অপরিচিত

হিল্লোল ভট্টাচার্য on

১.

রোববারের সকাল, অভ্যাসবশতঃ আমাদের পুরনো কেমিস্ট্রির শিক্ষক ড. অদ্রীশ বসুর বাড়ি গেছি আড্ডা মারতে। ইনি ই একমাত্র অধ্যাপক যাঁর সাথে কলেজ ছাড়ার পর ও আমাদের ঘনিষ্ঠতা রয়ে গেছে। কিছুটা তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার আর কিছুটা নানান অদ্ভুৎ,ইন্টারেস্টিং শখ আমাদের আকর্ষিত করে রেখেছে। সারা জীবন নানান হবি নিয়ে কাটিয়েছেন, গত কয়েকবছর ধরে শখের গোয়েন্দাগিরি নিয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক।

ছেলেবেলা থেকে দেশি-বিদেশি রহস্যকাহিনী পড়ে গোয়েন্দার চেহারা সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা হয়ে আছে, তার কোনোটার সাথেই এবি কে মেলানো যায় না। লম্বা, মোটাসোটা, ঝুপো গোঁফ, মাথাজোড়া টাক। কম বয়সের ছবি দেখেছি, একেবারে আদর্শ বাঙালী জামাই মার্কা, দেখলেই মনে হয় এখুনি হাসিমুখে এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেন জামাইষষ্ঠি করতে। এটা নিয়ে পেছনে লাগলে বলেন, এটাই নাকি ওঁর ইউ এস পি! অপরাধী ধোঁকা খেয়ে যাবে। আর ওঁর মতে উন্নত নাসিকা, শানিত ছুরিকার মত ধারাল মুখ আর দীর্ঘাঙ্গ গ্রীক ভাস্কর্য্যের সাথে খুলির গ্রে ম্যটারের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। রবিবার বা অন্যান্য ছুটির দিনে জনা ছয়েক আসে। সবাই নিজের কর্ম ও পারিবারিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আস্তে আস্তে জনসমাগম টা কমে আসছে, বিশেষত যাদের ছোটো বাচ্চা আছে তারা প্রতি সপ্তাহে সময় করতে পারে না। বিশেষ ছুটির দিন গুলো তে সন্ধ্যায় আসর জমায় তারা।

রবিবারের আড্ডায় সব থেকে বেশি নিয়মিত রজত-নন্দিনী, সমীরণ আর আমি। রজত-নন্দিনী আমার ব্যাচের। ওদের কেমিস্ট্রি টা যতদূর মনে পড়ে এবি স্যারের ক্লাস থেকেই জমে উঠেছিল। রজত এবি র পদাঙ্ক পুরোপুরি অনুসরণ করেছে বলা যায়, একটা কলেজে সেও রসায়ন পড়ায়। নন্দিনী পেশায় ডাক্তার, হাজার টা নার্সিংহোম আর চেম্বারে প্র্যক্টিস করে পয়সার পেছনে ছোটে না বলেই হয়ত নিজেদের আর বন্ধুদের জন্য কিছুটা সময় এখনো বের করতে পারে। সমীরণ আমাদের থেকে দু বছরের জুনিয়র, এক ই কলেজের। বেশ কয়েকবছর ধরে তার বিয়ের কথা চলছে শুনছি কিন্তু চোর-ডাকাত দের পেছনে দৌড়ে আর সময় করে উঠতে পারছে না সম্ভবত। ডিউটি না থাকলে রবিবারে সে হাজির হয়। সব থেকে নির্ঝঞ্ঝাট আমি, বাড়ির লোকে বিয়ের জন্য বলে বলে হাল ছেড়ে দিয়ে এখন বুঝেছে আমি কনফার্মড ব্যাচেলর। আমার প্রথম, দ্বিতীয় ও শেষ প্রেম খেলা। ছোটোবেলা থেকে আমি ঠিক যেটা হতে চেয়েছি,সৌভাগ্যবশতঃ সেটাই আমার জীবিকা এখন। একটা বিখ্যাত বাংলা পত্রিকার খেলার পাতায় লিখি আমি, ক্রীড়া সাংবাদিক সৌভিক গুপ্ত। আজকাল খেলার বাইরে ছোটোখাটো গল্প, উপন্যাস লেখার ধান্দা করছি। যদিও বন্ধুদের মতে সেগুলো অতিমাত্রায় গাঁজাখুড়ি, পাতে দেওয়া যায় না,আমার নাকি স্পোর্টস জার্নালিজম টাই ঠিক আছে। তবে আমি লেগে আছি, হাল ছাড়ি নি পুরোপুরি।

