এক মুঠো জোনাকী আর রাত রঙা চা

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় on

একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে ছোট্ট বৃত্তগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল। একটা ক্ষীণ মৃদু আন্দোলন। ট্রেন গেলে এমন হয়। স্টেশনের পাশেই চায়ের দোকান। কাঠের বেঞ্চে চায়ের গ্লাস রাখলে শব্দ-তরঙ্গের এমন পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ করা যায়। কাঁচের গ্লাস, না ভাঙলেই হ’ল। মাটির ভাঁড় পেলে ভাল, না পেলে কাঁচের গ্লাস। পরিচিত দোকান, আমার অত ছুঁতমার্গ নেই। গোকুলদার দোকানে সকাল থেকে ভিড় লেগে থাকে। একটা অল্পবয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যন্ত্রের মত কাপের পর কাপ চা সাপ্লাই করে যায়। একের পর এক লোকাল ট্রেন চলে যায়। দুপুর বাড়লে একটু পাতলা হয় ভিড়। তখন হাতপাখা নিয়ে নিজেকে হাওয়া করতে করতে কাঠের বেঞ্চে লম্বা হয়। বাড়ি ফেরে না। আমরা, যার গোকুলদাকে অনেক বছর ধরে দেখছি, তারা জানি… রাত হ’লে একেবারে দোকান বন্ধ করে গোকুলদা ফিরবে, তার আগে বাড়ি যাবে না। বাড়ি ফেরার টান নেই মানুষটার। 


   বিকেল হলেই আবার যন্ত্রের মত ব্যস্ত হয়ে যায় গোকুলদা। আবার সন্ধে বেড়ে রাত হ’লে স্টেশনের সঙ্গে সমানুপাতে ফাঁকা হয়ে যায় দোকান। মফস্বলের স্টেশন। রাত আটটার পর খাঁখাঁ করে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের পেছন দিকের রাস্তা। আমার আবার এই সময়টাই দোকানে এসে বসতে সব থেকে বেশি ভাল লাগে। হলুদ ষাট ওয়াটের আলোয় পেন্টিং-এর মত জেগে থাকে দোকানটা। মেটে রাস্তাতেও অনেকটা দূরত্ব রেখে একটা করে আলোর থাম, একই রকম হলুদ আলো, একটু বেশি জোরালো, অথবা উচ্চতার জন্যে একটু বেশি আলো ছড়ায়। ডিমের খাঁচাটাও হাওয়ায় দুলে উঠলে হঠাৎ মনে হয়, একটা পাখি ডানা ঝটপটিয়ে উঠল খাঁচার ভেতর। সেই খাঁচার ছায়া দুলে ওঠে দোকানের সামনে বেঞ্চের ওপর, হলুদ আলো ফিরিয়ে দেওয়া মাটির ওপর। গোকুলদা চুপ করে বসে থাকে শূন্যদৃষ্টি নিয়ে। ছেলেটা চলে যায় কোথাও আড্ডা মারতে। আমার মত দু-একজন এসে চা অথবা সিগারেট চায়, মাঝে মাঝে। দূর-পাল্লার ট্রেন চলে যায়, স্টেশনে না থেমে। আর বেঞ্চে রাখা চায়ের কাপে এইভাবে জন্মায় মৃদু-আন্দোলন। সামান্য মানুষের ছোট ছোট স্মৃতি ঢেউ।

– তোর এই র চা খাওয়া টা একটা উৎপাত। রাতের দিকে খুব অসুবিধে হয়। 
– কেন? থাকে তো। 
– না থাকে না। সব সময় থাকে না। 
– তাহ’লে বলে দেবে… নেই! 
গোকুলদা উঠে চলে গেল দোকানের জিনিসপত্র গোছাতে। আর কোনও কথা বলল না। আমি দুধ-চিনি ছাড়া চা খাই। এই সময় এলেও র-চাই খেতে চাই। গোকুলদা আলাদা করে র-চা বানিয়ে রাখে। না থাকলে নতুন করে চা-পাতা দিয়ে বানায়। আর মাঝে মাঝে এমন কথা শোনায়। আমিও এমন উত্তর দিই। 

– দোকান বন্ধ করবে?
– হ্যাঁ, এবার কেটে পড়…
– এখনও তো সাড়ে আটটাও বাজেনি! আর এক কাপ…
– না… আর নতুন করে জল চাপাতে পারছি না… অনেক হয়েছে!
– দোকান বন্ধ করার জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?
– শরীরটা ভাল লাগছে না… বাড়ি যাব। 
– বাড়ি ফিরবে? কোথায় ফিরবে  গোকুলদা? আমার সঙ্গে যাবে?

গোকুলদা কাজ থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল। দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও বোঝা যায় বড় বড় চোখ দুটোয় কেমন ভাসা ভাসা দৃষ্টি ছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলল ‘না!’ 

আমি আবার একবার বললাম… “কোথায় ফিরবে গোকুলদা?” 
গোকুলদা শুনতে পেলো না। শুনতে চাইলো না। 

                                        — — — 

গোকুলদাকে অনেক ছোটবেলা থেকে দেখছি। তখন ওর গলায় এমন তুলসীর মালা ছিল না, আর এই চায়ের দোকানও ছিল না। ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে, বাবার মনোহারী দোকানে মাঝে মাঝে বসত। পুজোপার্বনের দিনে যজমানী করত বাবার সঙ্গে। ওর বাবা নাকে তিলকসেবা করে, গলায় তুলসীর মালা পরে দোকানে বসত। টাকার হিসেব করতে করতেই মাঝে মাঝে ‘রাধে রাধে’, ‘হরি হে দীনবন্ধু’ করে উঠত। আড়ালে টিটকিরি করত লোকজন, “হরি হরি… হর হর” এইসব বলে। তবে গোকুলদা ছিল অন্যরকম। একমাথা ঝাঁকরা চুল, বেতের লাঠির মত চেহারা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, টানা টানা চোখ। আমাদের থেকে আর না হ’লেও দশ-বারো বছর বড়। দোকানে বসলে বা রাস্তাঘাটে গেলে দেখা হ’ত। কথা হ’ত না। আলাপও ছিল না। গ্রামের যাত্রায় বিবেক সেজে গান গাইত গোকুলদা।  মহাভারতে কৃষ্ণ সাজত। গ্রামে অমন রেডিমেড কৃষ্ণ পাওয়া দুষ্কর। গোকুলদার ভাল নামডাক ছিল যাত্রাদলে। কাছাকাছি অন্যগ্রামেও শো করে আসত। এমন কি দরকার মত দলের সঙ্গে সাইডে বসে বাঁশিও বাজাতে পারত। তবে, গল্প-সিনেমার মত মাঠে-ঘাটে বাঁশি বাজিয়ে বেড়াতে কখনও দেখিনি গোকুলদাকে। যখন একা একা কোথাও বসে থাকতে দেখেছি, একা… বা দোকা, সেখানেও না। 
যে বছর হায়ার সেকণ্ডারী পাশ করলাম, সেই বছরই আষাঢ় মাসে গোকুলদার বিয়ে হয়েছিল। কবে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, কার সঙ্গে বিয়ে… এসব আমাদের জানার কথা নয়। জানতে পেরেছিলাম, কারণ গোকুলদাকে বিয়ের ছ’দিন আগে থেকে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাড়িতে কান্নাকাটি আর গ্রামে খোঁজখোঁজ পড়ে গেছিল। বিয়ের দু’দিন আগে পাওয়া গেছিল গোকুলদার মাসতুতো দাদার কাছে, বার্ণপুরে। গাড়ি করে নিয়ে এসেছিল পাড়ার চার-পাঁচজন মিলে। কেন চলে গেছিল, আর কেন ফিরে গেছিল তা নিয়ে অনেক রকম কথা শুনেছিলাম। কিন্তু কোনটা সঠিক, বলা মুশকিল। অনেকেই বলল সব গোকুলদার বাবার প্ল্যান। মেয়ের বাপকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করবে বলে ইচ্ছে করে নাটক করল। বিয়ের যোগার-যন্ত্র সব পাকা, এই সময় বিয়ে না হ’লে ফাঁপরে পড়ে যেত মেয়ের-বাড়ির লোক।  কিন্তু বিয়েটা দিনের দিনেই হ’ল। বিয়ের দিন কোনও অশান্তিও হ’ল না। যে গাড়ি করে গোকুলদাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, সেই একই গাড়ি ফুল দিয়ে সাজিয়ে বিয়ে করতে গেল । আমার বাবা-ই পরিচিত একজনকে ধরে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, তাই ভদ্রতা করে বাবাকে বিয়ে-বউভাত দু’দিনই যেতে বলেছিল। বাবা বিয়েতে যেতে পারল না, দূরে বলে। তার বদলে আমি গেছিলাম বর যাত্রী। নির্লজ্জের মত গেছিলাম… বিয়ের ভোজ খেতে। 
   নতুন বউয়ের মত মাথা নিচু করে বসে ছিল গোকুলদা। মাথা নিচু করেই সব আচার-অনুষ্ঠান করছিল,যা যা বলা হচ্ছিল – পুতুলের মত করে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে হেসে ফেলছিল ফিক ফিক করে। দেখে মনে হচ্ছিল না যে ‘বিয়ে করবে না’ বলে পালিয়ে গেছিল এই ছেলেটা। কেন যে অমন সার্কাস করল, বুঝতে পারলাম না। কিন্তু এক ভাঁড় গরম চায়ে দু ফোঁটা হুইসকি ফেলে খেলে একটা অন্যরকম খেতে লাগে… সেটা জানলাম। বেশি না, শুধু দু ফোঁটা! গোকুলদার যাত্রাদলের এক বন্ধু নিয়ে গেছিল লুকিয়ে। 

