ঘুম

রিংকু কর্মকার চৌধুরী on

তোমার মনে আছে রুহ আমাদের কী ভীষণ ঘুরে  বেড়ানোর ইচ্ছে ছিল। তুমি বলতে অনি আমরা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবো। তারপর একদিন যখন বয়স হবে একচিলতে বাগান ঘেরা বারান্দায় বসে কফি খেতে- খেতে গল্প করবো। তুমি ঘর সাজাবে,  নিজের হাতে বাগান করবে, আমার জন্য যখন যা ইচ্ছে তাই রেঁধে বেড়ে খাওয়াবে। আর আমি কী করবো জিজ্ঞেস করলে বলতে আহ! অনি তুমি চুপ করো। আমাকে বলতে দাও।তুমি.. তুমি..
তুমি শুধু খুঁত খুজে বেড়াবে। আর আমি রেগে গিয়ে নাকের পাটা ফুলিয়ে ঝগড়া করবো। তারপর তুমি আমার মান ভাঙাতে বাগানের সেরা ফুল ছিঁড়ে গুঁজে দেবে আমার খোঁপায়। আমি হাসতে গিয়েও চেঁচিয়ে উঠবো ফুল ছিঁড়েছো কেন বলে।

আর তারপর আমি– আমি কিছু বলার আগেই তুমি তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে বলতে, উফফ তোমার জন্য আজও বাড়ি ফিরতে দেরী হবে।ধ্যাৎ। কী যে করো।আমি শুধু বোকার মত তোমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলতাম।আর তুমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘামতে-ঘামতে ছুটে গিয়ে বাস ধরতে।এমনটাই তো রোজ হতো।
এইভাবেই তো আমরা ফিরে আসতাম সেই সমস্ত জায়গা থেকে যেখানে আমাদের একসাথে কখনও কোনদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি।




তোমার এখনও মনে আছে সেসব? আচ্ছা সুসান কেমন মেয়ে? তোমাকে খুব ভালোবাসে? ঠিক যেমনটা আমি তোমাকে..



ভালোবাসার কি মাপকাঠি হয়।একজন একজন এক একরকমভাবে জড়িয়ে থাকে। সব জড়িয়ে রাখার কি বিচার করা যায়। তুমি কী বলতে পারবে পার্থ তোমাকে ঠিক কতখানি ভালোবাসে? ভালোবাসা আসলে ছবির মত।এক একজন শিল্পী তাকে তার নিজের মত করে দেখে। যেমন আমার কাছে তুমি রোহিনী নও রুহ।রুহ মানে মনে আছে বলেছিলাম তোমাকে। আত্মা। 



আমাকে তোমার দেখতে ইচ্ছে করে? সেই কবেকার কথা।  তখন তুমি কিরকম বোকা-বোকা ছিলে।আমি যা বলতাম তুমি তাই করতে। একজোড়া অদ্ভুত চোখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। না!ভুল বললাম।তুমি খুঁজে বেড়াতে। তুমি কোনদিন আমাকে বলোনি তুমি ঠিক কী চাইতে। তোমার চোখ দুটো অপলক, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে।
আমি বাড়ি ফেরার পথে তোমার ওই চাহনী নিয়ে ফিরতাম। তারপর সারাটা রাত এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়ে সকালে ছুটে যেতাম।তোমার কাছে। তখন তুমি হয় জীবনানন্দ কিম্বা শঙ্খ ঘোষে ডুবে। আমি রাগ করতাম আর তুমি আমার হাত দুটো ধরে বু্ঁদ হয়ে একের পর এক কবিতা শোনাতে।তোমার ওই মেসের ঘরে শুধুই তুমি আমি। আমার যে কী ভীষণ ইচ্ছে করতো তুমি একবারটি আমাকে ছুঁয়ে দেখো।