আজ আমি ছাড়া আর কেউ আসে নি। বসবার ঘর থেকে দেখতে পাচ্ছি এবি হাতে একটা খবরের কাগজ নিয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। কথা শেষ হয়ে গেলে আমার সামনের টেবিলে খবরের কাগজ টা ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “নিশিথ চ্যাটার্জি মারা গেছেন, অস্বাভাবিক মৃত্যু। পুলিশ সন্দেহ করছে এটা হত্যাও হতে পারে।”
আমি একটু হাসি গোপন করলাম, স্যার এমন ভাবে বললেন যেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে লেস্ট্রেড আর গ্রেগসনের ফোন এসেছিল। স্যার কে খুশি করতে সমীরণ নির্ঘাৎ এইসব খবর দেয় মাঝে মাঝে। যাতে হাসি টা দেখতে না পান তাই আমি খবরের কাগজটা মুখের সামনে ঢাকনার মত তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম,
“নিশিথ চ্যাটার্জি কে? নামকরা কেউ?”
এবি খানিকক্ষণ অবাক হয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অবজ্ঞার স্বরে বললেন, “তুমি সাংবাদিক হয়ে দেখছি কোনো খবর ই রাখ না। আমাদের সময়ের বিখ্যাত অভিনেতা নিশিথ কুমার চ্যাটার্জি, ফিল্মে ‘নিশিথ কুমার’ নামটাই চলত।”

আমার এবার মনে পড়ল, বাবা কাকা দের কাছে নামটা শুনেছি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা বাংলার সব বিখ্যাত হিরোদের বেশিরভাগের ই পদবী চ্যাটার্জি হয় কেন বলুন তো? উত্তম কুমার, সৌমিত্র, বিশ্বজিত, শুভেন্দু, অনিল, শাশ্বত, প্রসেনজিত হয়ে হালফিলের আবীর, পরমব্রত সব্বাই!”
এবি গালে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলেন, “তাই? এটা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই নি তো, অবিশ্যি নিশিথ কুমার বাংলা-হিন্দি দুই ভাষাতেই চুটিয়েই কাজ করেছেন। ইনফ্যাক্ট তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রতিষ্ঠা হিন্দি ছবি করেই। উফফ কি সব সুপার হিট ছবি তখনকার দিনে। রোমান্টিক হিরো হিসেবে কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকতেই হঠাত করেই ফিল্ম করা ছেড়ে দেন| খুব বেশি দিন অভিনয় করেন নি, ফিল্ম জগতে তাঁর আবির্ভাব, উত্থান ও প্রস্থান সব কিছুই রহস্যে ঢাকা। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর একেবারেই প্রচারের আলোয় আসতেন না। তবে,আমাদের যৌবনে বিশেষত মহিলাদের মধ্যে তাঁর ফ্যানফলোয়িং ছিল ঈর্ষনীয়।”

কাগজে নিশিথ কুমারের একটা সাদা-কালো ছবি দেওয়া আছে। দেখলাম যৌবনে সত্যি অত্যন্ত আকর্ষনীয় চেহারা ছিল তাঁর। হলিউডের ক্যারি গ্রান্টের সাথে কিছু টা মিল আছে।
এবি বললেন, “দক্ষিণ কলকাতায় নিশিথ কুমারের বাসস্থানে দুর্ঘটনা টা ঘটেছে গতকাল বিকেলে, প্রতিদিনের মত ছাদে পায়চারি করতে গিয়ে কোনোভাবে নীচে পড়ে গিয়ে মৃত্যু। অ্যাক্সিডেন্ট, আত্মহত্যা, খুন তিনটের যে কোনো একটা হতে পারে। সমীরণ শিওর হতে পারছে না। আমি তৈরী হয়ে নিচ্ছি। তুমি রজত-নন্দিনী কে একবার ফোন করে দেখ ওরা সরাসরি ওখানে চলে আসতে পারে কিনা।”

গাড়ি তে যেতে যেতে খবরের কাগজ আর এবির স্মৃতি তে ভর করে নিশিথ কুমারের সম্পর্কে যা জানা গেল সেটা এরকম,
– নিশিথ কুমারের সেই অর্থে কোনো ফিল্মি ব্যাকগ্রাউণ্ড ছিল না। একেবারে অখ্যাতনামা এক থিয়েটার অভিনেতা থেকে কোনো গডফাদার ছাড়াই নিজের প্রতিভা আর অভিনয় দক্ষতার জোরে খ্যাতির শিরোনামে চলে আসেন। প্রথম হিন্দি ছবিই ব্লকবাস্টার হিট হয়ে রাতারাতি তারকার আসনে বসিয়ে দেয় তাঁকে। সমসাময়িক অভিনেতাদের অনেকেই ভেবেছিলেন ‘ওয়ান ম্যাচ ওয়ান্ডার’ তিনি, স্রেফ ফ্লুকে প্রথম ছবি হিট হয়েছে, পরেরগুলো বক্স-অফিসে মুখ থুবড়ে পড়বে। সবাই কে ভুল প্রমাণিত করে অত্যন্ত পরিশ্রমী অভিনেতা নিশিথ কুমার সোনার রথ ছুটিয়ে একের পর এক জুবিলি হিট ছবি উপহার দিতে থাকেন ইন্ডাস্ট্রি কে। রোমান্টিক অভিনয়ে এক ধরনের আধুনিকতা এনেছিলেন তিনি, কিছুটা হলিউডি ধাঁচে।

