স্বার্থক সম্প্রীতি ও হিন্দু–মুসলমান

কৌশিকরঞ্জন খাঁ on

ভবিষ্যত দ্রষ্টা কবিরা জানতেন ভারতীয় উপমহাদেশ কোন বারুদের স্তুপের উপরে অবস্থান করছে, তাই তাঁদের লেখায় সবসময় সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। হিন্দু – মুসলমান দুই মুখ্য ধর্ম এই উপমহাদেশের কাজেই এই অঞ্চলের শান্তি নির্ভর করবে তুই কমিউনিটির সম্প্রীতির উপরেই। তাই নজরুল লিখেছিলেন — ”মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান ”। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, / অন্ধ সে জন শুধু মারে আর মরে”। মহান লেখকদের এই উপলব্ধি মানুষের চেতনার মূলে সম্প্রীতির বারি সিঞ্চন করতে কিছুটা সফল অবশ্যই হয়েছে কিন্তু বাকি থেকে গেছে অনেকটাই। তাই বিশ শতকে এসেও সংখ্যালঘুদের হন্যে হয়ে বাড়ি ভাড়া খুঁজতে হয়।বিধর্মী বলে মুখের উপর দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে গিয়ে কবি আব্দুস সামাদ সমুকে গভীর বেদনা নিয়ে লিখতে হয়েছে — “একই বৃন্তে দুটি কুসুম, এখনও তাই ভাবো?/ এমন কথা আনলে মুখে আচ্ছাসে চাবকাবো।”

চেতনা সম্পন্ন চিন্তাশীল মানুষের প্রাজ্ঞ কবিদের উত্তরাধিকার বহন করার সময় এটা। লেখায়, নাটকে সিনেমায় আরও বেশি বেশি সম্প্রীতির বার্তা পরিবেশন হওয়া উচিৎ। তাই আজও অক্লান্ত ভাবে জাতির বিবেক হয়ে কথা বলে উঠতে হয় অশীতিপর কবি শঙ্খ ঘোষকে, অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে। এই কারনে তাদের খারাপ কথা কম শুনতে হয় না, কিন্তু তাঁরা তাঁদের পবিত্র কর্তব্য পালন করা থেকে পিছিয়ে আসেন না। কেন না বলতে বলতেই একদিন হবে, শুনতে শুনতেই একদিন হবে।

হিন্দু – মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকেই সম্প্রীতির জন্য ঐকান্তিক প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। থামলে চলবে না। আমাদের জীবনযাপন এবং অভ্যাসে এই সম্প্রীতিকে লালন করতে হবে। হিন্দু– মুসলমান দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে পরষ্পরের কাছাকাছি আসতে হবে। সম্প্রীতির সেল্ফি তুলে স্যোসাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেই দায়িত্ব শেষ হয়না কিংবা ব্রাক্ষ্মন কমিউনিস্ট নেতা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গো– মাংস ভক্ষন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দায়িত্ব এর পর থেকেই শুরু হয়।

উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে আন্তরিক ভাবে ভাবতে হবে — আমার আচরণ কি সম্প্রীতির সহায়ক? নাকি ‘ জলের উপর পানি না পানির উপর জল’ করতে করতে সম্প্রীতির সৎকার সম্পন্ন করছি। বৈশাখ মাসে শিবলিঙ্গে জল ঢালার হিড়িক পড়ে। এসময় দেখা যায় একশ্রেণির মানুষ ‘বোল ব্যোম’ ধ্বনি তুলে জল ঢালতে ছোটে। সেই ‘বোল ব্যোম’ উচ্চারণে যতনা ভক্তি থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে উন্মাদনা ও ত্রাস ছড়ানোর সস্তা প্রয়াস। একই কথা মহরমের তাজিয়ার দিনেও খাটে। জৌলুসে ফিঁকে হয়ে যায় কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া হৃদয় বিদারক ঘটনা। পথচলতি মানুষ যানবাহন ত্রস্ত হয়ে পড়ে অস্ত্র সজ্জিত সেই সব উন্মাদনায় পরিপূর্ণ তাজিয়া দেখে।

কে বড়ো? এই প্রশ্নের সমাধান কোনোদিন হবেনা কেননা যতক্ষন না স্বীকৃতিটা বিপরীত দিক থেকে আসে ততক্ষন এই প্রশ্নের সমাধান হবেনা। আপনাকে বড়ো বললেই বড়ো হওয়া যায় না। বড়োজোর কূপমন্ডুক হওয়া যায়। ধর্মোন্মাদদের সাধনাই কূপমন্ডুক হওয়ার।

এখন দেখা যাক আমাদের সম্প্রীতি সাম্প্রতিক সময়ে কিভাবে এগোচ্ছে। মুসলমান মহল্লা দিয়ে ধর্মীয় মিছিল থেকে ‘জয় শ্রী রাম’ অথবা হিন্দু মহল্লা দিয়ে যাবার সময় মিছিল থেকে যদি গলার রগ ফুলিয়ে বলা হয় ‘নারায়ে তকবির’ কিংবা ‘আল্লাহ হু আকবর’ – তাহলেই সম্প্রীতির দফারফা সম্পন্ন হয়। রামনবমীর মিছিলে এসে ফেজ টুপি পরে পানীয় জলের বোতল দিলে কি হয়? সম্প্রীতি হয় নাকি নাম কেনার সস্তা প্রয়াস হয়? একদিন জল দিলাম আর বছরের তিনশ চৌষট্টি দিন বলবো – এই মহল্লায় বিধর্মী ঢুকতে দেব না!

