বন্ধু

বর্ণালি বসাক বোস on

সকাল থেকেই সৃজার মনটা আজ খুব ফুরফুরে। গুনগুন করে গান গাইছে। জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্যটা আজকে যেন অন্যরকম লাগছে ওর। সব কেমন রঙ্গিন হয়ে উঠেছে আজ। সৃজা স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিল। আর সময় নষ্ট না করে মা আসছি… বলে বেরিয়ে যাচ্ছে অমনি মা বললে,
— কিরে মা আজ কি কলেজে কোন অনুষ্ঠান আছে নাকি এত সেজেছিস যে?
— কি যে বল মা। কি এমন সেজেছি? একটা তো কেবল শাড়ীই পড়েছি।
— তা যাই বল তোকে কিন্তু আজকে দারুন দেখাচ্ছে। আয় দেখি একটু থু থু দিয়ে দি কারো নজর না লাগে।
— মা আমি এখন বড় হয়েছি ওসব আর দিয়ো না।
— তাই নাকি মা বড় হয়েছ? তাহলে বাবাকে বলি পাত্র দেখতে।
সৃজা খুব লজ্জাপেল “ধুর” বলে মা কে একটু আদর করে চলে গেল। কলেজটা আজ একটু বেশীই দূর বলে মনে হচ্ছে আজ যেন দ্বিগুণ সময় লাগছে। এই তো কলেজের গেট। সৃজা কলেজে ঢুকছে এমন সময় ওর চোখ পড়ল কলেজের বকুল তলার দিকে, ঐ তো সে যার জন্য আজ সৃজা নিজেকে সাজিয়ছে, যার জন্য কাল সারা রাত ও ঘুমতে পারেনি , যার সঙ্গে সময় কাটাবে বলে সারাটা সকাল রঙিন স্বপ্নে নিজেকে ধুয়ে নিয়েছে। ঐ তো সে সাদা গেঞ্জি নীল জিন্স পড়া বকুল তলার বাঁধান সানে বসে অপেক্ষা করছে শুধু সৃজার জন্য। সৃজা আস্তে আস্তে বকুল তলার দিকে এগিয়ে গেল। শ্রেয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল , “একটু দেরি হয়ে গেল সরি।” শ্রেয়ান কোন কথা বলল না দুজনে আস্তে আস্তে পাশে রাখা বাইকের কাছে গেল দুজনে তাতে উঠে বসল। সৃজা মনে মনে কত কি ভেবে রেখেছিল। ভেবেছিল হয়তো শ্রেয়ান তাকে দেখেই বলবে, “বাঃ তোমায় তো বেশ দেখতে। শাড়ীতে তোমায় ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। এত দিন তো শুধু মোবাইলেই তোমার ছবি দেখেছি। সামনে তুমি অনেক বেশী সুন্দর।” দেখতে দেখতে ওরা চলে এল একটা নির্জন জায়গায় সামনে সরু নদী বয়ে যাচ্ছে, দুপাশে বালির চর, আকাশটা কেমন রঙিন লাল, সাদা, নীল কত রঙের ছোঁয়া। একটা গাছের তলায় বসল দুজনে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি, আনন্দে আবেগে সৃজার মনটা ভরে উঠল। কত কথা মনে। কিন্তু শ্রেয়ান কেন চুপচাপ? এখনও পর্যন্ত সে একটিও কথা বলল না ! মোবাইলে চ্যাটিং করার সময় তো কত কথা লেখে ! না কি সৃজা একপ্রকার জোর করেই দেখা করেছে বলে সে রাগ করেছে। সৃজার তো মনেই হচ্ছে না আজ সে প্রথম শ্রেয়ানকে দেখছে। ওর মনে হচ্ছে রোজই তো তাদের কত কথা হয়। ফেসবুক ফ্রেন্ড তো কি হয়েছে? চ্যাটিং করতে করতে কবে যে সৃজা ওকে এত আপন করে নিয়েছে তা ও নিজেই জানে না। সৃজা ভাবল এবার ও নিজেই কথা শুরু করবে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ী ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। সৃজা বলল , “কি হল কথা বলছ না যে? রাগ করেছ ?” শ্রেয়ান ঘাড় নেড়ে উত্তর দেয়, “না”। সৃজা কথা বলতে বলতে শ্রেয়ানের কাঁধে মাথা রাখে ওমনি শ্রেয়ান ছিটকে উঠে যায় ও অবাক হয়, ভাবে কি ব্যাপার শ্রেয়ানের আচরণের মধ্যে কেমন একটা আস্বাভাবিক ভাব? সৃজা দেখে শ্রেয়ান একটু দূরে গিয়ে ফোনটা নিয়ে কিছু একটা করছে। এবার সৃজা রেগে যায় ভাবে সে সামনে থাকতেও ও ফোনে ফেসবুক করা নিয়ে ব্যাস্ত? তার কি কোন গুরুত্বই নেই। সৃজা ভাবে শ্রেয়ানের কাছে গিয়ে বলবে, “কি ব্যাপার বলতো কথাই যখন বলবে না তা হলে এসেছ কেন?” তক্ষুনি সৃজার ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে। বিপ শুনে ফোনটা খুলতেই দেখে শ্রেয়ান ম্যাসাঞ্জারে সৃজাকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। সৃজা আবাক হয় সামনে থাকতেও চ্যাটিং করছে তাহলে কি লজ্জা পাচ্ছে? কি বলতে চায় ও? না কি ফোনেই বেশী সাবলীল বলে নিজের ভালবাসার কথাটা সামনে এসে না বলে ফোনেই বলছে! সৃজা ম্যাসেজটা পড়ল, এ কি? কি লিখেছে ও? সৃজার চারপাশটা কেমন ঘুরতে শুরু করল, চারিপাশের সব রঙ নিমেষের মধ্যে সাদা –কালো হয়ে গেল, শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে পৃথিবীর সবার থেকে দূরে মনে হচ্ছিল। চারিপাশটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। সকাল থেকে যে আনন্দে ওর দিন কাটছিল সব যেন মিথ্যে বলে মনে হতে লাগল। কিছুক্ষন সে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। রাগ করবে? অপমান করবে? কি করবে? এত দিন ধরে ফেসবুকে চ্যাটিং করছে তারা কত কথা হয়েছে তাদের অথচ সে তার জীবনের এত বড় সত্যটা গোপন করে গেছে! কি বলবে শ্রেয়ানকে সে যে কথা বলতে পারে না তা সে আগে বলে নি কেন? পরেক্ষনেই সৃজার মনে পরে আজ তো সেই জোর করে তাকে এনেছে শ্রেয়ান তো আসতে চায়নি। আর কারো দুর্বলতার কথা জেনে তাকে অপমান করার শিক্ষা তার বাবা –মা তাকে দেয় নি। কোন কথা না বাড়িয়ে সৃজা শ্রেয়ান কে বলল, “আমি বাড়ী যাব।” শ্রেয়ান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বাইকে উঠে বসল। গোটা রাস্তা একটা থমথমে ভাব। শ্রেয়ানের অনুভুতি বোঝার কোন উপায় নেই অবশ্য ইচ্ছেও খুব একটা হল না।

