চলচ্চিত্র সমালোচনা : Volcano / Ixcanul (2015)

অভিষেক ঘোষ on

volcano

Ixcanul (2015)
Director : Jayro Bustamante.
Cinematography : Luis Armando Arteaga.
Edit : César Díaz.
Music : Pascual Reyes.
Country : Guatemala.
Language : Kaqchikel, Spanish.
Cast : María Mercedes Coroy, María Telón, Marvin Coroy, Manuel Manuel Antún, Justo Lorenzo.

একদিকে মেক্সিকো, অন্যদিকে কলম্বিয়া-কোস্টারিকা-নিকারাগুয়া, মানচিত্রে এদের মধ্যবর্তী সরু সাঁকোর মতো জায়গাটা হল গুয়াতেমালা। মেসো-আমেরিকান উপজাতির এই দেশ, আজও অসংখ্য মায়ান অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কার বুকে আঁকড়ে লড়ে যাচ্ছে সামন্তবাদ-উত্তর নতুন পৃথিবীর সঙ্গে। ছবিটা দেখলে যদিও মনে হয়, এ এক অন্য সময়, অচেনা পৃথিবী। ছবি জুড়ে আছে কালো আগ্নেয় পাহাড়, এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, উপজাতির বিশ্বাসে সূর্য-চন্দ্রের মতো সেই ভলক্যানোও এক দেবতা। আর এই গুয়েতামালা জুড়ে ছড়িয়ে আছে সেই আগ্নেয় পাহাড়ের গন্ধক-বায়ু আর কফির খুশবু। আর আছে ‘Land of opportunity’ আমেরিকার হাতছানি, মেক্সিকো পেরোলেই সেই সম্ভাবনার দেশ! গুয়াতেমালার হতভাগ্য স্বপ্নদর্শীদের কাছে আমেরিকা মানেই বাগান-ঘেরা বাড়ি আর প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব গাড়ি।

আগ্নেয় ছাইতে ঢাকা সেই উপত্যকায়, অসংখ্য সাপ আর পতঙ্গে পরিপূর্ণ এক কফি-ক্ষেতে, মা-বাবার সাথে কাজ করে মারিয়া (María Mercedes Coroy)। ওরা যাযাবর, মূলত পশুপালনই যাদের উপজীবিকা। ওদের আগ্নেয় দেবতা পথ দেখায়, বিশ্বাস দেয় ভরসা, আর অক্লান্ত পরিশ্রম যোগায় পেটের ভাত। মারিয়ার সঙ্গে ওই কফি ক্ষেতের মালিক ইগনাসিও (Justo Lorenzo)-র বিয়ে হবে, যে বিয়েটা পুরোটাই জমি ও জীবিকা বাঁচিয়ে রাখার বিনিময় প্রথা মাত্র, মারিয়া সেখানে পণ্য। ছবির শুরু ও শেষে তাই মারিয়ার মায়ান ব্রাইডের সাজে সেজে ওঠার মন্তাজ যেন আইরনি। এদিকে মারিয়া যে ভালোবাসে পেপে-কে, হয়তো ঠিক ভালোবাসাও নয়, প্রয়োজন। কারণ পেপে নদী পেরিয়ে, মরুভূমি ডিঙিয়ে, আমেরিকা যাবে। মারিয়া স্বপ্ন দেখে সেই নতুনের, সেই মুক্তির। তিনশো বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ যে হাড়ভাঙা হীনমন্যতা চাপিয়ে দিয়েছে মাথায়, তার থেকে মুক্তি চায় মারিয়া ও পেপে দুজনেই।  পেপেও আসলে তার হবু বরের কফি ক্ষেতের শ্রমিক, রগচটা, স্বার্থপর ও মদ্যপ। লোভীর মতো সে শুধু মারিয়ার শরীর চায়। কিন্তু ছবির শুরুর ওই নববধূর সাজ গল্পের শুরু নয়, গল্পের শেষ। ওই সাজ আসলে আগ্নেয়গিরির সমস্ত সম্ভাবনাকে মিথ্যে করে দেয়, প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা দেয় নিভিয়ে। গোটা সিনেমা জুড়ে আমরা সেটাই দেখি… কীভাবে একটা আগুন নিভে গেল, শৃঙ্খল পরলো শিখায়।

