একজন টিকটিকি (পর্ব – ১৩)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

সাধনবাবু টেবিলে পড়ে থাকা চিঠিটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন!

গতকাল ঠিক এমন একটা ধূসর খাম এসেছিল। খামের উপরে হাতের লেখাটাও এক। ছাপা অক্ষরের মত নিখুঁত। ঠিকানাতেও সামান্য ভুলভ্রান্তি নেই। সাধনবাবুর নামের নীচে প্রধান  শিক্ষক, হরিমতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় উল্লেখ করে দিয়েছে।

 প্রথমটায় তিনি ভেবেছিলেন মামুলি চিঠি। এমন চিঠি প্রচুর আসে। সেই ভেবে  তেমন পাত্তা দেননি। টিফিনের পর একবার দেখে সরিয়ে রাখবেন ভেবে খুলতেই অবাক হলেন। খামের ভেতরে খুব পুরনো একটা বিজ্ঞাপন। হলদে খয়েরি মলিন কাগজটিতে লেখা, মহাত্মন্, আপনাদের জ্ঞাতার্থে নিবেদন করিতেছি যে আগামী সপ্তাহে তিনদিন অর্থাৎ সোম, বুধ ও শুক্রবার এবং তারপর হইতে প্রতিদিন আপনাদের পরিচিত এয়ার ওয়েজ ইন্ডিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বালুরঘাট বিমানঘাটিতে আমাদের তত্ত্বাবধানে অবতীর্ণ করিবে।যাত্রীদের বসিবার জন্য স্প্রিং যুক্ত সুন্দর মখমলের গদি আটা চেয়ার আছে, পরীক্ষা প্রার্থনীয়। নিবেদন ইতি—–

নীচের অংশ খুব সাবধানে কেটে বাদ দেওয়া। কাগজটা বার তিনেক উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে পেন্সিলে লেখা খুব ছোট্ট দুটো শব্দ চোখে পড়ল। চোখের কাছে আনতে চমকে উঠলেন। পেন্সিলে আবছা করে লেখা,  দেখা হবে।

খামের গায়ে প্রেরকের নাম, ধাম কিচ্ছু নেই। কেউ কী বাজে ধরনের মজা করছে? নিজেকেই প্রশ্ন করলেন সাধনবাবু। উত্তর কিছু এল না। আর অন্য কাজেও  মন দিতে পারলেন না। বাড়ি ফিরে  চুপ করে বসে থাকলেন। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হল না। হবার কথাও নয়।সকাল হতেই জগদীশকে ফোনে ধরলেন। কথাবার্তা হল এই রকম।

—এক্ষুণি একবার আসতে  পারবে আমার বাড়িতে। এসব কথা ফোনে বলা ঠিক হবে না বলেই তোমায় বাড়িতে আসতে বলছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসো।

—ঘন্টা খানেক পর যাচ্ছি। রান্নাঘরে আছি। আপনি তো স্যার জানেন আমার অবস্থা। রান্নাবান্না না করে বেরুলে দুটো প্রানী না খেয়ে থাকবে। মেয়েটাকে যে দেখাশুনা করে সে আসে নটায়। এখন বাজে সাড়ে আটটা।

— তাই এসো। একটা বিপদের আশংকা করছি। তুমি বলেছিলে খুব তাড়াতাড়ি  ওই দীনবন্ধু লোকটাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করবে। খবর পেলাম সে বহাল তবিয়তে আছে। কিছু জানো?

— অনেক কথা আছে স্যার গিয়ে বলছি। ভাতে ফুট এসেছে। নামাতে হবে। 

ফোনটা কেটে জগদীশ বেশ কিছুক্ষণ ওভেনের নীল আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকল। শান্ত, নরম, যেন আগুন নয় জলের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর। অনেকটা তার মত।

দীনবন্ধুর প্রসঙ্গ এলেই আজকাল  মাথাগরম হয়ে যায় জগদীশের। লোকটার সাহস কম নয়! নিজে থেকেই বাড়ি অব্দি চলে আসছে। বেশ কিছুদিন আগে একবার এসেছিল। বাড়ি ফিরতেই লিপি বলেছিল, একজন বয়স্ক মানুষ এসেছিল তোমার খোঁজে। উঠোনের পেঁপে গাছের নীচে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিল। কখন যে চলে গেল। বিলুর সংগে বেশ গল্প জুড়েছিল। বিলু বলল খুব ভালো লোকটা। 

—নাম বলেছে?

— না।

—কেমন দেখতে?

— বয়স্ক, খুব রোগা। লিকলিকে রোগা। সুতির একটা জ্যালজ্যালে টাইপ পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে ছিল৷

— বিশেষ চিহ্ন- টিহ্ন কিছু মনে পড়ছে? তেমন কিছু ছিল?