সৃজা বাড়ী ফিরে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। মা বলল, “কি রে এত তাড়াতাড়ি চলে এলি? কিছু হয়েছে নাকি? মুখটা কেমন শুকনো দেখাচ্ছে?” ঘরের ভেতর থেকে সৃজা উত্তর দিল, “কিছু হয় নি, মাথাটা একটু ধরেছে আমি একটু শুতে চাই মা” মা বললে, “ মাথার আর দোষ কি মা এত রোদে সে তো ব্যাথা করবেই ভাবছি এবার তোকে চোখের ডাক্তার দেখাব” সৃজা ঘর থেকে – “মা প্লিজ একটু চুপ কর না আমার ভালো লাগছে না” বলে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। এবার সৃজা হাপুস নয়নে কেঁদে ভাসাল। চোখের জল যেন আর বাঁধ মানতে চাইছে না। বালিশে মুখ চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকল সে। শুধু শ্রেয়ানের কথা মনে পড়ছে। এদিকে শ্রেয়ানও বুঝতে পারেনি সৃজা এতদুর এগিয়েছে। শ্রেয়ান যে সৃজাকে ভালোবাসে না তা নয় কিন্তু সে তো তার সীমাবদ্ধতা জানে তাই সে স্পর্ধা সে করে না। সে ভাবছে কি ভাবে সৃজার সঙ্গে সব কিছু সহজ হয়ে উঠবে।