একটা ছোট্ট ঘরে সপরিবারে থাকার মানে শয়ন-সঙ্গম একত্রে। তাই বিয়ের পাকা কথার পর মোটাদাগের রসিকতায় সম্ভোগের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ, মারিয়ার মনে পুলক জাগে । মারিয়ার পাশেই যখন রাতের আঁধারের চাদর গায়ে জড়িয়ে, মা সাগ্রহে বাবাকে নিজের শরীরে টেনে নেয়, সে দু-কান ভরে তখন শীৎকারের শব্দ শোনে। বিকল্প সন্ধানে মারিয়া অরণ্যে যায়, বৃক্ষদেবতাকে প্রণাম জানিয়ে, তার শুঁড়ের মতো পাকানো গুঁড়িতে সতেরোর মারিয়া নিজের শরীর সমর্পন করে তির্যক ঘর্ষণে। তাতেও মেটে না বাসনা, বরং বাড়ে। তাই সে অভিসারে যায়, মাতাল প্রেমিক উদাসীন পেপে-কে টেনে নেয় নগ্ন দেহে। তারপর সকাল হয়, রামের বোতল নিয়ে জীবন্ত আগ্নেয়গিরির সিল্যুয়েটে সে যখন নীচে নামছে (কালোর প্রেক্ষাপটে লাল পোশাকের সেই কম্পোজিশন অপূর্ব ), তখন তার গর্ভেও আগুনের জন্ম হয়েছে তাকে পোড়াবে বলে। এরপর যা হয়… পেপে পলাতক হয়। মারিয়ার মা প্রথমে অগ্নিদেবের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চায়, তারপর নিরুপায় হাতে মেয়ের গলায় ঢেলে দেয় উপজাতীয় ওষধি, যা গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট করবে। কাজ হয় না। তখন মারিয়াকে তপ্ত উপত্যকার কিনারে নিয়ে গিয়ে তার মা লাফাতে বলে, যদি ভ্রূণ নীচে পড়ে যায় তো মুশকিল আসান। আবারো কাজ হয় না। তখন অন্ধবিশ্বাস বলে, এ সন্তান দেবতার আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে, একে বাঁচতে দিতে হবে। কিন্তু তাহলে মারিয়ার বিয়ের কি হবে! ইগনাসিও যে তাদের ভাগ্যবিধাতা! কফি ক্ষেত থেকে তাড়িয়ে দিলে তারা যাবে কোথায়, খাবে কী?

মারিয়া ও তার মা বাঁচার তাগিদে এক নির্জন মুহূর্তে কফির ক্ষেত পুড়িয়ে দেয় যাতে নতুন করে বীজ বোনার কাজের তাগিদে, তাদের প্রয়োজন থাকে মালিক পক্ষের কাছে। কিন্তু ক্ষেত ভর্তি সাপ। তার জন্য ভাবনা কি! মারিয়ার মা স্নানের সময় শিখিয়েছে, সে যখন গর্ভবতী ছিল, তার গর্ভস্থ মঙ্গলময় আগুনের জাদুতে সাপ-খোপ, দত্যি-দানো পালাতে পথ পেত না। তাহলে মারিয়াই বা পারবে না কেন! সেও তো পেটে জাদু ধরেছে! আর এই ভ্রান্ত বিশ্বাসই কাল হয়। পরিবারের কল্যান-কল্পে এক মায়ান পুরোহিতকে ডেকে এনে, ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে মন্ত্রধ্বনির সাথে হেঁটে চলে সে, গর্ভের জাদু-আগুনে সাপ ভাগাতে। তারপর সাপের কামড়ে আধমরা মারিয়াকে বাঁচাতে তার পরিবারের মরিয়া চেষ্টার পরবর্তী দু মিনিটের ভিস্যুয়াল বোধকরি ওদেশের সিনেমার ইতিহাসে থেকে যাবে। সে যাই হোক, হসপিটালে ইগনাসিও কিছু ভেলকি করে। ভাষাগত সমস্যায় (মারিয়ারা উপজাতীয় Kaqchikel ভাষা বলে) তাদের কথা কেউ বোঝে না। ইগনাসিওর স্বাস্থ্যদপ্তরে পরিচিতি রয়েছে, সে তাদের সেই অসুবিধার সুযোগ নিয়ে, ভুলভাল বুঝিয়ে মারিয়ার টিপ-সই নিয়ে নেয় এই বয়ানে যে, তার গর্ভস্থ মেয়ে হসপিটালেই মারা গেছে। পরবর্তীতে পুলিশ কেসের সময়ও সে শঠতা অবলম্বন করে।

