বেনারস ডায়েরি

ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য্য on

১। ব্যাগ গোছানোর বাহানা

“Benaras is older than history, older then tradition, older even than legend and looks twice as old as of them put together.”

– Mark Twain

মনে পড়ছে ফেলু মিত্তির কে? বেনারসের ঘাটে চোয়াল শক্ত করে বলছেন- হয় আমি এর বদলা নেব, নইলে গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবো।ঠাকুর চলে যাওয়ার পর মা সারদাও তো এসেছিলেন তীর্থ করতে। পথের পাঁচালীতে হরিহরের মৃত্যু, তার সাক্ষীও এই কাশী।চোখেরবালির বিনোদিনী – তাঁর সাথেও বারানসী আছে। কোনটার টানে আবার যাচ্ছি- এখনও হিসেব করা হয়নি। মহাভারত থেকে জাতক, তুলসিদাস থেকে সন্ত কবীর, শঙ্করাচার্য বা ইন্দোরের অহল্যাবাই এই শহরে কে আপন কে পরদেশী তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই।বলিউডের অভিনেত্রী রিচা চাড্ডার একটা দারুন কথা মনে পড়ছে এই বেনারস নিয়ে-

“ It is strange city where you can feel like a dweller and alien at the same time. It is ancient, modern, progressive and sometimes regressive, all at once.”

তাই এভাবে ঢুকে পরা এক গিঞ্জি গলির বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা গোটা একটা ভারতবর্ষ দর্শনে।মহাদেবের ত্রিশুলের ডগায় নাকি এই বেনারসের অবস্থান, তাই জর্দা, রাবড়ি, শাড়ি, জ্ঞানবাপীর দেওয়ালচিত্রের সাথে একটু আধটু পুণ্য সঞ্চয় হলেও হতে পারে।আনন্দবাজার পত্রিকার (বারাণসীতে ডুব দিয়ে খুঁজে পাওয়া গেল সেই প্রাচীন বারাণসীকেই! লেখক : গৌতম চক্রবর্তী)একটি প্রতিবেদনে বেনারসের একটা ইচ্ছেপত্রের সন্ধান পেয়েছিলাম।

  • হেরিটেজ শহরের স্বীকৃতি
  • গঙ্গা দূষণ থেকে মুক্তি
  • গঙ্গায় স্বচ্ছ জলের পাশাপাশি ৭২টি ঘাটের যথাযথ সংস্কার
  • বারাণসী শহর ঘিরে প্রস্তাবিত যে রিং রোড বছরের পর বছর শুধুই কাগজকলমে রয়ে গিয়েছে, অবিলম্বে তার কাজ শুরু
  • গোধূলিয়া মোড়, বেনিয়াবাগ, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার হাঁসফাঁস-করা যানজট থেকে বাঁচতে ফ্লাইওভার
  • গঙ্গার ধারে শহর, তবু গলির মধ্যে অনেক জায়গায় পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছায় না। সেই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি
  • নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি। বর্ষায় যেন রাস্তার নোংরা জলে হাবুডুবু না খেতে হয়
  • বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি। প্রত্যহ গড়পড়তা ঘণ্টা পাঁচেক
  • লোডশেডিং এ শহরে যে ভাবে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা থেকে রেহাই

সেই ইচ্ছেপুরনের জরিপটাও একবার করে নেব আর আশ্রয় নেব গঙ্গার কাছে দশাশ্বমেধ লজে।আজও সেখানে বাথরুমে রানিং হট ওয়াটার সাপ্লাই নেই, রানিং সারভেন্ট আছে।

কি হবে কিছুই জানা নেই।“পুরাণে আছে, কাশীর রাজা দিবোদাস নাস্তিক বৌদ্ধদের ভক্ত হলে শিব বিরক্ত হয়ে এই শহর ছেড়ে কৈলাসে চলে গিয়েছিলেন। দেবতারা কোনও দিনই পরমতসহিষ্ণু নন। কিন্তু দেবতাদেরও পরিবর্তন হয়। শঙ্করাচার্য কাশীতে গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন। আচমকা তাঁর পিছনে চারটি কুকুর নিয়ে এক চণ্ডাল। শংকর ‘দূর হঠো’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। অস্পৃশ্য চণ্ডাল সামনে এসে বলল, “কোথায় যাব? আপনি কি দেহটাকে সরে যেতে বলছেন? না আত্মাকে? আত্মা তো অদ্বৈত। কোথায় সরে যেতে বলছেন প্রভু? এক অন্নময় দেহ থেকে আর এক অন্নময় দেহে? নাকি এক চৈতন্য থেকে অন্য চৈতন্যে?” শংকর বুঝলেন, ইনিই স্বয়ং শিব। চণ্ডালের বেশে কাশীর গঙ্গাতীরে তাঁকে অদ্বৈততত্ত্ব বোঝাতে এসেছেন। কাশীশ্বরের মতিগতি বোঝা ভার। কখন বৌদ্ধদের প্রতি রেগে যাবেন, আবার কখন নিজেই অস্পৃশ্যবেশে দেখা দেবেন, কেউ জানে না।”

