ভূগোল পরীক্ষা

শাশ্বত বোস on

“কি রে ভাই ? প্রিপারেসন কেমন ?”
এটাই হচ্ছে পরীক্ষার হলের চিরপরিচিত প্রশ্ন। ছাত্র জীবনের সবচাইতে
খারাপ জিনিস হল পরীক্ষা । পরীক্ষার আগে, পরে, এবং পরীক্ষা দেওয়ার
সময় যে কত কিছু কাণ্ড হয় তা একমাত্র একজন পরীক্ষার্থীই জানে । আর
ভালো ছাত্র হলে তো আর কথাই ওঠে না। জীবনের যত বন্ধু, বান্ধবী, ঋনী,
উপকারী ইত্যাদি সব পরীক্ষার সময়েই এসে জোটে। আর তখন একটাই কথা
তাদের মুখে আসে –

“এই তোর বন্ধুত্বের প্রতিদান !”

এরকম এক আজগুবি দিন আমার জীবনে আসে । এরকম পরীক্ষা আগেও
আসেনি এবং, আশা করি, ভবিষ্যতেও আসবেনা ।
নতুন স্কুল । তার নিয়ম – কানুন আমার কিছুই জানা নেই । সমস্যা হয়ে
দাঁড়াল স্কুলের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন্স। কোথায় কি আছে না আছে তা তো
জানি না। অবশ্য বন্ধু তাড়াতাড়িই হয়ে গেল । বন্ধুত্বের দিনগুলির মধ্যেই
চলে এল এস.এ.১।
প্রথমে তো গিয়ে দেখি এ কি, কথায় বসব, পরীক্ষা কথায় হচ্ছে তা তো
কিছুই লেখা নেই ! প্রচন্ড ঘাবড়ে গেলাম কিন্তু ভগবান সহায় থাকায় বন্ধুরা
খুব ভাল করে হল – এ বসিয়ে দিল । কিছু কথপকথনের পর বাজল ঘণ্টা । চলে
আসল আমাদের চিরশত্রু – প্রশ্নপত্র । সাথে শিক্ষকমন্ডলী । গার্ড দেখে
তো সবার চক্ষু ছানাবরা । স্বয়ং প্রিন্সিপাল ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিন্সিপাল
দুজনেই হল এ হাজির । জীবনে প্রথমবার কোন প্রিন্সিপালকে গার্ড দিতে
দেখলাম । অ্যাসেম্বলি তে না থাকলে ও তার ঘরে ডাক না পরলে, একমাত্র

সূর্য পশ্চিম দিকে উঠলেই তার মুখ দেখা যায় দেখা যায় । আজকে যে তার কি
হয়েছিল কোন ছাত্র কিছুই আন্দাজ করতে পারল না ।
প্রশ্নপত্র বিতরণ হল ও দুজনেই জেলর এর মত বড় বড় চোখ করে বসল ।
ভাবটা এমন ছিল যে ইহুদীরা হিটলার কে ধরে ফেলেছে । যাক, আমার প্ল্যান
হিসেবেই কাজ শুরু করলাম । খুব তাড়াতাড়িই উত্তর লিখে রেস্ট নেওয়ার
ধান্দা ছিল কারন বেশির ভাগই আমার জানা উত্তর । কিন্তু সময় কি আর
সাহায্য করে, সে দৌড়াচ্ছে নিজের মত আর তার পিছু ধরতে হচ্ছে আমাকে ।
১০ টার পরীক্ষা এখন এগারোটা বাজল । এই দিকে আমার ঘাম বেড়চ্ছে ।
ভুগলের প্রশ্ন বলে কথা, তাও আবার জুলাই এর ১৩ তারিখ, বার – শুক্রবার
। দিনটা একদমই অপয়া । ফালতু একদম । আবার ২ ঘণ্টার ঘণ্টা বাজবে বলে
। প্রিন্সিপাল যেন বলছে –