আমি যে অনিকেত রুহ।আমার যে বাড়ি ঘর থাকতে নেই। কী করে বাসা বাঁধতাম তোমার নরম জমিতে।কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতাম তোমার উর্বরতায়।আমি যে তোমাকে কর্ষণ করতে চাইনি। তুমি যে আলোকবর্তিকা।আমার আকাশে চিরদিন আটকে রাখতে আমি  কখনোই চাইনি।




সুসান কোথায়।ও জানে তুমি আমার সাথে রোজ কথা বলো? রোজ তোমার নামের পাশে সবুজ আলো দেখে আমি ছুটে আসি। তুমি না থাকলে তোমাকে খুঁজি। তোমাকে একবারটি দেখার লোভ সামলাতে পারিনা। তোমার প্রোফাইলে তন্ন-তন্ন করে খুঁজি তোমাকে সুসান কে।তোমাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো দেখে জ্বলেপুড়ে মরতে চাই। কিন্তু কিচ্ছু পাইনা। কোন ছবি দেখি না। কেন নিজেকে ঢেউয়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছো। কেন নিজের ছবি দাও না। কেন? যাতে আমি আরও কষ্ট পাই।তাই?



রুহ। তুমি অনুভব করতে পারো তো আমার হৃদস্পন্দন।বুঝতে পারো তো তোমার খুব কাছেই আমি আছি। তাহলে আমাকে দেখে কতটুকুই বা প্রাপ্তি হবে তোমার বলো। আমি দীর্ঘ বছর তোমাকে না দেখে কাটিয়েছি। তোমার গলার আওয়াজটুকুও শুনতে পাইনি।তবু কি আমি তোমায় এতটুকু ভুলে গেছি। তুমি আমার সেই রুহ-ই আছো।আমার ভাগের রুহ টুকু তো আমার একার। নিজস্ব। সেখানে কোন পার্থ,কোন সুসানের প্রবেশ নেই। আমি যে ঢেউয়ের মতই আছড়ে পড়ি তোমার স্মৃতির ভেতর। তাই না।




আমাকে নিয়ে যাবে তোমার কাছে।  সেই স্বপ্নের শহর ব্রাসেলসে।  যেখানে গোলাপী হয়ে ফুটে থাকে বসন্তের ফুল। আমাদের ছোট বাংলোয় যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকবো ভেবেছিলাম। আর কেউ না,কেউ না, কেউ না।



নিশ্চই। আমরা যখন বৃদ্ধ হব।তুমি আমি সেরে নেব আমাদের সমস্ত কাজ। আমি তোমাকে ডেকে নেবো নিজের কাছে।তারপর দুজনে বসবো লাল পপি ফুলেদের বাগানে। তুমি গেয়ে উঠবে গান আর আমি শোনাবো কবিতা। পপি ব্রাসেলসের জাতীয় ফুল জানো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় রাজকন্যের লাল রঙের গাউন ছড়িয়ে রেখে অপেক্ষা করছে তার প্রিয়তম মেষপালকের জন্য। যে চুপিসাড়ে রাতের আঁধারে অভিসারে আসবে। ঠিক যেমন ঘুম না হলে আমি চলে যেতাম তোমার বাড়ির নীচে।মেস থেকে চুপি-চুপি বেড়িয়ে পড়তাম তোমার কাছে। তোমার ঘরের আলো কখনও জ্বলতো,কখনও নেভানো থাকতো৷ অনুভব করতাম তোমার পাশে থাকা।তোমার নিবিড় অস্তিত্ব আমার জীবনে। তাই আজও তুমি আমার রুহ।



আমি অপেক্ষা করবো। ওটুকুই আমি পারি। শুধু একবারটি নাম ধরে ডেকো।




অপেক্ষা করো অন্তহীন। আমি তোমাকে ডেকে নেব শীত পোহানোর দেশে।তোমার নরম পিঠে পিচ্ছিল রোদ আরাম করে শোবে। আমরা দুজন তখন শেষ করবো বেলাশেষের গান।
এখন একটু ঘুমিয়ে পড়।