প্রতিভাবান অভিনেতা নিশিথ কুমার চরিত্রবান ছিলেন এমন বলা যায় না। নানা সময়ে বিভিন্ন অভিনেত্রীর সাথে নাম জড়িয়েছে তাঁর। স্ক্যান্ডাল এক সময়ে এতটাই মাত্রা ছাড়ায় যে তাঁর স্ত্রী পারিবারিক অশান্তির জেরে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। নিশিথ কুমারের মতই তাঁর স্ত্রী অপর্ণা ছিলেন খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত
ঘরের মেয়ে। অন্য নারীর সংগে স্বামীর অবৈধ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন নি। এই ঘটনার পর নিশিথ কুমার একেবারেই ভেঙে পড়েন। ১০ বছরের সিনেমার কেরিয়ারের ইতি ঘটিয়ে শিশুপুত্র কে নিয়ে একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। সেই অজ্ঞাতবাসের সময় কোথায় ছিলেন, কি করেছেন ঠিক জানা যায় না।
বছর দশেক আগে বাপ-ছেলে মিলে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন, দক্ষিণ কলকাতায় পৈত্রিক বাড়ির অনেক সংস্কার করে বসবাস শুরু করেন। জানা যায় একেবারেই বাহুল্যবর্জিত সাধারণ জীবন যাপন করতেন এক কালের রূপালি পর্দার গ্ল্যামার কিং।

 

২.

ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখলাম নির্মেদ পেটান চেহারায় সমীরণ বাইরে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবে কি যেন ভাবছে। আমরা আসতে মাটিতে মার্ক করা একটা জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “এই খানে পড়ে ছিল লাশ টা”। তিনজনেই বার কতক উপর-নীচে দ্রুত দৃষ্টিপাত করলাম, যেন মানসচক্ষে দেখতে চাইছি ঠিক কোন পথে প্রয়াত অভিনেতার দেহ টা জমিতে এসে পড়েছে। ছাদের রেলিঙের একটা অংশে সারাইয়ের কাজ চলছিল, সেই কাঁচা গাঁথনির কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে লাশের সাথে। সমীরণ গতকাল ই এসেছিল, রুটিন মাফিক পুলিশি তদন্ত করে দেহ পোস্ট-মর্টেমে পাঠিয়ে দিয়েছে। আজ দিনের আলোয় এসেছে ক্লু এর সন্ধানে। ঘনঘন মাথা চুলকানো দেখে মনে হচ্ছে ভেবে খুব একটা কুলকিনারা করতে পারছে না।

ইতিমধ্যে নন্দিনী এসে পৌঁছেছে, রজত কোনো একটা কাজে আটকে পড়ায় সে একাই উপস্থিত। সমীরণ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এলে তাকে দেখিয়ে তার একটা মতামত নেবে বলে জানিয়ে রাখল।
“উঁহু, সে তোমরা দেখতেই পার, তবে আমার একটা হাঞ্চ হচ্ছে পোস্ট-মর্টেম, ডিটেইল ফরেন্সিক রিপোর্ট এ ক্ষেত্রে খুব বেশি সাহায্য করবে না, শুধু ছাদে পায়ের ছাপ ছাড়া। সেটাও বোঝা কঠিন হয়ে যাবে যদি না বুঝে শুনে পাড়ার এক গাদা লোক পুলিশ এসে পড়ার আগে ছাদে গিয়ে কৌতুহল নিরসন করতে যায়।”
এবি মাথা নেড়ে বললেন, ভ্রূকুঞ্চিত মুখে।

সমীরণ তার এক সহকর্মী কে দিয়ে লাশের এনলার্জ করা ছবি আনতে নির্দেশ দিল। রোল করা ছবিটা খুলতে খুলতে বলল, “আজ সকালেই প্রিন্ট করে আনা হয়েছে। দেখুন যদি কিছু হদিশ মেলে।”
এবি একটু অবাক হয়ে বললেন, “বডি টা চিৎ হয়ে পড়ে ছিল, না ছবি তোলার জন্য তোমরা টার্ন করেছ?”
“এই ভাবেই পড়েছিল,প্রত্যক্ষদর্শী দের বয়ান অনুযায়ী”
“হুমমম, তা হলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা টা নির্দ্বিধায় বাদ দিতে পার” এবি বলেন
“হ্যাঁ স্যার, কাল সবার সাথে কথা বলে আমার ও সেরকম ধারণা হচ্ছিল, ইদানিং কালে এমন কিছু ঘটেনি বা তাঁর আচরণে এমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় নি যা আত্মহত্যার পাল্লা টা ভারী করে। শুধু একটা জিনিস মনের মধ্যে খচখচ করছিল”
“কি জিনিস?”
“স্যার, বহু বছর আগে নিশিথ কুমারের স্ত্রী ও বাড়ির ছাদে উঠে গায়ে আগুন লাগিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিলেন” – চিন্তিত শোনাল সমীরণের স্বর
এবি একটু চমকালেন, অগ্নিদগধ হওয়ার কথা জানলেও, ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার ব্যপার টা তিনি জানতেন না।

