একজন টিকটিকি (পর্ব – ৭)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

ekjon_tiktiki-7

জনতা কুকারে টগবগ করে ফুটছে জল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে চায়ের প্যান থেকে তা উপচে পড়বে। তবু সেদিকে খেয়াল নেই দীনবন্ধুর। জল ফুটতে শুরু করতেই তিনি ঘরে ছুটে এসেছিলেন চা-পাতার কৌটো নিতে। চৌকির নীচে, টেবিলের উপরে ভাল করে খুঁজেও পেলেন না।

“এমন হন্যে হয়ে কী খুঁজছিস দীনু?”

দীনবন্ধু ঘরের এক কোনে রাখা ট্রাংকের উপরে পুরনো খবরের কাগজের বান্ডিল সহ হাবিজাবি জিনিসপত্র  সরিয়ে দেখছিল। চেনা কণ্ঠস্বর কানে যেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে চৌকির দিকে তাকালেন। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, “তুমি আবার এসেছ কেন ? কতবার বলেছি তুমি আসবে না। আরকখনও আমার কাছে আসবে না। যাও।”

“এমন ভাবে বলছিস যেন আমি বেঁচে-বর্তে থাকা মানুষ। মরা মানুষকে কেউ এমন করে বলে! জানিস না মানুষ মরে গেলে দোষ মিলিয়ে যায়। পড়ে থাকে শুধু গুন। মরা মানুষকে ভক্তিশ্রদ্ধা করতে হয়। মনে রাখবি মৃত্যু হল জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। পুরস্কারও বলতে পারিস।  কতদূর থেকে তোর সঙ্গে একটু গল্প করব বলে আসি। আর তুই শুধু মেজাজ দেখাস। তা কী খুঁজছিস দীনু?”

“তুমি শুনে কী করবে?”

“সন্তান সমস্যায় পড়েছে বাবা হয়ে চুপ করে বসে থাকব কেমন করে! কর্তব্য বলে একটা ব্যাপার আছে না! চটপট বলে ফ্যাল আমি খুঁজে দিচ্ছি।”

“আমি নিজেই ভুলে গেছি। দাঁড়াও মনে করি।আমি এসেছিলাম বারান্দা থেকে। একবার বারান্দা থেকে ঘুরে এলে হয়ত সবটা মনে পড়বে।”

“তুই চুপটি করে চোখ বন্ধ করে বস। আমি দেখছি।”

দীনবন্ধু মেঝেতেই থেবড়ে বসে থাকল।

“কুকারে চায়ের জল বসিয়েছিলি। চা-পাতা খুঁজছিলি।  তাইনা?”

“হুম, মনে পড়েছে। যাই কুকারটা নিভিয়ে আসি।”

“নেভাবি কেন? ওই দ্যাখ তোর টেবিলের উপরে বইয়ের ফাঁকে চাপাতার কৌটো। ওর উপরে মোম জ্বালিয়ে পড়াশুনো করেছিস। আর ওকেই ভুলে গেছিস। যে আলো জ্বালিয়ে রাখতে সাহায্য করে জীবিত মানুষেরা তাকেই পাত্তা দেয় না। যা চটপট চা করে আন।আমার সামনে বসে শব্দ করে চা খা।  তুই শব্দ করে চা খেতিস বলে একবার চড় মেরেছিলাম। তখন তুই ক্লাস এইটে পড়তিস। দুম করে রেগে যাওয়া ছিল আমার অভ্যেস।আমার সেদিন তোকে চড় মারাটা খুব অন্যায় হয়েছে। খুব। যা চা করে আন। আজ শব্দ করে খাবি।  তোর নিশ্চয় মাথা ধরেছে?”

” না,মাথা ধরেনি। তোমায় বললাম না যাও। এখনও নির্লজ্জের মত বসে আছ কেন?”

“আজ দুপুরে কী খাবি? ঘরে কিছু আছে? “

“তুমি জেনে কী করবে!”

“ঘরে কী কী আছে জানতে পারলে আজ খানকয়েক রান্না শিখিয়ে দিতাম। রান্নার চেয়ে বড় শিল্প কিছু নেই। অনেকেই  ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয় না। বুঝতে চায় না। আমার মা ঠাকুরমাকে দেখেছি শুধু অন্যকে খুশি করবে বলে দিনরাতের বেশিরভাগ সময় রান্নাঘরে পড়ে থাকতে। কী পেয়েছে তারা! অন্যের মুখে সেরাটা তুলে দেবার মত কাজ কেন সেরা শিল্প হবে না?   তুই পেয়েছিস তোর মায়ের হাত। পেট ভরলেই হল!”

“তুমি আজকাল রান্নার রেসিপি নিয়ে ঘুরছো?”