বহুদিন পর ঘুমোবো জানো।কত যুগ যেন না ঘুমিয়ে বসেছিলাম। সারা শরীরে আমারও বোধহয় উঁই ঢিবি হয়ে গেছিল।অনিকেত তুমি আমার।




মনে রেখো রুহ।আমি আবার ফিরবো।আবার নতুন কোন দেশ থেকে তোমাকে চিঠি লিখবো। বলবো সে দেশের গল্প। ততদিন তুমি অপেক্ষা করবে।  নিজেকে হারিয়ে ফেলবে না। মনে রেখো অনিকেত ফিরবে। রুহই তার ফেরার ঠিকানা।




আমাদের আর কথা হবে না? তুমি চলে যাচ্ছো? কিন্তু কেন? আবার একরাশ বিষাদ আমার চারদিকে পাক খেতে থাকবে।



অপেক্ষা করো আমার জন্য। জেনো আমি ফিরবোই।ফিরতেই হবে আমাকে।



সবুজ আলোটা টুক করে নিভে গেল। অ্যাক্টিভ ফিউ মিনিটস এগো লেখাটা তখনও টিপটিপ করছে। পাশে শুয়ে থাকা স্বামীর দিকে একবার তাকিয়ে রোহিনী মোবাইলটা বালিশের নীচে গুঁজে দিল। পায়ের নীচে পড়ে থাকা চাদরটা টেনে গায়ে দিয়ে চোখ বুজল। নিশ্চিন্তের ঘুম। বহুদিন পর।রোহিনী ঘুমিয়ে পড়ার পর  পার্থ উঠে বসল।আলতো হাতে নিজের মোবাইলটা  তুলে নিয়ে হাওয়া- পায়ে একরকম উড়ে চলে গেল ড্র‍য়িং রুমে। নম্বর ডায়াল করতে ওপ্রান্ত বলে উঠল,’হ্যালো!’ নীচু গলায় পার্থ ফিসফিসিয়ে উঠল,’আজ ঘুমিয়েছে বহুদিন পর। হুম।আচ্ছা।রাখছি।কাল দেখা হচ্ছে। এগারোটা তো? আচ্ছা।গুডনাইট।


পার্থ ফোন রেখে দেখল রাত সাড়ে বারোটা বাজে। শোওয়ার ঘরে একবার উঁকি দিল, দেখল রোহিনী অকাতরে ঘুমাচ্ছে। দরজা ভেজিয়ে ড্র‍য়িং রুম সংলগ্ন ঘরের একচিলতে বারান্দায় এসে সিগারেট ধরালো।দু একবার ফস্ ফস্ করে টেনে ফেলে দিল সিগারেটটা।টয়লেটের আয়নায় মুখে চোখে জল দেওয়ার সময় চোখ পড়ল আয়নায়।নিজেকে আজকাল চিনতে পারে না পার্থ।কি অসম্ভব বুড়িয়ে গেছে। চোখের পাশে বলিরেখা,চুলেও গভীর পাক।কেউ দেখে বলবে না ওর বয়স চল্লিশের কোঠায়। সংসারের পিছনে সময় দিতে গিয়ে নিজের অস্ত্বিত্ব কে কোনদিন গুরুত্বই দেয়নি।বলা ভালো ইচ্ছেই হয়নি কখনো।  সংসার,অফিস,ছেলেমেয়ে,স্ত্রী কে সুখী রাখার বিনিময়ে জীবন তাই বোধহয় ওকে এই অকালে বুড়িয়ে যাওয়া উপহার দিয়েছে।অথচ রোহিনী এখনও কী সুন্দরী। ‘তুমি আর আমাকে ভালোবাসো না তাইনা? রোহিনীর মুখটা ভেসে উঠলো ওর চোখে। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এল টয়লেট থেকে।




