একজন টিকটিকি (পর্ব – ১২)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

ekjon_tiktiki

তিনদিন হল যোগেন শহরে এসেছে।

দীনবন্ধু কুন্দপুরে গিয়ে তাকে নিয়ে এসেছে। যোগেন শহরে আসবার জন্য ছটফট করছিল। দিনেরপর দিন দীনবন্ধুর জন্য অপেক্ষা করেছে ! কবে আসবে, কখন আসবে ভেবে কোনও কাজে যায়নি। যদি মানুষটা এসে তাকে না পেয়ে ঘুরে চলে যায়! অথচ সত্যিসত্যি যেদিন দীনবন্ধু গ্রামে তাকে নিতে এল সেদিন গ্রাম ছেড়ে আসবার জন্য মনকেমন করে উঠল! বুকটা ফসল কাটা মাঠের মত ফাঁকা মনে হল।

এতদিন যোগেন স্বাধীনভাবে বেঁচেছে। মাঠঘাট, ফড়িং এসব নিয়ে বেশ কাটছিল, শহরে সত্যিসত্যি যাবার ইচ্ছে থাকলেও সব ছেড়েছুড়ে যাবার সাহস যে তার কোনকালেই ছিলনা তা টের পেল ।

আগাছার রঙিন ফুলের মাঝে অলস দুপুরে সে শুয়ে থাকত। কেউ ডাকবার নেই। কোনও দু:খ নেই।কার্তিকের হাড় কাঁপা ঠান্ডায় কিংবা এই বর্ষায় তাকে কত কষ্ট করতে হয়! তবু সে কুন্দপুরের বাইরে যায়নি। পাঁড়মাতালের মত এই গ্রামের মাঠঘাট পুকুরের চারপাশে পড়ে থেকেছে। কেউ খোঁজেনি, কেউ ডাকেনি, সহজে বুঝতে চায়নি তাকে ! এরমাঝে শহরে যাবার ইচ্ছেটা মনের ভেতরে গুঁজে দিয়ে দীনবন্ধু চলে গিয়েছিল ।

ধীরেধীরে যোগেনের মন হয়ে উঠল পাখি। সে পাখি দিনরাত উড়াল দেবার স্বপ্নে বিভোর। মনের ভেতরে ডানা ঝাপটায়। ঘরের চালের উপরের লকলকে লাউডগার মত ইচ্ছেটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল।যেন দুঃখের এই চৌকাঠ ভেঙে তাকে যেতেই হবে বহুদূর। এই টানের বাইরে সে একজন অসুখী মানুষ!

সন্ধে হলেই একঘেয়ে ঝিঁঝির কান্না আর ঘরের সামনের সুন্দরী গাছটার পাতার ফাঁকে জমে থাকা কুচকুচে অন্ধকারে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তেমন কোনও কাজ তো তার ছিল না!

শুধু কুন্দপুর নয় প্রতিটি গ্রামের অন্ধকারে সাপ আর পাখিরবাসা মিশে থাকে।কেউ দুম করে খোঁজ নিতে এলে যোগেনের কানে ভেসে আসত সাপের জিভের চুক-চুক শব্দ। হয়ত পাখির মত উদাসীন একটা জীবন নিয়ে বেঁচে ছিল বলেই এসব মনেহত যোগেনের !

গ্রাম থেকে রওনা হল বিকেলের দিকে ।পশ্চিম আকাশ তখন হোলি খেলছে। যোগেনের মনে হল,আষাঢ়ের তুমুল বৃষ্টির ভেতর দিয়ে যেতে পারলে বেশ হত। তখন বৃষ্টি আর চোখের জল আলাদা করে চিনতে পারত না কেউ। যতই সে শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততই পালক হারানো দোয়েল পাখির করুণ শিস কানে আসছে । একসময় মনে হল কানে তালা লেগে যাবে। অথচ সে জানে ট্রেকারের ছাদে বসে থাকা চারপাশের কেউ এই ডাক শুনতে পাচ্ছে না! পাবার কথাও নয়!

ছেড়ে চলে যাবার মত বিরাট কষ্ট নিয়ে মানুষ জন্মায়। বহুকিছু তাকে ছাড়তে হয়। একটা মামুলি দিনের মধ্যেও কত কী ছাড়তে হয়! সহজে বুঝতে পারিনা আমরা । এসব দীনবন্ধু মন্ডল ট্রেকারে উঠবার আগে বলেছিল।

ট্রেকার থেকে নেমে বাস। অন্তত ঘন্টা দুয়েকের পথ। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। দীনবন্ধুর ডাকে চোখ খুলে দেখল বাসটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে অজস্র মানুষ।
যোগেন মিননিন করে বলল, এটা কোথায়?
দীনবন্ধু জবাব না দিয়ে যোগেনের লাইলনের ব্যাগখানা হাতে নিয়ে বলল, চলে এস। বাস থেকে নামতেই ঝপ করে অন্ধকারে ডুবে গেল চারদিক। লোডশেডিং।

আকাশে মস্ত চাঁদ।ষাঁড়ের মত একখানা মেঘ স্পষ্ট শিং বাগিয়ে ছুটে আসছে। খানিকটা এগিয়েই দীনবন্ধু দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছু ফিরে দেখল মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে যোগেন।
এগিয়ে গিয়ে যোগেনের কাঁধে হাত রেখে দীনবন্ধু বলল, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?

