একজন টিকটিকি (পর্ব – ৮)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

ekjon_tiktiki

দীনবন্ধু পেছন ফিরতেই দেখলেন মেঝের এক পাশে বসে আছে তার একত্রিশ বছর সাতমাস আগের মৃত মা। মায়ারানী মন্ডল।

চুপ করে বসে না থেকে হাসিহাসি মুখে বিড়বিড় করছে, এই যে আমি মাঝেমধ্যেই চলে আসি এটা ঠিক নয় তাই না রে দীনু?

দীনবন্ধু জবাব না দিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন। জনতা কুকারের উপরের প্যানে চায়ের জল শুকিয়ে গেছে। জলের মত চা খাবার ইচ্ছেটাও শুকিয়ে গেছে । আজ আর কিছুই ভাল লাগছে না। একবার মনস্থ করলেন বাইরে কোথাও গিয়ে বসে থাকবেন।টাকাপয়সা যা আছে তাতে হোটেলে খেয়ে বেশ কিছুদিন চলে যাবে। এখন ঠিকঠাক ঘুম আর খাবারের খুব প্রয়োজন।

আত্রেয়ীর বাঁধের ধারে সস্তার বেশ কয়েকটা হোটেল হয়েছে। দীনবন্ধু মাঝেমধ্যেই সেখানে খেয়ে যান ।রান্না ভাল। সবচেয়ে বড় কথা সবসময় গরম গরম খাবার পাওয়া যায়। ডালের বাটিতে হাত দিলে মনে হয় আগুন গুলিয়ে রেখেছে। চাইলে অন্তত বার দুয়েক হাসিমুখে ঝিরিঝিরি আলুভাজা দিয়ে যায়। রাগ করে না। ঠোঁট উলটে কড়া কথা শোনায় না। ভাতের থালাতে থাকে এক টুকরো পেঁয়াজ, লেবু আর কাঁচালংকা। পোনামাছ কিংবা রাইখর নিলে সাহস করে তৃতীয়বার আলুভাজা বলে মৃদুস্বরে ডেকে দেখেছেন।ডাক বিফলে যায়না।

বারান্দা থেকে নামতেই স্পষ্ট শুনলেন, কোথায় চললি? আমি এতদূর থেকে আসি আর তুই ইদানীং একটাও কথা বলিস না। আমায় দেখলেই পালিয়ে যাস। আমায় এত ভয় পাস কেন দীনু?
দীনবন্ধু আপ্রাণ চেষ্টা করলেন পেছন ফিরে না তাকাতে। প্রতিবারের মত আজও পারলেন না।একবার পেছন ফিরে তাকালে সমস্যা বাড়বে জানার পরও মায়ের মুখের দিকে তাকালেন তিনি ।

এসবের শুরু হয়েছে প্রায় আট বছর আগে এক বর্ষার রাত্রিতে। তখন যে ভাড়া বাড়িটাতে থাকতেন তার মাথায় ছিল টিনের ছাউনি। নিশুতি রাত।ঝমঝম বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে একটি কথা মুখেমুখে ঘোরে তা হল, টিনের চালে পড়া বৃষ্টির শব্দে রাতে ভালো ঘুম হয়। কথাটা দীনবন্ধুর ক্ষেত্রে সত্যি না।

ঝমঝম শব্দে ঘুম ভাল না হয়ে সেদিন ভেঙে গেল। মনে হতে লাগল কেউ একজন একটানা নেচে চলেছে, নেচেই চলেছে। তার নুপুরের ঝমঝম শব্দ কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে দিচ্ছে না।
এক অদ্ভুত হাতছানি।

এর মাঝেই যেন অন্য এক জগত থেকে ভেসে আসছে একটা চেনা ডাক, দীনু, দীনু, ভয় পাচ্ছিস বাবা? ভয় পাচ্ছিস?

সত্যি সত্যিই ভয় পাওয়ার মত ডাক। তবু এতটুকু ভয় পাননি দীনবন্ধু। খুব সহজ গলায় বানের জলে ভাসতে থাকা মানুষের হাতের কছে খড় কুটো পাবার মত আনন্দে বলে উঠেছিলেন, মা, তুমি সত্যি সত্যিই এসেছ?

— হুম। আগেও বারকয়েক এসেছি। তুই ভয় পাবি বলে সামনে আসিনি। আজ যখন দেখলাম জ্বরে খুব কষ্ট পাচ্ছিস তাই আর আড়ালে থাকতে পারলাম না।

— ভাল করেছ।

— দাঁড়া তোর মাথার কাছে যাই। দুম করে আমার দিকে তাকাবি না। ভয় পাবি।তুই যা ভীতু ছিলিস। অন্ধকারে যা তোর ভয়!