                                    — — — 

বউদির নাম ছিল গীতা। কথার মধ্যে একটা বাঁকুড়ার আঞ্চলিক টান ছিল, শুনতে বেশ মিষ্টি লাগত। গোকুলদার পাশে মানাতোও ভাল। ওই পালিয়ে যাওয়ার জন্য বিয়ের নেমন্তন্ন, আর বিয়ের নেমন্তন্ন থেকেই গোকুলদার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়। নাহ’লে হয়ত চেনা জানাই হ’ত না সেভাবে। খবর টবর সব পেতাম, কিন্তু এর ওর মুখ থেকে। কিছু আসত যেতো না। কিন্তু আলাপ হয়েছিল বলে গোকুলদা মানুষটাকে চেনার সুযোগ পেয়েছিলাম। আর পাঁচজনের মাঝে থেকেও পাঁচজনের থেকে কোথাও একটা আলাদা। চারপাশে সকলের কথা শোনে, কিন্তু নিজে বেশি কিছু বলে না। হাসে, প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। শুয়ে পড়ে বা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে এলিয়ে যায় চোখ বন্ধ করে। অথচ, যাত্রার রিহার্সালের সময় একেবারে অন্য মানুষ। হাতে বাঁশি তুললে নিজের মধ্যে ডুবে যাওয়া সাধক। সুরগুলো কোনও প্রচলিত গানের নয়, কোথা থেকে এসব সুর শুনে বাজাত কে জানে! জিজ্ঞেস করতাম নিজের দেওয়া সুর কী না,  হাসত। যাত্রাদলের আবাহ-সঙ্গীত কে দেয়, তার নাম আর কে মনে রাখে! নাম থাকত অন্য একজনের, যে অর্কেস্ট্রার ব্যবস্থা করত। অথচ গোকুলদাকে এত বার বলতেও কোনওদিন নিজে একা বাঁশি বাজিয়ে শোনালো না স্টেজে উঠে। যেন কোনও অজ্ঞাত গোপন নিষেধ আছে, পালন করছে একলব্যের মত! 

      কলেজ থেকে ফিরে শনিবার সন্ধেবেলা গোকুলদার বাড়ি যেতাম, তেলেভাজা-মুড়ি খেতে খেতে আড্ডা হ’ত ছাতে বসে। বউদি কখনও আড্ডায় বসত না। কিন্তু মাঝে মাঝে আসত চা দিতে, ধামায় করে তেলে ভাজা দিতে। মুখে প্রকাশ না করলেও, আমরা অনেকই অপেক্ষা করতাম নূপুরের শব্দের। ধীরে ধীরে সিঁড়ির ধাপে ধাপে ওপরে উঠে আসছে। সরাসরি না হলেও, অনেকেই তাকিয়ে থাকত বউদির দিকে… আত্মপ্রকাশ থেকে অদৃশ্য হওয়া… সবটা আকণ্ঠ পান করত। অস্বীকার করলে কিছুই পালটে যাবে না। চোর ছিলাম আমরা সবাই। চুরি করার সুযোগ আর সাহস সবার হয় না।
  গোকুলদা হয়ত কিছু কিছু ব্যাপার বুঝতে পারত। কিন্তু মুখে কিছু বলত না। বছর পার হ’ল। একটা সময় শনিবার সন্ধের আসরও কমতে কমতে হারিয়ে গেল। তার বদলে দেখা হ’ত ক্লাবে, অথবা যাত্রার রিহার্সালের ওখানে। গোকুলদা আমাকে ওখানেও ডাকত। বসে বসে রিহার্সাল দেখতাম।  গোকুলদা যে পার্টির কাজ করত, সেই দলের কাজে গোকুলদার সঙ্গে সাইকেল করে এখানে ওখানে যেতাম। পলিটিক্স বুঝতাম না, কিন্তু এখান ওখান ঘোরা হ’ত… একটা ‘পার্টি করছি’ ব্যাপার ছিল। মজা পেতাম। গোকুলদা কখনও দলীয় মত বা আদর্শ নিয়ে আমাকে জ্ঞান দেয়নি। আমরা দুজনেই ছিলাম শ্রমিক। যা করতে বলত, করে দিতাম। আর মিটিং মিছিল হ’লে ভিড় বাড়াতে যেতাম। 

