“মাতৃ দিবসে সকল মায়েদের

প্রতি রইল আমার শুভেচ্ছা।”


মোনালি ছুটে গিয়ে ডঃ ঘোষকে রিপোর্ট করল ২০৩ নাম্বার বেডের পেসেন্টের জ্ঞ্যান ফিরে এসেছে। ডঃ ঘোষ তারাতারি ছুটে গেলেন দেখলেন ভদ্রমহিলা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। ডঃ ঘোষ তার কানের কাছে গিয়ে বললেন, “ মা কেমন আছেন এখন ? একটু ভাল লাগছে ?কথাটি শুনে ভদ্রমহিলা কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলেন ডঃ ঘোষের দিকে তারপর চোখের পাতাটি বন্ধ করে সম্মতি জানালেন। আবার ডঃ ঘোষ বললেন, “ মা আপনার নাম কি ?বাড়ি কোথায় ? একটু কথা বলার চেষ্টা করুন।” কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর ভদ্রমহিলা বলল, “ কি হয়েছে আমার ? আমি এখানে কেন ?” ডঃ ঘোষ ততক্ষণে নিশ্চিন্ত হলেন যাক ভদ্রমহিলার কথা বলার ক্ষমতা চলে যায় নি। মনে মনে খুব খুশি হলেন ডঃ ঘোষ। বললেন, “ আপনার একটু শরীর খারাপ হয়েছিল।”

— কি হয়েছিল স্ট্রোক ?

— হ্যা আপনার সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়েছিল।

— কে আমাকে এখানে নিয়ে এল ?

— সম্ভবত আপনার প্রতিবেশীরাই আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

— এটা কোন হাসপাতাল ?

— এটা আনন্দলোক হাসপাতাল।   

— ওঃ আচ্ছা।

— মা এখন আপনার কেমন লাগছে ? কোন কষ্ট আছে ?

— না ডাক্তার আমি ভালো আছি। আর আমার যেখানে কষ্ট তা তুমি সারাতে পারবে না।

— মানে ?

— ও কিছুনা। তুমি যাও।আমি ঠিক আছি।

ডঃ ঘোষ চলে গেলেন। মোনালিরও ডিউটি আওয়ার শেষ। নাইট শিফটে এল চয়নিকা মোনালি তাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। চয়নিকা ওয়ার্ডে এসে দেখল ২০৩ নাম্বার বেডের পেসেন্ট তখন জেগে। উনি একা একা উঠে বসার চেষ্টা করছেন।চয়নিকা দৌড়ে ওনাকে তুলে দিতে গেল কিন্তু ভদ্রমহিলা বললেন, “ না না আমাকে একা উঠতে দাও। আমি পারব।” চকনিকা অবাক হয়ে গেল। এত মনের জোর ? ও পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সত্যি উনি একাই উঠে বসলেন। রাতে একটু হাল্কা খাবারও খেলেন। তারপর ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বললেন, “ আমায় একটু ওয়াশরুমে নিয়ে যাবে ?” চয়নিকা খেয়াল করল ভদ্রমহিলা প্রায় নিজের চেষ্টাতেই ওয়াশরুম পর্যন্ত হেঁটে গেল। বেডে ফিরে এসে একটু চা খেয়ে পাশের বেডের ভদ্রমহিলার সঙ্গে গল্প করছেন এমন সময় ডঃ ঘোষ এলেন রাউন্ডে।ওনাকে দেখে বললেন, “বাঃ আজ তো আপনাকে বেশ চনমনে লাগছে। আর দু দিন দেখে আপনাকে ছুটি দিয়ে দেব।” এবার চয়নিকার যাবার পালা মর্নিং শিফটে আজ আবার মোনালির ডিউটি। মোনালি এসে ওয়ার্ড ঘুরে দেখছে সকলকে ওষুধপত্র দিচ্ছে তখন অর চোখ পরল ২০৩ এর ভদ্রমহিলার উপর।ওনাকে মোনালির  খুব ভাল লেগেছে সব সময় ঠোঁটের কোনায় হাঁসি কোন বিরক্তি নেই। প্রচন্ড স্বাবলম্বী। যাকে মায়ের মত শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে হয়। মোনালি সব কাজ সেরে একটু ফাঁকা হয়ে ওনার কাছে এসে বলল, “ কেমন আছেন মা ?

— ভালো।

— আপনার কাছে একটু বসব ?

