মৌখিক ইতিহাস ও পুরাকথায় দক্ষিণ দিনাজপুর (পর্ব – ৬)

ড. সমিত ঘোষ on

moukhik_itihas

আজ ষষ্ঠ পর্বের মৌখিক ইতিহাস ও পুরাকথায় জেনে নেবো তপন থানার মন্দির বাসিনী দেবী ও পোড়াগাছির মন্দির এবং হরিরামপুর থানার বৈরাট্টা গ্রামে অবস্থিত আলতা দীঘি সম্পর্কে।

মন্দির বাসিনী দেবীঃ  তপন থানার ভিকাহারে রয়েছে প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি প্রাচীন মন্দির বাসিনী দেবীর মন্দির। জনশ্রুতি এক তান্ত্রিক এখানে তন্ত্র চর্চা করতেন। তিনি সিদ্ধি লাভের জন্য একটি মেয়েকে মন্দিরের বেদীর জায়গায় গর্ত করে সমাহিত করেন। লোকশ্রুতি গভীর রাতে মন্দির চত্বর থেকে ধূপ, ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়। সেই গন্ধ কারও খারাপ লাগলে সেই পরিবারের ক্ষতি হয়। বর্তমানে অমাবস্যার কালীপুজোর দিন সোয়া হাত মাটির কালীমূর্তি পূজিত হয়।

mondir basini debir mondir
মন্দির বাসিনী দেবীর মন্দির

আলতা দীঘিঃ জেলার হরিরামপুর থানার বৈরাট্টা গ্রামে অবস্থিত আলতা দীঘি (জে. এল. নং – ৪, ছোট মহেশপুর)। দৈর্ঘ্য ১২৮০ এবং প্রস্থ ২৭০ গজ। আলতা দীঘিকে নিয়ে রয়েছে নানা লোকগাথা। দীঘির অদূরে বাস করেন বুড়িকালী। তিনি প্রতিবছর কার্তিক মাসে একবারই আলতায় রাঙিয়ে দীঘির ওপর দিয়ে নৃত্য করতে করতে তাঁর মাসির বাড়ি কুকড়ামনি যান। দীঘির সমস্ত জল বুড়িকালীর আলতা মাখা পায়ে লাল হয়ে যায়। কার্তিক মাসে বুড়িকালীর মেলা উপলক্ষে প্রচুর নারী দীঘির ধারে দু’পা আলতায় রাঙিয়ে দীঘির জল স্পর্শ করেন। তখন আলতা দীঘির জলের কিছুটা অংশ জুড়ে আলতার মত লাল হয়ে যায়।

poragachhir mondir
পোড়াগাছির মন্দির

পোড়াগাছির মন্দিরঃ তপন থানার জামতলা থেকে উত্তর দিকে গেলে চকমধুসূদনপুর। এটাই পোড়াগাছি নামে পরিচিত। এখানে একটি সুন্দর টেরাকোটার মন্দির আছে। আনুমানিক ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকে তৈরী। মাঝখানে দুর্গা মন্দির, তার দু’দিকে কালী ও দধিবামন ঠাকুরের মন্দির আছে। শোনা যায় মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত করার সময় ১০৮টি মোহর ভরা কলসি নিবেদন করা হয়েছিল। পূর্বে এখানে মূর্তি পূজা করা হতো। জনশ্রুতি ভোগ দেওয়ার সময় একটি অল্প বয়স্ক মেয়েকে দেখতে পাওয়া যায়। এরপরই দেবীমূর্তির মুখে চুলের খোপা লেগে থাকার জন্য এখানে মূর্তি পুজো বন্ধ হয়ে যায়। এখানে মিথ, কিংবদন্তি, জনশ্রুতি, পুরাকথা সব মৌখিক ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়েছে।

ক্রমশ…

*পঞ্চম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


ড. সমিত ঘোষ

শিক্ষক গবেষক সমিত ঘােষ প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইতিহাস চর্চায় রত। ইতিহাসের সঙ্গেই তাঁর দিনযাপন। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে তিনি নানা প্রবন্ধ লিখেছেন। ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল কয়েকটি জার্নালেও তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির জন্য তিনি পেয়েছেন বেশ কিছু সম্মাননা। ২০১৫ সালে মালদা থেকে সংবেদন কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন ‘বিমলা বর্মন স্মৃতি স্মারক' পুরস্কারে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা প্রেস ক্লাবের তরফে পেয়েছেন রাধামােহন মােহান্ত স্মৃতি স্মারক’ সম্মাননা। মুক্তধারা পত্রিকা থেকে পেয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সেরা গবেষক ২০১৯'সম্মাননা। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল "Transformation of the Rural Society of North Bengal from the Permanent Settlement to the Operation Barga with Special Reference to Malda and West Dinajpur (1793-1978) '-এ পর্যন্ত লেখকের পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে— ‘আর্থ-সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গে দক্ষিণ দিনাজপুর (২০০৬), ‘উত্তরবঙ্গের ইতিহাস (২০০৯), “দিনাজপুরের বিপ্লবী আন্দোলন’ (২০১২), ‘দক্ষিণ দিনাজপুরের পুরাকীর্তি,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস’ (২০১৪), 'উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও পুরাকীর্তি' (২০১৯)। 'দক্ষিণ দিনাজপুরের পুরাকীর্তি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস' গ্রন্থটি ২০১৭ সালে টাঙ্গন লােকমঞ্চ পুরষ্কারে ভূষিত হয়। লেখক দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সােসাইটির সম্পাদক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।