— এখন আর ভয় পাই না মা। একা একা রাতবিরেতে কত জায়গায় ঘুরতে হয়।

— তবু আমার দিকে তাকাবি না। কয়েকদিন যাক। তেলে জলে যেমন মেশে না ঠিক তেমন মরা মানুষ আর জ্যান্ত মানুষের মিল সহজ ঘটনা নয় রে দীনু। এর জন্য সময় লাগবে। সময় হল সব কিছুর ওষুধ। হা হা হা।

— তুমি এখন কোথায় থাকো মা?

—ঠিক জানি না রে। বলতে পারিস অন্ধকারে থাকি।মরে যাবার পর থেকে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ ধরে ভেসে যাচ্ছিলাম।চারদিকে সোঁ সোঁ শব্দ। ঝড়ের ভেতরে যেমন টিনের চাল থেকে একটা এক একটা টিন উড়ে যায় আপন খেয়ালে ঠিক তেমন কোথায় যাচ্ছি জানি না। কেন যাচ্ছিলাম জানি না।

— তারপর?

—-আলো দেখতে পেলাম।খুব সামান্য।সেই আলোর দিকে ছুটতে লাগলাম। যত এগিয়ে যাচ্ছি সেই আলো আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তেজ বাড়ছে। আমি খুব কাছে পৌঁছে গেলাম।

—- গিয়ে কী দেখলে?

— কিছুই নেই। আলো ছাড়া কিছু নেই। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না আবার পিছন ফিরব কিনা? ঠিক সে সময় কেউ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, জীবমাত্রই মৃত্যু ভয়ে কাতর। তুমি এখন মৃত । তবু কেন ভয় পাচ্ছ?
আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম আর কোনও কথা ভেসে এল না দেখে গলা চড়িয়ে বললাম, আমি ফিরে যেতে চাই?

সংগে সংগে উত্তর এল, প্রতিটি আত্মাই এমন চায়। কেউ পারে কেউ পারে না।
আমি আবার জানতে চাইলাম, কেন পারে না?
উত্তর এল, কর্মফল।

— তুমি আমার কাছে ফিরতে পেরেছ এতে আমি খুব খুশি হয়েছি।আর যেও না মা। তুমি জানো আমি এখন কী কাজ করি?

— জানি!
— তোমার রাগ হয় না।
—না।বেঁচে থাকলে হত। এখন এসব নিয়ে ভাবি না। তোর বাবা যে কাজটা করত তা বেঁচে থাকতে ঘৃণা করতাম। এখন করি না।

— বাবার সংগে তোমার দেখা হয়েছে?

— হয়েছে। আগের মত রগচটা আর নেই। অনেক জ্ঞানের কথাবার্তা বলে। সে নিজে তোর কাজ নিয়ে অসন্তুষ্ট। মুখে বলে না আবভাবে বুঝি।

—একটা ভাল কাজ পেলে এই কাজটা ছেড়ে দেব মা। ভাল কাজের খোঁজে আছি।

— সে তোর ব্যাপার। তোর ওই থানায় গোপন খবর দেওয়ার কাজ ছাড়া সহজ নয়। ওরা ছাড়লে তবেই ছুটি পাবি। তোর বাবাও অনেক চেষ্টা করেছিল। পারেনি।

— আমি পারবো।

— খুব ভাল।যেদিন ছাড়বি আমি আর তোর বাবা দুজনে আসব সারারাত গল্প করব।সেদিন এমন বৃষ্টি হলে বেশ হবে। তোর বাবা বৃষ্টির রাতে ঘুমোত না। জানলা খুলে বসে থাকত। কত বকেছি বৃষ্টির ছাটে বিছানা ভিজবে। আমায় ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখত।

— কেন থাকতে চুপ করে থাকতে মা? কেন থাকতে মুখ বুঁজে?

— আমারা আসলে সবাই ভালবাসার কাঙাল ।যা করি তার প্রতিদান চাই। আমি মানুষটাকে ভালবাসতাম।মানুষটা জানত আমায় দয়া করেছিল। ভালবেসে ভালবাসা চেয়েছি? ভালবাসা কখনও ফেরত নেওয়া যায়! কেমন বোকাবোকা না?