— বেশ তো বোস না। একটু গল্প করি। আজ তো তোমার ওয়ার্ড ভালই যাচ্ছে। এখন তো মনে হচ্ছে তুমি একটু ফাঁকা।

— হ্যাঁ তাই তো এলাম আপনার সঙ্গে গল্প করতে।মা আপনার বাড়ি থেকে কেউ আসে নি ?

— নাঃ !

— আপনাকে কে রিলিজ করে নিয়ে যাবে ? নার্সিং হোমের বিল কে মেটাবে ? কাউকে তো দেখছি না।

— কেউ নেই আমার।

— তাহলে ?

— নার্সিং হোমের বিল আমি নিজেই মিটিয়ে দিতে পারব।

— কেউ নেই ? আত্মীয় স্বজন, বন্ধু ?

— হ্যাঁ বন্ধু একজন আছে কিন্তু সে বিদেশে থাকে। আর আত্মীয় স্বজন তারা কেউ থেকেও নেই।

— আপনি কি চাকরি করেন ?

— করতাম। রিটায়ার করেছি দু বছর হল। ডাক্তার ছিলাম আমি। আমার নাম ডঃ নিরুপমা চৌধুরী।

— হ্যাঁ। নাম টা তো দেখেছি কিন্তু আপনি যে ডাক্তার ছিলেন সেটা জানতাম না। তাহলে আপনার ছেলে–মেয়ে তারা বুঝি খবর পায়নি ?

— ছেলে – মেয়ে ? তা ছেলে একজন ছিল।

— ছিল মানে ? কি হয়েছে তার ?

— না না কিছু হয় নি। আমাকে আজকাল আর তার ভালো লাগেনা।

— এই হয়েছে এখনকার ছেলেদের সমস্যা নিজের মাকে আর ভালো লাগে না।

— নিজের মা ? আচ্ছা মা ও নিজের বা পরের হয় তাই না ? মা ভালো হয় খারাপ হয় ! আচ্ছা মা শুধু মা হয় না ? যে নিজের জীবনের সব টুকু দিয়ে তার সন্তান কে ভালবাসবে।

— ঠিক বুঝলাম না।

— থাক ওসব কথা। তুমি বল তোমার বাড়িতে কে কে আছেন ?

— আমি আর আমার মা। বাবা অনেক ছোট বেলায় মারা গেছেন। মা অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন আমাকে।

— মা কে কক্ষনো কষ্ট দিয়ো না। তিনি তোমাকে বড় করে তার দ্বায়িত্ব পালন করেছেন এবার তোমার পালা।

— ঠিক বলেছেন। খুব চেষ্টা করি জানেন মাকে ভালো রাখার।

— এই টুকুতেই হবে। তুমি কি পারলে বা পারলে না সেটা বড় কথা নয়। তুমি যে চেষ্টা করছ এটাই সব। 

— আপনি বলুন না। আপনার ছেলের কথা। কি হয়েছিল ?

— সে অনেক কথা।

— বলুন না।অবশ্য যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।

— না না আপত্তির কি আছে ? তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে তোমাকে বলাই যায়।আমি তখন সবে ডাক্তারি পাশ করেছি। প্রথম পোস্টিং গ্রামের একটা হেলথ সেন্টারে। বাবা মার খুব আদরের মেয়ে ছিলাম আমি। শহরের মেয়ে গ্রামে গিয়ে প্রথমে খুব অসুবিধায় পরলাম মনে হল চাকরি ছেড়ে দেই কিন্তু গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় আমি খুব তারাতারিই ওদের খুব কাছের একজন হয়ে উঠলাম। তখন আর ওদের ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করল না। খুব আনন্দে কাটছিল দিনগুলো। আমার এক বন্ধু ছিল শালিনী যার কথা তোমায় বললাম।ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।আমরা এক সাথে ডাক্তারি পড়েছি। তারপর ও আরও পড়াশুনার জন্য বিদেশ চলে যায়। আর দেশে ফেরে নি।