— চাঁদটা আজ বড়ই সুন্দর,তাইনা? উত্তর না পেয়ে আবার বলল, দ্যাখেন, কেমন একখানা মেঘের ষাঁড় ছুটে আসতিছে!

সেদিকে তাকিয়ে দীনবন্ধু বলল, শুধু ষাঁড়টা দেখলে চলবে কেন চাঁদটাকে দ্যাখো।
কিছুই হয়নি, কিচ্ছু হবে না এমন ভাব নিয়ে চাঁদ তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।

আলো ফিরল। যেন শহরটা একটা ছোট্ট ডুব দিয়েছিল অন্ধকারে।আবার মাথা তুলল। ঠান্ডা হাওয়া আসছে। বুড়ো ফনি-মনসার গাছের মত এবড়োখেবড়ো একটা বাড়ি।পুকুরের চারপাশে একপায়ে মাথা উঁচু করে তালগাছ দাঁড়িয়ে থাকার মত এখানেও আছে মস্ত ফ্ল্যাট।

ঘরে ফিরে দীনবন্ধু খিচুড়ি বসিয়ে গল্প জুড়ল, তোমার হয়ত খুব জানতে ইচ্ছে করছে কেন এখানে আনলাম তোমায়?
যোগেন মাথা ঝাকিয়ে সায় দিল।

–আজ যা বলব মন দিয়ে শুনবে। তোমার প্রথম কাজ হল দেখা ও মনে রাখা। দুজন মানুষের উপরে নজর রাখতে হবে। দুজনকেই আমি চিনিয়ে দেব।যা করবে তা সকলের আড়ালে।ধৈর্য্য রাখবে। মানুষ দুজন কখন কোথায় যাচ্ছে তা জানতে হবে।আর ওদের সংগীদের খুঁজে বের করতে হবে।অবস্থা যাইহোক কখনও পালাবে না। পরিচয় প্রকাশ পায় এমন কিছু পকেটে রাখবে না।

—আমি পারব?

— পারবে। আমি শিখিয়ে দেব। চোখ টানার মত পোষাক পড়বে না।খুব সাধারণ জামা কাপড় পড়বে।যেন সবার সংগে মিশে যেতে পার।চলাফেরা,কথাবলা সব হবে নর্মাল।কাজের জায়গার পাশের প্রতিটা রাস্তা, গলি, হোটেল,অফিস সব চিনে রাখবে।মানুষ দুটোকে এমন ভাবে চিনে নেবে যাতে শুধু মুখ দেখে নয়। চিনবে তাদের চেহারা,পোষাক, হাঁটা এসব দেখে।সবকিছু মাথায় গেঁথে রাখবে।

— যদি ধরা পড়ে যাই?

—একটা মনগড়া গল্প মনেমনে বানিয়ে রাখবে।কেউ জিজ্ঞেস করলে গড়গড় করে সব বলে যাবে। একটানা বললে মানুষ বিশ্বাস করে। থেমে- থেমে কিছু বললেই মানুষ তোমায় ধরে ফেলবে।ধারণা করবে তুমি মিথ্যে কথা বলছ।

—আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।যদি ওরা ধরে ফেলে আমায়!

— ভয় পেও না। তুমি ধরা পড়বে না। কারণ আমরা তোমার আশপাশে থাকব। তুমি শুধু তার চলার পথটুকু জেনে আসবে। যার পিছু নেবে সে টের পেলে, সন্দেহ করলে তাকে বুঝতে না দিয়ে সামনের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যাবে।যেন কিছুই জান না এমন ভাব করবে।এরপর অন্যজন তোমার মত পিছু নেবে।প্রয়োজন পড়লে আরও একজন…। এভাবে চলার নাম আছে, নামটা সুন্দর।

— কী নাম?
— দাদুরী। এভাবে যদি কারুর উপরে নজর রাখা যায় তবে সে কিছুতেই চোখের বাইরে যেতে পারবে না।

— আপনি কি পুলিশের লোক?