    একটা সময় হঠাৎই অনুভব করলাম, গোকুলদাই যেন কৌশল করে… একটু একটু করে সব চোরদের মৌচাক থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। শনিবারের সন্ধে বলে নয়, গোকুলদার বাড়িতেই আর যাওয়া হ’ত না। আড্ডা অন্য কোথাও হ’ত… গোকুলদার বাড়ি যাওয়ার প্রয়োজনই পড়ত না। বন্ধুরাও কেউ প্রসঙ্গ তুলত না। আর আমি গীতা বউদির কথা না ভেবে ব্যস্ত হয়ে গেলাম পার্টির কাজে, যাত্রা দলের কাজে… আর কলেজের পড়াশুনোয়। 
একদিন পাশের গ্রামের ব্লক অফিসে পার্টির একজনের সঙ্গে দেখা করে ফিরতে ফিরতে একটা চায়ের দোকানে বসে দু’জনে চা আর খাস্তা বিস্কুট খাচ্ছি। হঠাৎই পাশের সবুজ পুকুরে পাতি-হাঁস দেখতে দেখতে গোকুলদা বলল, “এবার রথের মেলায় খাবারের দোকান দেব… হেব্বি হবে… না?”
– খাবারের দোকান? কী খাবার? 
– কেন? ওই তেলে ভাজা, জিলিপি, নিমকি, গজা… 
– একা পারবে?
– কেন? তুই থাকবি না?
– আমি রোজ কী করে দোকানে বসব! কলেজ থাকবে… আর আমি এইসব রান্নাবান্নাও তো পারি না। বেকার…
– সে রান্নার বাউন জুটিয়ে নেবো। একা ভরসা পাচ্ছি না… আর একজন হ’লে…
– তোমার বন্ধুদের বলেছ? বউদিকে?
বউদি না বন্ধু, কার কথা শুনে জানি না… কিন্তু প্রশ্নটা শুনেই গোকুলদা চুপ হয়ে গেল। আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “কেন? তুই আমার বন্ধু নস?” প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক… তাও শুনতে কেমন অন্যরকম লেগেছিল। গোকুলদাকে অমন গলায় কথা বলতে আগে কখনও শুনিনি। সত্যি বলতে… কাউকেই বলতে শুনিনি আগে কখনও। কী উত্তর দেবো বুঝতে না পেরে… চুপ করে রইলাম। 
     ফেরার পথে সাইকেলে ডবল ক্যারি করতে করতে গোকুলদা বলল “মেলার বদলে স্টেশনের দিকে একটা এমন চা-বিস্কুটের দোকান, আর সঙ্গে তেলেভাজা… এটাও ভাল হবে। বল?”
– পার্টিকে কমিশন দিতে হবে। 
– ও যা করব, তাতেই কাউকে না কাউকে কিছু না কিছু দিতে হবে। চলবে কী না বল!
– তা চলবে, স্টেশনের কাছে… কিন্তু চায়ের দোকানে আমি সারাদিন বসে থাকতে পারব না!
“হা হা” করে হেসে উঠল গোকুলদা। সাইকেলের হ্যাণ্ডেলটা সামান্য নড়ে গেল বেসামাল হয়ে। আমি বললাম, “বউদিও খুব ভাল রান্না করে, বলো? সেই আমাদের জন্য এক ধামা করে বেগুনি, আলুর চপ, কত কিছু…”
সাইকেলটা একটা গাড্ডায় পড়ে ঝাঁকুনি খেলো। আমার কথাটা শেষ হ’ল না। গোকুলদা বলল “ভাল করে ধর, রাস্তা বড়া বেইমান…”

                                    — — — 

পঞ্চায়েত আর পার্টি অফিসে একে-তাকে ধরে সত্যিই চায়ের দোকান খুলে ফেলল গোকুলদা। সেদিন সাইকেল করে ফিরতে ফিরতে কথার ছলে যা বলেছিল, দু-বছরের মধ্যেই সেই মত একটা চায়ের দোকান খুলে ফেলল স্টেশনের দিকে। মনোহারী দোকানে গোকুলদার বাবা আর ছোটভাই বসত। গোকুলদা ফুলটাইম চায়ের দোকানে বসা শুরু করে দিলো। আমি শুরু করলাম সরকারী চাকরির চেষ্টা। না পেলে যাহোক কিছু করার চেষ্টা। মাস্টার্স আমার দ্বারা হবে না… বুঝে গেছিলাম। বাবাও বুঝে গেছিল, জোরজার করত না। বুঝত, একটা উপার্জনের ব্যবস্থা বেশি প্রয়োজন।
     দোকানে দুবেলা চা-বিস্কুটের সঙ্গে ঘুগনি পাওয়া যেত।  ডিম ভাজা আর পাউরুটিও পাওয়া যেত। ঘুগনিটা বাড়ি থেকে রান্না করিয়ে ডেকচি করে নিয়ে আসা হ’ত। মুখে দিয়েই বুঝে গেছিলাম গীতাবউদির রান্না। কিন্তু জিজ্ঞেস করিনি। শুধু বলেছিলাম, “এই ঘুগনি খেতেই ভিড় জমে যাবে, মিলিয়ে নিও!” 

স্টেশনের ধারে চায়ের দোকানটা বেশ চালু দোকান হয়ে গেল। লাভের টাকার একটা অংশ একে ওকে দিতে হ’ত… জানি। কিন্তু তাও ভাল লাভ হচ্ছিল। যাত্রার দলকে বেশি সময় দিতে পারত না গোকুলদা। তবে চাইলেই পার্টি ছাড়া যায় না, ওটা ধরে থাকতে হ’ল। নতুন দোকানটার কথা ভেবে ধরে থাকতেই হ’ল। যেখানে যেখানে গোকুলদার সঙ্গে আমি যেতাম, সেখানে অন্য একটা ছেলেকে নিয়ে গোকুলদার হয়ে প্রক্সি দিতে যেতাম। আমাকেও পার্টিকে ধরে থাকতে হয়েছিল… তখন একটা চাকরির ব্যবস্থা খুব দরকার। গোকুলদা জানত, মুখে অনেক কথা বললেও মনে মনে জানত যে দোকানে আমি বসব না। ওদের সঙ্গে কোথাও একটা আমাদের পারিবারিক ইচ্ছে আর সুবিধে-অসুবিধের তফাৎ আছে… এটাও বুঝতে পারত। ইচ্ছে নেই, পারতামও না। তাই, সেসব প্রসঙ্গে যেতো না… তবে দোকানে গেলে খুশি হ’ত। দোকানটা ঠিক বন্ধুদের আড্ডার ঠেক ছিল না। বন্ধুদের ভিড় বাড়লে ব্যবসা করা যায় না। ধার-বাকি শুরু হয়ে যায়। গোকুলদার বন্ধুদের অন্য চায়ের দোকান ছিল আড্ডার জায়গা… ইস্কুল মাঠের দিকে। তারা স্টেশনের দিকে গেলে মাঝে মাঝে ওই দোকানে যেত। আমিই বোধহয় একটু বেশি যেতাম। ট্রেনে করে কোথাও যাওয়া আসা করার থাকলে, বা কোনও কাজে স্টেশনের দিকে গেলেই একবার চায়ের দোকানে গোকুলদার সঙ্গে দেখা করে আসতাম। দুধ ছাড়া লিকার চা খাওয়ার অভ্যেস শুরু হ’ল। খালি পেটে দুধ খেলে অম্বল হয় আমার… দুধ-চা খেলেও। 