‘তোমাকে চা দেব?’
রোহিনীর প্রশ্নের উত্তরে শুধুই মাথা নেড়ে না বলল পার্থ।
‘আচ্ছা’বলে টি-টেবিলে পড়ে থাকা পেপারটা তুলে নিয়ে চলে গেল রোহিনী।
পার্থ বাজারের ব্যাগ নেওয়ার জন্য সোফা ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে-যেতে দেখল রোহিনী আয়নার দিকে তাকিয়ে,বুকের উপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সরানো। পার্থর চোখ রোহিনীর শঙ্খের মত ধবধবে পেটের দিকে তাকিয়ে চকচক করে উঠল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ পার্থ কে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফেলে রোহিনী  তাড়াতাড়ি লুটোনো আঁচল বুকের উপর তুলে ওর দিকে এগিয়ে এল। পার্থর বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দ।ও জানে এই সকালে বাড়িতে কেউ নেই,তিন্নি-বুকান স্কুলে।সেই বিয়ের পরের সময়গুলো মনে পড়ে গেল ওর। কি অদ্ভুত আদিম স্রোতে ভেসে যেতো ওরা।এই রোহিনী তখন বাঁধভাঙা নদী। রোহিনীর ওরকমভাবে এগিয়ে আসায় আবার যেন সম্মতি খুঁজে পেল ও।অথচ এগিয়ে যেতে গিয়েও পারলো না।থমকে গেল রক্ত চলাচল। রোহিনী  এগিয়ে এসে মুখের উপর দরজটা বন্ধ করে দিল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল পার্থর।চোখের কোণ যে ভিজে গেছে বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিল ও।


‘অনিকেত তুমি কবে আসবে আমাকে নিতে?’ আমার আর ভালো লাগছে না। যেন আজ পার্থ আমার দিকে লোভী শেয়ালের মত ধূর্ত চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিল।’

‘প্লিজ রূহ এভাবে কাউকে ছোট করতে নেই।আর তাছাড়া ও তোমার স্বামী।তোমাকে ভালোবাসে।তোমার সন্তানদেরর বাবা।’

‘তাতে কি। আমি শুধু তোমার।’

‘আজ ঘুমাও রুহ।আমার কাজ আছে।আজ বেশীক্ষণ কথা বলতে পারবো না।মিটিং আছে।’

‘আচ্ছা।তবে আসি।শুভরাত।’

‘হুম!’

‘ও শোনো কাল আমি ডাক্তারের কাছে যাব। ওনাকে বলবো আমি ঘুমোতে পারছি।আমার ঘুম পায় এখন।আর জেগে থাকিনা।’

‘গুড গার্ল।নাউ গো টু স্লিপ সোনা।’ ‘আ হ্যাভ টু রাশ।’

‘টাটা।’

মন খারাপ হয়ে গেল রোহিনীর। কি করবে বুঝতে না পেরে উঠে বসলো।পাশে শুয়ে-শুয়ে পার্থ তখনও জেগে। ল্যাপটপে কাজ করছে। খাট থেকে নেমে রোহিনী ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে পড়ল।পার্থ একবার আড়চোখে দেখে নিল রোহিনীকে।


‘জানি একদিন মেঘের ঠিকানা সে পাবে
বলবে পাখীরা ওরে মেঘ তুই গা,গা-গা
তোর কাছেই আসবে গান,তোর কাছেই যাবে
যারা হারায় রুপকথায়,রঙধনু কে চায়।’

‘বাহ দারুণ গান করেন আপনি রোহিনী।আবার নতুন করে শুরু করুন।দেখবেন বাকী কম্পলিকেশন্সগুলোও আর থাকবে না।’নিজেকে ভালোবাসুন।ভালোবাসতে শিখুন।নিজেই সুস্থ হয়ে উঠবেন। আর আমাকে লাগবে না। কী পার্থ ঠিক বললাম কিনা?
ডাঃরায়-এর দিকে তাকে পার্থ মুচকি হাসলো।


