রাবাংলা – রালং – বোরং

তুষার কান্তি দত্ত on

পথে এবার নামো সাথী….. 

বাঁশ ইদানিং আমাদের নিত্যসঙ্গী। ট্রামেবাসে, অফিসে আদালতে , স্কুলে, রাস্তায়, মাঠে ময়দানে বাঁশ দেওয়াতে  সিদ্ধহস্ত বাঙ্গালী। তাই কটা দিন বরং বাঁশহীন জীবনের আশায় এত ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে দক্ষিন সিকিমের উত্তর দিশায় বোরং। শিলিগুড়ি থেকে সিংতাম – রাবাংলা পেরিয়েই বোরং- পালক গ্রাম। কিন্তু এখানে এসেও সেই বাঁশ। আজ রাতের মেনু টুসা। আমাদের আস্তানা “হিমালয়ান ভিউ হোমস্ট্যের” মালকিন আজ আমাদের জন্য রেধেঁছেন বাঁশের তরকারি। কঁচি বাঁশের আগাকে স্থানীয়রা ভুটিয়া ভাষায় বলে টুসা। টুসার তরকারির সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে থাকছে সিশনে শাক। ইতিপূর্বে মাইরুং এ যখন গিয়েছিলাম, তখন অজয়’ও চিনিয়েছিল সিশনে আর ঠোটনে শাক। বড়জোর ১০/১২ ঘর লোকের বাস। খুব ছোট্ট একটা পাহাড়ি জনপদ। একটাও পর্যটক চোখে পড়ল না কোত্থাও। এবারে আমাদের দলনেতা বিশ্বজিৎ। নামেই দলনেতা। হোটেল, হোমস্ট্যে, রিসোর্ট কিছুই বুক করে নি। শেয়ার জিপের ড্রাইভার হোটেলের কথা জিজ্ঞাসা করায় আমরা এ ওর দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে পালক বাস স্টপের ১কিমি আগেই নেমে পড়েছিলাম। বউ বাচ্চা তো সাথে নেই। চিন্তা কি? এবারে হাটতে হাটতেই হোটেল খুঁজে নেওয়া। আর সত্যি বলতে কি, এটাই আমাদের স্টাইল!  

গাড়ি চলে না, চলে না….. 


মেল্লি হয়ে সিংতামে যখন পৌঁছলাম তখন অলরেডি ১২টা বেজে গেছে। টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই।  অবশেষে ছাড়া পেলাম। গাড়ি নম্বর SK04 J0197। থার্ড-রো এর চারটে সিট আমাদের। ভালো ভাষায় বললে, আমরা সবার পেছনে। এবারে ৫১কিমি পাহাড়ি রাস্তায় লাম্বারের সাথে যুদ্ধ। বন্ধু বিশ্বজিতের লাম্বার পেইন। ওকে নিয়ে পাহাড়ি পথে যত ঝক্কি। প্রতিমার কাঠামো নিয়ে প্রসেশন করার মত হাল আমাদের। ডিক্স এতটুকু এলো মেল হলেই লে হালুয়া। এতশত বিপদের মধ্যেও একটা তৃপ্তির অনুভূতি মধ্যপ্রদেশে। আসার পথে কিরণেতে জম্পেশ ভুঁড়িভোজ হয়েছে। অর্গানিক ও ইনঅর্গানিক সহ। সাথে পোস্ত দিয়ে ডিমের ঝোল। ঝালে ঝোলে অম্বলে বেশ একটা পূর্ণতার স্বাদ। ফুরফুরে মেজাজে নেপালী গান শুনতে শুনতে কিছুটা আসতেই ফসসসস…. । টায়ার পাংচার। বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ের গায়ে তখন সবুজের সমারোহ। একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। অদ্ভুত এক ঠান্ডা শিরশিরানির অনুভূতি। বালুরঘাট ছেড়েছিলাম ৪০ ডিগ্রি পারদ স্তম্ভ দেখে। এখানে অনেকটাই স্বস্তি। আস্তে আস্তে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটাকে সাইড করে ড্রাইভার। রাস্তা থেকে অনেক নীচে ওষুধ তৈরির কারখানা। বাঁ দিকের সামনের চাকার নীচে একটা বড় পাথর রেখে জ্যাক ঢুকিয়ে গাড়িটা আস্তে আস্তে তুলে ধরে  ড্রাইভার। হাত লাগায় বিশ্বজিৎ  আর ধীরাজ। প্রবীর তখন সিগারেটের টানে আনমনা। মোবাইলে ছবি তুলছে সবুজের। অনেকে চেষ্টা করেও দুটো নাট কিছুতেই খোলে না। অবশেষে কাপড় দিয়ে থ্রেটটা পেঁচিয়ে লগ নাট টা আনস্ক্রিউ করা গেল। কথাতে বলে না, স্ক্রু ঢিলা! মানে তালকানা। তাইবলে এতটা টাইটও ভালো বিষয় নয়। খুব টাইট থাকলে আবার প্যাঁচ খোলা অসম্ভব। সমস্ত বিষয়টাই থ্রেড নির্ভর। প্যাঁচে প্যাঁচে …. পেঁচানো এ পাহাড়ি রাস্তায় ফেরার পথে বুঝেছিলাম,  আমাদেরও প্যাঁচ কোথাও কেটে গেছে। বয়সের সাথে সাথে একদিন মনও পুরাতন হয়। TLS  রোগ হয়। তখন মন-গাড়ি পথ এগোয় মাত্র। গন্তব্য আর থাকে না। কিম্বা প্রকান্ড রাস্তার একপাশে গাড়ি পরেই থাকে , চাকা আর ঘোরে না।

আজ দুজনার দুটি পথ ওগো…..