                 একবার আমি বাড়ি আসছিলাম ট্রেনে ঠিক আমার সামনের সিটে লাল শাড়ি পড়া একজন মহিলা মুখটা ঘোমটায় ঢাকা,হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি পড়া কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে উঠল। ওরা আছে ওদের মত। আমিও আমার মত রবিঠাকুরের ‘চোখের বালি’ পড়ছি। আমাদের কামরাটা তখন প্রায় ফাঁকা। হঠাৎ মহিলাটি আমায় বলল,“ বেহেণজী আমি একটু টয়লেট যাচ্ছি আমার লেড়কাটাকে একটু দেখবেন তো।” আমিও বই থেকে মুখটা তুলে বললাম, “ঠিক আছে।” ট্রেনটা তখন দাঁড়িয়ে ছিল। আমি দু এক লাইন করে পড়ছি আর বাচ্চাটাকে দেখছি ও তখন ঘুমাচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষন হয়ে গেল ভদ্রমহিলা আসছে না এদিকে ট্রেনও ছেড়ে দিয়েছে। আমি তো পড়লাম মহা মুশকিলে কোথায় গেল সেই মহিলা কোথায় খুঁজব তাকে ? এতটুকু বাচ্চাকে কার কাছে দেব ? আমার তো পাগল হবার জোগাড়। কাউকে কিছু বলতেও পারছি না আমার কাছ থেকে নিয়ে বাচ্চাটার যদি কেউ ক্ষতি করে দেয়। এর মধ্যে বাচ্চাটা জেগে ওঠে। ও কাঁদতে শুরু করে।  পাশেই ওর দুধের বোতলটা রাখা ছিল ওটা খুলে আমি ওর মুখে ধরি। বাচ্চাটা ওর ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে আমার আঙুল গুলো ধরল।আমি কেমন বাচ্চাটার প্রতি দুর্বল হয়ে পরছিলাম। কি অদ্ভুত সেই অনুভুতি যেন আমায় বলছে “আমায় ছেড়ে যেও না।”ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি মহিলাটি বাচ্চাটাকে রেখে পালিয়েছে। সারাটা রাত বাচ্চাটাকে নিজের কাছেই রাখলাম। ভাবলাম বাড়ি গিয়ে বাবার সাথে আলোচনা করে একটা ব্যাবস্থা করা যাবে। কি অদ্ভুত একটা রাতে বাচ্চাটার উপর কেমন মায়া পরে গেল আমার।পরের দিন সকালে ট্রেন থেকে নেমে বাড়ি যাচ্ছি পাড়ার লোকগুলোর কেমন কৌতূহলী দৃষ্টি খেয়াল করলাম আমি। কেমন একটা আড় চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমি পাত্তা না দিয়ে বাড়ি গেলাম বাড়ি ঢুকতেই যথারীতি মা জিজ্ঞেস করল, “ কি রে এটা কে?” আমার সাথে মার সম্পর্ক তা ছিল একদম বন্ধুর মত আমি ও মজা করে বললাম “ আমার ছেলে তোমার নাতি।” সাথে সাথে আমাদের বাড়ির পরিবেশটা পালটে গেল। আমি তখনও ফ্রেশ হইনি সবে সোফায় বসেছি সারারাতের জার্নি তার উপর আবার বাচ্চাটাকে সামলান খুব ক্লান্ত লাগছিল। বাবা –মা দুজনেই ততক্ষণে ভেবে নিয়েছে ও সত্যি সত্যি আমার ছেলে। নানা রকম ভাবে বকাবকি করতে লাগল আমি ওদের বঝাবার চেষ্টা করছি এমন সময় পাশের বাড়ির দুই কাকিমা এসে হাজির। এসেই মাকে বললেন,“ কি ব্যাপার শিলাদি মেয়ে যে একদম বাচ্চা কোলে নিয়ে ঢুকল ? তা কবে হল এসব কিছুই তো বললে না। জামাই কোথায়? কথা গুলো আমাকে কেমন ছুরিকাহত করতে লাগল। বাবা মা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি কোন ভাবেই পরিস্থিতি সামলাতে পারছি না। এই কাকিমাদের কথা মা আগেও আমাকে বলেছিল এরা নাকি সব বিষয়েই আমাকে হিংসে করত। আমি মাকে বলতাম পাত্তা দিও না এনজয় কর। কিন্তু সেদিন আমি আর এনজয় করতে পারলাম না। বুঝলাম মা কেন এদের কথায় কষ্ট পেত। বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বললেন। আমারও খুব অভিমান হল যে আমার নিজের বাবা মা আমাকে বুঝল না ? আমি কেমন আমার বাবা মা কি তা জানে না ? জান তো মা আমাদের সমাজের আজ এই অবস্থা কেন ? আসলে আমাদের সমাজে মেয়েরাই মেয়েদের সব থেকে বড় শত্রু। বিপদে কেউ কারো পাশে দাঁড়াবে না কিন্তু কারো যদি কোন দুর্বল জায়গা খুজে পেল তো আর কথাই নেই তাকে একদম দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেবে। যাই হোক আমি