২। মগনলালের পাড়ায়

২ রা অক্টোবর ট্রেনে উঠেও,মনটা খুঁতখুঁত করছিল। ফেসবুকের বেশীরভাগ ট্রাভেল গ্রুপেই তখন বেনারসের বন্যার খবর। ওয়েদার রিপোর্টে বলছে এখনও বৃষ্টি হবে। তবে কি বিপত্তি সঙ্গে করে হাজির হবো মগনলালের পাড়ায়? রাতে ট্রেন চলার ধাতব শব্দে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম যখন,মনেহল মগনলাল চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে— “আসেন,আসেন”। স্টেশনে পা পড়তেই নিজেকে জটায়ু মনে হচ্ছিল। অটোওয়ালা আর হোটেলের দালাল ঘিরে ফেলল। দশাশ্বমেধ বোর্ডিং হাউসে উঠবো শুনে বলল— ও এলাকা এক হাঁটু জলের তলায়। ঠিক যেভাবে অর্জুণ তার নাইফ থ্রো করছিল আর মগনলাল চিৎকার করছিল “নাজুক, নাজুক” ,ঠিক তেমন ভাবেই হাসছিল তারা। ফোন করলাম বোর্ডিং হাউসে। ম্যানেজার বললেন, নিশ্চিন্তে আসুন। একটুকুও জল নেই। গোধুলিয়া মোর অবধি অটো আর বাকিটুকু রিক্সায় আসতে আসতে দেখলাম কিছু রাস্তায় জল আছে বটে তবে অনবরতঃপাম্প চলছে,নিষ্কাশনের জন্য। তবে গোধুলিয়ার জ্যাম, আজও জমজমাট। ড্রাইভ এজ ইউ লাইক টাইপের মনোভাব নিয়েই সবাই গাড়ি চালাচ্ছে। বোর্ডিং -এর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে প্রথম খারাপ খবরটা পেলাম। বোর্ডিং -এর রানিং সারভেন্ট জয়কিষাণ বললে- গঙ্গার জল ঘাট ছাড়িয়ে রাস্তা অবধি প্রায়। নৌকা ভ্রমণ বন্ধ। আরতীও হচ্ছে ঘাটের প্রথম সিঁড়িতেই।

আকাশে রোদ্দুর ছিল। তাই প্ল্যান করলাম সারনাথ, রামনগর ফোর্ট, এগুলো ঘুরেই আসি। দুপুরের লাঞ্চ বোর্ডিং -এই সেরে নিলাম আর রওনা দিলাম।

৩। বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি,আর নির্বাণ লস্যিতে

ফার্স্ট স্টপেজ— সারনাথ। স্তুপ,আমলকি বন, বিখ্যাত সেই অশোক স্তম্ভ, ছাড়াও নব নির্মিত সুবিশাল বুদ্ধ মূর্তি আর বৌদ্ধ মন্দির ঘুরে ফিরে দেখলাম। মাত্র একশো টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে একজন বিএইচইউয়ের ছাত্র (যদিও অ্যাকাডেমিয়া চেক করিনি) সারনাথ ঘুরিয়ে দেখালেন আর ইতিহাস বলতে লাগলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক তার ইতিহাস পরতে পরতে গৈরিক হয়ে উঠছিল। রাজনীতির দখলদারি, এভাবে ইতিহাস, ভুগোল আর মানুষের রোজকারের জীবনযাত্রায় চেপে বসতে, আগে দেখিনি।

এরপরের স্টপ রামনগর ফোর্ট। আগেও এসেছি। সেবার গঙ্গায় নৌকা চেপে,পল্টন ব্রিজের পাশ দিয়ে। এবার এলাম গাড়ি চেপে। ফোর্টের সামনে এসে দেখি পুলিশের ভীড়। রাজা স্বয়ং আছেন। তিনি বাইরে যাচ্ছেন। সঙ্গে পাইক,বরকন্দাজ। পুলিশ তাঁকে গার্ড অব অনার দিচ্ছে। সাবেকি ব্যাপার তবে রাজার বাহনটি হাল ফ্যাশানের সাদা জাইলো। ফোর্টের মিউজিয়াম দেখে যখন গঙ্গার পাড়ে এলাম,দেখি আবার মেঘ জমছে ভারি হয়ে। সন্ধ্যায় নিভু আলোয় বয়ে চলেছে গঙ্গা।