—তোমার আসল পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলে কেন? যখন জেনেছি খুব রাগ হয়েছে।খুব রাগ।
অথচ গর্ব করার বিষয়। আমার মা একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী!

–আমাদের দেশে লাখে লাখে মানুষ স্বাধীনতার জন্য লড়েছে।

— তুমি নিজেকে আড়ালে রাখলে কেন?

— একেকজন একেকরকম ভাবে লড়েছে।যেমন, আদিবাসীরা লড়েছে তীর ধনুক নিয়ে জংগলে পাহাড়ে।কৃষকেরা বেশিরভাগ সময় লড়েছে খালিহাতে।শ্রমিকেরা হাতিয়ার নিয়ে লড়েছে। আবার কেউ লড়েছে বোমা, পিস্তল নিয়ে।এদের সবার লড়াই মিলেই একটা স্বাধীনতা। এতজনের সকলের কথা জানা সম্ভব?

— কেন জানবে না?

—- কত শহীদের নাম আজও অজানা থেকে গেছে কিংবা খুব কম লোক জানে।সব বড় কাজে কিছু অজানা থাকেই। থাকবেই।বসন্তদা আমায় বলেছিল, ননীবালা দেবীর কথা।ষোল বছর বয়সে আমার মত বিধবা হয়।যুগান্তরের সংগে যোগাযোগ হতেই বিপ্লবের কাজে নেমে পড়েন।বিপ্লবীরা তাকে ডাকত’ মেজ পিসিমা ‘ বলে।একজন বিপ্লবী ধরা পড়তেই সমস্যা দেখাদিল।রামচন্দ্রের কাছে থাকা ‘মসার’ পিস্তলের খোঁজ আনতে মেজপিসিমা ছুটলেন জেলে। একদম ঘাবড়ালেন না। জেলে গিয়ে বললেন তিনি রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী।স্বামীর সংগে দেখা করতে চান।

— ঠিক তোমার মত! তুমি যেমন বিপ্লবীদের স্ত্রী সেজে বালুরঘাট থেকে গোয়ালন্দ অব্দি পিস্তল পৌঁছে দিতে!

— ওসব কথা এখন রাখ। বিপ্লবের জন্য এমন অনেক কাজ করতে হয় যা সমাজ মানতে চায় না। মেজপিসিমার কথা শোন। ননীবালা জেনে আসেন পিস্তলের খবর। এর কিছুদিনের মধ্যে পুলিশ জেনে যায় ননীবালার আসল পরিচয়।
ননীবালাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল পেশোয়ারে।ওখানে থাকার সময় ননীবালার কলেরা হয়।সেরে উঠতে না উঠতেই ধরা পড়ে যান। তিন নম্বর রেগুলেশন আইনে কোনও কারণ ছাড়াই তাকে আটকে রাখা হয়।তুই এই ননীবালার নাম আগে শুনেছিস? তিন নম্বর রেগুলেশন আইনে প্রথম ও একমাত্র মহিলা বন্দীর নাম?

না বলতে গিয়ে কতক্ষণ চুপ করে ছিলেন দীনবন্ধুর মনে নেই। বহুক্ষণ বাদে মা, মা করে ডাকার পর সাড়া না পেয়ে বিছানা থেকে নেমে জানালা খুলে দিয়েছিল। ভোরের পাতলা আলোয় দেখেছিলেন, কেউ নেই। তিনি একা। বড্ড ফাঁকা মনে হচ্ছিল। মা চলে গেলে এমন ফাঁকা হয়ে যায় বুঝি চারপাশ!

তাই আজ মায়ের ডাক শুনেও না শোনার ভান করে বাইরে যেতে পারলেন না। মায়ের মুখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বললেন, চলো ঘরে গিয়ে বসে গল্প করি। বেশ কয়েকটা পুরনো কাগজ পেয়েছি খুঁজে। দেখাব তোমায়।

মায়াদেবী হাসলেন, কেন বারবার অতীত ঘাঁটতে যাস? অতীত বড্ড আঁকড়ে ধরে। নিস্তার পাবি না।

— যা খুশি হোক। তুমি আগে কাগজ গুলো দ্যাখো। দাঁড়াও ট্রাংকটা খুলি।

ট্রাংক থেকে হলদে খয়েরি ছাপ কয়েকটি কাগজ বের করলেন দীনবন্ধু মন্ডল।

মায়ারানী মন্ডল কাগজ গুলোর দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন।


ক্রমশ…


পড়ুন, এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।