এই ভারতবর্ষ দেখেছে কোনও মুসলিম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হিন্দুর মুদিখানা দোকান থাকলে তার পাশে রাতারাতি মুসলমানের দোকান হয়। এবং মাতব্বরদের ফিসফাসে, চাপা হুমকিতে হিন্দুর দোকানের খরিদ্দার কমতে থাকে এক সময় দোকানটি উঠে যায়। আবার দেখা যায় কোনও হিন্দু পাড়ায় কোনোভাবে কোনও মুসলিম বাড়ি কিনলে তাকে প্রতিবেশী হিসেবে মেনে নেওয়ার উদারতা দেখায় না হিন্দু সমাজ। সম্প্রীতির পক্ষের যোদ্ধাদের এই জায়গাতেই আঘাত করতে হবে। আমি সারা বছর ফেজ টুপি পরি না এলাকায় থাকার সময় কিন্তু বাসে ট্রামে যেতে গেলেই পরতে ইচ্ছে হয়। এই মানসিকতা বদলানো দরকার। কোলকাতার রাস্তায় দেখেছিলাম ট্রাফিক সার্জেন্ট হেলমেটহীন সওয়ারীকে আটকে ফাইন ঠুকছে পাশ দিয়ে ফেজ টুপি পরা তিনজন এক বাইকে চেপে চলে গেলেও তাদের আটকানো হলো না। সরকারি ব্যক্তির এই কর্তব্যে গাফিলতি সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়। রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে সব নাগরিক সমান। আইন ভাঙলে একই সাজা – এই অভ্যাস গড়ে না উঠলে সম্প্রীতি বাধাপ্রাপ্ত হবেই।

এদেশের হিন্দু ও মুসলমান রাজনীতি করতেও মেরুকরণ করে নিচ্ছে। আমি হিন্দু অতএব আমার স্বাভাবিক ভাবে হিন্দুত্ববাদী দলকে সমর্থন করা উচিত কিংবা আমি মুসলিম অতএব আমাকে উলেমাদের কথা শুনে ভোট দিতে হবে– এই অভ্যাস ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ভীষন ক্ষতিকারক। স্বাধীন দেশের শিক্ষিত জনগণ যদি মন্দির মসজিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার অভ্যাস না ছাড়তে পারে তাহলে সম্প্রীতি আসবে কোন পথে?

ধর্মাচারন মানুষের ব্যক্তিগত অভিরুচি। তা এতটা প্রকাশ্যে না আসাই উচিত যাতে আমাদের সংবিধান নির্দেশিত ধর্ম নিরপেক্ষতা চাপা পড়ে যায়। কজন হিন্দু রোজ দুবেলা সন্ধ্যা আহ্নিক করেন? অথচ হাঁটে বাজারে ভিড়ে লোকালয়ে চায়ের দোকানের আলোচনায় তার চেয়ে বড়ো হিন্দু আর কেউ হয়না।

এদেশের মুসলমানেরাও সবসময় নিজেদের মতো করে জুড়ে যেতে চান নিজেদের ধর্মের লোক পেলে। এই মানসিকতা সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেবেই। ব্যক্তিগত ধর্মাচারনের সময় ছাড়া মানুষের ধর্মীয় পরিচয় কোন কাজে লাগে? রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায় পরপোকারী মানুষ। সুস্থ হয়ে কি খোঁজ নিতে বসি আমাকে হাসপাতালে যারা ভর্তি করেছিল তাদের মধ্যে কজন হিন্দু কজন মুসলমান? কিংবা যে রক্ত ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে দেওয়া হলো তাতে কার রক্ত ছিল?  অথবা যে ডাক্তারবাবু আমার চিকিৎসা করছিলেন, বিপরীত ধর্মের মানুষ জানলে কি জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে তাকে অস্বীকার করতে পারবো?জীবনমরনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে যখন আমি আমার হিন্দুত্ব বা মুসলমানিত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাইনা তাহলে সুস্থ সবল ভাবে বেঁচে থাকতে কেন খামোখা ধর্ম ধর্ম করে মাথা খারাপ করি!

কোনও ভেক ধারণ না করেও আমি যা সেই পরিচয় নিয়েই অন্য ধর্মের মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করতেই পারি। ভেকধারনে একধরণের শঠতা থাকে। শঠতা মুক্ত হয়ে আন্তরিক ভাবে মানুষের সাহচর্য কামনা করলে বিফল হতে হয় – এরকমটা মনে হয়না। এই যে এতো বিরোধ দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে, তার প্রধান কারণ হিন্দু মুসলমান পরষ্পরকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছে কম। সামাজিক, পারিবারিক অনুষ্ঠানে একত্রিত হয়ে অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক দাবী দাওয়ায় মানুষ পরিচয়ে সম্মিলিত অংশগ্রহণই পারে হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির সেতু গড়ে তুলতে। চিন্তা, চেতনা, সম্পর্ক , মূল্যবোধের অভ্যাসে যেদিন ধর্মীয় পরিচয় গৌণ হয়ে যাবে সেদিনই স্বার্থক সম্প্রীতির পরিমন্ডল গড়ে উঠবে।



কৌশিকরঞ্জন খাঁ

১৯৭৭ সালে জন্ম। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর । সব রকম গদ্য লিখলেও ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখতে বেশি পচ্ছন্দ করেন। আনন্দবাজার, নন্দন, কথাসাহিত্য, শিলাদিত্য, তথ্যকেন্দ্র, উত্তরভাষা, মোহিনী তে লেখা ছাপা হয়।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।