সুখ

শুভঙ্কর চ্যাটার্জী on

দিনভর ক্ষেতে খামারে কাজ সেরে বিকালে ঘরে ফিরতেই বউয়ের খ্যাঁচখেচি শুনতে হল নবীনকে। মেজাজটা কীভাবে ঠিক থাকে? আজ রোদও চড়া। ধান গাড়ার সময়। হাতে প্রচুর কাজ। অনেক কষ্টে রাগ সামলে বলল- দ্যাখ হাসি, মাথাখান গরম আছে, ঠিক করে কথা ক।
– ক্যান খারাপটা কি কইসি?
-কিছু কোসনি, থাম এখন।
– মোক থামায় কি হোবে, এর পর গোটা গাঁও তো কোবে। তখন? মরদের জাত, নোংরা তো ঘাটা লাগপেই। খারাপ কাজ করার সময় মোর কথা মনে পড়ে না, না? পড়বে ক্যান? হাসি গলা চড়াল।
– থামলি শালী থামলি? চিৎকার করে উঠল নবীন। হাতে ধরা হাঁসুয়াটা বাগিয়ে বলল- এক্কেরে দু ফালা করে রাখব নে। শালা শ্যাষ করে দিল জীবনটাকে।
হাঁসুয়াটা গলার কাছে দেখে হকচকিয়ে গেছিল হাসি। প্রাথমিক চমকটা কাটতেই শুরু করল ফুঁপিয়ে কান্না।
– ধুর শালা, বাড়িতেই থাকপ না। থাক তুই। হাতের অস্ত্রটা মাটিতে আছড়ে ফেলে বেড়িয়ে গেল নবীন।
হাসি দাওয়ায় বসে কাঁদতে লাগল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত। রাতের আকাশে বড় করে চাঁদ উঠল।

অনেক রাতে চোরের মত পা টিপে টিপে বাড়িতে ফিরল নবীন। দেখল হাসি বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে গেছে। কাছে গিয়ে ঠেলা দিল – বউ, অ বউ এখানে বসে কী কর?
হাসি হাতে ধরা হাঁসুয়াটা এগিয়ে দিয়ে বলল- মোক কাটপা কইসিলা। তাই বইসা আছি।
-ছিঃ, ছিঃ, তখন রাগের মাথা, কি কইতে কি কইসি। হাসির হাত থেকে হাঁসুয়াটা নিয়ে দূরে সরিয়ে রেখে বলল নবীন।
-চলো ঘরে চলো।
নিকানো উঠান জুড়ে তখন থকথকে কাদার মত সাদা জোছনা।
ঘরে ঢুকে হারিকেন ধরিয়ে টেবিলে রাখল নবীন। হাসি বিছানায় বসে বলল- মোক আর ভাল লাগে না, না?
– কী কোচ্ছ এসব?
– জানি অন্য মাগী মনেত ধরিসে।
– ক্যান কও এসব কথা? বউয়ের কাঁধে হাত রাখল নবীন।
-নিতাই মন্ডলের বউ তোমার কাছে আইসিলো কি না?
-হ, আইসিলো।
-তুমি ওক নিয়া মাঠের কাম ছাড়ে গেসিলা?
-হ, গেসিলাম। একবার নয় দু বার গেসিলাম।
-কোন কামে গেসিলা? মোক আসে কোলা না ক্যান? ক্যামনে কোবা? ফস্টি- নস্টি করপা গেসিলা তো।
-ছিঃ, এসব ভাবলা কি কোরে? নিতাই গ্যাছে বিদেশ, ধান গাড়ার সময়। বউ আনাড়ি। মোক কোলো নবীনদা এট্টু চলেন না। আপনার বন্ধুর কাম। লেবার রেজনীগুলা মোক ঠকে শেষ করল। তাই গেলাম। নিতাইয়ের বউ মালতী মোক কত সন্মান দেয় আর তুমি এসব ভাবে রাখিছো?
-সত্যি কচ্ছ?
-না মিছা কথা। লোকের কথা শুনে নাচো ক্যান?
হাসির রাগ অনেকটা কমেছে। থেমে থেমে বলল- মোর গা ছুঁয়ে কও।
-এই তো নাও।
-খপরদার কোচ্ছি, হাসি জোর গলায় বলে উঠল -প্যাটত হাত দিবা না, জানো না মোর সুড়সুড়িটা বেশি?
-তাই নাকি, কই দেখি।
হাসিকে ধরে জোর করে বিছানায় শুইয়ে পেটের কাপড়টা সরিয়ে মুখ গুঁজে দিল নবীন।
বাচ্চা মেয়ের মত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল হাসি। নবীনের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল- ওরে, খাওয়া লাকপে না, খিদা পায় নাই?
-খিদা তো পাইসে।
-ইস, রান্না তো করি নাই। রান্নাঘরে চলো, চুলা ধরাই। চালে ডালে মিশাল দিই।
-থাক, অত হাংগামার দরকার নাই, এক কাম করলে হয় না?
-কী কাম?
-আজ রাত তোক মুই খাই আর মোক তুই। ফিসফিসিয়ে বলল নবীন।
হাসি লজ্জার হাসি হেসে বলল- উঁ, ঢং।

হারিকেনের আলোটুকু নিভে গেল। ধীরে ধীরে ঘর ভরা সুখ সাগরে ডুব দিল দুটি মানুষ। তাদের ভালোবাসার সাক্ষী রইল চাঁদের সেটুকু আলো, যেটুকু ঘরের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ছিল।


শুভঙ্কর চ্যাটার্জী

জন্মঃ ১৯৮২ সালের ২৭শে জুলাই। পড়াশোনাঃ বালুরঘাট হাই স্কুল। লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত স্নাতক স্তর থেকে। বর্তমান পেশাঃ প্রাথমিক শিক্ষক। সঙ্গে লেখালেখি। এছাড়া ছবি আঁকার সঙ্গে যুক্ত।ছবি আঁকার প্রথাগত কোন শিক্ষা নেই। অনেকটাই দেখে শেখা। সে অর্থে স্বশিক্ষিত। ছবি আঁকার সঙ্গে যুক্ত ছেলেবেলা থেকেই। অয়েল এবং অ্যাক্রেলিকে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। মুলত ছোটগল্প ও অণুগল্প লিখতে ভালোবাসেন। এছাড়া কিছু বড় গল্প এবং উপন্যাস ও লিখেছেন। মানুষের কথা, সমাজের কথা, সাংসারিক টানাপড়েন এইসবই লেখার উপজিব্য বিষয় । আনন্দমেলা, পত্রপাঠ প্রভৃতি পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে। স্থানীয় পত্রিকা আত্রেয়ীর পাড়াতে লেখা ছাপা হয়। কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প - ফ্রেন্ডশিপ, ফেরী, বিষ ইত্যাদি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।