স্টেশনের ধারে, দুবেলা এত লোক আসে-যায়… গোকুলদার একটা সুনাম ছিল… তাই সকলের জানারই কথা। অনেক সময়, যা ভাল চলে – তা বেশি করে চোখে পড়ে। আর যা চলে না, তা চোখেই পড়ে না। আবার, অনেক সময় চোখে পড়ছে না বলেই ভাল চলে না। অন্ততঃ মানুষ এমন ভেবে নেয়। আমিও ভেবে নিই। গীতাবউদির সঙ্গে যেহেতু আর আগের মত দেখা বা কথা হ’ত না, মানুষটা কেমন আছে কী করে… তাও আর মনে সেভাবে উঁকি দিতো না। পাড়ায় পুজো-টুজো হ’লে দেখতাম শ্বাশুড়ির সঙ্গে পুজো দিতে এসেছে। কোনও বিয়ে-পৈতে বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গেলে দেখতাম। এমনকি পাড়ায় যাওয়া আসা করতেও যে দেখা-সাক্ষাৎ হ’ত না, তা নয়। কিন্তু ওই টুকুই। সেই যে চোরটা শনিবার সন্ধেবেলা সিঁধ-কাটার মত জায়গা খুঁজত… সে মাঝে মাঝে নড়ে-চড়ে উঠত। কিন্তু সুবিধে করতে পারত না। সত্যি বলতে, এমন কোনও সুযোগও পেতাম না, যেখানে বউদির সঙ্গে বসে দু’টো কথা বলা যায়… শুধু দু’জনে বসে। পণ্ডিতে বলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আমার ওটাই ছিল না বোধহয়… ওই ইচ্ছেটা আর কি! 
      বিয়ের চার বছর পার হয়ে গেল, আমি এখানে-ওখানে ধাক্কা খেয়ে সদরের হাসপাতালে ক্লার্কের কাজ পেয়ে গেলাম… কিন্তু গোকুলদার ঘরে সন্তান এলো না। শুরু হ’ল মানত, তাবিচ, মাদুলীর ঠেলাঠেলি। 
 – গোকুলটা দোকান দোকান করে পাগল হয়ে গেছে, বউটার দিকে তাকায়?! 
– মাগী আসলে বাঁজা, এত চেষ্টা-চরিত্তির করেও না হ’লে শুকনো থাকে? 
– ডাক্তার দেখাতে বলো, ওসব লোক-লজ্জা ভুলে শহরে গিয়ে ভাল ডাক্তার দেখাও। এরপর বয়স পার হয়ে গেলে কেঁদে কুল পাবে না! 
– এই বার বুঝছো? ছেলে কেন বিয়ে করতে রাজী হচ্ছিল না? কেন পালিয়েছিল?
এমন এক একরকম প্রশ্ন আর উপদেশ সোডার বোতলে উথলে ওঠা ফোনার মত বিজবিজ করছিল এলাকা জুড়ে। আমার কানে যদি এতটা আসে, তাহ’লে গোকুলদার কানেও অনেকটাই গেছিল। হয়ত সত্যিই ডাক্তার-বদ্যি করছিল। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে সে সব বোঝা যেত না। বরং দোকানে থাকার মেয়াদটা ক্রমে আরও বাড়িয়ে দিলো। অস্বাভাবিক লাগত দেখে, দুপুরেও ঘরে ফেরে না। দোকানেই থেকে যায়। কেন জানি না, গোকুলদার চোখের দিকে তাকিয়ে বউদির কথা জিজ্ঞেস করতে পারতাম না আর, মনে হ’ত প্রসঙ্গ তুললে মানুষটাকে আঘাত দেওয়া হবে। 
একদিন ইস্কুল মাঠের দিকের চায়ের দোকানে শুনলাম গোকুলদারই যাত্রাদলের এক স্যাঙাৎ চায়ের গেলাস দোলাতে দোলাতে বলছে – গোকুলটার সংসারে মনই নাই! কোনও কালে ছিল না! মান্সের বাই তো উঠবেই! তার উপ্‌রে গোকুলের সঙ্গে বয়সের তফাৎঠো দেখ! ধর আমার খিদা লাগছে, আমার ঘরে খাবারঠো নাই… আমি কী করব? দোকান থেকে এনে খাবো… না হ’লে পাড়ার কারো কাছে হাত পাতব… না খেয়ে মরে তো যাব নাই!

কথাগুলো শুনে আমার মাথার মধ্যে কেমন ঝিঁঝিঁ ধরে গেল। গীতাবউদি আঁচল পাতছে প্রতিবেশীর কাছে… গোকুলদা খিদে মেটাতে পারছে না বলে! চিৎ হয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে বউদি, দু’ হাত বাড়িয়ে কাউকে ডাকছে আঁচল সরানো বুকে উঠে আসতে! চোখে আর ঠোঁটে বহুদিনের জমে থাকা তেষ্টা ! আমার হাত কেঁপে চায়ের ভাঁড়টা পড়ে গেল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে চায়ের দামটা মিটিয়ে দিলাম। বুঝতে পারলাম আমার হাতের সঙ্গে পাও কাঁপতে শুরু করেছে। মনে হ’ল চিড় ধরে যাবে হাতে-পায়ে… ভেঙে যাব চিনে-মাটির পুতুলের মত। কারও চোখের দিকে না তাকিয়ে সোজা সাইকেলে উঠে পালিয়ে গেলাম ইস্কুল মাঠ থেকে। আমি জানি, ওরা আমাকে দেখছিল। আমি জানি, ওরা অনেকদিন এটা নিয়ে হাসাহাসি করবে। ওরা জানে… কোন প্রসঙ্গে কথা শুনতে শুনতে আমি পালিয়ে গেছিলাম। 

                                   — — — 

খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। হয়ত অন্য কারও পরিবারের খবর হ’লে গুরুত্বই দিতাম না। কিন্তু গীতাবউদির নাম কানে যেতেই মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম “কোন গীতা?” মা আমার কৌতূহল দেখে হয়ত অবাক হয়েছিল, পাশের বাড়ির মাসিমার সঙ্গে কথা থামিয়ে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দু’জনেই কথা থামিয়ে দেখছিল আমাকে। তারপর সেই মাসিমা বললেন, “কোন গীতা আবার… গোকুলের বউ গীতা! আবাগীর বেটি!” 
সে অর্থে কেচ্ছা নয়। আবার কেচ্ছাও। কারণ গীতাবউদিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। দু’দিন আগের ব্যাপার… সকালে ঘরের কাজ কর্ম করে, চান করে, দুধ-রুটি জলখাবার খেয়ে বাজারের দিকে গেছিল কিছু কিনতে। তারপর আর ফেরেনি। গত দু’দিন কাছাকাছি আত্মীয় এবং বউদির বাপের বাড়ির লোকজন মিলে খোঁজখবর করে বুঝেছে – সত্যিই নিখোঁজ। 
পালিয়ে যেতে পারে, হারিয়ে যেতে পারে, কিডন্যাপ হ’তে পারে… দুর্ঘটনার শিকার হ’তে পারে… এমন কি আত্মহত্যাও করে থাকতে পারে। 
কিন্তু এত কিছু না ভেবে ওই নিরুদ্দেশ বলেই গোকুলদার বাবা আর শ্বশুর গিয়ে থানায় রিপোর্ট করল। এবারও বাবা গেছিল, সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে চেনাজানা ছিল বলে। আমিও যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মা বারণ করল। গোকুলদার কাছে যাওয়ার সাহস পেলাম না। কী বলব গিয়ে? কী জিজ্ঞেস করব? সান্ত্বনাই বা কী দেব?
     বিশ্বাস করতে অসুবিধে হচ্ছিল। “জলজ্যান্ত বউটা… সকাল থেকে উঠে সব কাজ করল… কোথাও কোনও অশান্তি নেই… এভাবে কর্পূরের মত উবে গেল?!” এমন অনেক কথা পাড়ার কাকিমা-পিসিমাদের  বলতে শুনলাম। বৌদিরা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চোখ বড়বড় করে দেখছিল বারান্দা থেকে, দরজায় দাঁড়িয়ে… ছেলে কোলে নিয়ে। দেখছিল গোকুলদার বাড়ির দিকে বারবার লোকজনের যাওয়া আসা। বাড়ি আর দোকানের সামনে ভিড়। 

গোকুলদার মা খুব কান্নাকাটি করছিলেন।  স্বাভাবিক।  আরও কিছু পাড়ার মহিলা ওঁর সঙ্গে গলা মেলালেন। 
পুলিশ গোকুলদাকেই সব থেকে বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। থানায় না জানিয়ে যেন জেলার বাইরে না যায়, তাও মুচলেখা দিয়ে আসতে হয়েছিল। মনে হচ্ছিল গোকুলদাই অপরাধী। থমথমে মুখে, মাথা নিচু করে আসা যাওয়া করত ভাই কিংবা বাবার সঙ্গে। পার্টির ছেলেরা প্রথম দিকে, দু-তিনজন যেত… পরে সরে গেল। পার্টি থেকে বারণ করেছিল এসবে নাক গলাতে। স্টেশনের ধারের চায়ের দোকানটাও মনোহারী দোকানটার মত বন্ধ পড়ে রইল। সাত সাতটা দিন পার হয়ে গেল… গীতা বউদির কোনও খবরই কেউ দিতে পারল না। কাছাকাছি পুকুর, ঝিল, ভেরি কিংবা নয়ানজুলিতে জাল ফেলেও কিছু পাওয়া গেল না। গ্রামের লোক ভিড় করে থাকত জাল ফেলা হ’লে। দমবন্ধ লাগত এত মানুষের  অসুস্থ কৌতূহল দেখে। তারপর যা হয়… একটা একটা করে দিন পার হয়ে গেল, অভ্যেস হয়ে গেল সকলের। 
লাশ পাওয়া যায়নি বলে অনেকে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিল। আসতে আসতে অনেক কথার মধ্যে ওই কথাগুলোই জোরালো হয়ে গেল – 
হারিয়ে যায়নি, কেউ তুলেও নিয়ে যায়নি… নিজেই পালিয়ে গেছে কোথাও। এখানে আর পোষাচ্ছিল না। 

