কৃষ্টি

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায় on

krishti

ন্যাংটা কারিগর! তুমি ছেনি কিংবা আকাশ-শলাকা
দুরুদুরু চিদানন্দে ঠুকে ঠুকে যা-তা ভগবান
বানিয়ে বিশ্বস্ত হলে। আমাদের মুড়ো-নাড়ি-ক্বাথ
ধর্ম ধর্ম করে আজ; ঘণ্টা বাজে মহা সমারোহে।
ন্যাংটা কারিগর! তুমি হাড়ে হাড়ে আবার পুতুল
বানিয়ে জাদুর কালো ছুঁচ তুলে মজ্জার গোপনে
গেঁথে দিলে চুপিচুপি। ওহো! কী বিপুল ব্যথা জাগে।
ভয়ার্ত ভক্তির এই প্রাদুর্ভাব বহুদূর যাবে।
যাবে সর্বনাশ থেকে অন্য সর্বনাশে; যাবে ভয়
থেকে পুলকিত যুদ্ধে। রাখে হরি, মারে অহংকার।
বাকি যা এখনও বেঁচে, বুদ্ধি, জরা, পুষ্প, নির্বাসন—
ন্যাংটা কারিগর, তুমি ছেনি কিংবা আকাশ-শলাকা
ঠুকে ঠুকে সে-সমস্ত ভেঙে দেবে, ভেঙে দিও ক্রমে।
নচেৎ যে আবর্তনে প্রত্যাবর্তনের শস্য, রেতঃ
লুক্কায়িত থাকে, সে-ও শতঝর্নাজল হবে। জল
ছেনি, হাত, হাত, ছেনি ধ্বংস করে দেবে। তুমি প্রিয়
ন্যাংটা কারিগর, শেষে ঠুঁটো ঈশ্বরের প্রতিরূপ।
এ বাবা! তুমিও প্রভু? অতএব পরিত্রাণও ভ্রম?
এবার কোথায় যাব? নাটুকে পোশাক গায়ে তুলে
বৃন্দগানে গলা পাতি; গলা ফেটে রক্ত, ইতিহাস
সমস্ত প্রকাশ্যে এল। এল সংজ্ঞা, বোধ পিছুপিছু।
‘ভক্তি’-র ‘ভ’-টুকু নেই। পাথুরে প্রেমের চিহ্নগুলি
সন্তাপে কামের বর্ণ ধরে আছে থোকা থোকা হয়ে।
থোকা থোকা প্রভুপাদ, মুহুর্মুহু প্রণাম সেহেতু।
কারিগর! নগ্নতায় যত বেশি মানুষ রয়েছ,
তত তো ক্বচিৎ কেউ থাকে জনান্তিকে। থাকে রোজ
অবিবাহে পরিতৃপ্ত। একাকী জীবিত থাকা জয়।
যে-যার একাকী মুখ তুলে নিয়ে ঘরে-ঘরে ফিরি,
ফিরে আসা বৃত্ত নয়? বৃত্ত কোন হমুন্দি’র পুত?
পরিধি পেরিয়ে যাব, এমন সাহস থেকে পাপ-
পুণ্য মাথা তোলে… কোনও চিকিৎসায় সুরাহা জোটে না।
জোটে না সে-উপশম, যার আয়ু আমাদের দেহ
খেয়ে বেঁচে থাকে। খায় জন্ম-সম্ভাবনা মৃত্যুপথে।
কীভাবে পেরোব এই নিজের মহিমা, মোহ, তাপ?
প্রেমিকা পেরোতে গেলে মাংস টেনে ধরে মাংস, মেদ;
কৌমার্য পেরোতে গেলে শৈশব ঐশিক ভ্রম হয়।
জন্মের বাগানে প্রৌঢ় চোখ নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখি—
পিতৃ-অবয়ব নিয়ে যে-শত্রু গৃহের সত্য দেয়,
তাকেই সন্তান মেনে স্তন গজানোর খেলা শুরু…
অথচ নিস্তনী যারা, অপাঙ্‌ক্তেয় খেলার প্রথমে,
