মন্দারমনি

তিস্তা দত্ত on

২৫ তারিখ। একটা ছোট্ট ট্যাক্সি গাড়িতে করে শুরু হল আমাদের যাত্রা। হাওড়া থেকে গাড়ি ধরে ছ-ঘন্টার মধ্যে মন্দারমণিতে এসে পৌঁছেছি। হোটেলের নাম ড্রিমল্যান্ড। সমুদ্রের গায়ের সাথে একেবারে লাগানো। সামনেই বাগান। চারপাশ সবুজ ঘাসে ঢাকা। চারদিক দিয়ে সারি সারি নারকেল গাছ। সুন্দর বাগানটাতে পাতা রয়েছে গুটিকতক চেয়ার আর কটা দোলনা। দোলনা গুলোতে বসে দোল খেলেই কানে আসে সমুদ্রের গর্জন। চখে পড়ে উত্তাল ঢেউ……

এখানে এসে হোটেলের ঘরে বসে থাকা গেল না বেশিক্ষন। গায়ে গামছা জড়িয়ে আমি আর বাবা চললাম সমুদ্র স্নানে। চারদিকে সমুদ্রের বিশাল প্রসার। যতদুর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। এই দীগন্ত বিস্তৃত নীলের যেন কোন শেষ নেই……

মন্দারমনি পৌঁছাতে আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই ঘোরা হল না বেশি। স্নান করে খাওয়া দাওয়ার পর আবার আসলাম সমুদ্র-তীরে। সকালে সূর্যের আলোতে সমুদ্রকে রূপোর মত চকচকে লাগছিল। এখন রাত্রিবেলা। সমুদ্রকে দেখাচ্ছে সম্পুর্ন আলাদা। অন্ধকার আকাশে যেন ছড়িয়ে পড়েছে চাদের মাধূর্য্য। সমুদ্রের কাল জলে দেখা যাচ্ছে সবুজ রঙ। এই রঙের কারণ পরে অবশ্য জানা গেছিল হোটেল ম্যানেজারারের কাছ থেকে। পাশের হোটেল থেকে লেজার লাইট ফেলার জন্য দেখা যায় ওই আলো।

রাত্রে সমুদ্রের ধারে বসেই হল খাওয়া দাওয়া। ঠান্ডার মধ্যে অন্ধকারে বসে। প্রতি মহূর্তেই ঠান্ডা হাওয়া এসে কনকনিয়ে জানান দিয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীর। জোয়ারে ফুলে ফেঁপে উঠেছে সমুদ্রের জল। একের পর এক উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে উপকুলে। ২৬ তারিখ সকালে ঘুম থেকে উঠেই পিঠে গীটারটা নিয়ে আমি আর বাবা চললাম সমুদ্রের ধারে। গীটারের সুরের সাথে ভেসে আসতে লাগল সমুদ্রের গর্জন। আর বাবার গলায় গান……

বেলা ১০টা। শুরু হল হাঁটা। বারো ঘন্টা পরে এখন আবার জোয়ার। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ঠেকছে জল। সমুদ্রের বুকের মধ্যে দিয়ে জল ছিটিয়ে ছুটে চলেছে কতগুলি জেট-স্কি আর স্পিড বোট। আমরাও চড়ে বসলাম একটা স্পিড বোটে। চারিদিকে শুধু জল আর জল। অথৈ জলরাশির বুকে ভেসে থাকতে ভয় লাগে। আমি যে সাঁতার জানি না। ড্রিমল্যান্ড হোটেল থেকে ২ কিলোমিটার পর মোহনা। বেগুনী, গোলাপী ও সাদা রঙের ঝিনুক ছড়িয়ে আছে সমস্ত সৈকত জুড়ে। পথে যেতে যেতে তখন একটাই কাজ। ঝিনুক কুড়োনো…….

মহনার খুব কাছেই হল শঙ্করপুর। শঙ্করপুর এখানকার প্রধাণ মৎস সংগ্রহ কেন্দ্র। মোহনায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই নাকে এল বিচ্ছিরি আঁশটে গন্ধটা। একটু এগিয়েই বুঝতে পারলাম যে এ গন্ধটা আসলে শুটকি মাছের। সার বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সুটকি মাছ। এখানকার স্থানীয় মহিলাদের এই মাছেদের সাথেই ওঠাপড়া। তাই এরকম গন্ধে ওদের কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

মোহনা থেকে বাড়ি ফিরে অনেক্ষন বসে ছিলাম সমুদ্রতীরে। সন্ধ্যার এই সময়টাতে অপরুপ সৌন্দর্য। সূর্যটা টকটকে লাল। সেই লাল রঙের প্রতিফলন পড়েছে সমুদ্রের জলের উপর। ধীরে ধীরে রঙ… আলো… আবছা হয়ে আসছে। প্রকান্ড লাল সূর্যটা মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের বুকে ।

আজ ২৭ তারিখ। আজই ফিরে যাব কলকাতায়। সমুদ্রকে ছেড়ে যাওয়ার শেষ মুহুর্তে কানে এল আছড়ে পড়া এক ঢেউয়ের শব্দ। সেই ঢেউয়ে একই সাথে ছিল বিচ্ছেদের সুর, আর ফিরে আসার আমন্ত্রণ।



তিস্তা দত্ত

নাম - তিস্তা দত্ত। জন্ম - ২৫/০৫/২০০৪। বাসস্থান - খাদিমপুর, বালুরঘাট, দ: দিনাজপুর। শিক্ষা- দশম শ্রেণীতে পাঠরত। শখ- গীটার বাজানো।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।