মনোহারী দোকান আবার খোলা হ’ল… কিন্তু চায়ের দোকানটা খুলল না গোকুলদা। নিজেকে ঘরে বন্ধ করে রাখত। বাড়ির বাইরে বেরতো শুধু থানা থেকে ডাক এলে। আমি দু-তিনবার গেছিলাম দেখা করতে। মাসিমা এক কাপ চা নিয়ে আসতেন, মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। এমনিই গোকুলদার সঙ্গে এটা-সেটা নিয়ে কথা বলতাম। পার্টির কাজের কথা বলতাম। সব কথা শুনত বলেও মনে হয় না। আওয়াজ জোরে করে টিভিতে খবর শুনত। তাও বলতাম, তাও যেতাম… মনে হ’ত একটু অন্য কারও মুখ দেখলে যদি মানুষটার মনটা হালকা হয়। একদিন এমনই টিভিতে কোথাও এক গৃহবধূকে নির্যাতন করে হত্যার খবর দেখাচ্ছিল। গোকুলদা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেই খবর শুনতে শুনতে হঠাৎ আমার হাতদুটো ধরে বলে উঠল, “বিশ্বাস কর… আমি সত্যিই জানি না তোদের বউদি কোথায় গেছে! আমি কিচ্ছু বলিনি ওকে! কিছুই হয়নি… “। “কিছুই হয়নি” বলে থেমে গেল। তারপর হাতদুটো ছেড়ে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল আবার। এই প্রথম আমার মনে হ’ল গোকুলদা আর বউদির মাঝে এমন কিছু আছে, যা বাইরের কেউই জানে না। আসলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সব পরিবারেই এমন অনেক কিছু থাকে, যা বাইরের কেউই কোনওদিন সবটা জানতে পারে না… হয়ত কিছুই জানতে পারে না। ভাবে ‘জানি’। এই নিয়ে গোকুলদাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিনি… শুধু জানতে চাইতাম পুলিশ কোনও খবর দিলো কী না। দেয়নি… পুলিশও ওই একই কথা বলছিল – 
কেউ অপহরণ করলে, এখন ট্রেস করা মুশকিল। কারণ তারা মুক্তিপণ চায়নি… অন্য রাজ্যে চলে গিয়ে থাকলে আর খোঁজ পাওয়া যায় না। বিহার-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে নারী পাচার চক্র খুব অ্যাক্টিভ। 
আর অপহরণ না হ’লে আর একটাই সত্যি বাঁচে – ইচ্ছে করে চলে গেছে, একা অথবা কারও সঙ্গে। কেউ ইচ্ছে করে কোথাও পালিয়ে গেলে তাকে আর কোথায় খুঁজবে পুলিশ? 
মাস পার হয়ে গেল… ওই দেখছি আর জানাবো-তে থেকে গেল থানা। গোকুলদার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ প্রমাণ হয়নি,জেলা কমিটির সিনিয়রদের বলে-কয়ে একটা দিক সামলানো হ’ল – এই ব্যাপারে গোকুলকে দায়ী করার মানে হয় না। গোকুল নিজেই ভিক্টিম… যদি স্ত্রী নিজেই পালিয়ে গিয়ে থাকে। 

ইস্কুল মাঠের আকাশের মেঘ অন্যরকম। সেখানের রাস্তা আর চায়ের দোকানে বসে থাকা মানুষদের মনে কাঁকড়ও অন্যরকম। গোকুলদা চায়ের দোকান খোলার পর থেকেই গোকুলদার যে বন্ধুরা ভেতর ভেতর জ্বলতে শুরু করেছিল, তাদের কাউকেই এই দুঃসময়ে গোকুলদার পাশে দেখলাম না। অথচ, ওই ইস্কুল মাঠের ধারে চায়ের ঠেকে নিয়মিত গোকুলদাকে নিয়ে আলোচনা হ’ত। গীতাবউদিকে নিয়ে নোংরামো চলত। ওই রাস্তা দিয়ে সাইকেল করে যাওয়া আসা করে দোকান থেকে কেউ না কেউ ঠিক হাত তুলে ‘কী… ভাল তো?” বলে হাসত। আমি অভদ্রতা করতে পারতাম না। কিন্তু জানতাম, সাইকেল থামালেই আমাকে জিজ্ঞেস করবে গোকুলদার কথা। কী কী বলতে পারে তা বুঝতে পারতাম, সেগুলো শুনতে ইচ্ছে করত না বলেই প্যাডেল চালিয়ে এগিয়ে যেতাম। এরা গল্পের ছলে কারও ঘরের বউকে পালা করে হাতবদল করতে ভোগ করতে পারে। ঘরে যা পায় না, এভাবে কল্পনায় খেয়ে সুখ পায়। 
       কিন্তু এই ইস্কুল মাঠের দিকে না এলে কথাটা জানতে পারতাম না… খেয়ালই করতাম না – 
বাজারের কাছে একটা মোটর-বাইক রিপেয়ারিং-এর দোকান আছে। দু-তিনজন মিলে কাজ করত। তাদের একজনের নাম মনোজ, বিহারের ছাপরা থেকে এসেছিল। দোকানের পাশ দিয়ে গেলেই ভোজপুরি গানের শব্দ ভেসে আসত। সারাদিন দোকানে ভোজপুরি গান চলত। 
যেদিন থেকে গীতাবউদিকে পাওয়া যাচ্ছে না, তার ঠিক একদিন আগে মোটর-বাইক সারানোর মিস্ত্রী মনোজও পালিয়ে গেছে কাজ ছেড়ে। একদম বেপাত্তা!

এভাবে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। দোকানের মিস্ত্রীদের পালিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এমন অনেকেই এর-তার কাছে টাকা ধার চেয়ে অথবা ক্যাশ-বাক্স থেকে টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। তার সঙ্গে গীতাবউদির নিখোঁজ হওয়া এভাবে মিলিয়ে দেওয়া উচিৎ? সম্ভব? 
স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, এই খবরটাও বাজারে একটা গল্প হয়ে ভাসবে। কিন্তু গোকুলদাকে এসব বলতে ইচ্ছে হ’ল না। বাবাকে বললাম চেষ্টা করতে যাতে স্টেশনের ধারে দোকানটা আবার জোর করে খোলানো যায়… এক মাসের ওপর বন্ধ পড়েছিল। বেদখল হয়ে যেত। 

                                   — — — 

গীতাবউদির  বাপের বাড়ির সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ রাখত না গোকুলদারা। পরোক্ষ ভাবে দায়ী করেই সম্পর্ক ছিন্ন করা। সবাই মোটামুটি নিজের মত গল্প বানিয়ে নিয়েছিল। গোকুলদাকে আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করত না। কিন্তু গোকুলদা পার্টি আর যাত্রাদল দুটোই একেবারে ত্যাগ করে দিলো। শুধু চায়ের দোকানটা নিয়ে থাকত। গীতাবউদি নেই, তাই ঘুগনী রান্না করার জন্য লোক রাখতে হ’ল। সেই ছেলেটাই দোকানের কাজও করত। খদ্দেররা আবার এক এক করে ভিড় করল, কিন্তু ঘুগনীতে আর আগের মত স্বাদ ছিল না। ব্যালেন্স করতে সন্ধেবেলা আলুর চপ আর সিঙ্গারা ভাজা শুরু করল গোকুলদা। সকাল থেকে রাত ওই দোকানেই থাকত। 