–নাকটা অসম্ভব লম্বা। গলার স্বর গম্ভীর।

জগদীশ যা ভেবেছিল ঠিক তাই। সে জানত লোকটা পিছু নিয়েছে। এত দ্রুত বাড়ি অব্দি চলে আসবে ভাবতে পারেনি।

এটাই শেষ নয়  আবার এসেছিল। জগদীশ  থানা থেকে যতটা খবর পেয়েছে তাতে অবাক হয়েচে। ভাঙব তবু মচকাবোনা টাইপ লোক। জেরায় আবোলতাবোল কথা বলেছে।মোটকথা লোকটাকে জেরা করে কিছুই লাভ হয়নি। সারারাত বসিয়ে রেখে সকালে ছেড়ে দিতে হয়েছে। না দিয়ে উপায় নেই। এস আই দত্তবাবু নিজে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে জেরা করেছেন। জগদীশের বাড়ি কেন গিয়েছিলেন, প্রশ্নের উত্তরে দীনবন্ধু  বলেছে, জগদীশের সঙ্গে আমার দেখা হওয়া খুব জরুরি স্যার। আমি নিশ্চিত জগদীশ লোকটা বিপদে পড়বে। খুব বড় বিপদ। ভাবলাম গরীব লোক বিপদে পড়লে ঘরে অসুস্থ মেয়ে তার একটা ছেলেটা আছে। কী হবে তাদের? তাই আগাম সাবধান করতে গিয়েছিলাম। দেখা হল কই! আপনাদের সংগে দেখা হলে জানাবেন। 

সাধনবাবু খুব সাবধানে খামটা খুললেন, বেশ পুরনো  বইয়ের  দুটো পাতার কিছু অংশ। প্রথম পাতায় চোখ রাখলেন, ‘বিপ্লবীদের আত্মীয়েরাও অনেকসময় পুলিশের চর হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তবে একেবারে অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনাও আছে। একেবারে বিপরীত মেরুর কথা বলি। এমন বেশ কিছু গোয়েন্দার কথা আমরা বিপ্লবীদের লেখাপত্রে পাই যারা গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করত। এই রকম একজন মানুষ হলেন, রাম সিং। তিনি ছিলেন পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর। এই মানুষটি বিপ্লবীদের প্রচুর সাহায্য করেছেন।  গোয়েন্দাদের গুপ্ত খবর তিনি আগেই বিপ্লবীদের জানিয়ে দিতেন।’

দ্বিতীয় খন্ডটিতে লেখা, ‘বেংগল পুলিশ ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী  ১৯২৪ সালের ২৪ শে আগস্ট কলকাতার মিরজাপুর  স্ট্রিটে একটি খদ্দরের দোকানে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ঐ দোকানের মালিক মারা যান। এই হত্যার পেছনের কারণ, ওই খদ্দরের দোকানের আড়ালে ছিল গুপ্তচরদের বিপ্লব বিরোধী কাজকর্ম।

কলকাতার শোভাবাজার অঞ্চলে একটি বাড়ির তিনতলায় বেশ কয়েকজন বিপ্পবী আত্মগোপন করে থাকতেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের চর ছিল। কিন্তু কে তা জানা যায় না। পুলিশ সময় বাড়িতে হানা দেয়। ভেতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া বোমার কারখানা আবিস্কার,  বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা, পরিকল্পনা কিছুই প্রকাশ পেত না।’

মাস্টারদা সূর্য সেনকে কলকাতায়পুলিশ গ্রেফতার করে। কে খবর দিয়েছিল? কে জানত মাস্টারদার গতিপথ?  নিশ্চয়ই পরবর্তীতে সেই মহাবিপ্লবী সেজেছে। হাতেনাতে ধরা না পরার ফলে এমন মানুষেরা সুযোগ নিয়েছে।’

দুটো লেখার নীচে আবছা পেন্সিলে লেখা, দেখা হবে।

জগদীশ অন্য দিনের মত ঠিক ঘন্টা খানেক বাদেই এল। সব শুনে গম্ভীর গলায় বলল, দীনবন্ধু লোকটা এসব করছে। লোকটার সম্পর্কে যতটুকু জানলাম তাতে বেশ অবাক হয়েছি।

— কী জেনেছ?

— লোকটা খুন করেনি। ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েছিল। পুলিশের হয়ে কাজ করত। এই কাজে গিয়েই সমস্যায় পড়ে। বেশ কয়েকবছর জেলে ছিল। সে সময় ওনার স্ত্রী একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কুন্দপুরে চলে যান। আমি কুন্দপুরে গিয়ে খোজখবর করে দেখেছি দীনবন্ধুর মেয়ে ও স্ত্রী এখন কোথায় আছে কেউ জানে না।  

— পুলিশ কী স্টেপ নিচ্ছে?

—শুনেছি নজরে রেখেছে। একটু আধটু ভুল করলেই তুলে নেবে।

 আপনি ভয় পাবেন না স্যার লোকটা আমার সঙ্গে খেলতে শুরু করেছে। জানে না এর ফল কতটা ভয়ংকর হতে পারে! শুধু তো আপনাকে নয় আরও দুজন মানুষকে এমন কিছু চিঠি পাঠাচ্ছে।

— এখন তবে কী করব জগদীশ?

— কিছু করতে হবে না। মাথা ঠান্ডা রাখুন। একদম দুশ্চিন্তা করবেন না। খেলা ঘুরবে।বাঁচতে চাইলে ওই বুড়ো লোকটাকে আপনার পায়ে এসে পড়তে হবে। মিলিয়ে নেবেন আমার কথা। আমি এমনি এমনি মুখ দেখার জন্য আপনার কাছে টাকা নিইনি! এখন যাই খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে।


ক্রমশ…


পড়ুন, এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।