ডাঃ রায়ের চেম্বার থেকে থমথমে মুখে বেরোলো রোহিনী। সারারাস্তা একেবারে চুপ করে ছিল। মাঝে পার্থ জিজ্ঞেস করলো,কিছু খাবে কিনা। কোন উত্তর না পেয়ে পার্থ আর ঘাটালো না।
বাড়ি ফিরেও সেই থমথমে মুখ করেই রইল।ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলল না একটাও। রাতে খাবার টেবিলে পার্থই প্রথম কথা শুরু করল,’তোমার কী কিছু হয়েছে?’ শরীর খারাপ লাগছে?’

ডাঃ রায় কে কেন বলেছো আমি গান জানি।রোহিনী কেটে-কেটে কথাগুলো বলল।

‘তাতে কী হয়েছে।কী সুন্দর গান গাও তুমি।দুম করে ছেড়ে দিলে। উনি তো ভালোই বলেছেন।আবার শুরু কর।’পার্থ খুব শান্তভাবে বলল।

‘তুমি কে এসব কথা বলার।কে তুমি? বল কে? আমার কোন ব্যাপারে তুমি নাক গলাবে না।বুঝেছো?’ কোন ব্যাপারে না। সোহাগ হচ্ছে সোহাগ। কথা শেষ করার সাথে-সাথে ডালের বাটিটা ছুঁড়ে দিল পার্থর দিকে। বাটিটা পার্থর গায়েও লাগার বদলে মাটিতে পড়ে গেল। তিন্নি -বুকান ভয়ে কেঁদে ফেলল। 
 
পার্থ চেয়ার ছেড়ে উঠে ওদের জড়িয়ে ধরল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল ‘রোহিনী! পাগল হয়ে গেছো তুমি?’

হ্যাঁ! হয়ে গেছি। কেউ না তোমরা আমার।আর শুনে রাখো আমি অনিকেত কে ভালোবাসি। আমাকে মুক্তি দাও। আই ওয়ান্ট ডিভোর্স,বলে ছুটে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল রোহিনী।



‘আমি থাকবো না পার্থর কাছে।’ তুমি আমাকে নিয়ে যাও।’

‘আর সুসানের কী হবে?’

‘ওকে ছেড়ে দাও।’

‘শাট -আপ। এসব কী বলছো।তোমাকে বলেছি তো নিয়ে আসবো।আর আমি সুসান কে ছাড়তে পারবো না। তুমি আমাকে প্রেসারাইজ করোনা প্লিজ রুহ।’

‘তবে আমি কে।কী তোমার কাছে?’

‘তুমি রুহ আমার আত্মা,কিন্তু সুসান আমার অস্তিত্ব। and one can never denies his existence .

‘ও আচ্ছা।আমি তবে কেউ নই তাই তো।তাই না।’

‘প্লিজ রূহ শান্ত হও।

‘শুভরাত।’


‘হ্যালো!ব্যস্ত আছেন? বিরক্ত করলাম।আজ কী  চেম্বারে আসতে পারি একবার। আসলে কয়েকদিন ধরে রোহিনী খুব অস্থির। আমি খুব অসহায়বোধ করছি।একবার যদি একটু কথা বলতেন।বেশ।একাই আসবো। আচ্ছা।রাখছি।বেশ।

ডাঃ রায় কে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট  নিয়ে সকালের চায়ে চুমুক দিল পার্থ।রোহিনী তখনও বিছানায়।অকাতরে ঘুমাচ্ছে। আজ রোহিনী কে ছাড়াই যাবে চেম্বারে মনঃস্থির করেছে। কিছুটা সময় তার নিজের জন্যও চাই।ডাঃ রায় কে বলবে সে নিজেও ভালো নেই।আজকাল রাত্রিগুলো তার অবসন্নতায় ভরা।