একদিন দোকানে বসে কথা বলতে বলতে রাত হয়ে গেছিল। সেদিন সন্ধে থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। শীতের বৃষ্টি বলে বোধহয় লোকও বেশি বেরোচ্ছিল না বাড়ি থেকে। বৃষ্টি-রাতের খাওয়া-দাওয়া, ফিস্ট, একসঙ্গে রাত জাগা… এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় গোকুলদাকে হঠাৎ বলে ফেললাম “তোমার বিয়ের দিন নিতাইদারা লুকিয়ে হুইস্কি নিয়ে গেছিল, মনে আছে? সে চায়ের কাপে দু ফোঁটা… ” , বলে চুপ করে গেলাম। নিজেরই অপ্রস্তুত লাগছিল হঠাৎ বিয়ের দিনের কথা তুলে। গোকুলদার চোখে কোনও পরিবর্তন দেখতে পেলাম না। স্বাভাবিক ভাবে গামছা দিয়ে বৃষ্টির জল মুছতে মুছতে বলল “তুই মদ খাস?” মাঝে মাঝে খাই, কিন্তু নেশা নেই… বাড়িতেও জানে না কেউ এই ব্যাপারে। কিন্তু গোকুলদার কাছে লুকোলাম না। 
– কী খাস?
– খুব কম গো… মানে ন’মাসে-ছ’মাসে ।
– কী খাস তাই বল না… দিশী?
– না না… রাম, বীয়ার… 
– বলিস কী! কবে থেকে ধরলি?
– আহ তুমিও না… ধরার কি আছে? আমি কি মাতাল নাকি! 
– কী অবস্থা… এদিকে ভিজে বেড়াল হয়ে থেকেছে পাড়ায় এতদিন… কাউকে বলতে গেলে আমাকেই খিস্তি করবে!
– এই প্লিজ প্লিজ, কাউকে বলো না। বাবা জানলে বাজে কেস খাবো। 
– দূউউউর! পারলে আমাকে নিয়ে লোকে এখনও শুরু হয়ে যায়! আমি আর অন্যকে নিয়ে কী বলব! 

একটু অপ্রস্তুত হয়েই আমি সেদিনের মত বেরিয়ে আসতে চাইছিলাম উঠে, রাতের অজুহাত দিয়ে। গোকুলদা পিছু ডেকে বলল “বলছি… ইংলিশগুলোর খুব দাম, না রে? একবার এখানে আনতে পারবি… যেটা তোর ভাল লাগে? আমি দাম দিয়ে দেবো! কাউকে বলব না!” কোনও কিছু লুকিয়ে প্রথমবার করা, এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। গোকুলদার চোখে সেরকম রোমাঞ্চ দেখেছিলাম। এত দিন পর হঠাৎই নিজে থেকে কিছু চাইছে ছেলেমানুষের মত। ‘না’ করতে পারলাম না। 

প্রথম দিন গোকুলদার ঘরে বসেই খেয়েছিলাম একসাথে। দোকানে বসে নয়। সেদিন গোকুলদার বাড়িতে কেউ ছিল না, অন্য গ্রামে বিয়ে বাড়ি গেছিল। মা’কে বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্নর কথা বলে চুপি চুপি অন্য রাস্তা দিয়ে গোকুলদাদের বাড়ি চলে গেছিলাম। আগে থাকতে সব প্ল্যান করা ছিল। গোকুলদা রুটি, কষা মাংস নিয়ে এসেছিল বাজার থেকে। ঘরে পেঁয়াজ আর ছোলা লেবুর রস দিয়ে মেখে চাট বানানো হ’ল। সঙ্গে সেঁকা পাপড়। গোকুলদাকে আমি আগে কখনও মদ খেতে দেখিনি। কিন্তু সেদিন খেতে দেখে মনে হ’ল না যে প্রথমবার খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম বীয়ার আর রামের মধ্যে কোনটা ভাল লাগল। শুধু হাসল, কোনও উত্তর দিলো না। দুটো বড় বীয়ারের বোতল আর একটা রামের বোতল শেষ করতে করতে মাঝ রাত পার হয়ে গেছিল… মাতাল হইনি, রয়ে সয়ে খেলে কেউ মাতাল হয় না। একটা আচ্ছন্নতা থাকে। 
  গোকুলদার খাটেই শুয়ে পড়েছিলাম, গোকুলদাও শুয়ে ছিল পাশেই। তখন অনেক রাত, বাইরে কুকুরের ডাক ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। জানলার পর্দার ওপর দিয়ে রাস্তার আলো তেড়চা ভাবে এসে পড়েছিল ঘরের দেওয়াল আর মেঝেতে। তন্দ্রার মধ্যেই টের পেলাম তিন-চারটে আঙুল আমার হাফ-প্যান্টের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করছে। আমি বাধা দিলাম না, তার প্রবেশ করে আমার পুরুষত্বকে মুঠো করে ধরল। তারপর এদিক ওদিক আঙুল বুলিয়ে আদর করতে করতে কঠিন করে তুললো তাকে। টের পেলাম, আমার ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে গোকুলদার মুখ। পাশ বালিশের মত আমার পায়ের ওপর পা তুলে দিয়েছে আমাকে আদর করতে করতে। অস্বস্তি হওয়ার কথা, নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা। ছিটকে নেমে পড়ার কথা খাট থেকে। অথচ সেসব কিছুই করার ইচ্ছে হ’ল না। ঘরটা তখন একটা অন্যরকম মায়াবী জগৎ হয়ে গেছে। একদম অচেনা লাগছিল সব কিছু। কানে ঝিঁঝি ডাকের মত আওয়াজ হচ্ছিল একটু আগে, এখন শুনতে পাচ্ছি বাঁশির সুর… ঠিক যেমন গোকুলদা যাত্রার আবাহ-সঙ্গীতে বাজাত। বুঝতে পারলাম গোকুলদার লুঙ্গির ভেতর থেকে একটা শক্ত মাংসালো কিছু আমার পায়ুছিদ্রে সুরসুরি দিচ্ছে।  একই সঙ্গে পায়ু ছিদ্র আর লিঙ্গে আদর! উফফ! অপ্রস্তুত ব্যথার ‘আহ’ এর ওপর আরও কিছু ‘আহ’ ভারী হয়ে চেপে বসে। সেই প্রথম বুঝতে পারলাম… পায়ু ছিদ্রে কিছু প্রবেশ করলেও এক অন্যরকম সুখ আর তৃপ্তির অনুভূতি জাগে আমার মধ্যে। গোকুলদা আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিল সেই অনুভূতি… প্রথমবার!
     ভোরবেলা একবার চোখ খুলে দেখছিলাম গোকুলদার বুকে মাথা গুঁজে শুয়ে আছি। গোকুলদা আমাকে জড়িয়ে আছে পাশ বালিশের মত। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম খাটে একাই শুয়ে আছি। জানলার পর্দা সরিয়ে দিয়ে গেছে কেউ… বাইরে চড়া রোদ, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। গতকাল রাতের কথা মনে পড়তে প্রথমেই মনে হ’ল – বোতলগুলো সরাতে হবে। ঝুঁকে পড়ে খাটের তলায় দেখতে গিয়ে বোতলগুলো দেখলাম নেই! সঙ্গে সঙ্গে গোকুলদার গলা পেলাম – “ও আমি ভোর হ’তেই হাফিজ করে দিয়েছি!”
মাথা তুলে দেখলাম রান্নাঘর থেকে এক কাপ লিকার চা করে নিয়ে এসেছে। ঠিক সিনেমায় যেমন হয়। 