তেষ্টা পেলে জল খেতে হয়,এই ধ্রুব সত্যটা বেনারসে এপ্লিকেবল নয়,কারন সামনেই মালাই চাপা দেওয়া লস্যির ভাঁড় অপেক্ষায় আছে।

রাতের ডিনারে পাঁঠার ঝোল আর শেষ পাতে মালাই রোল আর বেনারসি পানের মৌতাত নিয়ে ঘুমিয়ে পরলেই হল। যদিও বোর্ডিং হাউসের সামনের গলি জেগে থাকে অনেকরাত অবধি।

৪। ভোলে বাবা পার করেগা আর যতটুকু খাওয়া দাওয়া

তেত্রিশ কোটি দেবতাই যেখানে, সেখানে এলে মন্দির দর্শনটা নেসেসারি। সঙ্গদোষও বলা চলে। তবুও মন্দিরের ভয় জয় করে ভোর ভোর বিশ্বনাথ মন্দির দর্শনটা সেরেই ফেললাম। পুজোর পর আসে প্রসাদ। আর প্রসাদ মানেই পৌষ্টিক তন্ত্রের পুজো-পার্বণ। পেট পুজোর জন্য আমরা চললুম লক্ষ্মী চায়ে ওয়ালার দোকানে। প্রসিদ্ধ ব্লু লস্যি শপের গলি ছাড়িয়ে ষাড়ের পথ আটকানো অগ্রাহ্য করে হাজির হলাম সেথায়। দুগ্ধ পোষ্য শিশু দেখেছি,এ তো দেখি দুগ্ধ পোষ্য চা! সাথে মালাই মোড়া টোস্ট। মরমে পশিল সে স্বাদ।

গঙ্গার ঘাটে ঘোরাঘুরির কোন স্কোপ নেই, এবার। জল থৈ থৈ। নৌকা বাঁধা আছে। টুপ করে চলে এলাম মান মন্দির। ছাদের উপরের সূর্য ঘড়ি দেখে দিব্যি সময় বোঝা যায়। সম্প্রতী মান মন্দিরে গ্যালারি হয়েছে। লাইট এন্ড সাউন্ড শো হচ্ছে। বেনারসের ইতিহাসের ভিডিও প্রেসেনটেশন চলছে স্ক্রিনে। তবে প্রচ্ছন্ন ভাবে রাজনীতির রঙ লাগানো হয়েছে তাতে। সেটা একটু হলেও অসোয়াস্তি দেয়।

নেশা করা হয়নি। বিকেল গড়িয়ে রাত। হিংয়ের কচুড়ি তো হল। শেষ পাতের নেশাটাও তো চাই। কালই চলে যাবো বেনারস ছেড়ে। শিব্রাম বলতেন,নেশা করলে রাবড়ির নেশা করতে। আমরাও নটে গাছ মুড়োনোর আগে রাবড়ি সাবার করতে ভুল করিনি।



ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য্য

জন্ম ১৯৮৩র ৫ই এপ্রিল। ড়ি টাকিতে।রসায়নে স্নাতক।লেখালেখি সখ ইস্কুল থেকেই। স্রোত, কাজরী এমন কিছু লিটল ম্যাগের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল লেখা।সেই ভাললাগা থেকেই লিখে যাওয়া। সেভাবে বিশেষ কোন ধরনের প্রতি আলাদা পক্ষপাত না থাকলেও, ভ্রমনের গল্প, কবিতা, অনু গল্প, গল্প সব রকমের লেখাই পছন্দের। আপাতত রাজ্য সরকারের অধীনস্থ সংস্থায় কর্মরত আর অবসর সময়ের সঙ্গী এই লেখা। বর্তমানে ব্লগ টগের মতন কয়েকটি অন-লাইন ব্লগের সাথেও এই লেখালিখির সুত্রে জড়িত। প্রতলিপি বা Story Mirror এর মতন পোর্টালেও লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই নভেম্বরে Story Mirror আয়োজিত একটি সর্ব ভারতীয় প্রতিযোগিতায় “ট্যাটু” গল্পটি প্রথম পঞ্চাশটি গল্পের সূচীতে মনোনীত হয়েছে। লেখলেখির পাশাপাশি ছবি আঁকা, ছবি তোলা আর বেড়ানোর সখ আছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।