গল্পে গল্পে চোরবাটো ধরে নেমে এসেছি অনেকটা। তা প্রায় ৬/৭কিমি। ছায়াচ্ছন্ন পাহাড়ি রাস্তার মোড় ঘুরতেই কড়া রোদ। জলের শুন্য বোতলে পিপাসার্ত চোখ। বাঁশ গাছের মর্মর শব্দ আর নাম না জানা কি একটা পাখির শিস বাতাসের গায়ে ভেসে ভেসে উড়ে গেল বরবটি আর মকাইয়ের খেত ধরে। দুপুরের ক্লান্তি বারবার জড়িয়ে ধরে পা দুটিকে। মনে হয় একগ্লাস ঠান্ডা জল। আর একটু ছায়া। পথ চলতি একটা দোকান। মালকিন পাসাং ছুকি। এ কথা সে কথা / দে বুড়ি আলাপাতা.…..। একে একে জল। জল থেকে চা। চা থেকে মুড়ি চানাচুর। এমন কি ১২০০ টাকার বিনিময় একটা গাড়ির ব্যবস্থাও করে দিল দিদি।আমরা সূচ হয়ে ঢুকি ফাল হয়ে বের হই। আমরা গর্বিত। আমরা বাঙ্গালী….


টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট – রালঙ মনস্ট্রি হয়ে গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল বোরং হিমালয়ান ভিউ হোমস্ট্যে তে। ভুটিয়া ড্রাইভার, কর্মা আমাদের দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিলেন রালঙ নিউ মনস্ট্রির ক্যাফেটেরিয়া তে। সাহায্য, বিশ্বাস, ভালোবাসা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, দয়া, করুণার উপর প্রতিষ্ঠীত দক্ষিণ সিকিমের এই অঞ্চলের ভুটিয়া জনগোষ্ঠি বুদ্ধধর্মের আশ্রিত

উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে….

২০১৩সালে বুদ্ধদেবের ২৫৫০তম জন্মতিথিতে ১৪তম দলাই লামা রাবাংলার বুদ্ধমূর্তিটি উদ্ঘাটন করেন। চৌ-জো লেকের পাশেই এই বুদ্ধপার্ক। রাজ্য সরকার ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের যৌথ প্রচেষ্ঠায় ৭বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা হয় এই স্থাপত্য। ধর্মের সাথে সাথে সিকিমের পর্যটন মানচিত্র বৌদ্ধপার্কটি জায়গা করে নিয়েছে স্বমহিমায়। ১২৮ফুট উঁচু তথাগতের মূর্তিটি বর্তমানে ভারতের চতুর্থ উচ্চতম মূর্তি।

 ১ম প্যাটেল           Guj  ৫৭৯ফিট

২য় হনুমান           AP   ১৩৫ফিট

৩য় থিরুভাল্লুভার TN   ১৩৩ফিট

৪র্থ বুদ্ধ                SK   ১২৮ ফিট

দক্ষিণ সিকিমের ছিমছাম পরিছন্ন একটা শহর রাবাংলা। অনেকে আদর করে রাবাং বলেও ডাকে। লা শব্দের অর্থ গিরিপথ। মাথাপিছু ৫০₹ টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম মস্ত ফটক দিয়ে। সারসার ধর্ম চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে অধঃপতন…. হঠাৎ করেই কোথা থেকে এক খন্ড মেঘ এসে ঢেকে দিল তথাগতকে। ৩১/১০/২০১৮ তারিখের আগে এটি ছিল ভারতের তৃতীয় উচ্চতম মূর্তি। কালের প্রবাহে তথাগতের উচ্চতা গত ক্রমিক সংখ্যা হয়ত আরও পেছনে চলে যাবে। নতুন নতুন রাজা ও তাদের জয়-গাঁথা আরও অভ্রভেদী হবে। হোক না ক্ষতি কি! এখানেই তো বুদ্ধের শ্বাশত দর্শন। কোন কিছুই চিরন্তন নয়। ক্ষমতা – আস্ফালন- দম্ভ কিংবা গর্ব।




তুষার কান্তি দত্ত

জন্ম - ১৯৭৩। শিক্ষাগত যোগ্যতা - এম এ, বি এড। পেশা - শিক্ষকতা । বাড়ি - বালুরঘাট, দক্ষিণ দিনাজপুর। ভালো লাগে পাহাড় জঙ্গলে নিজের মত ঘুরে বেড়াতে কখন বন্ধুদের সাথে, কখনো বা একদম একা একা। ট্রেকিং ও অফবিট ট্রাভেলিং-এ সাচ্ছন্দ বধ করেন। সকাল সন্ধ্যে ছাদের বাগানেই কাটে সবুজের সান্নিধ্যে। মন হলেই রঙ তুলি হাতে নিয়ে বিমূর্ত ভাঙ্গা গড়ায় নিবিষ্ট অন্তর্মুখী....

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।