 রোহিনীর অসুস্থতা একা তার উপর নয় তিন্নি-বুকানের উপরেও প্রভাব ফেলছে।পড়াশুনায় প্রচন্ড অমনোযোগী হয়ে উঠছে ওরা।নিত্যদিন পেরেন্টস কল।আর পেরে উঠছে না একা-একা।



ঘুম থেকে উঠে রোহিনী দেখলো পার্থ অফিস চলে গেছে।তিন্নি-বুকান স্কুলে। মুখ হাত-পা ধুয়ে,চা খেয়ে রান্নার দিদি কে রান্না বুঝিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে অনিকেত কে ডাক দিতে গিয়ে দেখলো অনিকেত ওকে ডেকে চলে গেছে। আপাতত অফলাইন। সকাল-সকাল অনিকেতের কাছ থেকে ডাক পেলে মন ভালো হয়ে যায় ওর।ছবি না হোক,  যদি একবার গলার স্বরটা অন্তত শুনতে পেতো।মন খারাপ লাগে রোহিনীর। কতবার বলেছে এই সময়টা ও ফাঁকাই থাকে যেন  ভিডিও কল বা ফোন করে অনি।অনি প্রতিবার এড়িয়ে গেছে বলেছে, ‘না থাক এই তো ভালো।’ ও জোর করেনি। জোর করতে পারে না রোহিনী। একা-একা মনখারাপগুলোর সাথে বকবক করে যায়। অনিকেতে তো এখন আর তার একার নয়।


‘বৌদি আমি কি যাবো তবে?’ মিঠুদির গলায় চমকে উঠলো রোহিনী।তারপর মনে-মনে হেসে ফেলল, ইস! আজকাল যে তার কী হয়েছে।সারাদিন অন্যমনা হয়ে আছে। কত পুরোনো, কবিতা গান মনে পড়ে যায় । চোখের সামনে সেপিয়া টোনে ঘোরাফেরা করে।

‘উম এই মিঠুদি শোনো! একটু সর্ষে বেটে,নারকেল কুড়িয়ে রেখে যেও,চিংড়ি মাছ আছে ফ্রিজে রাতে করবো। আর তুমি যাওয়ার আগে রুটি তরকারী খেয়ে নিও কিন্তু,কথাটা বলে আয়নার সামনে বসে চিরুনিটা তুলে নিল।
মিঠুদি চলে যাওয়ার সামনে একবার আড়চোখে ওকে দেখে নিল।

‘তোমার কী সুন্দর চুল।তুমি স্টেপ কাটলে দারুণ দেখাবে।

‘চুলের তুমি কী বোঝো?’ নিজে তো কোন যত্নই নাও না।’

‘তাতে তো তোমার মত একজন কে পেয়েছি।’

‘আচ্ছা খুব অহংকার দেখছি।’

‘সেতো হবেই সেরা জিনিষটা যে আমার ঝুলিতে ম্যাডাম।’

‘আহা! কত ঢং।’

‘সে তুমি যাই বল।’ এই বলছি সিনেমা যাবে?’

‘কী? সিনেমায় যাবো? সেই তারপর দেরী হোক আর আমি বাড়িতে বকুনী খাই। আমার মা-বাবা কে তো জানোই কেমন।’

‘ ভীতুর ডিম।’

‘মোটেই না। আমাকে একটা চাকরী পেতে দাও দেখবে আমি কি করি।’

‘আচ্ছা আপাতত বাড়ি যাও।নইলে কাকু আমার মেসে হামলা করবেন।’

‘শয়তান একটা। ‘

বিকেলের বারান্দায় নিভে যাওয়া সূর্যের আলোয় অনিকেত কে আবার যেন নতুন করে ছুঁতে পারছে রোহিনী।সেই কবেকার কথাগুলো বকুল ফুলের মত কোঁচড়ে এসে ঝুপঝাপ পড়ছে।

‘এই তোমাকে বকুল বলে ডাকি?’