নন্দিনী ই প্রথম আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, “স্যার দেখুন নিশিথ কুমারের মুখে একটা আতঙ্কের ছাপ আছে, মনে হয় মৃত্যুর ঠিক আগে কোনো কারণে উনি খুব ভয় পেয়েছিলেন।”
খানিকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে তারিফের স্বরে এবির জবাব, “সাবাস নন্দিনী!, ওয়েল ডান”
এরকম সময় বাড়ির ভেতর থেকে দুজন কে বের হয়ে আসতে দেখা গেল। একজন বছর তিরিশের যুবক, আরক্ত দৃষ্টি তার, অন্যজন ক্ষীণকায় অবাঙালী, রংবেরং এর পাগড়ী দেখে মনে হয় রাজস্থানী। প্রৌঢ়ের পোশাক-আশাকে দাড়িদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট।
ধীর গলায় অনুনয়ের স্বরে প্রৌঢ টিকে কিছু বলতে শোনা যায়
যুবক টি বিরক্তির সাথে গলা তুলে জবাব দেয়, “নেহি, আভি সহি ওয়াক্ত নেহি ইয়ে সউদে কি বাত করনে কি।”

কাতর দৃষ্টিতে আমাদের সবার দিকে একবার তাকিয়ে প্রৌঢ় মাথা নাড়তে নাড়তে ধীর পায়ে নিষ্ক্রান্ত হলেন, যুবক টি ভেতর দিকে চলে যায়।
সমীরণ জানায়, “নিশিথ কুমারের একমাত্র ছেলে, ইন্দ্রজিৎ, বলিউডের নামকরা মিউজিক ডাইরেক্টর, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে আজ ভোরের ফ্লাইটে মুম্বই থেকে এসেছে।”
এবার বুঝলাম সারারাত জাগার ফলে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে ইন্দ্রজিতের।
“চলুন একবার ভেতরে যাওয়া যাক, সবার সাথে কথা বলবেন”
এবি, আমি আর নন্দিনী মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। একটু অস্বস্তি হচ্ছে, কি পরিচয়ে এই এক্স্ট্রা তিনটে লোক ইন্স্পেক্টর সমীরণ ভৌমিকের সাথে ভেতরে ঢুকে তদন্ত করবে?”
তবু কিছুটা দোনমনায় ভোগার পর আমরা ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমেই বসবার ঘরে ইন্দ্রজিতের সাথে দেখা হয়ে গেল।
সে আমাদের দেখে অবাক হয়ে সমীরণ কে জিজ্ঞেস করল, “এনাদের পরিচয়?”
“আমার বন্ধু ড নন্দিনী চ্যাটার্জি, জার্নালিস্ট সৌভিক গুপ্ত, আর আমার কলেজের প্রফেসর ড অদ্রীশ বোস” – সমীরণের কথার সাথে সাথে আমরা নমষ্কার জানাই।
“তো?” প্রতিনমষ্কার জানিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ইন্দ্রজিতের।
“আমাকে তদন্তের কাজে সাহায্য করতে এসেছেন” – সমীরণের গলায় অস্বস্তি ধরা পড়ে।
“এক্সকিউজ মি, আমি কোনো প্রাইভেট ডিটেক্টিভ নিয়োগ করি নি কাজেই আপনার ডিপার্টমেন্টের বাইরে কাউকে এন্টারটেইন করতে পারছি না, সরি”
সমীরন অপ্রস্তুত স্বরে কিছু জানাতে যায়, এবি তার কাঁধে হাত দিয়ে বারণ করেন,
“উঁহু, উনি যা বলছেন একদম ঠিক, নিজের এক্তিয়ারে থেকেই বলছেন, বরং আমরাই ইন্ট্রুড করেছি বলা যায়| তুমি কাজ মিটিয়ে সোজা আমার বাড়ি চলে এস, আমরা অপেক্ষা করছি|
“সরি স্যার, আমার জন্য ফালতু আপনাদের অপমানিত….”
“ধুর ছাড় তো, সত্যসন্ধানে এসব তুচ্ছ ইমোশনের কোনো জায়গা নেই, নমষ্কার ইন্দ্রজিৎ বাবু, মন বলছে খুব শিগগির আবার আমাদের দেখা হবে, চলি বাই।”
————————————
বাড়ি ফিরে নন্দিনী প্রথম মুখ খুলল, “সিমস লাইক আ টাফ নাট টু ক্র্যাক”
“হুম, বড় শক্ত ঠাঁই ইন্দ্রজিৎ চাটুজ্জ্যে” – সম্মতি জানালেন এবি
“অতঃপর?” জিজ্ঞেস করলাম আমি
“শীতল সমীর কবে আসিবে অভ্যন্তর
অপেক্ষিব মোরা, নাহি গত্যন্তর” –
যাক, সত্যি তাহলে অপমান টা গায়ে মাখেন নি এবি, হাল্কা মুডে ছড়া কাটা দেখে স্বস্তি পেলাম আমি আর নন্দিনী।

