বালুরঘাটে বৌদ্ধ-তন্ত্রের দেবী তারার উপাসনা ও এক মহান অঘোর-বৌদ্ধ সাধক (শেষ পর্ব ও একটি তথ্যচিত্র)

কৌশিক বিশ্বাস on

aghor8

সম্পর্ক যে ছিল সেটা একটি বিস্তারিত প্রবব্ধে আমি বছর দুইয়েক আগে লিখেছি । নেতাজীর সাথে দিনাজপুর বা বালুরঘাটের সম্পর্ক। বিগত কয়েক কিস্তিতে যে মহাসাধকের কথা লিখেছি তাঁর সাথেও নেতাজীর দেখা ও বাক্যালাপ হয়েছিল। তিনি ও তারাক্ষ্যাপা; এই দুজনের সাথেই নেতাজীর আলাপ ছিল। পশুপতিনাথ মন্দিরের সাথেসাথে তিনি আরেক জায়গায় যেতেন যার কথা খুব বেশি প্রকাশ্যে আসে না। হিমালয়ের পাদদেশে “দেবী পাটান” নামক এক স্থানে। কিছু বৌদ্ধ রীতির অনুসরণ হত ওই উৎসবে। তাঁর যোগজ্ঞানের সূচনাও হয়েছিল সাম্য বৌদ্ধবিহারে যেটা স্থাপন করেছিলেন স্ময়ম্ভূনাথ বা পদ্মসম্ভব। এই পদ্মসম্ভবই তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের গোড়াপত্তন করেছিলেন। নাথ যোগীদের সাধনা আদিকাল থেকে গুহ্যজ্ঞান হিসেবে থেকেছে সাধারণ মানুষের লোকচক্ষুর অন্তরালে। প্রচারের বিপরীতে হেঁটে নীরবে, নিভৃতে, গুরুমুখী সিদ্ধজ্ঞান আহরণ করাই অঘোরদের যোগসাধনার মূল কথা। অঘোর সাধনার তাত্ত্বিক দিক নিয়ে আমি লিখতে বা আলোচনা করতে চাইনি। সচেতন পাঠক নিশ্চয় তা আমার থেকে ভাল জানেন। গুহ্যজ্ঞান বাইরে এনে মূলনীতির বিরোধিতা করা বা এ নিয়ে অন্য কোন সাধকের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা কোনদিক থেকেই যুক্তিগ্রাহ্য না বলে আমার মনে হয়। কারণ পুথিঁগত জ্ঞান বা অন্যের মুখ থেকে শোনা নয়; সাধনক্ষেত্রে নিজের উপলব্ধ অভিজ্ঞতাই একমাত্র উত্তরণের পথ যা এই মহাপুরুষ নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। তাহলে এর বাইরে কি থাকে? থাকে। অনুরাগ। ভক্তিমার্গের মূল স্তম্ভ রচিত হয় এর উপর। একজন সাধারণ অনুরাগী হয়ে বালুরঘাট মন্দিরে যাওয়া থেকেই আগ্রহী হয়ে পড়েছিলাম তাঁকে একটু জানবার জন্য। একটু একটু করে দিন গেছে আর একটু একটু করে হেলেছি তাঁর দিকে। জেনেছি তাঁর অন্যতম সাধনক্ষেত্র বালুরঘাট আর এখানকার অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগীদের সম্পর্কে। তাঁর বিভিন্ন অলৌকিক ক্রিয়াকলাপের গল্প নতুন করে ভাবিয়েছি অনেককিছু। জেনেছি এই আত্রেয়ী তীরে বালুরঘাটেই সমাধিস্থ হবার বাসনা নিয়েও। কিভাবে তিনি নিজেই সেই জায়গা কিনেছিলেন যেখানে বালুরঘাটের বর্তমান মন্দিরটি আছে। ঠিকই ধরেছেন, একজন নিতান্ত সাধারণ অনুরাগী হয়ে এই মহাজীবনকে বিগত কয়েকটি কিস্তিতে শুধু ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। তাঁকে নিয়ে বলবার ধৃষ্টতা আমার নেই আর সেই সাহসও আমি দেখাতে চাই না। মন্দিরের সিঁড়ির একেবারে নীচের ধাপে হাত ছুঁয়েছি মাত্র এই কয়েক কিস্তিতে। ভালোবাসা ও অনুরাগে কয়েক কলম লিখেছি। নদীমাতৃক দেশে নদীকেন্দ্রিক ধর্মজীবন ও তাঁকে কেন্দ্র করে এক মহাজীবনের সামান্যকিছু আমার অভিজ্ঞতা শুধু ভাগ করতে চেয়েছি মাত্র। শুধু একটি ঘটনার কথা বলে শেষ করতে চাই। শেষ যেবার মন্দিরে গিয়েছিলাম সেখানে বাবার এক দীক্ষিত শিষ্যর সাথে কথা হচ্ছিল। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন, জানেন- এই যে আমরা খাবার পাতে একটু ভাত নষ্ট করি ; বাবা বলতেন -এটা অনেক ছোট ছোট পিপড়া, কীট বা কোন প্রাণীর খাদ্য হয়ে যায়। তাঁরা এর উপর বেঁচে থাকে। বাবা বলতেন- জগতের সকল প্রাণীর কল্যাণের কথা। আমার কানে যেন মহাযান বৌদ্ধধর্মের মূলকথা ধ্বনিত হতে থাকলো। “জগতের সকল প্রাণীর মুক্তি”। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সন্ধ্যাবেলায় জ্বলন্ত প্রদীপের আলো আর ধূপকাঠির ধোঁয়া ভেসে ভেসে চলছে আত্রেয়ীর ঘাটের দিকে। ক্রমেই তা কালের সারণী বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে মিলিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে! মন্দিরে শুধু একা একজন বসে আছেন।আপাত নির্লিপ্ত, নিশ্চল কিন্তু ত্রিকালসিদ্ধ ডাঃ রামনাথ অঘোরী!


এই মহান সাধকের একটি তথ্যচিত্র রইল আপনাদের জন্য…

সৌজন্যে – সূরজ সুবেদী ক্ষত্রী


কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।