বাচ্চাটাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। কোথায় যাই আমি ভাবতে ভাবতে শালিনীর কথা মনে পড়ল। ও তখন কোলকাতায়। ওকে ফোন করে ওর ফ্ল্যাটে চলে গেলাম। একমাত্র ওই সেদিন আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সব শুনে ও অবশ্য আমাকে বাচ্চাটাকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিতে বলল। কিন্তু আমি রাজি হলাম না ভাবলাম ওর জন্য যখন বাবা মাকে ছাড়তে হল তখন ওকে আমি নিজের কাছেই রাখব। তবে ওর মাকে যে খোঁজার চেষ্টা করিনি তা কিন্তু নয়। আমি আর শালিনী বাচ্চাটাকে নিয়ে বর্ধমান স্টেশনে গেছিলাম কি জানি ভাবলাম ওর মা হয়তো ওর জন্য ওখানে অপেক্ষা করছে। অনেক খুজলাম স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম কেউ কোন বাচ্চার খোঁজ করেছে কি না। ওর মা তো বর্ধমান স্টেশনেই নেমেছিল। কোন লাভ হল না। অগত্যা ও আমার কাছেই থেকে গেল। আমি কোলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে নিলাম। শালিনী একটা ফ্ল্যাটেরও ব্যাবস্থা করে দিল। আমি আর শালিনী ওর নামকরণ করলাম। শালিনী ওর নাম রাখল দিবাকর। আশীর্বাদ করে বলল সূর্যের মত তেজস্বী হও। পাশের একটি কালী মন্দিরে ওর অন্নপ্রাশন করলাম আমরা। তারপর শালিনী আবার বিদেশে চলে গেল। এবার আমি একদম একা। কি ভাবে বাচ্চাটাকে সামলেছি ভাবতে পারবে না। একদিকে হসপিটাল আর এক দিকে ও আমি একপ্রকার নাজেহাল হয়ে পরতাম।আস্তে আস্তে ও বড় হল ওকে স্কুলে ভর্তি করলাম। সিঙ্গিল মাদারের সন্তানের পরিচয়ে ও বড় হল। পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল আমার ছেলেটা। বরাবরই খুব ভালো রেজাল্ট করত। ভেবেছিলাম আমার মত ডাক্তার হবে কিন্তু ওর ইঙ্গিনিয়ারিং এর প্রতি ঝোঁক। আমিও আপত্তি করলাম না। জান তো সব সময় সব কিছুতে ওকে সাপোর্ট করে গেছি। বাবা মার দুজনেরই ভালোবাসা দেবার চেষ্টা করেছি। ইঙ্গিনিয়ারিং পাশ করে একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরি পেল। ওর অফিসেরই একটা মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করল। মেয়েটি বেশ ভালো। আমরা তিনজনে বেশ ভালই ছিলাম। মাঝে মাঝে বৌমার বাবা মা আসতেন। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিছু দিন পর খেয়াল করলাম বৌমার মা চলে যাবার পর দেবু আর বৌমার ব্যাবহার কেমন পালটে যায়। প্রথম দিকে ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেই নি। নিজের কাজ নিয়েই ব্যাস্ত থাকতাম। এরপর রিটায়ার করলাম। কয়েকদিন আগে শালিনী এসেছিল। আমি ওকে কিছু কিছু কথা ফোনেই বলেছিলাম। সেদিন আমি আর শালিনী ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছি। বউমা ওর মার সাথে ওদের বেডরুমে বসে আর দেবু তখনও অফিস থেকে ফেরেনি। শালিনী আমায় বলল, “ দ্যাখ তুই যে ভাবে দেবুকে বড় করেছিস এমনটা কজন পারবে ? ওর জন্য তুই কোনদিন নিজের কথা ভাবলি না। বিয়ে পর্যন্ত করলিনা পাছে ওর অযত্ন হয়। একা একা একটা বাচ্চাকে মানুষ করলি। বাবা মার দুজনের ভালোবাসা দিলি। কোন কিছুতে ত্রুটি রাখিসনি।”আমি বললাম, “ তুই যদি সেই সময় আমার পাশে না থাকতিস তাহলে এই সমাজে একটা অবিবাহিত মেয়ের পক্ষে একটা বাচ্চা মানুষ করা অত সহজ হত না। আমরা বুঝতে পারিনি বৌমার মা আড়াল থেকে আমাদের কথাগুলো শুনছিল। আমি দেবুকে ওর নিজের সম্বন্ধে কক্ষনো কিছু জানাই নি। ও জানে ও আমার ছেলে। আমি ডিভোর্সি। শুধু শুধু আমি ওকে কষ্ট দিতে চাইনি। ও যে আমার গর্ভে ধারন করা ছেলে নয় সেটা জানলে ও যদি দুঃখ পায়। যদি হীনমন্যতায় ভোগে। আর আমি তো ওকে কখনও নিজের সন্তান ছাড়া কিছু ভাবিই নি।