এদিকে সৃজা অনেক কান্নাকাটি করার পর অন্ধকার ঘরে বসে রইল চুল ছাড়া, বাঁ হাতটি কোলের উপরে রাখা মাথার বালিশটির উপর ভর দিয়ে বাঁ গালে দিয়ে। অনিমেষবাবু অফিস থেকে ফিরলেন। রাতে সবাই যখন একসঙ্গে ডিনার করতে বসল সৃজা বাবা-মাকে সব ঘটনা বলল। সুজাতা দেবী, অনিমেষবাবু দুজনেই খুব অবাক হলেন। আনিমেষবাবু শুধু বললেন, “মা ,শুধু আবেগ দিয়ে নয় বুদ্ধি দিয়েও জীবনের গুরুত্বপুর্ণ সিধান্ত নিতে হয়। তুমি জীবনের একটি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছ তাই তোমাকে নিজেকেই এই ধাক্কা সামলাতে হবে। আমরা তোমার পাশে সব সময় আছি কিন্তু সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। সৃজা অবাক হয়ে বাবা-মার দিকে চেয়ে রইল। সে ভেবেছিল বাবা-মা তাকে ভীষণ বকাবকি করবে, বলবে ঐ ছেলেটির সাথে কোন যোগাযোগ রাখবে না বা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এখন তো ও যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল। কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। আজ এই একটা দিনে ও যেন অনেক বড় হয়ে গেল। ডিনার সেরে ঘরে শুতে গেল সৃজা, ঘুম কিছুতেই আসছে না ফোনটা পাশেই রাখা। সৃজা ফোনটা হাতে নিতেই শ্রেয়ানের একটা ম্যাসেজ আসে রোজ এই সময় শ্রেয়ান ওকে গুড নাইট জানায়। সৃজার ইচ্ছে হলো না ম্যাসেজটা দেখার। তবু ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজটা দেখল। দেখল আজ আর শুধু গুড নাইট না অনেক কিছু লেখা। সৃজা পড়তে শুরু করল শ্রেয়ান লিখেছে। “তোমার মনের ঝড় থামল? আচ্ছা সৃজা সব সম্পর্কের পরিণতিই কি প্রেম বা বিয়ে? একটি ছেলে আর একটি মেয়ে কি সারা জীবন শুধু বন্ধু হয়ে থাকতে পারে না? তোমার আর আমার জীবন কোন দিন একসুত্রে গাঁথা সম্ভব নয়। আর বন্ধুত্বের জন্য তো কোন কারন লাগেনা। আমি তোমাকে আমার সব থেকে কাছের বন্ধু বলে মনে করি। আমি জানি পৃথিবীতে সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের কথা। আমার উচিত ছিল আমি যে ক্রানিও সেরিব্রাল ট্রমায় আক্রান্ত সে টা তোমায় আগেই জানিয়ে দেওয়া তুমি আমায় ক্ষমা করো। তুমি যদি চাও আমরা এভাবেই আমাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করে যাব তাহলে আমার কথা বলতে না পারাটা তোমায় কোন সমস্যায় ফেলবে না।”

এবার সৃজা বুঝতে পারল সে একটু বেশীই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে উত্তরে সে শ্রেয়ানকে লিখল, “নিশ্চয় বন্ধু ”। সৃজার মনের ঝড়টা এখন একদম থেমে গেছে ,নিজেকে অনেক হালকা লাগছে। ওদিকে মেয়ের কথা চিন্তা করে সুজাতাদেবী, অনিমেষবাবুর তখনও ঘুম আসেনি। সৃজা দরজায় গিয়ে ওনাদের ডাকল। সুজাতাদেবী দরজা খুলে মেয়েকে ভেতরে নিয়ে এল। সৃজা বলল, “ বাবা আমি তোমাদের একটা জিনিস দেখাতে এসেছি এই ম্যাসেজটা পড়।” সুজাতাদেবী আনিমেষবাবু দুজনেই ম্যাসেজটা পড়লেন। ওনারা মনে মনে খুব খুশি হলেন। আনিমেষবাবু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, “শ্রেয়ান তোর প্রকৃত বন্ধু।”



বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।