দীনবন্ধু হেসে জবাব দেয়, না।আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ।একটা সত্যি সামনে আনার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই করছি। এটা ঠিক যে, একসময় পুলিশের হয়ে কাজ করেছি। প্রয়োজনে ‘মেল রুজ’ ব্যবহার করব।

— সেটা কী?

—-গোপন কাজের মাধ্যমে চমকে দিয়ে কাজ হাসিল করা। এর জন্য ক্যুরিয়ারের লোক সেজে পার্সেল নিয়ে সরাসরি বাড়িতে চলে যেতে হবে। এবং বলতে হবে, মালিক ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না।মনে থাকবে?

— থাকবে।

বাইরে থেকে একটা পাখির করুণ ডাক শোনা যাচ্ছে। কোয়াক… কোয়াক…. কোয়াক।একটানা ডেকেই যাচ্চে। দীনবন্ধু এই ডাকটা চেনেন। বড়ভীমপাল ।মাঝেমধ্যেই পাখিটা তার চারপাশে এসে ডাকাডাকি করে আবার কোন গভীর জংগলে চলে যায়। কিছু কি বলতে চায়? কী বলতে চায়?
দীনবন্ধু গলা নামিয়ে জানতে চাইল, এই ডাকটা চেন?
— চিনি। ডাহুক পাখির ডাক।
দীনবন্ধু হাসলেন, ডাহুকের ডাক নয়। অন্যপাখি। এই পাখির নাম বড়ভীমপাল। এই পাখি নিজের ডাক বাদ দিয়ে অন্যের ডাক নিয়ে ব্যস্ত থাকে।আজ ডাহুকের ডাক নকল করেছে । আচ্ছা, পাখিরা একই শব্দ বারবার গেয়ে চলার কারণ জানো ?

যোগেন বলল, জানি না। আসলে এসব নিয়ে তো কখনও ভাবিনি। আপনিই, বলে দেন, আমি শুনি।

দীনবন্ধু বলে, আমরা পাখিদের যে শব্দগুলোকে ওদের গান ভাবছি আদতে সেগুলো পাখিদের কাছে শুধুই গান নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু।

—কী?

—পাখিরা এই শব্দের মাধ্যমে নিজের এলাকা ভাগ করে নেয় । কুকুররা যেমন মূত্রের গন্ধ দিয়ে নিজেদের এলাকা ঠিক করে। পাখিরা ঠিক তাদের এলাকা ঠিক করে চিৎকার চেঁচামেচির মাধ্যমে। যতটুকু অংশে ডাক ছড়িয়ে পড়ল ততটুকু এলাকা তার। এবার বুঝলে একই গান ওরা বারবার কেন ডাকে ওরা!

একটু থেমে দীনবন্ধু আবার বলতে থাকে, পাখিদের বেলায় চেঁচামেচির আরো একটা বাড়তি সুবিধা আছে। তা হল, পুরুষ প্রজাতির চেঁচামেচি নারী প্রজাতিদের আকর্ষণ করে। খুব চেঁচামেচি করলে অন্য পাখিরা তাকে বিরাট শক্তিশালী ভাবে । ডিমে তা দেবার সময় নারী পাখিরা অন্য কোনো কাজ করার ফুরসত পায় না। সন্তানদের নিরাপত্তার দিকটা এক্কেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময় বিপরীত লিঙ্গের যে পাখিটি তাকে আগলে রাখবে নারী পাখিটি তার সাথেই জোড়া বাঁধবে । আবার দ্যাখো শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্য চেঁচামেচির মানে আলাদা। শিশুরা চেঁচামেচির মাধ্যমে খিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এদিকে টিকটিকিরা বিপদ দেখলে লেজ খসিয়ে ফেলতে পারে। এতে শিকারি ঘাবড়ে যায়।লেজ কিছুক্ষণ নড়তে থাকে। শিকারি সদ্যকাটা লাফাতে থাকা লেজের দিকে তাকাতেই টিকটিকি পালিয়ে যায়।তোমাকেও বুদ্ধি করে পালিয়ে যেতে হবে। পারবে?

— পারব।

দীনবন্ধু ট্রাংক খুলে একটা ছবি বের করল। ছবির পেছনে পেনসিল দিয়ে ঠিকানা লেখা।
তারপর ফিসফিসিয়ে বলল,কদম খেতে কেমন লাগে তোমার?
— ভাল, টকটক জিনিস আমার পছন্দের।
দীননন্ধু হেসে উঠল,এই মিল আমি চাইনি যোগেন। এত মিল আমি চাইনি। কদম খাওয়া মানুষের কাছে প্রচুর খিদের গল্প থাকে, তাইতো?

যোগেন বড়বড় চোখে দীনবন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকে।


ক্রমশ…


পড়ুন, এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।