                                     — — —  

সেই শুরু। প্রথমবার আমি এনে দিয়েছিলাম। কিন্তু বার বার চাইতে আমি আর রাজী হইনি। নিজেই আনিয়ে নিতো কাউকে দিয়ে। সবাই জানত, যেদিন রাতে বাড়ি ফেরে না, সেদিন দোকানে বসে মদ খায় গোকুলদা। অনেকে বলত দোকানেই স্টক করা আছে। কেউ কেউ বলত, মাটিতে বাক্স পুঁতে রেখে দেয়। রাতে খুঁড়ে বার করে। আমি জানতাম, শুধু মদের বোতল না… আরও অনেক কিছু খুঁড়ে বার করে গোকুল দা। চাঁদের আলোয় সেসব উলটে পালটে দেখে আবার মাটি চাপা দিয়ে রেখে দেয়… ভোরের আলো ফোটার আগে। 

তবে গোকুলদা আর আমি, কেউই কাউকে জীবন থেকে সরাতে পারিনি। পারবোও না। আর কেউ জানুক না জানুক। আমরা বুঝতাম, আমরা একে অপরের কাছে কী! গীতাবউদিকে ছাড়াই একটা জীবন অভ্যেস হয়ে গেল গোকুলদার। অনেকের বলা কওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করল না। আমার অনুরোধে বাঁশি বাজানোটা আবার শুরু করেছিল। কিন্তু যাত্রায় নয়, ঐ দোকানে বসে… দুপুর কিংবা রাতের দিকে। যখন ভিড় কম থাকে। স্টেশনে নিত্যযাত্রীদের অভ্যেস হয়ে গেছিল… বাঁশির সুর শুনলে লোক শুনতে চলে আসত। কেউ কেউ টাকাও দিতে চাইত, গোকুলদা নিতো না। হাতজোড় করে কপালে ঠেকাত। একসময় দোকানের নামই হয়ে গেল বাঁশি কাকার দোকান। হিন্দুস্তানীরা বলত বনসি চাঁচা। তাই শুনে কেউ কেউ ভাবত গোকুলদার নামই হয়তও বংশী। বংশীদা বলেই ডাকত।  
গোকুলদার চুলে পাক ধরল… একদিন দেখলাম গোকুলদাও বাপের মত নাকে তিলকসেবা করে চায়ের দোকানে বসেছে। তারপর থেকে আর আমাকেও ছুঁতো না। 

আমারও বয়স চল্লিশ পার হয়েছে… বাবা রিটায়ার করে গেছে অনেকদিন হয়ে গেল। মা’র চোখে মুখে সবসময় একটা বিষন্নতা। “একের পর এক সম্বন্ধ কাটিয়ে দিতে দিতে বুড়ো হয়ে গেল… ঘরে আর লক্ষ্মী এলো না। শনির দৃষ্টি লাগলে যা হয়!” মাসিমাদের কাছে চোখের জল ফেলে মা। 
মায়ের কষ্ট হ’লে আমারও কষ্ট হয়। কিন্তু কী করব? গোকুলদা পালিয়ে ফিরে এসেছিল, ভুল করেছিল। শুরুতেই বিয়েতে রাজী হওয়া উচিৎ হয়নি। আমি পালাতেও পারব না, জেনেশুনে ভুলও করতে পারব না। গীতাবউদির মতই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে সে। ঠিকই করবে হয়ত।  একাধিক জীবনে জটিলতা ডেকে আনার থেকে এই ভাল। আধ্যাত্মিক চিন্তা করি, আধ্যাত্মিকতার চর্চা করি… চর্চার থেকে বেশি ভান করি। মা নিশ্চিত হয়… ছেলের সংসারে মন নেই। সন্ন্যাস-চিন্তা আসছে। 
 গোকুলদা যতদিন আছে, আমার কোনও অসুবিধে নেই। গোকুলদা আরও অনেক দিন থাকবে। আরও অনেক বছর থাকবে। আমিও থাকব ওর পাশে। অথচ এরা কেউ জানতেই পারল না আমরা কীভাবে জড়িয়ে আছি আষ্টেপৃষ্ঠে! 

তাও, মাঝে মাঝে গীতাবউদির মুখটা মনে পড়ে। গীতাবউদির শরীরও আমাকে টেনেছিল। কেমন ছিল সেই টান, কেন ছিল সেই টান… বুঝতে পারি না। অনেক বছর আগে আসানসোল স্টেশনে একবার একজনকে দেখেছিলাম। অবিকল গীতাবউদির মত দেখতে। সঙ্গে ছেলেটাও যেন মনোজের মতই। মনোজের মুখ অবশ্য খুব সাধারণ, দেহাতি মুখের ছবি। অমন মুখ মাঝে মাঝেই দেখা যায়। কিন্তু গীতাবউদি? যদি গীতাবউদি না হবে তাহ’লে হঠাৎ চোখাচুখি হ’তে চমকে গেছিল কেন? অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো কেন? ওটা স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ছিল… ধরা পড়ার। ওটা গীতাবউদি। বিহারী বউদের মত কপালে সবুজ টিপ, সিঁথিতে গেরুয়া সিঁদুর, ঝলমলে সবুজ শাড়ী, এক হাত কাঁচের চুড়ি… কিন্তু গীতাবউদিই ছিল! গীতাবউদিকে দেখেই হয়ত সঙ্গে যাকে দেখেছি তাকে মনোজ ভেবে নিয়েছে মন। কিংবা ওটা সত্যিই মনোজ, জানি না। ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছিল, চায়ের ভাঁড়টা পায়ের তলায় পিষে দিয়ে দৌড় দিলাম রানিং ট্রেন ধরতে। 

ওই গেরুয়া সিঁদুর পরা দেহাতী গীতাবউদির মুখ আমার যতটা মনে পড়ে… আজও তার চেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই সন্ধেবেলা নূপুরের শব্দ তুলে চা-তেলেভাজা দিতে আসা গীতাবউদিকে। তার গায়ে মনোহারী দোকানের দামী সাবান আর ঘাড়ে পাউডারের গন্ধকে। 
গোকুলদার পিঠে আঙুল বুলোতে বুলোতে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম… “তোমার গীতাবউদির কথা মনে পড়ে না?”, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল গোকুলদা। আমি জানি ওটার মানে ‘হ্যাঁ’। আমরা দু’জনেই তাকে ভুলতে পারব না। সেদিন আসানসোল স্টেশনে গীতাবউদিকে দেখার কথা, আর মনোজের কথাও বলেছিলাম। গোকুলদা উঠে বসে বলল, “জানি। মনোজের সঙ্গে ওর ভাব ছিল। কী করে হয়েছিল জানি না… কিন্তু ছিল। ওই জন্য ইচ্ছে করেই দুপুরে বাড়ি ফিরতে চাইতাম না। গীতাকে ছেড়ে দিতাম সময়টা। ওরও তো একটা জীবন আছে… ইচ্ছে আছে… বল?”
– তুমি জানতে?
– হ্যাঁ?
– গীতাবউদি পালিয়ে যাবে… তুমি জানতে?
– না… তবে বুঝতে পেরেছিলাম, একদিন চলে যাবে। 
– মানে…
– মনোজ চাকরি ছেড়ে চলে গেছে… এটা শুনেই বুঝে গেছিলাম। আর চিন্তা হয়নি। 
– আর কাউকে বলো নি? 
– ইচ্ছে হয়নি… কী বলব? আর কেনই বা বলব বল তো? গীতা মনোজের সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিল… 
কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। মাথার মধ্যে একটা ঘোর লেগে গেছিল। গেঞ্জিতে হাত গলাতে গলাতে গোকুলদা বলল… “গীতাকে দেখেছিস… এটা তখনই জানাতে পারতি… বোকা ছেলে! শুনে মনটা খুশ হয়ে গেল! আজ ভাল মাল কিনব… চল!” 

