দিনাজপুরে দাঁশাই / দাঁসায় (দুঃখের দিন)

কৌশিক বিশ্বাস on

এখন সম্পদ বলতে যেমন টাকা-পয়সা গাড়ি-বাড়ি বোঝায়, অতীতে সম্পদ বলতে বোঝাতো গরু, ভেড়া, মহিষ ইত্যাদি। আদিবাসীদের “হুদুড়-দুর্গা” নামে এক সৎ, দয়াবান, পরাক্রমশালী মহিষাধিপতি ছিলেন। আদিবাসীদের প্রধান দেবতা “মারাংবুরুর” কাছ থেকে হুদুড় দুর্গা বর পেয়ে অজেয় শক্তির অধিকারি হয়েছিলেন। হিমালয় পর্বত থেকে শুরু করে গাঙ্গেয় সমভূমি পর্যন্ত সুবিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল তাঁর রাজত্ব। বিরাট পরাক্রমশালী হুদুড়-দুর্গার সঙ্গে যুদ্ধে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের দেবকুল অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গার বিভন্ন আর্য গোষ্ঠী বারে বারে পরাজিত হয়েছিল। পরাজিত আর্য গোষ্ঠীপতিরা বা দেবকুল হুদুড়-দুর্গাকে আখ্যাদেয় “অহুর” বলে — যার অর্থ ‘অসীম ক্ষমতার অধিকারী’। পরাজিত আর্যগোষ্ঠীপতিরা একত্রিত হয়ে এক কৌশল অবলম্বন করে। অহুর হুদুড় দুর্গাকে ছলে বলে কূট কৌশলে নিধনের জন্য নৃত্যগীতে পারদর্শী এক  নর্তকী, ছলনাকারিনী, কামিনী আর্যকন্যাকে নিযুক্ত করে। এই আর্য কন্যা পার্বতী  ছলনায় সত্যনিষ্ঠ মারাংবুরুকে মহিত করে তাঁর কাছ থেকে হুদুর দুর্গাকে নিধনের উপায় জেনে নেয় এবং আর্যগোষ্ঠীপতিদের সাহায্য নিয়ে অহুর হুদুড় দুর্গাকে কৌশল পূর্বক হত্যা করে। অহুর হুদুড় দুর্গাকে নিধন করে বিজয় লাভ করার ফলেই পার্বতীকে “দুর্গা” নামে আখ্যায়িত করা হয়।

                      ভারতীয় মূলনিবাসীদের বীর যোদ্ধাকে নিধন করার আনন্দে আর্যসংস্কৃতির উত্তর সূরী ব্রাহ্মন্যবাদীরা সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গোৎসবের নামে আনন্দে মেতে ওঠে। অপর দিকে সপ্তমীর দিন থেকে শোকের প্রতীক হিসাবে দাঁশাই নাচ বা ভুয়াং নাচের মাধ্যমে শুরু হয়ে যায়  আদিবাসীদের শোকের পদযাত্রা। আদিবাসী পুরুষেরা দলে দলে মহিলাদের পোষাক পরে রাস্তায় দাঁশাই নাচ ও গানের মধ্য দিয়ে “হায় হায়” করে তাদের বীর যোদ্ধার স্মৃতিতে শোক প্রকাশ করে। তাই প্রতিটি দাঁশাই গানের শুরুতে এবং শেষে “হায় হায়” শব্দ ব্যবহৃত হয়। দাঁশাই নাচ গানে অংশ নেওয়ার সময় আদিবাসী পুরুষেরা মাথায় ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে নারী বেশ ধারন করেন। কারন পার্বতীর নেতৃত্বে আর্য গোষ্ঠীপতিদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে আদিবাসী পুরুষ যোদ্ধারা নারীর ছদ্মবেশ ধরে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তারই প্রতিচ্ছবি দাঁশাই নাচ গানে আজও দেখতে পাওয়া যায়।

                    “সাঁওতাল ধর্ম” অনুসারে ভিক্ষা করা নিষিদ্ধ। তাই পথে-ঘাটে, ট্রেনে-বাসে আদিবাসীদের ভিক্ষা করতে একেবারেই দেখা যায় না। কিন্তু দাঁশাই নাচ পরিবেশনকারীরা প্রতিটি গ্রামবাসীর নিকট থেকে মুষ্টি ভিক্ষা হিসাবে ঐ দিন গুলিতে ধান-চাল, টাকা-পয়সা, নাড়ু-মুড়ি গ্রহন করে থাকেন। কারন আদিবাসী যোদ্ধারা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে পলায়নের সময় পথের গ্রামগুলির বাসিন্দাদের কাছ থেকে ভিক্ষা করেই নিজেদের প্রান বাঁচিয়েছিলেন এবং আজও দাঁশাই নাচ-গান পরিবেশনকারিরা উক্ত ঘটনার স্মরন করে থাকেন।



কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।