ঘণ্টা খানেক পর সমীরণ এসে আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করতে এবি হাতের ইশারায় ধূলো ঝাড়ার ভঙ্গী করে উড়িয়ে দিতে বললেন। কথা শুরু করার আগে মাসিমার কড়া নির্দেশে লুচি, ছোলার ডাল আর পায়েস খেয়ে নিলাম। কলেজের সময় থেকেই এবির বাড়ির স্বর্গীয় খাবার দাবারে আমরা কেউ কখনো আপত্তি করি না। এই জোরাজুরির পেছনে নিঃসন্তান দম্পতির যে এক ধরনের অপত্যস্নেহ লুকিয়ে আছে, তা আমরা খুব কাছের কয়েক জন সেই বয়সেই বুঝে গেছিলাম। সমীরণ আর নন্দিনী খুব স্বাস্থ্য-সচেতন ও স্বল্পাহারী। অন্যদিকে আমি, রজত আর স্যার পুরোমাত্রায় ভোজনরসিক।

সমীরণ শুরু করে,
“বাড়ি টা অদ্ভুৎ, ঠিক বিপরীতধর্মী দুটো চরিত্রে বিভক্ত। যে অংশটায় নিশিথ কুমার থাকতেন সেখানে বিলাস বৈভবের কোনো চিহ্ন নেই। না একটাও পুরনো সিনেমার পোস্টার না কোনো পুরষ্কার, মনে হয় নিজের অভিনয় জীবনের সমস্ত স্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছেন। অন্য দিকে ইন্দ্রজিতের অংশ টা ঠিক একজন সফল সঙ্গীত পরিচালকের বাড়ি যেমন হওয়া উচিৎ ঠিক এমন ই। শোকেস ভর্তি ট্রফি, নিজস্ব বার, দেশ-বিদেশের শো পিস এর কালেকশন। বেশ শৌখিন মানুষ বোঝা যায়। তবে, কাজের জন্য বেশির ভাগ সময় ই ইন্দ্রজিৎ মুম্বই তে থাকেন। সেখানেও অভিজাত পল্লী তে ফ্ল্যাট তাঁর।
বাড়িতে বাপ-ছেলে ছাড়া দুজন কাজের লোক, একজন নিশিথ কুমারের বহু পুরনো সঙ্গী মোহন, সে রাতেও বাড়ি তেই থাকে দেখাশোনা করার জন্য। রান্নার লোক নবকুমার সকাল বিকেল রান্না করে ফিরে যায়। এছাড়া কমলার মা দুবেলা বাসন মাজা, ঘর মোছা ইত্যাদি করে দিয়ে যায়। যে সময়ে ঘটনা টা ঘটে, তখন বাড়িতে তিনজন ই উপস্থিত ছিল। আপনার জন্য বয়ানের একটা কপি নিয়ে এসেছি।”
হাত বাড়িয়ে জবানবন্দীর কপি টা নিলেন এবি, একবার ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে রেখে দিলেন, “পরে দেখব” বলে। কপালে বলিরেখা, চিন্তার ছাপ সুস্পষ্ট।
“আমি শুধু ভাবছি, ওই বুড়ো রাজস্থানী টি কে? কিসের সউদা তার সাথে ইন্দ্রজিতের?”

 

৩.

পত্রিকার দপ্তর থেকে সবে ফিরেছি, স্যারের ফোন, “সৌভিক, এখন ই একবার আসতে পারবে?” ক্লান্ত ছিলাম, তবু রহস্যের গন্ধ পেয়ে বললাম,
“রজত-নন্দিনী কে বলব? সমীরণ আসছে?”
“রজত নন্দিনী কে ছেড়ে দাও, শুক্রবার সন্ধ্যা, ওরা একটু ওদের মত কাটাক, সমীরণ আমার এখানেই আছে। তুমি এস অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল”
একটু মনক্ষুন্ন হলাম, এই যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ ব্যাচেলর দের মনুষ্যপদবাচ্য মনে করে না এটা আমার ভীষণ নাপসন্দ। বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়দের কাছে
প্রায়শই শুনতে হয়, “তোর আর কি? একলা মানুষ, রাতে থেকে যা কিম্বা তোর আবার কি কাজ বাড়িতে, ঝট করে অমুক জায়গায় চলে আয় বা তমুক কাজ টা করে দে ভাই” ভাবখানা এমন যেন ব্যাচেলর দের প্রাইভেসি বলে কিছু নেই বা উইকেন্ডে নিজের প্ল্যান মাফিক কিছু করার এক্তিয়ার নেই!
যাই হোক, বিবাহিত পুরুষদের দুর্গতির লিস্ট মনে করে নিজেকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে মনটা হালকা হলে যাবার জন্য তৈরী হলাম।

