অন্য বসন্ত

এরিনা ঘোষ on

টানা ছয় সাত ঘন্টা গোলাগুলি চলার পর চারদিকে শীতল স্তব্ধতা। বোমারু বিমানের গোঁ গোঁ আওয়াজ এখনো কানে বাজছে।গতকাল বড়দিনের বিরতির পর নতুন আঘাতে শহরটাকে গুঁড়িয়ে দিতে এই আক্রমন।  আলেপ্পো রেল স্টেশনের পেছনের ঘিন্জি বস্তির আশেপাশের বহুতলগুলো বছর দুই আগের গৃহযুদ্ধের সময় বোমার আঘাতে ধ্বংসস্তুপ হয়ে গেছে। তার আড়ালে থাকা বস্তিগুলো বোমারু বিমানহানা থেকে বেঁচে যায় হয়ত নগন্যতার জন্যই। সাকূল্যে প্লাই ঘেরা দুটো নড়বড়ে  ঘর আর একফালি উঠোন নিয়ে সান্দ্রাবুড়ির সংসার। হায়ান আর হালার বাবা সান্দ্রার ছেলে সেই যে চার বছর আগে সিরিয়ান আর্মড ফোর্সের হাতে ধরা পরে এনকোয়ারি তে প্রান  দেয় তার দিন কয়েকের মধ্যেই এলোপাথারি গোলাবর্ষনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হায়ান হালার মা। হালা প্রানে বাঁচলেও বধির হয়ে যায়। আর ওদের বড় ভাই সামের শেলের আঘাতে মায়ের সঙ্গেই মারা যায়। ছেলের মৃতদেহের খোঁজ মেলেনি বুট পরা বাঁ পা টি ছাড়া। বুড়ি সান্দ্রা সেটিকেই রেল লাইনের ওপাশের জমিতে কবর দেয়। মা আর  বড় ভাইএর ছিন্নভিন্ন লাশ ওদের হাতে আসার আগেই আলেপ্পোর শহর উন্নয়নের লাশবাহী গাড়ি তুলে নিয়ে যায়। গতকাল বড়দিনের সন্ধ্যেটা নিতান্তই সাদামটা ছিল ওদের। মিলিটারি ব্যারাকে কুকের হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যা রোজগার হয় তাতে দুই নাতি নাতনি আর নিজের পেট ঠিকমত ভরে না। দুচারটে ভেড়া ছাগল ও পালতে হয় তাই। সঙ্গে কিছু হাস মুরগি। বাজারে দুধ ডিম নিয়ে বসে হায়ান। বছর আটের হালা এর মধ্যেই কিছু রান্নার কাজ শিখে গেছে। ছোট ভাই হায়ান বাজার থেকে ফিরলেই আধাসেদ্ধ জাউ খেতে দেয় তাকে। মনে পরে সেই কোন ছোটবেলার ভাসা ভাসা বড়দিন পালনের স্মৃতি। আলেপ্পো র নাতিশীতোষ্ণ উত্তাপে একটুকরো আগুন ঘিরে বাবা মায়ের হাসিমুখ আর গুনগুন ক্যারোল। গৃহযুদ্ধের বোমায় সেই স্মৃতিও এখন ধোঁয়াটে ।

