অন্তর্বর্তীরেখা

সমীরণ ঘোষ on

ontorbortirekha

১.

কেন বেগুনি আলো-ই তুমি পছন্দ করবে! ভাবি
কেন বেগুনি আলোয় প্রেতরাত্রি খুলবে বারবার

ভাবি, আর অগ্নি গড়ায় কালো মেঘে
ভাবি, আর দাবার দু-প্রান্তে নামে ঝড়
ভাবি, আর বজ্র জ্বলে যায় দুই বিপক্ষ শিবিরে

নৌকো ডুবছে। ভাঙা পায়ে গড়িয়ে পড়ছে যত ঘোড়া

ছকের দু-প্রান্তে দুই শব ঝুঁকে ঝুঁকে
মৃত্যু তুলছে। ঝুঁকে ঝুঁকে মৃতের পাহাড়

২.

এমন কোনো কলেরার বছর কি পেরিয়ে এলাম, যেখান থেকে
ভ্রূ নাচিয়ে ইস্পাতের ডাইরিগুলো একবার খোলা যেত!

বিকেলের ট্রেন চলে যেতে রবারের ফ্যাকাশে মুখে বসে

লোহার নৌকো থেকে নেমে আসছে বরফস্তব্ধ মাছ

সন্ধে কাঁধে জেলেরা নামছে
সন্ধে কাঁধে মেয়েরা নামছে
ইস্পাতের ডাইরি কাঁধে মড়কের তীব্রতম গান

৩.

একটু জোরে হাঁটলেই ব্রিজটা পেরুনো যেত
কিন্তু একটা পা কোথায় যে হারিয়ে এলাম

পাশে পাশেই হাঁঁটছে লোহার ক্রাচ
আর মাথায় শ্বাস ফেলছে বাজভরতি আকাশ

আমরা একে অপরের সাথে বিন্দুমাত্র বাক্যালাপ করিনি
একে অপরে প্রতি যথেষ্ট ক্ষুব্ধ আর যথেষ্ট সন্দিহান
যথারীতি থুথুক্কার করলাম সারা পথ

আর একটু জোরে হাঁটলেই ব্রিজটা পেরুনো যেত!

একটা পা কোথায় যে হারিয়ে এলাম

৪.

যথেষ্ট সাহসের সাথে বলতে পারি মূর্তিগুলো
তুমিই লুকিয়েছিলে

যেতে যেতে গন্ধগুলো ফিকে হয়ে এল
এখন রক্তের দাগ ভীষণ অস্পষ্ট
এখন কলারের নীচে লন্ড্রির মার্কাও উধাও

চোয়ালের জড়ুুল দেখে মনে পড়ে গেল তুমি খ্রিস্টপূর্ব
আর মূর্তিগুলো একই সাথে খুঁড়ে তুলেছিলাম

যখন ব্রোঞ্জের হাঁসুলি গলায় এক মেয়ে বাচ্চাকে স্তন দিচ্ছে
আর হাড়ের দণ্ড হাতে পাহারা দিচ্ছে শস্যের চাতাল

৫.

বাজারের মধ্যে লম্বা দড়ি রেখে বেমালুম লাফিয়ে চলেছ
ওই লম্বা দড়ি আর ধোঁয়া ওঠা লম্বা বাজার

খেলাঘর হাতে সেই মেয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে মরুর পাহাড়
ওই স্তব্ধ খেলাঘর আর বালিঝড় কাঁধে মেয়ে

বৌদ্ধগুম্ফাগুলো কবেই না গুঁড়িয়ে এলাম। ধোঁয়া উঠছে
পোড়া পুঁথির গন্ধে একবিংশ শতাব্দীর ভোর

দড়ি নেড়ে দু-একটা রেখায় তুমি বাবরি বানাচ্ছ, বামিয়ান

লম্বা দড়ি। তোমার পাথরচাপা পাণ্ডুলিপি। পোড়া বাজারের পথ

৬.

কী করে বুঝবে, তুমি নও, তোমার ছায়ায় কেউ রক্ত মেখে বসে!

ব্রতকথা পড়ছে যত দল বেঁধে মেয়ে। আর কুয়াশা ঘনাচ্ছে

পাথর ভাঙল যারা এতটা বছর, ফিরে কি আসবে!
বদর বদর যত নেমেছিল মেছো ভেলা, ফিরে কি আসবে!

কুপির আলোয় রাত ফুরোতে চায় না। শুটকির গন্ধে
বেলা ফুরোতে চায় না। হাট বসে, মেয়ে-সন্ধের হাট উপকূলে

ঘর পোড়া আরো উঠে আকাশ চমকায় শুধু ক্বচিৎ কখনো

৭.

তিনিই রক্ষক। আর শিঙা হাতে সেই যে বেরোলাম

পেরিয়ে যাচ্ছি পঞ্চস্তূপ। কইপুকুর। চন্দ্রবিল। নাটাপাহাড়
বিংশ শতকের শেষে কার কোলে ঘুমিয়ে পড়লাম!

হাতআয়নার পাশে যে-কৌটো কখনো খোলেনি, আজও
স্তব্দরূপ। শুধু দৈতের হাত এসে মুচড়ে দিয়েছিল গলা

জলের অনেক নীচে পানিসিঙাড়ার পথ, বাঁকা আলো

এসেছি অতল। বাকি পথ অস্পষ্ট অধরা

৮.

আর কার জন্যই বা লিখবে! কেন লিখবে! কীভাবে!

টেবিলের ওপর কাটা পাঞ্জাটুকু রেখেই বেরিয়ে পড়ো
টেবিলের ওপর রহস্যময় খেলনাবন্দুক রেখে বেরিয়ে পড়ো

গাধার পিঠের ওপর সারি সারি বেরিয়ে পড়লাম
যখন আকাশ মাংসময়। পিঠে দো-নলা ভিস্তি। আর
জুতোর নীচে লকলকে ছুরি

পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মরে যাওয়ার আগেই একবার গান গাইব
ফাঁকা আওয়াজ করব গুলির। আর নতমস্তক স্মরণ করব
সেই পাঞ্জার কাঁপন

যা হয়তো কেউ লালকাপড়ে মুড়ে পেরিয়ে যাচ্ছে
গিরিপথ আর বনবেশ্যার ডিহি



সমীরণ ঘোষ

জন্মঃ ১৯৫৫, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ সিভিল এঞ্জিনিয়ারিং। প্রকাশিত কবিতার বইঃ - কবিতাসংগ্রহ, চাঁদলাগা চৌষট্টি আশমান, অন্তর্বর্তীরেখা, কলোপাথরের হারমোনিয়াম, মরচে গোধূলির পাঠ, মরিচগন্ধের সেতু হাড়ের দূরবিন, প্রিয় পঞ্চবিংশতি, হাতআয়নার ঘুম। অনূদিত নাটকঃ সুইফট নির্মিত প্রাসাদ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।