” সন্তান টিকটিকি পকেটে নিয়ে ঘুরলে বাপ পকেটে রন্ধন প্রণালী রাখতে পারবে না! শোন কীভাবে টকডাল রান্না করবি। ঘরে মুগ কিংবা মটর ডাল থাকলেই চলবে। নেই? ঠিক আছে। যখন থাকবে তখন করবি। জেনে রাখলে কাজে লাগবে। প্রথমে কড়াইতে ডাল সেদ্ধ করতে হবে।  কাঁচা আম খোসা ছাড়িয়ে পাতলা করে আমানি করে নিলে ভাল হবে। এবার সেদ্ধডালে কাঁচা আম দিয়ে দিতে হবে। অল্প হলুদ আর নুন ছড়িয়ে দিবি। অন্য একটা কড়াইয়ে তেল চড়িয়ে শুকনো লংকা আর সরষে ফোড়ন দিয়ে সেদ্ধ ডাল ঢেলে আন্দাজ মতো চিনি দিয়ে ফুটিয়ে নামিয়ে নিবি। রেডি টকডাল। এখন কাঁচাআম পাবি। তবে কাঁচা আম যখন পাবি না তখন আমড়া, চালতা, টেপা কুল, তেঁতুল দিয়ে এই ডাল করতে পারিস।”

“এটা মা গরমের সময় প্রায়ই করত। তুমি এমন ভাবে  বললে যেন নিজে আবিস্কার করেছ। এটা আমার জানা।”

“আরেকটা অদ্ভুত রান্নার কথা বলি,আমার ঠাকুরমার রন্ধন প্রণালী। খুব সাধারণ রান্না হলেও খেতে অসাধারণ । আমরা রান্নাটার নাম দিয়েছিলাম,’হাপুসহুপুস’।
একটা পরিস্কার কাপড়ের মধ্যে ভাজা মুগডাল, খোসা ছাড়ানো  কাঁঠাল বিচি আর আলু বেঁধে ভাতের হাঁড়িতে ছেড়ে দিত। একটা টমাটো পুড়িয়ে  আর কাঁচালংকা  দিয়ে  সেদ্ধ মুগডাল, কাঁঠাল বিচি আর আলু বেশ করে মাখত। একথালা ফ্যানা ভাত উড়ে যেত। এবার বুঝলি অমন নাম কেন!”

“অনেক কথা বলেছ।এবার বিদেয় হও। কাল সারারাত ঘুম হয়নি বলে তুমি আসতে পেরেছ। আর আমাদের দেখা হবে না। যাও।”

“দীনু আমি বারবার আসি তার কারণ তুই আমায় টেনে আনিস বলেই। তাছাড়া আমি কেন আসব। তোর সংশয় আমায় আসতে বাধ্য করে। ভালবাসা আর ঘৃণা সমান সমান হলে এমন হয়।”

দীনবন্ধু হাসতে হাসতে বেশ জোরের সংগে বললেন,”আমি তোমায় ভালবাসিনা। শুনে নিশ্চয় দুঃখ পেলে।”

“না, মরা মানুষকে দুঃখ দেবার ক্ষমতা জীবিতর নেই। হাসি আর অতিরিক্ত জোরের সঙ্গে বলা কথা  মিথ্যে হয় দীনু।”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। কারণ তুমি ব্রিটিশ পুলিশের টিকটিকি। সামান্য টাকার জন্য ইংরেজদের চাটুকারিতা করে দেশের  সর্বনাশ করা একজন মানুষ। তোমাকে ঘৃণা না করলে কাউকে ভালবাসতে পারতাম না।”

“আসল কথাটা যখন উঠেই এল তখন শোন, সে সময় পুলিশের গুপ্তচর পথে ঘাটে, মেসে, ছাত্রাবাসে, স্কুল-কলেজে সর্বত্র ছিল। ছাত্র থেকে শিক্ষক,রাস্তার মোড়ের পান-বিড়িওয়ালা, হোটেল মালিক কে ছিল না! বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশির লেখা পড়েছ গতকাল রাতে তবু শুধু আমায় ভাবছ গুপ্তচর। খুব কম জানো বলে সহজেই ধারণা করে নিতে পারছ। স্বাধীনতার সাত বছর পর তোমার জন্ম। অনেক কথা তোমায় বলতে পারিনি। বাংলার অগ্নিযুগে এমন কিছু ঘটনা আছে যা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে, কাল যে ছিল খাঁটি বিপ্লবী আজ সে দলত্যাগী বিভীষণ! বন্ধুরা যখন দিন-রাত তোমায় সন্দেহ করে চলবে তখন বুঝবে! আমি কে? সংশয় রেখো না মনে তাহলেই আমাদের দেখা হবে না। আজ যাই।”

দেয়াল থেকে ভেসে এল, টিক-টিক-টিক।

দীনবন্ধু দেয়ালের দিকে তাকাতেই দেখলেন, পুরনো ক্যালেন্ডারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে উদাস। তার চোখ দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি ঠিকরে বেরিয়ে যাবে।


ক্রমশ…


পড়ুন, এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।