         বৌমার মা কথা গুলো শুনে নিজের মত করে দেবুকে বলেছে। রাতে উনি চলে যাবার পর ডিনার করে আমি নিজের ঘরে গেছি  এমন সময় দেবু আর বউমা আমার ঘরে এল। কেমন একটা থমথমে মুখ দেবুর। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি খুব রেগে গেলে ওর মুখটা অমন হয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম কিছু বলবে ? দেবু সরাসরই আমায় জিজ্ঞেস করল

— আমার বাবা কে ?

এরকম একটা প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি গম্ভীর ভাবে বললাম

— তোমায় বলেছি না তোমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করবে না। যেদিন থেকে ওনার সাথে আমার ডিভোর্স হয়েছে তার সঙ্গে আমার আর কোন যোগাযোগ নেই।

— বাজে কথা বল না। তুমি তো অবিবাহিত। তার মানে আমি তোমার ফুর্তির ফল তাই তো?

আমি আবার একবার ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলাম। দেবুর প্রশ্নের কি উত্তর দেব ? বুঝতে পারলাম ওর ভালোমত মগজ ধোলাই হয়ে গেছে।আমি ওকে আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলাম না। দেবু বলল, “ আমি আর তোমার সঙ্গে থাকতে পারব না। আমি জাস্ট তোমাকে সহ্য করতে পারছি না আমরা কালই চলে যাচ্ছি তোমাকে জানিয়ে দিলাম।” আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়লেও উপরে যতটা সম্ভব নিজেকে শক্ত দেখিয়ে বললাম, “ তোমার যা ঠিক মনে হয় কর।” সারা রাত ধরে ওরা প্যাকিং করল। সকাল বেলা বেড়িয়ে বাড়ি ঠিক করে এল। দুপুরে সব কিছু নিয়ে বেড়িয়ে গেল।আমি একদম একা  হয়ে পড়লাম শালিনীকে ফোন করলাম ও ছুটে এল আমি আর নিজেকে সামলাতে না ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। ও আমাকে ওর সাথে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যেতে চাইল। আমি গেলাম না। এই বাড়িটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করল না। দেবুর ছোট বেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ঘর গুলোতে। কত সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত ওর আর আমার।স্কুল থেকে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করে এলে বেডরুমেরমের একটা কোনায় বসে থাকত যতক্ষণ না রাগ কমত। আবার যখন খুব খুশি হত তখন ড্রইং রুমে নাচানাচি করত।একটু যখন বড় হল ওকে আলাদা ঘরে শুতে দিলাম মাঝ রাতে উঠে দেখি আমার পাশে এসে শুয়ে আছে। রান্নার লোক থাকলেও ওর জন্য একটা পদ আমাকে নিজে হাতে করতেই হবে। যেদিন পারতাম না সেদিন বাবুর খাবার মুখে রুচত না। এসব স্মৃতি ছেড়ে কি যেতে ইচ্ছে করে ? দুদিন ঠিকই ছিলাম জান কিন্তু মনে হয় প্রেসারের ওষুধটা খেতে  ভুলে গিয়েছিলাম। সেদিন সকাল থেকেই শরীরটা খারাপ লাগছিল। আমার যতদুর মনে পরছে আমি বারান্দা থেকে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলছিলাম। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ কি ব্যাপার দিদি আপনার ছেলে নাকি চলে গেছে ? কি হল আবার ?” আমি বললাম, “ হ্যাঁ ওদের অফিস করতে অসুবিধা হচ্ছে।”এতটুকু মনে আছে তারপর শরীরটা খুব খারাপ করতে লাগল আর কিছু জানি না। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল দেখি আমি এখানে। একি মোনালি তুমি কাঁদছ কেন ? আমি ঠিক আছি। মোনালি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, “ ধন্য আপনি এরকমও মা হয় ? আপনাকে স্যালুট। তবে দিবাকর বাবুকে তো সত্যি তা জানাতে হবে  উনি একজন দেবীকে অপমান করেছেন।

নিরুপমা দেবী বললেন, “না। ওতো কিছু জানতে চায় নি ! ও ওর মত ভালো থাক আমি বেঁচে থাকতে ও কিছু জানতে পারবে না।”

       নিরুপমা দেবী লাঞ্চ সেরে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।  

   ————————–

Categories: গল্প

বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।