“ হাম আংরেযোঁ কে যামানে কে জেলর হ্যাঁই।

হামারে ইজাজত কে বিনা কোই পারিন্দা ভি পর নহি মার সাক্তা।”
প্রশ্ন আসছে নিজের মত । নাম্বার পাওয়ার ধান্দায় বশে আছি । যে ভাবে
হক আমায় নাম্বার পেতেই হবে । ভুগল বিষয়টাই অদ্ভুত । আর্টসের বিষয়
হলেও অঙ্ক করতে হয়, বিজ্ঞাণের মত আঁকাতে হয় আর ইতিহাসের মত
লিখতে হয় । যাই হোক আমার বন্ধুরা ছোট ছোট করে প্রশ্নের উত্তর
দিলেও আমি নাম্বার এর চিন্তায় এক্সেস বেশী করের লিখছি । লিখছি তো
লিখছি আর লেখা থামে না । যেখানে আমার বন্ধু জিওমেট্রি বক্স-ই আনেনি,
আমি সেখানে ডায়াগ্রাম দিয়ে যাচ্ছি তো দিয়েই যাচ্ছি । হঠাৎ দু ঘণ্টার
একটা বেল পরল । বুকটা যেন ফেটে পরল আমার । পরীক্ষার খাতায় প্রশ্ন
আমি কখন ছারি নি কিন্তু এবার এটা কি হল । খুব চিন্তায় পরে গেলাম । মা
বাবা কে কি বলব, টাইম শেষ হয়ে গেছিল !

তখনি যেন মাথায় একটা শক খেলাম । দেখি, একি এখন আবার
সবাই খাতা খুলল কেন ? স্যার কে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, হাও মাচ মোর
টাইম ?” আর যে উত্তরটা পেলাম তা শুনে নিজেকে দু থাপ্পর মারতে ইচ্ছে
করছিল । উত্তর টা ছিল এই যে, “ইউ হ্যাভ অ্যান আওয়ার লেফট ।”
তখন আশ্বস্ত হয়ে আবার লেখা শুরু করলাম। ঠিক ৪৫ মিনিট আগে পরীক্ষা
সেশ করলাম। এবার শুরু হল খেলা।
পিছন থেকে শব্দ আসছে, “এই ভাই, তোর চতুর্থ পেজ টা দে !”
— মানে ?
— মানে কি, পাস কর !
— মানে কি ? আমার অ্যান্সার পেপারটা তোকে দেব ? পাগল নাকি ?
— এই তোর বন্ধুত্বের প্রতিদান।
আমিও লাচার। কি করব।
— আচ্ছা নে।
দিলাম পেজ টা আর তারপরেই শুরু হল ঝামেলা। ইনভিজিলেটারের মাথায় জং
পরে জাওয়ার জন্য যে কি অসাধারন টুক্লি হচ্ছে, তা আর কি বলি।
বারবার তাদের ডায়লগের জন্যে সেশ পর্যন্ত এই অবস্থা হল যে পরীক্ষার
১৫ মিনিটের বেল পরল আর আমার কাছে আমার খাতা নেই……
কি করব কিছু বুঝে পাচ্ছিনা। খাতাও আমি রিচেক করিনি। আমার ১০টা পৃষ্টা
সারা হলে ঘুরে বেরাচ্ছে।
এরকম সময়ে আমি বললাম, “কি রে খাতা দে !”
— হ্যা ভাই। দিচ্ছি

সিগ্নাল গেল। আসল প্রথম পাতা। পাতা আসছে আর আমি চেক করছি। জেন
প্রিন্ট হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক হল। আমি, খাতা জমা দিলাম। কিছু তো
বলতে পারলাম না, কিন্তু মনে মনে যে কি দুঃখ পেলাম আর যে কি রাগ টা হল,
তা ত আর বলার নেই।
অবশেষে সকল কে ৮০ তে ৮০ পাইয়ে দিয়ে, আমিও ৮০ নিয়ে বাড়ি গেলাম।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


শাশ্বত বোস

আত্রেয়ী ডি. এ. ভি পাবলিক স্কুলের অষ্টম শ্রেনির ছাত্র, সারাদিন পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে লিখতে ভালবাসে। নিজের এই  ১৩ বছরের জীবনের হাসির ঘটনাগুলি নিয়েই তার বেশিরভাগ  অনুগল্প লেখা। সে ইংরেজিতে কিছু আর্টিকেলও লিখেছে যেগুলি 'শমি ডট ইন' পত্রিকায় প্রকাশিত ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।