড় খুব ভালো লাগে আমার। পাহাড় মানুষকে উদার হতে শেখায়,” ভদ্রলোক বলে ওঠেন। শ্রীময়ী অল্প হেসে তাকায়।

-“আমার ছেলে যে আমাকে নিজের কাছে রাখেনি – আসলে, তার দোষটা বোধহয় আমারই,” ভদ্রলোক আবার বলে ওঠেন। শ্রীময়ী অন্যদিকে তাকায়। এইধরণের স্বগতোক্তি শুনতে সে অভ্যস্ত।

-“সারাটাক্ষণ বলে এসেছি, শুধু নিজেরটা ভাববে, আগে নিজের কেরিয়রটা তৈরী করবে, তারপর আর সবকিছু,” ভদ্রলোক আপন মনে বলে চলেছেন, “শেষটায় যে নিজের নিজের বলতে গিয়ে, আমাকেও যে আর নিজের বলে ভাবতে চাইবে না …” ভদ্রলোক একটা শ্বাস ফেলেন। শ্রীময়ী এখনও খাদের দিকটায় তাকিয়ে আছে। আশ্রমের দিক থেকে ছেলেদের প্রার্থনাসঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছে। বিকেলের প্রেয়ার শুরু হয়েছে। শ্রীময়ী আপন মনে ঘাসের দিকটায় তাকায়। চটি থেকে পা-টাকে বের করে এনে মাটিতে ছোঁয়ায়। ভেজা ভেজা একটা স্পর্শ। ঠান্ডার আমেজ।

-“তোমার কখনও মনে হয় না – এতগুলো বুড়োবুড়ির দায়িত্ব নিয়ে এভাবে একা পড়ে আছো এখানে ? বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না ?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন।
-“অভ্যাস হয়ে গেছে,” শ্রীময়ী ছোট্ট করে জবাব দেয়। ভদ্রলোক অল্প হাসেন।
-“অন্ধকারে আরোই দেখতে পাইনা,” ভদ্রলোক বলেন, “সামনে অনেক পাহাড় তাই না ?” শ্রীময়ী ঘাড় কাত করে, একবার জোরে বলে ওঠে “হ্যাঁ, অনেক পাহাড় – আকাশ পরিষ্কার থাকলে অনেকদূর অবধি দেখা যায়।” ভদ্রলোক মাথা নামিয়ে নেন।
-“তোমার সময় নষ্ট করছি,”
-“এমা! তা কেন হবে! আমিও ফিরবো একটু পরেই। ততক্ষণ নাহয় থাকি এখানে, আমারও তো খারাপ লাগছে না।” শ্রীময়ী উত্তর দেয়।
-“আমার ঘরের জানলাটা খোলা ছিলো, টেবলের সামনেটায় – ছবিটা কোনোভাবে উড়ে যায়নি তো ?” ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করেন।
-“লনে গিয়ে পড়লে, কাল সকালেই পাওয়া যাবে – মালিকে বলে রাখবোখন। এত রাত্তিরে আর খোঁজবার চেষ্টা করা বৃথা।” ভদ্রলোক সায় দেন।

-“এতগুলো বছরেও মেনে নিতে পারিনি। শেষ বয়সে এসে অনুতাপের জ্বালায় কুরে কুরে শেষ হয়ে যাচ্ছি,” ভদ্রলোক অল্প হাসেন, “ছেলেকে বলেছিলাম, ‘এই বয়সেই এত লায়েক হয়ে যাচ্ছো, প্রেম করতে শিখেছো। আবার বিয়ে করে এসেছো।’ নাইন্টি ফাইভ কি নাইন্ট সিক্স তখন,” ভদ্রলোক বলে চলেছেন, “সবেমাত্র বিটেক শেষ করেছে কি করেনি, এসে বলে কি না বিয়ে করবো – রেজিস্ট্রী করে এসেছে। মেয়েটার মুখদর্শন করিনি পর্যন্ত। বাড়ির দরজা থেকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ছেলেকে তার একমাসের মধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম জার্মানীতে, আমার ভাইয়ের কাছে – হাইডেলবার্গে। অথচ,” ভদ্রলোক যেন হেসে ফেলেন, “ছেলেটাও একবার আপত্তি করলো না। এতটুকু রাগ পর্যন্ত দেখালো না। আসলে বোধহয় তখনই,” শ্রীময়ী বেজার মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, “তখনই বোধহয় আমার ছেলে আর আমাকে বাবা বলে মেনে চলাটা বন্ধ করে দিয়েছিলো। আমি তখন কেবল ওর সুপিরিয়র হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম – দ্য ওয়ান হু অর্ডারস,” ভদ্রলোক সোজা হয়ে সামনের পাহাড়গুলোর দিকে তাকান। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। আশ্রমের দিক থেকে কে যেন একটা এগিয়ে আসছে বলে মনে হলো। শ্রীময়ী দু’পা এগোয়।

[৪]

-“দিদি! দিদি-ই-ই!” শিরিং ছুটতে ছুটতে আসছে, “এইত্তো দিদি এইখানে! পেয়েছি” হাঁফাতে হাঁফাতে বলে শিরিং।
-“কি! পেয়েছিসটা কি,” অল্প উষ্মার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে শ্রীময়ী।
-“তোমার ছবিটা – পেয়েছি গো পেয়েছি, ছোটোবেলায় সেই কি’রকম দেখতে ছিলো গো তোমায়,” শিরিং গড়গড় করে বলে যাচ্ছে, “লনের ওপরে কোথা থেকে যেন উড়ে এসে পড়েছিলো! নির্ঘাত তোমার অফিসঘর থেকেই। পিছনে আবার কতকিছু লেখা, তোমার বাড়ির কথা লেখা আছে কি ? এবার তো বলতেই হবে তোমার বাড়ি কোথায়!” শিরিংকে থামাতে চেষ্টা করে শ্রীময়ী। চোখটা কেমন খসখস করছে হঠাৎ। শিরিংকে তখন আর থামায় কে! ওর হাতের মুঠোয় শ্রীময়ী দেখতে পাচ্ছে, সাদায়-কালোয় একটা ইতিহাস, ছোট্ট পানপাতার মতো একখানি মুখ, গলায় একখানি ফিনফিনে সোনার হার, তেইশটা বছর …

তুষারশুভ্র নীরবতায়, শ্রীময়ীর চোখের সামনে এখন গোরিচেনের অন্ধকার। আশ্চর্য সাদা বরফের মতো একেকটা বিকেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে সে দেখলো, ভদ্রলোক তখনো সেই খাদটার মুখেই দাঁড়িয়ে আছেন। শ্রীময়ী একবার শিরিংকে থামাতে চেষ্টা করলো। তিনজন অসমবয়স্ক মানুষ আর উদাসী হয়ে নেমে আসা একটা কুয়াশার চাদর, গোরিচেনের পাদদেশে যেন অন্ধকার হয়ে নেমে এলো। পাহাড়ের কোলের স্যানিটোরিয়ামে একেকটা করে আলো জ্বলে উঠছে তখন। আশ্রমের প্রেয়ার শেষ হয়ে গেছে। আজ শ্রীময়ীর জন্মদিন।

শ্রীময়ী একটা বড়ো করে শ্বাস ফেলে। আশ্রমের দিকে পা বাড়ায়। ওকে এখন জেনারেটার চালাতে হবে। শিরিং না হয় পিছন পিছন ভদ্রলোককে নিয়ে আসবেখন …



অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।