কৃচ্ছ্রসাধনায় অন্তে তাদেরই প্রতিষ্ঠা ধ্রুব হয়।
বাকিরা খাদ্যের উৎস, অন্যের সহায়ে অন্নময়।
শুধুমাত্র অন্নময় হওয়া বা না-হওয়া থেকে কিছু
সঞ্চিত হবে না সিদ্ধি। ন্যাংটা কারিগর! সিদ্ধি বোঝ?
বোঝ ধ্যান মায়া মাত্র? ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যতিরেকে
যা-কিছু এখানে ঘটে, তার গূঢ় রহস্য এখনও
উদ্ধার করার চেষ্টা সময়ের বিপরীতে হাঁটে।
রহস্য রহস্য থাক, যত বেশি শব-ব্যবচ্ছেদ
ততই বিস্ময় মৃত। ততোধিক মৃত জ্যান্ত থাকা।
আর কি কথার বিদ্যা প্রয়োজন আমাদের? ধ্বনি
ধ্বনির নির্মোক থেকে আলাদা হবে না কোনোদিন।
বরং স্তব্ধতা শ্রেয়। কথা অতিক্রম শ্রেয়তর।
কোথায় পৌঁছাব এই জ্ঞান নিয়ে? গন্তব্য বিরল।
বিরল নক্ষত্র-দ্যুতি, অন্ধকারে স্বীয় ব্যর্থতার
চেতনা চৈতন্য খুঁজি। পূতিগন্ধে মাথা কেঁপে ওঠে।
চিন্তাকরোটির স্তূপ, শীর্ষে কাঁপে যৌন-আলোড়ন।
ফের ভগাঙ্কুর মুখে তুলে নিয়ে জান্তব লেহনে
কোটি প্রতিজ্ঞার ছিদ্র ভিজে গেল প্রলয়ে, প্রণয়ে।
উত্থিত অস্ত্রের সত্তা কুম্ভের ভিতরে প্রাণ নাড়ে।
মুহূর্ত ব্রহ্মের মতো মনে হতে থাকে (ওগো, রূপ!
স্খলনে বিলম্ব দাও…) প্রতিজ্ঞা রভসে স্ফীত ফুল।
ফুল কবে ফেটে গেছে। যেটুকু যা রক্ত নেমে আসে,
সেটুকুই অভিজ্ঞান, সেটুকুই বিনাশবাহক।
অতঃপর? অস্ত্র ম্লান? রমণও বমন ছিল শুধু?
ন্যাংটা কারিগর! ফের নৈরাশ্যে জগৎ দেখে ফেলি।
আমার ভয়ের কোলে অন্য কার ভয় শুয়ে আছে?
ধর্মে নিয়ে গেছ। দেখি আমারই প্রাণের গায়ে বাণ
গেঁথে আছে; সমবেত। অস্তিত্ব প্রণামে লোভ রাখে।
কোথায় পালাব? পথ ঘুরেফিরে সীমাবদ্ধ পথে।
নতুন যা বলি কিংবা নতুন যা বলি না কখনও,
তাও তো নতুন নয়! প্রতিস্থাপনের বাষ্পে ঘেরা।
সুতরাং অর্থে অর্থ, অনর্থে অনর্থ রেখে রেখে
নিজেকে পৃথক করা— একে মূর্খ কবিতা ভেবেছে।
কোথা কারিগর? কোথা ছেনি কিংবা আকাশ-শলাকা?
মৈথুনে পায়ুর স্থিতি আভাঁ গার্দ। বিপ্রতীপ গতি
চর্চায় ভরিয়ে দাও। সম্ভাবনা সমূলে কোপাও।
এমন সঙ্গমক্রিয়া আলো-আলো। পঞ্চভূতে লীন।
যে-তুমি আলোর পথে মূর্তিমান আড়াল হয়েছ,
সে-তোমার গর্ভদেশে ডায়োজেনেসের পুনরায়
ফিরে আসা বিধিবদ্ধ। একে তুমি খণ্ডাতে পার না।
কপিশ লন্ঠন হাতে উপদ্রুত সন্ধান জাগিয়ে
বিধুর প্রেতের মতো তার এই ফিরে ফিরে আসা।
সঠিক মনুষ্য পেলে প্রত্যাবর্তনের শাপ থেকে