এবির লিভিং রুমে বসে জানা গেল এই কেসে সমীরণের প্রোগ্রেস রিপোর্ট খুব ই হতাশাজনক, এখনো পর্যন্ত। গত প্রায় এক সপ্তাহে সে বিশেষ কিছুই এগোতে পারে নি, ধোঁয়াশা যে রকম ছিল তেমন ই আছে। তার ঘন ঘন মাথা চুলকানো আর ঝুলে পড়া কালো মুখ দেখে বেচারির প্রতি একটু করুণা ই হল।
স্যার দেখলাম স্বভাবসিদ্ধ আলসেমি ঝেড়ে খুব সিরিয়াস মুখে পায়চারি করছেন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হল, গুরু শিষ্য মিলে যে খুব একটা কুলকিনারা করতে পারছেন না, সেটা বোধ হয় আঁতে লেগেছে। এবি সোফার কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, “সৌভিক, একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করছি, খুব ভেবে চিন্তে উত্তর দাও।”

ঘাবড়ে গেলাম, কি এমন জীবন মরণ প্রশ্ন আমার কাছে?
“তোমার রিপোর্টার বন্ধুদের মধ্যে সেরা লোক কে আছে যে এখনকার বলিউড মিউজিক বা মিউজিক ডাইরেক্টর দের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে ওয়াকিবহাল? প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া যে কোনো একটা হলেই চলবে।”
শ্বাসরুদ্ধ করে শুনছিলাম, হাঁফ ছেড়ে মনে মনে ভাবলাম, “ওহ হরি,এই প্রশ্ন? তার জন্য এত নাটকীয়তা?”
একটু ভেবে বললাম, “আমাদের ম্যাগাজিনের ঐন্দ্রিলা এই ব্যাপারে হেল্প করতে পারে। ফিল্ম বা মিউজিক রিলেটেড স্টোরি গুলো ওই করে আর রবিবারের কলামে এই জাতীয় ইন্টারভিউ গুলোও ও নেয়।”
“তোমাকে আমি বললাম না ঐন্দ্রিলার কথা? আমি নিয়মিত পড়ি, খুব ভালো লেখে” – মুখ তুলে দেখি পর্দার কাছে মাসিমা এসে দাঁড়িয়েছেন হাতে আমাদের পত্রিকার একগাদা দৈনিক ও পাক্ষিক সংস্করণ। “এই দেখ মাস দুয়েক আগে কি একটা অ্যাওয়ার্ড পাবার পর ইন্দ্রজিতের একটা ইন্টারভিউ করেছিল, আমি খুঁজে রেখেছি”।

একবার সপ্রশংস দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছোট্ট “হুঁ” বলে খুব মনোযোগ দিয়ে ইন্টারভিউটা পড়তে থাকলেন এবি। মনে হল আমাদের উপস্থিতিতে এর থেকে বেশি অ্যাপ্রিসিয়েশন হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আমি আর সমীরণ চোখের চাউনিতে একটা চোরা হাসি আদানপ্রদান করলাম।

পড়া শেষ করে তারিফের স্বরে বললেন, “খুব ভালো লিখেছে মেয়েটি। লেখার স্টাইল টা যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনি অ্যানালিটিকাল। ভাবনাচিন্তায় গভীরতা রয়েছে আর মিউজিক সম্পর্কে তোমরা আজকাল যাকে বল বেশ ‘ফান্ডা’ আছে।

আজ বোধ হয় আমার মনক্ষুন্ন হবার দিন, কই আমার লেখা ম্যাচ রিপোর্ট বা ক্রিকেটার দের ইন্টারভিউ পড়ে কোনোদিন তো এত ভালো বিশেষণ ব্যাবহার করেন নি স্যার! হিন্দিতে বোধহয় এটাকেই বলে ‘ঘরকা মুর্গী ডাল বরাবর’।
“এখনই একবার কথা বলা যায় মেয়েটির সাথে?”
“শিওর” – মোবাইল এর কন্ট্যাক্ট থেকে ঐন্দ্রিলার নাম্বার খুঁজে ডায়াল করলাম। কেস টার ব্যাকগ্রাউন্ড আর এবির পরিচয় দিয়ে অর্থাৎ গৌরচন্দ্রিকা টা সেরে স্যার কে ফোন টা দিয়ে দেব ভেবেছিলাম। ঐন্দ্রিলা বারবার করে ওর বাড়ি তে আসতে বলল, ডিটেলস এ কথা বলতে সুবিধে হবে মুখোমুখি বসলে। এবি তো হাতে চাঁদ পেলেন তবু ও ফোন টা নিয়ে একটু শান্তিপুরি ভদ্রতার স্বরে বললেন,
“না না হুট করে চলে আসলে তোমাদের অসুবিধে হবে, বরং অন্য আরেক দিন……”
” না না কোনো অসুবিধে নেই স্যার, একদম নির্দ্বিধায় চলে আসুন”। ঐন্দ্রিলার স্বামী মুকেশ অবাঙালী হলেও ঝরঝরে বাঙলা বলে। ছেলেটি ভীষণ ভদ্র আর আন্তরিক। ওপাশ থেকে সেও বারবার করে অনুরোধ করায় আমরা গাত্রোথ্বান করলাম।

