২৫ শে, বৈশাখ-১৪২৫ | 9th May, 2018

দেবজিৎ সাহা on

জানালা – এই বিশেষ একটি শব্দ এবং তার কার্যকারিতা সম্পর্কে কিছু বলা যাক।

আপনার বাড়ির আপনার ভালোবাসার একটা জানালা আছে তো? থাকবেই; যেখানে ছুটির দিনে জানালার পর্দাটাকে একটু অবসর দিয়ে আরাম কেদারায় কিংবা বিছানার চায়ে শহর ডুবিয়ে নিয়ে একটা চুমুক — আহা , ভারি শান্তি। কিংবা ঝমঝম বৃষ্টিতে রাস্তা ঘাটের নাকল চেহারা দেখে একটু আনন্দ নেওয়া – ও সবাই করে। আর তার সাথে যদি সহধর্মিণী কিংবা গার্ল ফ্রেন্ড এর গরম নিঃশ্বাস জুটে যায় – উঃ দেখুন রোমান্টিকতায় কেমন আদেখলা হয়ে পড়লেন, আমিও পড়ি।

ছোটবেলার কথা মনে আছে? এখন নাকি দিনের বেলাও টেবিল ল্যাম্প ছাড়া সাহিত্য চর্চা হয় না। অভ্যেস গুলো কেমন হ্যাংলা হয়ে পড়েছে। কিন্তু একটা সময় সূর্যের অনধিকার প্রবেশ কিন্তু ওই জানালা দিয়েই ছিল। বেশিরভাগ সময় টা যদিও মা বাবার কোমল শাসানি টা সকাল হয়ে গায়ে পড়ত। জানালাটা কিন্তু খোলা থাকতো।

আলো বড়ো অদ্ভুত। সামান্য জানালা নিয়ে এত কথা, তাও আবার অতিরঞ্জিত , ভালো না লাগার ই কথা । ভালো লাগবে, যখন আবার নতুন করে জানালার উপস্থিতির গুরুত্ব বুঝবেন।

এখন আসি বাঙালির জানালায়। কয়েকটি রোমান্টিক মুহূর্তের কথা তো আগেই বলেছি। বলাযাক বাঙালির কাছে জানালার গুরুত্ব অপরিসীম। ইস্ রচনার মতো হয়ে গেলো। হক না একটু রচনা। যেমন জানালা দিয়ে আলো প্রবেশ করে । জানালা গ্রীষ্মে ঘর কে ঠান্ডা রাখে । ঘরের ভেতরের ব্যবহৃত বাতাসের বেশিরভাগ টা জানালা দিয়েই বাইরে বের হয়। আর মধ্যবিত্তের জানালা তো বেশিরভাগ সময়েই এয়ার-কন্ডিশনারের কাজ করে। তারপর? তারপর? আর পাচ্ছিনা রচনাধর্মি উপযোগিতা ।

বাঙালির জানালা আজ বড়ো একা। আলোর সাথে ওর সম্পর্কের কোনো অস্তিত্বই আমাদের চোখে পড়েনা। একটি ঘরের বেদনা, সেই ঘরটির খুশি, ব্যস্ততা, কলহ, বিশ্বাসঘাতকতা নিঃশব্দে ফিসফিস করে বাতাসের সাথে। একসাথে দুটো প্রেম; বাতাস এবং আলোর সাথে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আলো বাতাস ওর খুব কনফিডেন্সিয়াল ফ্রেইন্ড । আমার আপনার মত কিন্তু না।

ভূমিকম্প রোধক ইস্পাত দিয়ে বাঙালি ফ্ল্যাট বানালো। আর জানালা? আছে। ঐ যে দেখুন দারুন নক্সা করা গ্রীল , কাঁচটাও দামী। “এর বেশি কম করি কি করে বলুন?” এত বড়ো ডাইনিং স্পেস, দুটো বাথরুম, ১৪০০ স্কোয়ার ফিট । “আপনিও তো মার্কেট টা জানেন দাদা” । যদি বলি বাঙালি আজকে অসহায় , হয়তো মারতে আসবেন। তবে সত্যিই বাঙালি আজ অসহায়।
আজকে নাকি সূর্যের আলো, বাতাস, বৃষ্টি প্যাকেজে পাওয়া যায়। বেমালুম বিকোচ্ছে। দিন দিন তো গুমরে মরছেন দাদা। কোথায় সে রোমান্টিকতা? সে আলো বাতাসের নিমন্ত্রণ? ভিকিরির মতো প্রকৃতির প্রবেশ, তাও আবার ভয়ে ভয়ে।

ভাবুন, একা বসে আছেন আপনার ওই প্রিও জানালার পাশে। আর কবিগুরু, শরৎ চন্দ্র, বিভূতি ভূষণ , জয় গোস্বামী, শঙ্খ ঘোষ আরো আরো – এপার বাংলা , ওপর বাংলা। এরা আপনার বহুদিন আগে কিনে অনা ওই টেবিলের ওপর দেদার উন্মাদের মতো পারফর্ম করছে। আপনি উন্মাদ , আনন্দে কাদা, সাহিত্যের নেশায় মাতাল। আর মঞ্চের আলো নিক্ষেপ করছে ওই জানালাটা। উঃ ভাবুন তো একবার। শুধু কি এরাই ? দেখবেন আসছেন আরো অনেকেই। নতুন যুগের নতুন পারফর্মার। কিন্তু শর্ত একটাই, জানালা আপনাকে খোলা রাখতে হবে।

