“প্রাক্তন”-ই কি বাংলা সিনেমার ভবিষ্যত?

শুভদীপ আইচ on

সিনেমাটা বরাবরই হলে গিয়ে দেখতে ভালবাসি ! হল বলতে আমাদের এই মফস্বলের টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সিনেমা হলগুলোই , মাল্টিপ্লেক্স নয় ! যেগুলোর ঝুলে পড়া সিলিং , নোনা ধরা দেয়াল – জীবনের গল্প গুলো কে আরো জীবন্ত করে শোনায় ! সিনেমা বলতে সবরকম ( তবে “দেবাদিদেব” বাদে ) ! বিশ্বাস করি আর্ট বা কমার্শিয়াল বলে কিছু নেই ! ভীড়টাকে যেমন সম্মান করি , তেমনি নির্জনতাকেও ! 2008 এর 15 ই আগস্ট যে সিনেমাটা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম ঘটিয়েছিল , স্বপ্ন দেখিয়েছিল তথাকথিত কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমার জগতে আমূল বদল ঘটানোর , তার অপমৃত্যু হতেও দেখেছি চোখের নিমেষেই !

এরপর অঞ্জন – সৃজিত – কৌশিক যুগ এসে অচিরেই সেই দুঃখ মুছিয়ে দিয়েছে ! ভরসা যুগিয়েছে আবার হলমুখী হওয়ার ! কখনো ভীড় , কখনো নির্জনতাকে উপভোগ করার ! এরমধ্যেই হটাত করে সাতসকালে কাউকে না বলে চলে গেলেন একজন ! দিনটা “19 শে এপ্রিল “ছিল না , তবুও “নৌকাডুবি ” ঘটে গেল ! “আসা যাওয়ার মাঝে ” স্রোতেদের এই বোঝাপড়ার খেলাটা যখন এগিয়ে চলেছে , ঠিক তখনই হাজার ঢেউ এর ভিড়ে কখন যে একটা ঢেউ তীরে এসে আছড়ে পড়েছে – খেয়ালই করিনি ! এই পরিচালক জুটির আগের সিনেমাগুলি সবই স্যাটেলাইটের কল্যাণে ঘরে বসে দেখা ! ভেবেছি নতুন এসেছে এরা , যাক কদিন… ডাক পেলে কি আর ঘরে বসে থাকতে পারব !

তো ডাক এল ! ” ঘরে – বাইরে ” – র সেই হারিয়ে যাওয়া জুটি যখন একঝাঁক ইয়াং জেনারেশন এর সাথে ” বেলা শেষে ” ফিরে এল তখন নিজের ই নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল , কারণটা সেই সেলুলয়েডের বড় পর্দার টান ! তাই এবার যখন একটা অসহ্য আর অপ্রিয় জুটির 15 বছর পর ঘরে ফেরার গল্প কানে এল তখন শুধুমাত্র আর একটা মিরাকল এর ভরসাতেই ফের হলমুখী হলাম ! তাও শেষ বেলায় ! যখন আশেপাশের প্রায় সবকটা মানুষএর তা দেখা হয়ে গেছে ! পাতায় পাতায় খবর ছড়িয়ে পড়েছে ! শেষমেষ টিকিট কেটে যখন হল এ গিয়ে বসলাম তখন আমার আশেপাশে সবমিলিয়ে দশবার জন লোক হবে ! সিনেমা শুরু হল , মায়ানগরীর একটা ব্যস্ততম স্টেশন থেকে ! অনুপ্রবেশ ঘটল নায়িকার ! ট্রেন চলতে শুরু করল ! তাকে যত দেখছি বিস্ময় বাড়ছে ! সেই চশমার ফ্রেম , চেহারায় সদ্য ফেলে আসা যৌবনের ছাপ , বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি … মুহুর্তে চমকে উঠল বুকের ভেতরটা …. সব ” প্রাক্তন ” ই কি এমন দেখতে হয় ? …. কি জানি ! তো গল্পের পরত যত খুলতে লাগল তত বোঝা যেতে লাগল পরিচালকদ্বয়ের মুনশিয়ানা ! বর্তমান আর অতীতের খেয়া পারাপার যখন নিমেষেই চলছে , সেই সময় ব্যাকড্রপ এ কলকাতা শহর টা যেন নিজেই একটা চরিত্র হয়ে উঠল ! বাংলা সিনেমায় এইরকম এতটা উচ্চতা থেকে এরিয়াল শট এর ব্যবহার এর আগে হয়েছে কি না জানা নেই ! ” জাতিস্মর ” এ কিছুটা ছিল কিন্তু তা এতটা ব্যাপক নয় !

পরিচালকের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল অভিনেতাদের দক্ষতা ! নায়ক নায়িকাকে ম্লান করে দিয়ে দাপট দেখাতে লাগলো পার্শ্বচরিত্ররা ! অপরাজিতা আদ্য ওটা অভিনয় করল না অন্য কিছু তা হল থেকে বেরিয়ে এসেও বুঝে উঠতে পারলাম না ! ওদিকে ক্যামেরা ততক্ষণে কবিতা বলতে শুরু করে দিয়েছে ! অণুপমের গান তখন সেলুলয়েডে মায়াজাল বুনছে ! ” তুমি অন্য কারো সঙ্গে বেধ ঘর ” … গানের এইখানে এসে ” ঘর ” শব্দটিতে ক্যামেরা যখন বাচ্ছামেয়েটির খেলনাবাটির সামনে এসে থমকে যায় তখন মনে হয় পুরোটাই স্বপ্ন দেখছি না তো ?…. সম্পর্কের সেই সব আলগা বুনট , পরশ্রীকাতরতা , পুড়তে থাকা ভালোবাসার আগুনে সন্দেহের স্ফুলিঙ্গ , যৌথ পরিবারের ভাঙ্গন , বাংলা ব্যান্ড এর ওঠাপড়া … সবমিলিয়ে একটা দুরন্ত ককটেল !

অনেকদিন মনে থেকে যাবে এই শিবপ্রসাদ – নন্দিতা জুটিকে ! ভাল থাকুন আর ভাল রাখুন বাংলা সিনেমার বাতাসকে এইভাবে ক্রমাগত অক্সিজেন দিয়ে !


শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

2 Comments

Nandini saha · মে 12, 2018 at 4:20 অপরাহ্ন

Review pore khub valo laglo.ek e sathe bolbo film er imperfect dik gulo o tule dhorle review porte aro valo laage.aamar onek antorik subhechha roilo Subhadeep er jonyo.

ShubhdIp Aich · মে 12, 2018 at 6:39 অপরাহ্ন

ধন্যবাদ। ভবিষ্যতে রিভিউ লেখার ক্ষেত্রে এই দিকগুলিও মাথায় রাখবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।