ঝলসানো রুটি ও কবিতা প্রাসঙ্গিকতা

শুভদীপ আইচ on

jholsano_ruti_kobita_prasongikota

ফিরতে গিয়ে দেখি রুটির মতো চাঁদ পড়ে আছে রাস্তায়। সর্বাঙ্গে রক্তমাখা জ্যোৎস্না। কার রক্ত , কিসের রক্ত। সেই রক্তে অযোধ্যা লেগে আছে , নাকি মক্কা। এসব চুলচেরা বিশ্লেষণে ভরে উঠছে ব্ল্যাক করিডোর। কামান দেগে স্যানিটাইজ করতে গিয়ে ভুলতে বসেছি আত্মার মাংস ও অস্থি এখনো স্যানিটাইজ করা বাকি। যে বিভেদের রাজনীতি দেড়শো বছর আগে ইংরেজরা নিয়েছিল তা এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার একটি লোভনীয় অস্ত্র। পরাধীন যুগে বারবার যে কথা দেশনায়কেরা বলে গিয়েছেন সেই আশঙ্কাই আরো একবার সত্য প্রমাণিত হলো – আমাদের মূল বিভেদ আসলে ধনী ও গরিবের। কর্পোরেট এর সাথে মধ্যবিত্তের, মধ্যবিত্তের সাথে দিনমজুর, সহায় সম্বলহীনদের। অথচ এসব বোঝাতে গেলে বাঁদর ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার কাঁধে। আঁচড়ে, কামড়ে, দাঁত খিঁচিয়ে জানাবে অন্য বাঁদরদের। তারা আবার লাঠিসোটা, বল্লম, তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার উপর। লাশ পড়বে রাজপথে। ক্রমশঃ এই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে পথে – প্রান্তরে, রাজ্যে রাজ্যে, জেলায় জেলায়। প্রশ্ন করলে চালিয়ে দেওয়া হবে ক্ষিপ্র ট্রেন। উন্নয়নের গতি আপনাকে পিষে দেবার সময় ঝোলা থেকে বেরিয়ে পড়বে বেড়াল। বহুজাতিক কোম্পানির সসের মতো ছড়িয়ে পড়বে আপনার রক্ত। আপনার ট্যাক্সের টাকায় রাজকোষ ফুলে ফেঁপে উঠবে অথচ আপনি না খেয়ে থাকলে তার দায় নেবেন না সম্রাট। রেললাইন জুড়ে ফুলের মতো ছড়িয়ে থাকবে রুটি ও আপনারই মাংস আর রাজার পুষ্প উদ্যান সেজে উঠবে কোটি কোটি টাকায়। ‘ সম্রাট যত্ন তহবিল ‘ উপচে উঠবে অথচ প্রজাদের যত্ন করতে হবে নিজেদেরই টাকায়। আপনি কবিতা লিখবেন, গান করবেন, সিনেমা বানাবেন। দোরে দোরে গিয়ে ভিক্ষে চাইবেন প্রতিবেশীর প্রাণবায়ু বাঁচিয়ে রাখবার আশায়। অথচ ‘ যত্ন তহবিল ‘, ‘ স্বস্তি তহবিল ‘ থেকে মিনিমাম রিলিফটুকু জুটবে না আপনার। একদল প্রশ্ন করে বসবে ” ছি ছি এই অবস্থায় আপনারা কবিতা লিখছেন? গান বাঁধছেন? ” অথচ তাদের কাছে এক প্যাকেট লবণের দাম চাইলে সগর্বে জানাবেন রাজভক্তির কথা। রাজার তহবিল ভরিয়ে তারা গদগদ পোস্ট দেবে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

এই এত শত প্রশ্নের মাঝে এখন প্রশ্ন হলো এইরকম এক সঙ্কটপূর্ন অবস্থায় আমরা কি করে একটি কবিতা সংখ্যার প্রকাশ ঘটাচ্ছি! এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে কালের গর্ভেই। ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখবো এমনকি প্রবল বিদেশি শাসনের যুগেও এই কবিতাই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের অস্ত্র। চারণকবি অথবা রামপ্রসাদী গান এর আড়ালে যেমন ফুটে উঠেছে শোষণ ও নিপীড়নের ছবি, বাতলে দেয়া হয়েছে প্রতিবাদের উপায়, বর্তমান সময় ও তার ব্যতিক্রম নয়। ” সব ইয়াদ রাকখা জায়েগা ” – আসলেই সব কিছু মনে রাখা হবে। আজ থেকে পঞ্চাশ বা একশো বছর পর যখন আজকের ইতিহাস নিয়ে লেখা হবে তখন উল্লেখ হবে এ এমন এক রূপকথার দেশ যেখানে প্রজারাই প্রজাদের পাশে দাঁড়ায় আর রাজা বেহালা বাজায় পাহাড় চূড়ায় বসে।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

১. ইচ্ছে করেই তার ও তাদের বানানে অনেক জায়গায় চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার করা হয়নি।

২. শুধুমাত্র প্রতিবাদের লক্ষ্যে এই সংখ্যা গড়ে তোলা হয়নি। তাই কবিতা এসেছে কবিতার নিয়মেই। প্রতিবাদ আছে কি নেই তা আপনাদের ই খুঁজে নিতে হবে।



শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।