‘না একদম না।আমি রুহ’

মা! ও মা! মা! বুকানের ডাকে হুঁশ ফিরলো রোহিনীর।

‘হুম বলো।’

‘ক্ষিদে পেয়েছে খুব’

‘যাও পড়তে যাও।আমি খাবার বানিয়ে দিচ্ছি।’

‘না এখন খেলবো।চল না ক্যারাম খেলি
আগের মত।’

‘না পড়তে যাও।বিরক্ত কর না।’

‘না আমি পড়তে বসবো না’

‘মুখে -মুখে কথা বলবে না তুমি।’

‘তুমি একটা পচা মা।পচা।কেঁদে ফেলল বুকান।

ঠাস করে একটা চড় লাগাবো গালে।অসভ্য ছেলে।অসভ্যতা শিখছো।’চেঁচিয়ে উঠলো রোহিনী।

মায়ের চিৎকার শুনে ততক্ষণে দশ বছরের তিন্নি ছুটে এসেছে। আট বছরের ভাইকে কাঁদতে দেখে জড়িয়ে ধরল,বলল ‘বাবি বলেছে না মায়ের শরীর ভালো না।বিরক্ত না করতে।কাঁদে না ভাই।চল্।বুকান কে  হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল তিন্নি।

রোহিনীও গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেল।


‘আসতে পারি?’ ডাঃ রায়ের চেম্বারে ঢোকার মুহূর্তে জিজ্ঞেস করল পার্থ।

‘আসুন।বসুন।রোহিনী কেমন আছেন?’ডাঃরায় মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন।

‘ডা: রায়ের অমায়িক ব্যবহারে বরাবর মুগ্ধ হয়েছে পার্থ। হেসে বলল, যেমন ছিল তার থেকে খারাপ না ভালো কী বলবো বুঝতে পারছি না।’

‘আমি জানি এই সময়টা খুব মুশকিলের। আপনি যেটা সহ্য করছেন সেটা যে পাহাড়-প্রমাণ হয়ে উঠবে একদিন,আপনি তো জানতেন।তাইনা?’ডাঃ রায় নরম সুরে বললেন।

‘হুম।কিন্তু ও যে দিনদিন ভীষণ জেদী, একগুঁয়ে হয়ে উঠছে।’

‘আপনাকে তো আমি বলেছিলাম তখন।আপনি বলেছিলেন আপনি শুধু ওকে সুস্থ দেখতে চান,দরকার হলে আপনার জীবন দিয়ে।’

‘ আমি হেরে যাচ্ছি।আর পারছি না।’পার্থ ডুকরে উঠল।

‘ পার্থ আপনার স্ত্রী কী ছয় মাস আগে যেমন ছিলেন তেমনই আছেন? নাকি একটু বদলেছেন?’

‘বদলেছে একটু।নাকি সম্পূর্ণভাবে আলাদা মানুষ হয়ে উঠেছে। জানি না আমি।কিছু জানি না।’

‘উনি যে কনকাশানের রোগী।আপনি আপনার রোহিনী কে কবে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে পাবেন আমি জানি না। সবটাই সময় সাপেক্ষ।বোঝাতে পারছি তো?

‘পার্থ শুধুই মাথা নাড়লো।

ডাঃ রায় আবার শুরু করলেন, ওনার অ্যাক্সিডেন্টের পর ওনাকে আপনি ফিরে পেয়েছেন ঠিক তবে আপনাকে মানতে হবে যাকে পেয়েছেন সে একজন অন্য মানুষ।ওনার পুরো চরিত্রটাই পালটে গেছে। ঠিক যেন ডাবল রোল।একবোন ভালো অন্যজন খারাপ।মাথায় আঘাতের ফলে ওনার অনেক স্মৃতিই ডিলিটেড। দে উইল নেভার কাম ব্যাক।’