অধ্যুষিত বাঙালি আর উত্তর অধ্যুষিত বাঙালির বিস্তর ফারাক। বিবর্তন ঘটেছে সংস্কৃতির। বিদেশী রীতির গা ঘেঁষতে ঘেঁষতে পৌছে গেছি উন্নতির চরম সীমানায়। পেছনে তাকিয়ে আর কী লাভ। এখন তো সহজ পাঠ সহজলভ্য এমন একটি ভাষায় যাকে বেশি বেশি আউরাতে আমরা বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। হোক আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা। আমাদের মনের পরীক্ষাগারে চলছে ভাষা ও সাহিত্যের অভিনব গবেষনা । কিন্তু এই গবেষণা অদূর ভবিষ্যতে যে আরেকটি নতুন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম দেবে তাকে কি বাঙালি ভিক্টর সামলাতে পারবে? হয়ত পারবে। ধরনটা হবে অন্য।

একদিন কফি হাউসের সেই বিস্তর ফলক গুলো সাহিত্য স্রষ্ঠা দের প্রহরীর কাজ করত। প্রহরী বলাটা ভুল। তাদের অদৃশ্য প্রভাব কি ভাবে অভিস্রবণ পদ্ধতিতে লেখকের লেখার নীল কিংবা কালো রক্তে মিশে যেত সেটা শব্দ দিয়ে বোঝান বরই কঠিন।
আজ কফি হাউস শুধুই কফি হাউস । ঐতিহ্য বিক্রি হচ্ছে এক কাপ কফি আর দুটো সিঙ্গারার দামে। আজ কফি হাউস দামী দামী সিগারেটের প্ৰখ্যেলিত ধোঁয়ার আধুনিক গ্যাস চেম্বার সেখানে নিরীহ মানুষ হয়তো না কিন্তু মৃত্যু হচ্ছে সৃষ্টিশীলতার । আর সেখানে আমরাই হিটলার। জানলা গুলো আজো আছে । নিজের মধ্যে দিয়ে নির্গত করছে অকুলিন ঝংকার। তবুও তো আছে। থাকবে। হোকনা সে থাকাটা প্রয়োজন ছাড়াই।

থাক , অযথা বাড়াবাড়ি আলোচনার দরকার নেই । মনস্তাত্বিক চাহিদার কথা একটু বলি।
ভাবুন আমরা হাজত বাস করছি । আর সেই হাজতের একটাই ৫ ইঞ্চি/৫ ইঞ্চি সাইজের জানালা। তখন কী গুরুত্ব টা একটু বদলাবে না?
হঠাৎ হাজত বাসের কথা ?
করছি তো । দিনের পর দিন নিজেদেরকে করে তুলছি যাবতজীবন সাজা প্রাপ্ত আসামী। সমাজ , রাজনীতি , অর্থনীতির চাপে ধীরে ধীরে কখন যে মনের জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছি টের পাইনি। অন্ধকারের একাকিত্ব। যে অন্ধকার দিনের আলোর মত পরিষ্কার। দেখা যায়। বোঝা যায়না। অবিবেচিত কিছু ধারণা আর অযৌক্তিক অকুলীন রীতিনীতি নিয়ে ভালোই চলছে।
অস্তিত্বের এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে দরকার একটা পথ। দরকার আলোর অবাধ প্রবেশ । দরকার এনলাইটেনমেন্ট । সব বাধা কে সরিয়ে নতুন করে ফিরে যেতে হবে সেখানে যেখানে ঘটবে বাঙালি মননের আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি। হবে সংস্কৃতির মোক্ষ লাভ। তবে কোনো ধার্মিক উপায়ে না। সে গন্তব্য আসুক নিজের মনের বহু দূর্গম পথ অতিক্রম করে।
মননের বিকাশ , হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য হক আবার ফিরে পাওয়া। হোক নতুন করে আলোকে অনুসরণ। দরকার শুধু মনের বন্ধ হয়ে যাওয়া জানালার পুনোরুন্মচন । আর সেই উদ্দ্যেশ্য কে একটু জ্বালানী দিতে আমাদের “দক্ষিণের জানালার” একটি ছোট্ট প্রয়াস। তবে দক্ষিণ দিকের গুরুত্ব কিন্তু নিছকই ভৌগলিক। জানালা যখন খুলতেই হবে তখন শুধু দক্ষিণের কেন ? উত্তর, পূর্ব , পশ্চিম —- সব জানালাই হোক উন্মোচিত।

লিখেছেন: দেবজিত সাহা (সহ-সম্পাদক)


দেবজিৎ সাহা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভারসিটি থেকে স্নাতক ও গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি থেকে স্নাওকত্তর । সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই লেখা লেখির জগতে প্রবেশ। কলেজ জীবন থেকেই লেখা লেখি শুরু করেন। পেশায় শিক্ষক। এছাড়াও ফটোগ্রাফি তে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।