হাজার বছর আগে বৌদ্ধবিহারে যেভাবে হাত ধোয়া হতো

কৌশিক বিশ্বাস on

পৃথিবীর বয়েসের তুলনায় আমাদের জীবন খুবই কম সময়ের তাই এত ক্ষুদ্র সময় নিয়ে আধুনিকতার পরিব্যাপ্তিকে খোঁজা খানিকটা বোকামি। কেন বলছি একথা? বৈদিক যুগের পরবর্তী সময় থেকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে তাতে বৌদ্ধধর্মই যে মূল ভূমিকা পালন করেছে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বুদ্ধ থাকাকালীন এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধবিহারগুলির উপস্থিতি এই কাজকে আরো দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আধুনিকতা পেয়েছে এক নতুন পরিভাষা। বিহারে একজন ভিক্ষুকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও অনুশাসন মেনে চলতে হতো। সাধারন জীবনে যে নিয়ম ও অনুশাসন মেনে আমরা চলি বিহারে অবস্থানকারী ভিক্ষুরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বিহারে নানারকম রীতিনীতির ক্ষেত্রে মূল যে বিষয়ের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো তা ছিল পরিচ্ছন্নতা। মূলমন্ত্র যেন ছিল – “পরিচ্ছন্নতাই পবিত্রতা “। এই পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে হস্তধৌতকরণ ছিল প্রথম শিক্ষণীয় বিষয়। এক্ষেত্রে বিহার থেকে যে নিয়মাবলী আরোপিত ছিল ভিক্ষুগণকে তা কঠোরভাবে মেনে চলতে হতো। এই বিধির অনিয়ম করলে দোষী হিসেবে গন্য করা হতো। বৌদ্ধমন্দির বা উপাসনা গৃহ থেকে কিছু দূরে কুয়োর পাশে জল সহজলভ্য এমন পৃথক জায়গায় হাত ধোয়ার জায়গা নির্দিষ্ট ছিল। যে ভিক্ষু হাত ধোবে তাঁকে জল প্রদান করতো অপর কোন ভিক্ষু। এজন্য মাটির পাত্র তাকে কোন সতেজ এবং সবুজ গাছের পাতা দিয়ে ধরে শঙ্খপাত্রে জল ঢেলে রাখতে হতো। এরপর যিনি হাত ধোবেন তাকে তিনধরনের নির্দেশিত বস্তুর সাহায্য এই কার্য সম্পাদন করতে হতো। এই কাজে ব্যবহৃত তিন বস্তু – ১) বাদাম জাতীয় ফলের খোসা ২) শুকনো মাটি যা আধুনিক সাবানের আকারে রাখা থাকতো ৩) গোবর। প্রথম থেকে এই তিনটি উপাদান সহযোগে হাত ধুতে হতো। প্রথমে বাদাম জাতীয় খোসার দ্বারা ভাল করা হাত ঘসে হাতের নোংরা পরিস্কার করতে হতো। পরিস্কার করা হয়ে গেলে তারপর শুকনো মাটির সাবানের লেপ দিয়ে ভাল করে দুহাত ঘষে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হতো। গোবর ব্যবহার ছিল ঐচ্ছিক। বলাবাহুল্য এই হস্তধৌতকরণে যে ভিক্ষু সাহায্য করছেন তাঁর হাতে বা গায়ে যেন হাত ধোয়াকালীন কোন নোংরা জল বা এজাতীয় কিছু না লাগে। এই বিধি পালনের মাধ্যমে প্রত্যেক ভিক্ষুকে বিহারের ভিতর প্রাথমিক পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি পালন করতে হতো যা এতকাল পরে অর্থাৎ হাজার বছর পরে আধুনিক বিশ্বে যে শুধু প্রাসঙ্গিকই হয়েছে তাইই নয় মারণরোগ মোকাবিলায় হয়েছে একমাত্র বাঁচার উপায়!!

তথ্যসূত্র : ইৎ-সিং এর ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত, পঞ্চম অধ্যায়।



কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

1 Comment

Buddha Priya Bhikshu (Mahathero) · মার্চ 29, 2020 at 10:34 অপরাহ্ন

This is very knowledgeable and helpful for us and for the modern young community. Congratulations,????????

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।