‘আমি সব বুঝি। তবুও যে আমি নিজেকে সামলাতে করতে পারছি না।’ পার্থর গলায় করুন আর্তি।’


পারতে যে হবেই। ওর মেমরিতে অনিকেত রয়ে গেছে। তাই জ্ঞান ফেরার সময় উনি প্রথমেই অনিকেত কে খুঁজেছিলেন।আপনাকে নয়। এমন কী নিজের সন্তানদের কেও নয়।’ উনি একনাগাড়ে তাকেই খুঁজে চলেছিলেন, সারারাত ঘুমোতেন না দেখে আপনাকে বলেছিলাম অনিকেত নাম দিয়ে প্রোফাইল খুলতে। আর ওকে বলেছিলাম ইন্টারনেটে অনিকেত কে খুঁজতে
আপনি দারুণভাবেই কাজটা করছেন।তাইনা?’

‘কিন্তু আমি যে এভাবে ওকে পেতে চাইনা।আমি আমার রোহিনী কে কী কোনদিন ফের‍ত পাবো না?’

‘আই গেস নো।’ ডাঃ রায় দৃঢ়ভাবে জানালেন।’ হার আইন্ডেন্টিটি হ্যাস কম্পলিটলি চেঞ্জড মাই বয়। ইউ হ্যাভ টু অ্যাক্সেপ্ট ইট।’

‘আচ্ছা।তবে আজ আসি। বিমর্ষ পার্থ উঠে দাঁড়ালো।

ডাঃ রায় ইশারায় বসতে বললেন, দেখো জানি খুব টাফ টাইম যাচ্ছে। তবে তুমিই পারবে ওকে ব্যালান্সড করতে। টেক ইয়োর টাইম। আর ওকে স্পেস দাও ফর রিকন্সিলেশান।

‘আচ্ছা। আমি নেক্সট ডেটে ওকে আনবো।ওকে একটু বোঝাবেন যাতে ও বাচ্চাদের সাথে একটু ফ্যামিলিয়ার হয়’ কথাটা বলে পার্থ বেরিয়ে যাচ্ছিল।

 ডাঃ রায় পিছন থেকে ডাক দিলেন

‘পার্থ ওকে কখনোই জানতে দিও না যে তুমিই ওর অনিকেত। তোমরাই পরস্পর কে রুহ আর অনিকেত বলে ডাকতে এককালে। তোমার অনিকেত নামটাও ওরই দেওয়া।নামটা স্মৃতিতে থেকে গেলেও মানুষটা হারিয়ে গেছে। মে বি ফরএভার।
 ও একটা ঘোরে আছে। ঘোরটা কেটে গেলে ….  বুঝতে পারছো তো?


পার্থ চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘন বাতাস বুকে টানলো।  বুকভরা বিষাদ নিয়ে ভূতগ্রস্তের মত দাঁড়িয়ে আছে এক অবসন্ন প্রেমিক। ঘুণপোকারা ফালা-ফালা করে দিচ্ছে তার নরম পাঁজর।

পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে উইকিপিডিয়ায় নরওয়ে দেশটা খুঁজে বের করলো। আজ রুহ কে নরওয়ের গল্প বলতে হবে। বাসে উঠতে- উঠতে ঠিক করলো বাকী তিনটে কবিতার বইও পুড়িয়ে ফেলতে হবে অন্যগুলির মতই।



রিংকু কর্মকার চৌধুরী

ইংরেজী তে স্নাতকোত্তর।অপদার্থের আদ্যক্ষর পত্রিকা, পথের আলাপ, দৌড়, কবিতা ক্লাব, নতুন কৃত্তিবাস, চিলেকোঠা, নিয়ন,রংছুট, শব্দের মিছিল, শাব্দ, শব্দযান, বৃষ্টিদিন এ ছাড়াও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিওমিত লেখেন। কবির কাছে লেখা মনের আরাম। কেরিয়ার- নিজস্ব বুটিক অমলতাস।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।