মিনিট পঁয়তাল্লিশ পর ঐন্দ্রিলার বাড়ি পৌঁছে দেখি সে সান্ধ্য স্ন্যাক্স এর এলাহি আয়োজন করেছে। অফিস থেকে ফেরার পর এবি আমাকে অবকাশ দেন নি, খিদেটা জাঁকিয়ে পেয়েছিল, আমি দ্বিরুক্তি না করে পকোড়া, পেস্ট্রি জাতীয় সুখাদ্যে মনোনিবেশ করলাম। এবি ও দেখলাম দুএকবার মৃদু আপত্ত্রির স্বরে
“এসব ঝক্কি আবার কেন করতে গেলে, মা?” বলে প্লেট টা টেনে সোৎসাহে তার সদব্যবহার শুরু করলেন।
এবি ব্যাখ্যা করে বললেন, “ইন্দ্রজিতের কর্মজীবনের সাথে হয়তো এই কেসটার একটা যোগসূত্র থাকতে পারে। তুমি যতটা জান, বল; পার্সোনাল লাইফেরও যদি কিছু জানা থাকে বাদ দিও না। আমার কাছে পুরোটাই অন্ধকার, সুতরাং এনিথিং অ্যান্ড এভরিথিং হেল্প্স।”

ঐন্দ্রিলা একটু ভেবে বলল, “পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না দুটো ঘটনা ছাড়া। ১) এক গায়িকার সঙ্গে লিভ-ইন করতেন মুম্বই এ, বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি সম্পর্ক টা, তার আগেই ভেঙে যায়। ২) বাবার সম্পর্কে খুব উদাসীন ছিলেন, খুব একটা ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয় না।
ইন্টারভিউয়ে বারবার বাবার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন। নিজের সাফল্য ও তার রেকগনিশন নিয়ে এত কথা খরচ করলেন যে একটু অবাক ই হচ্ছিলাম। বড্ড বেশি নিজেকে জাহির করেন ভদ্রলোক।

স্টোরি টা করার জন্য ওনার গান নিয়ে রিসার্চ করেছিলাম, শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সব গান ই প্রায় শোনা। কেরিয়ার টা খুব অদ্ভুৎ, প্রথম ৫ বছর তেমন কোনো সাফল্য নেই, গান গুলোও সাদামাটা, তেমন দাগ কাটেনি কোনোটাই। সেভাবে কোনো সিগনেচার স্টাইল ও ছিল না। হঠাৎ গত তিন বছর ধরে ইন্দ্রজিতের ভাগ্যের চাকাটা আচমকাই বদলে যায় এক ভিন্ন ধারার গানের হাত ধরে”

“কোন ঘরানার গান সেটা?” – এবির স্বরে উত্তেজনা ধরা পড়ে।
“সুফি আর ফোক”

“বাঙলা ফোক”? এবার প্রশ্ন সমীরণের

“না সেটাই আশ্চর্যের, পাঞ্জাবী, গুজরাতী, রাজস্থানী বা মধ্যপ্রদেশের প্রভাব টাই বেশী” – ঐন্দ্রিলা জবাব দেয়
“তা আশ্চর্যের কেন? অনেক বাঙালী সঙ্গীত পরিচালক তো ভিন রাজ্যের গান নিয়ে কাজ করেছেন”
“ইন্দ্রজিতের গানের গুরু যাঁরা বা যে মিউজিক ডাইরেক্টর দের প্রভাব ওনার উপর আছে বলে নানা যায়গায় উনি দাবী করেছেন তাদের কারোর সঙ্গেই সুফি বা ফোক এর কোনো যোগ নেই, প্রথম দিকের কাজ দেখলেও খুব একটা রেফারেন্স পাওয়া যায় না। হঠাৎ করে কেরিয়ারের মাঝপথে জনরা চেঞ্জ করা টা একটু অস্বাভাবিক নয়?”