মেজর জেনারেল এর খামখেয়ালিপনায় অতিষ্ট সেনারা। সন্ধ্যে নামার আগেই দুই বিমান চক্কর খেল আলেপ্পোর আকাশে।ছড়িয়ে দিল অনেক অনেক লাল গোলাপ ।  বোমারু কি সিরিয়ান যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ এখন আর ভয় ধরায় না ওদের মনে। রোজই কেউ না কেউ মরছে কি আধমরা হচ্ছে।ছিন্নভিন্ন প্রীয়জনের শরীর নিয়ে দৌড়ান মানুষ কি প্রীয়জনের রক্তাক্ত লাশের উপর আছড়ে কাঁদা মানুষের ছবি হায়ান হালা কে কষ্ট দেয় না আর। তবু দু একটা খুব চেনা মানুষের এরকম পরিনতিতে দু এক দিন মনটা ভার হয়ে থাকে। পলিন খুড়ো গত যুদ্ধে এক পা হারিয়ে এই বস্তিতেই একটু দূরে থাকত। গাঁয়ের দিক থেকে সাপ্তাহিক  হাটে যে লোকগুলো গবাদি পশু নিয়ে আসে তাদের দালালি করতো।সান্দ্রাবুড়িকে খুব কমেই ভেড়া জোড়া পাইয়ে দেয় ও। হায়ান ,হালা ও বস্তির বাকি বাচ্চাদেরও রঙীন চকোলেট কি কেকের টুকরোটাকারা  দিত। মাস ছয় আগে শেল মর্টার বিঁধে পরে গেল হাট ফিরতি রাস্তায়।হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোক ও পাওয়া গেল না সেদিন। গোলাবর্ষনের খবরে হাট থেকেই জোয়ান গুলো সব এদিক সেদিক পালিয়েছিল। বিকেলের দিকে ডুবন্ত সূর্যের কমলা আলো আর রক্তে একাকার হয়ে মারা গেল খুড়ো। ছোট্ট হায়ান তখন ওর মাথার কাছে বসা। হাতের মুঠোয় কয়েকটা রঙীন লজেন্স। পলিন খুড়োর দেওয়া। তারপর থেকে লজেন্স দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে হায়ানের। বাজারের পশ্চিমের চার্চে যাবে বলে বেড়িয়েছিল সান্দ্রা,হালা আর হায়ান কে নিয়ে। বস্তির লোকজনের চেঁচামেচিতে গিয়ে জড় হয় সামনের মাঠে। বিস্ময়ে অবাক হয়ে দেখে মাঠময় লাল গোলাপের ছড়াছড়ি। দুহাতে যতটা ধরে ফুল গুলো বুকে চেপে নেয় হায়ান। এত্ত ফুল একসঙ্গে এই প্রথম দেখে ওরা। সেদিন আর চার্চে যাওয়া হয়না ওদের। আলেপ্পো সিরিয়া রেল লাইন পেরিয়ে ওধারের গ্রেভইয়ার্ডে ছোটে দুই রিক্ত বালক বালিকা ও এক অশীতিপর   বৃদ্ধা। ছেলের কবরে ছড়িয়ে দেয় কুড়িয়ে আনা গোলাপ।

এই রাতে নাকি সান্টা আসেন পৃথিবীতে । লাল পোষাকের পেটমোটা সাদা দাড়ির বুড়োটাই মনে হয় এত্ত ফুল ছড়িয়ে গেছে। নিঝুম রাতে চুপিচুপি কি যেন পরামর্শ করে দুই ভাইবোন।

পরদিন খুব ভোরে উঠেছিল হায়ান।   ছুটে গিয়েছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বোমার খালি শেলগুলো তুলে আনতে। বাজার ফিরতি কটা গোলাপ চারা এনে বসাবে ওগুলোয়। আর ফেরা হয়নি সেদিন ওর। চার্চের মাঠে জড় হওয়া লোকজনের ওপর এলোপাথারি গোলা বর্ষন হয় সেদিন। হায়ান কে আর খুঁজেই পায়নি ওরা। শেষ দুই মাসে পেছনের উঠানে রাখা খালি শেল গুলোয় রোজ জল ঢেলেছে হালা। আলেপ্পিতে বসন্ত এসেছে। কালো শেলের মাটির বুকে ছোট্ট ছোট্ট গোলাপ চারার সবুজ পাতাগুলো দেখলেই হায়ানের কথা মনে পরে হালার।ফুলের দোকানের লোকটা বলেছে কিছু মাস পরই ফুল ফুটবে। ফুল ফুটলেই প্রথম ফুলটা বাবার কবরে দেবে কিন্তু ওটা হায়ান দেবে বলেছিল। তাই প্রথম ফুলটা ফোটবার আগেই ভাইটাকে খুঁজে পেতে হবে ওকে। তারাতারি ঘরের কাজ সেরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত  আলেপ্পির পথে পথে এক বধির মেয়ে খুঁজে ফেরে তার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে। আকাশে পাক খায় যুদ্ধ বিমান, অসহায় আহত মানুষের চিৎকারে , বোমার আওয়াজে কেঁপে ওঠে শহরের আনাচকানাচ। তারই মাঝেই চলে ফুল ফোটার অপেক্ষা আর সেই নিরন্তর অন্বেষন।


এরিনা ঘোষ

পেশা — সিভিল ইন্জিনিয়ার, নেশা — বই ও কবিতা, অবসর বিনোদন — লেখা ও পশুপাখির সঙ্গে সময় কাটান।

2 Comments

Gopa Deb · ফেব্রুয়ারী 23, 2019 at 2:55 অপরাহ্ন

Besh Valo ..

Somsubhra · মার্চ 12, 2019 at 5:18 পূর্বাহ্ন

Darun

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।