                                     — — — 

গোকুলদাকে একা রেখেই বেরিয়ে আসছিলাম দোকান থেকে। আকাশে তখন মেঘ ডাকছে, দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেকে থেকে। দু’পা এগোতেই পিছু ডাকল গোকুলদা, “শোন একটু…”। আবার দোকানের দিকে ফিরে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম “কী?”
-ছাতাটা নিয়ে যা, জল আসছে। 
– নাহ্‌… আমি পা চালিয়ে চলে যাব। 
– পাকিমি করিসনি… ফোঁটা ফোঁটা পড়া শুরু হয়ে গেছে! নে ধর…
একরকম জোর করেই আমার হাতে ছাতাটা গুঁজে দিলো গোকুলদা। আমি ছাতা খুলে বেরোতে যাব, তখন আবার পিছু ডাক। 
– কী হয়েছে?
– গীতা ভাল নেই… জানিস?
– কী?
আমি কথাটা বুঝতে পারলাম না, ছাতা বন্ধ করে দোকানের ভেতরে এসে বোঝার চেষ্টা করলাম গোকুলদা কী বলছে। বাইরে বৃষ্টির তোর বাড়ল। দোকানের চালে বৃষ্টির জল পড়ছে  চড়বড় করে। বাসনপত্র গুছিয়ে রাখতে রাখতে গোকুলদা বলল, “গীতা একদম একা হয়ে গেছে রে। বরটা সালা পালিয়েছে একটা কচি মাগী জুটিয়ে। দুটো মেয়ে নিয়ে একেবারে পথে এসে দাঁড়িয়েছে বেচারি। একটা বিউটি পার্লার দিয়ে একা কতটা পারবে বল?” 
আমি তখনও কিছু বলতে পারছিলাম না। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। অবাক লাগছিল এগুলো শুনতে, এভাবে শুনতে। গোকুলদা গীতাবউদির খবর রাখে! কত দিন ধরে খবর রাখছে! আর কী কী জানে! এগুলো ভেবে মাথায় ভেতর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। 
গোকুলদা তাহ’লে এই কারণে সন্ধে থেকে গুম মেরেছিল? আমাকে এত দিন কিচ্ছু জানায় নি… জানতে পর্যন্ত দেয় নি! আমার কাছেও লুকলো এইভাবে? গোকুলদা আমার হাঁটুর কাছে বসে পড়ল হঠাৎ, কেমন অসহায় ভাবে বলল, “কালকের মধ্যে কিছু টাকা ধার দিতে পারবি ভাই? ওই হাজার দশেক মত! খুব দরকার… মেয়েগুলো ভেসে যাবে না হ’লে। দেখার কেউ নেই! বাপের বাড়ির কেউ কোনও সম্পর্ক রাখে না!” 
দোকানের বাইরে মুখ বারিয়ে দেখলাম সামনের রাস্তা দিয়ে মেটে রঙের জলের ছোট স্রোত বইছে। গায়ে এসে লাগছিল বৃষ্টির ছাঁট। এ বৃষ্টি ঘন্টা দুয়েকের আগে থামার নয়। একটা দূরপাল্লার ট্রেন চলে গেল জোরে হর্ণ দিতে দিতে। বৃষ্টি ভেজা একলা স্টেশন আর একলা প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিঃস্বার্থ প্রেমিকের মত মনে হয়। যাত্রী অথবা ট্রেন, যে যার মত এসে চলে যায়। প্রত্যাশাহীন পড়ে থাকে এরা। পড়ে পড়ে ভেজে। ঘুমিয়ে পড়ে। এমন প্ল্যাটফর্মগুলোয় একটু মাথা ঢাকার মত জায়গা খুঁজে মানুষ আর কুকুর বেঁচে থাকে পাশাপাশি। ঘুমন্ত প্রেমের মুখে চাঁদ নেমে আসে! জোনাকীরা নরম আলো নিয়ে ভেসে বেড়ায়। প্রত্যাশার পতঙ্গরা সেখানে কিলবিল করে না। তারা উড়ে বেড়ায় জোরালো আলোর চারপাশে। এই যেমন গোকুলদার দোকানের এই হলুদ আলোটার চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে বাদলা পোকাগুলো। অথচ এই দোকানটাও একটা স্টেশন।  আমার মাথা গোঁজার জায়গা। এই বেঞ্চ আর গোকুলদা আমার সেই প্ল্যাটফর্ম… যেখানে জ্যোৎসনা আর জোনাকীরা নেমে এসেছিল রাতের পর রাত। 
গোকুলদার কথাগুলো শুনতে শুনতে হাসি পেলো। জমে থাকা প্রশ্নগুলোকে একসঙ্গে টিপে একটা কৌটোয় বন্ধ করে রাখলাম। 
হাত-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, “এই জল মাথায় করে এখন বেরোতেও পারব না… তোমার ছোকরাটাও ফিরবে বলে মনে হয় না। খিদে খিদে পাচ্ছে বুঝলে। একটু গরম চা আর সঙ্গে ডিম ভাজা হবে? পেঁয়াজ আর লঙ্কা না হয় আমিই কেটে দিচ্ছি?” 




জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বর্তমানে হায়দ্রাবাদ নিবাসী  হলেও, জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের শৈশব থেকে যৌবন সবটাই কলকাতার শহরতলী জুড়ে। জন্ম ২০শে আগস্ট, ১৯৮৬। বায়োটেকনলজিতে বি টেক শেষ করেই কর্মসূত্রে ২০০৮ সালে কলকাতা ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যান, এবং তারপর হায়দ্রাবাদ।প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, কলকাতার বাইরেই জীবন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিবিড় ভালবাসা থেকেই একসময় লেখার ইচ্ছে জন্মায়। প্রায় সাত-আট বছর উনি একাধিক আন্তর্জাল পত্রিকা এবং মুদ্রিত পত্রিকায় লিখে চলেছেন গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য এবং কবিতা। ২০১৩ সালে 'আদরের নৌকা' প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম গল্প সংকলন 'প্রতিবিম্ব'। এর পর ২০১৫ সালে  'হাওয়াকল' প্রকশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম উপন্যাস 'কৃষ্ণঘন যাম'। ২০১৭ সালে 'হাওয়াকল' প্রকশনা  থেকেই প্রকাশিত হয় প্রথম অণুগল্প সংকলন 'টিনিটাস'। ২০১৮ সালের কলকাতা বইমেলায় 'তবুও প্রয়াস' প্রকাশনা থেকে জয়দীপের প্রথম গদ্য সংকলন 'হৃদয়পুর কত দূর?' প্রকাশ পায়। এই লেখার মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। আর প্রতিযোগিতামূলক এই জীবনে এই লেখাই তাঁর কাছে একটা রিফিউজ। লেখার প্রতি ভালবাসার টানেই উনি লিখতে চান... যতদিন পারেন।

1 Comment

arkayan basu · জুলাই 23, 2020 at 12:10 পূর্বাহ্ন

অপূর্ব। অনবদ্য … কী বলা উচিত জানি না।পড়ে একটা অদ্ভুত মায়াবী ঘোরের মধ্যে পড়েছি।হয়ত আপনার কলমের যাদু…টানাপোড়েন আর সেই মতো অনুভূতিরা আনকোরা অথচ সাধনলব্ধ বাঁশির সুরের মতো খ্যালা করে বেড়ালো সমস্ত শিহরণের ভেতর।আপনার বলিষ্ঠ কলম আরো মুগ্ধ করুক পাঠককে,এই আশা রাখলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।