এর ফলে সন্তানহারা জননী সাপের বিষ হজম করেও মরমে মরে থাকে। খামারে যে গৃহপালিত শূকরদের বোতল বোতল রাম খাইয়ে মিলনে আশকারা দিত, তারা বাচ্চা বিলিয়েছে, তাদের জড়িয়ে বসে থাকে সারাদিন। তারপর মারিয়া জানতে পারে, তার সন্তানের কফিনে চাদরে জড়ানো থান-ইঁট রয়েছে! তাহলে বাচ্চাটা! না সিনেমায় এই প্রশ্নের উত্তর নেই। এমন বাচ্চাদের সাথে কি হয় জানতে চাইলে দেখতে পারেন, ‘Song Without a Name’ (২০১৯) নামের ছবিটি। তারপর? ভঙ্গুর হৃদয়ে বাগদত্তা মারিয়া নববধূর সাজে সেজে ওঠে এরপর। প্রতারক পুরুষ ও পরিবারের জাঁতাকলে প্রবেশের আগে শেষবার সেজে নেয় সে।

জায়রো বুস্তামান্তে কেমন পরিচালক, তার সাক্ষী হয়েছিলাম প্রথম, গত বছরের নভেম্বরের দশ তারিখে, নন্দনে। সেদিন কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত ছিলেন বুস্তামান্তে নিজেও, তাঁর ছবি ‘The Weeping Woman’ (La Llorona, ২০১৯) নিয়ে, লম্বা লোকটাকে দেখে এমনিতে ভিনদেশী বলে চেনা যায় না… শুধু ফ্যাশনে আলাদা লাগে। সেদিন দেখেছিলাম, একটা ছবিতে কত অবলীলায় তিনি ভৌতিক গোত্রের ধমনীতে সমাজ-রাজনৈতিক শোষণের রক্ত বইয়ে দিতে পারেন।  ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ — সুদীর্ঘ এই কালখন্ডে গুয়েতামালার মানুষ দেখেছে সিভিল ওয়ার, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত চলেছে মায়া উপজাতির মানুষদের উপর নির্মম নির্বিচার অত্যাচার — “নিঃশব্দ গণহত্যা” নামে কুখ্যাত সেই পর্বে চলেছিল বিপুল ধর্ষণপর্ব-ও। বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমনে গুয়েতামালার সরকার মায়া উপজাতির নেটিভদের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যমূলক বিভেদ-নীতিকে কাজে লাগায় সুচতুরভাবে। সেই ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়েই একখানা খাসা ভূতুড়ে গল্প ফেঁদেছিলেন পরিচালক (তিনিই প্রোডিউসার, এডিটর এবং আরো অনেককিছু)। সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন।

ইস্কানুল সেই ছবির মতো সঙ্গীতে-সম্পাদনায় অতটা যথাযথ না হলেও যথেষ্ট ভালো। ইস্কানুলে নেপথ্য সঙ্গীত প্রায় নেই। বরং সাউন্ডট্র্যাকে সারাক্ষণ থাকে একটা জোরালো আর ভারী বাতাস বয়ে চলার শব্দ আর থেকে থেকেই পর্বতের গর্ভে গনগনে আগুন জ্বলতে থাকার শব্দ, যেটা যে কোনো জৈব জ্বালানির উনুনের কাছে গেলেই অনুভূত হয়। পাহাড়ি পথে যতবার মানুষের ছোট্ট শরীর দেখা দিয়েছে, ততবারই ভালোলেগেছে, এটাই যেন প্রেক্ষিত দিয়েছে তাদের। বুস্তামান্তের ছবিতে এমন কিছু উপাদান থাকে, গল্প ছাড়াও যা বড়ো পর্দায় দেখার ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু দেয় দর্শককে।  ঘনায়মান অন্ধকারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মশাল হাতে শবযাত্রা, গাছের সাথে যুবতীর মিলন-আশ্লেষ, মরা মেয়ের মুখ দেখার জন্য পাগল মারিয়াকে তার মায়ের হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়া, স্নানঘরে মা-মেয়ের যুক্তি-তর্ক আর গল্প বা, পূর্বকথিত সাপে-কাটার দৃশ্যগুলি এতোই মোহময় যে মনে গেঁথে যায়। আর সে জন্যই এমন ছবি অতিরিক্ত মনোযোগের দাবি রাখে। এই ধরণের ছবি আমাদের চোখ আর মনের অভ্যস্ত চলন থেকে মুক্তি দেয়, খুলে দেয় বিশ্ব সিনেমার দিগন্ত।



অভিষেক ঘোষ

পেশায় স্কুল শিক্ষক, নেশায় কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র সমালোচক ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।