বালুরঘাটে বৌদ্ধ-তন্ত্রের দেবী তারার উপাসনা ও এক মহান অঘোর-বৌদ্ধ সাধক ( সপ্তম কিস্তি )

কৌশিক বিশ্বাস on

প্রথমেই ক্ষমা চাইছি, এই লেখাটি লেখার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত কিঞ্চিৎ দেরী হবার জন্য। তো হ্যাঁ, চলুন ফিরে আসি প্রসঙ্গে। আগের লেখাতে বলেছিলাম, কেন এমন কভারপেজের অবতারণা করা হয়েছিল। আসলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় গোটা ভারতের মধ্যে উত্তর-পূর্বের অঞ্চল একটা বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। শক্তি উপাসনা বা তন্ত্রের পথে শক্তির অবতারণা খুবই আবশ্যিক। গৌড়ে চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলনের ক্ষেত্রেও কিন্তু একইভাবে রাধার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। যুগল মূর্তি কিন্তু শক্তি সাধনারই একটা নিদর্শন। এই “অদ্ভুত রামায়ণ ” ও তাই। ভারতের মাটিতে পৌরাণিক গাথাগুলির সাধন ও স্থানভেদে নানান আকারে পুনরায় রচিত হয়েছে। এই “অদ্ভুত রামায়ণ ” ও তাই। সীতাই যে সমস্ত শক্তির উৎস এবং বস্তুত তিনিই যে মহাকালী ; এই গ্রন্থের এটাই উপজীব্য বিষয়। অঘোর বা নাথ যোগীদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বালুরঘাটে এরকম অনেক গৃহী, মহিলা ভক্ত এর বহু প্রমাণ পেয়েছিলেন। তাঁদের রক্ষার্থে তিনি বারবার ঘটিয়েছেন নানা অলৌকিক ঘটনা। তারমধ্যে একটি ঘটনা বালুরঘাট আশ্রমে বসে এক বয়স্ক মহিলার মুখ থেকে শোনা। বর্তমানে তিনি বছরে অন্তত দুইবার বালুরঘাট আশ্রমে আসেন। যদিওবা অঘোর রীতি অনুসারে কোনকিছু প্রকাশ্যে আনা যায় না; কোন প্রশংসাসূচক প্রশস্তি করা যায় না। তবুও তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়েই নাম অপ্রকাশিত রেখেই বলছি। হাওড়া স্টেশন থেকে নেমে তিনি আর কিছুতেই ভিড়ে চলতে পারছিলেন না। তার সাথে ভারী ব্যাগও ছিল যেটা বইবার জন্য কোন কুলী পাচ্ছিলেন না। মনে মনে তিনি বাবার স্মরণ নিলেন। আকস্মিক কোথা থেকে একটা সুঠাম দেহের কুলী এসে ব্যাগ বয়ে নিয়ে তাঁকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। তার পারিশ্রমিক বের করতে গিয়ে দেখেন যে ভিড়ের মধ্যে চোখের নিমেষ সে উধাও! তাঁর আর বুঝতে ভুল হয়নি যে ব্যাগটা সেদিন কে বহন করেছিল? এইরকম একজন বালুরঘাটের দীক্ষিত মহিলা ; তাঁকে একটি রুদ্রাক্ষ দিয়ে গোটা শরীর বজ্রবাঁধন দিয়েছিলেন। মৃত্যুর সময় কিছুতেই তাঁর প্রাণ বিয়োগ হচ্ছিল না। শেষকালে তাঁর পরিবারের লোকজন বুঝতে পারেন এবং সাথসাথে সেই রুদ্রাক্ষ তাঁর দেহ থেকে খুলে নেন। ব্যস, সাথেসাথে তাঁর প্রাণ বিয়োগ ঘটেছিল। পরে ওই রুদ্রাক্ষ জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পায়ে হেঁটে তিনি ঘুরেছিলেন গোটা ভারততীর্থ। তারমধ্যে এই বালুরঘাট প্রকৃত অর্থেই হয়ে উঠেছিল তাঁর লীলাক্ষেত্র। এই সিদ্ধযোগীর অপার করুণার সাক্ষী থেকে এই বালুরঘাট নীরবে, নিভৃতে।

বাকি কথা নাহয় আগামীতেই বলি।



কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।