সে-ও বেঁচে যেত, কিন্তু পাশবিক গ্রহবর্ণ নীল।
শাপ অন্তহীন তাই, টোটেম ঈশ্বর মেনে রোজ
জনপিণ্ড ঘোরে ফেরে। বলি দেয় আকাশ, পাতাল।
ন্যাংটা কারিগর! তুমি ছেনি কিংবা আকাশ-শলাকা
সযত্নে আঙুলে নাও। দ্যাখো, তাতে ভাঙনক্ষমতা
এখনও জীবিত কি না। যদি থাকে, ঠুকে ঠুকে গাঢ়
ছয়-ছয়-ছয় লেখ পরন্তপ প্রভু’র শিরায়।
আদপে শয়তান সে-ই, দ্যাখা-না-দ্যাখার ছলাকলা
বীভৎস আয়ত্তে ব’লে পৃথক আগুনে ধরা দেয়।
যা কিছু সৃষ্টির চিন্তা, তারই মধ্যে ধ্বংস আদি বীজ।
এ-ও তো দুর্জ্ঞেয় নয়, যে-কেউ সহজে বুঝে যায়।
শুধু যা বোধের ঊর্ধ্বে, কাব্য ভেবে সেসব সমীহে
দূরত্বে সাজিয়ে রাখ। ভাব এ-ই মঙ্গলসাধন?
এত নিয়ন্ত্রণ, তবু ন্যাংটা কারিগর দৈবমতে
দেওয়ালে ছিদ্রের আয়ু এঁকে দিয়ে সাপ ডেকে আনে।
ছোবল অমৃত গাঁথে। পত্নী ভাসে কলার মান্দাসে।
তবে কি প্রবাহ ঋত? বাকি ঘটনার মায়া নেই?
আদির কোথায় আদি? অন্তের কোথায় অন্ত? কেউ
জানুক বা না-জানুক, কাল ঠিক কাল খেয়ে নেবে।
আকাশ-শলাকা ক্রমে বিশালতা কুক্ষিগত ক’রে
ছেনির আকার নিয়ে কৈবল্য-শিলায় শান মাখে!
প্রকৃত ভাঙন হলে মানুষ প্রথমে ভেঙে যাবে।
গাছ রয়ে যাবে শুধু, হেঁটমুণ্ড, জগৎ যেমন।
ছয়-ছয়-ছয় ছোটে স্নায়ু বেয়ে প্রভুর ভিতরে।
এ-ও তো সঙ্গম। এ-ই ঈশ্বরের অন্ত্যেষ্টি-নিনাদ…
এবার নতুন ক’রে নতুন বিজল্প শুরু হবে?
যা কিছু নিষিদ্ধ ছিল, সব হবে ঐশী সমাচার?
যা হবে তা দ্যাখা যাবে—স্থিতি, চিন্তা, মড়া, জন্মদ্বার।
জন্মদ্বার থেকে একা ফিরে যাওয়া পূর্ব জন্মদ্বারে
অলীক সৌভাগ্য। কারও নিয়তি তেমন সুস্থ নয়।
যে-যার শিকার হয়ে স্বমাংসে খিদের শান্তি পাবে।
সামান্যই টের পাবে সাদা কোনও অলক্ষুণে রাতে
ন্যাংটা কারিগর ফের ছেনি কিংবা পাতাল-শলাকা
কুম্ভীপাকে ঠুকে ঠুকে গড়ে দেবে যা-তা ভগবান।
শৈলীই প্রতিভা হয়ে স্বধর্মে ডুবিয়ে দেবে স্মৃতি।

উপলব্ধ হবে কোটি অরুন্তুদ এষণার শেষে—
জগৎ প্রমার মণ্ড; দুরূহ, বিশ্বাসযোগ্য ভুল।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

জন্ম– ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৮, হুগলি জেলার আরামবাগে। বর্তমানে তারকেশ্বরের বাসিন্দা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিতব্য কবিতার বই: 'ভূমা'।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।