“ঐন্দ্রিলা, তুমি আমাকে ইন্দ্রজিতের রিসেন্ট পাস্টের সব কটা হিট অ্যালবামের নাম একটু লিখে দিতে পারবে?”
“ও শিওর” বলে একটা প্যাড টেনে নিয়ে খসখস করে কয়েক টা ফিল্ম আর নন ফিল্ম অ্যালবামের নাম লিখে দিল ঐন্দ্রিলা।
“খুব উপকার করলে মা, অনেক গুলো গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন পাওয়া গেল”
“ইট’স নাথিং স্যার, আবার কোন দরকার হলেই জানাবেন” – হেসে জবাব দেয় ঐন্দ্রিলা।
আমি আর সমীরণ ও ঐন্দ্রিলার হেল্প ও সান্ধ্য জলযোগের জন্য আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লাম।

ফেরবার পথে একটাও কথা বললেন না এবি, খুব গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। বাড়ির কাছে পৌঁছে বললেন, “তোমাদের অনেক ক্ষণ আটকে রেখেছি, আজ আর রাত বাড়িও না। কালকের দিন টা আমাকে একটু ভাবতে দাও। পড়শু অর্থাৎ রোববার একবার সুরঞ্জন বাবুর বাড়ি যাওয়া যাবে, সবাই মিলে”।
“কে তিনি?”
“সুরঞ্জন কে বলতে পারো ঐন্দ্রিলার অতীতের সংস্করণ। পুরনো সিনেমা আর গানের চলমান ডিকশনারি তিনি। একাল আর সেকালের তথ্য গুলো জোড়া দিয়ে ব্রিজ টা বানাতে পারলেই পুরো ব্যাপার টা পরিস্কার হবে মনে হয়।”

বিদায় নেওয়ার আগে কি যেন হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় সমীরণ বলে, “ও স্যার বাই দ্য ওয়ে, এত কথার মাঝখানে আপনাকে বলতেই ভুলে গেছি, ছাদের পায়ের ছাপের রিপোর্ট এসেছে। সবকটাই আইডেন্টিফাই করা গেছে, সকালে কাজ করে যাওয়া মিস্ত্রী অনিল আর হাবু, তিনজন কাজের লোক, বয়ষ্ক প্রতিবেশী পালবাবু আর স্বয়ং নিশীথকুমার ছাড়া অন্য কোনো পায়ের ছাপ নেই।”

এবি অবাক হয়ে সমীরণের দিকে তাকালেন। খুব বিভ্রান্ত লাগছে তাঁকে। মনে হল যেন টুকরো টুকরো তথ্য, অনুমান, যুক্তি দিয়ে খাড়া করা ব্রিজ টা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতন।

 

৪.

রোববার সকালে পৌঁছে দেখলাম রজত, নন্দিনী আর সমীরণ আগেই এসে পড়েছে কিন্তু এবির দেখা নেই। মাসিমার কাছে কফি, ফ্রেঞ্চ টোস্ট ছাড়া আর যেটা পাওয়া গেল সে খবরটা হল, স্যার গতকাল সারাদিন ধরে অনেক বার ইন্দ্রজিতের গান বাজিয়ে বাজিয়ে মাসিমাকে বিরক্ত করেছেন। কয়েক বার নাকি কাকে একটা ফোন করে স্পিকারের সামনে ধরে গান গুলো শুনিয়েওছেন। আজ একেবারে সাত সকালে তালুকদার নামে তাঁর এক সঙ্গীত সমঝদার বন্ধুর বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়েছেন ওই ব্যাপারেই কিছু একটা পরামর্শ করতে, বলে গেছেন সাড়ে ৯টা-১০ টার মধ্যেই ফিরে আসবেন, আমরা যেন অপেক্ষা করি।

সোয়া দশটা নাগাদ এবি ফিরলেন বেশ ফুরফুরে মেজাজে পুরনো দিনের একটা গান গুনগুন করতে করতে। হাসি মুখে বললেন, মেঘ খানিকটা কেটেছে মনে হচ্ছে। পরে সব বলব, তবে চল আগে সুরঞ্জন দত্তর বাড়ি টা সেরে আসি।

সুরঞ্জন বাবু বেশ পয়সাওলা শৌখিন লোক, অভ্যর্থনা দেখে মনে হল খোলামেলা, দিলদার গোত্রের মানুষ উনি আর আড্ডাবাজ ও। আমরা ছাড়া আরেক ভদ্রলোক লিভিং রুমে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনা চক্রে তিনি ও পুরনো দিনের ফিল্মের একজন ডাইরেক্টর, শিশির দে, এখন অবশ্য আর সিনেমা বানান না। চা খেতে খেতে এবি কাজের কথায় এলেন। তিনি যেটুকু জানেন সেটা ব্রিফ করে দিয়েছেন আগেই যাতে এক ই গল্পের রিপিটেশনে অযথা সময় নষ্ট না হয়।
কথার সূত্র ধরে সুরঞ্জন বাবু বললেন,

“হ্যাঁ, আপনি মোটামুটি অনেক টাই ঠিক জানেন, আমি বাকি জায়গা গুলো তে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। অপর্ণা দেবীর আত্মহত্যার পর নিশিথকুমার খুব ভেঙে পড়েন। উনি নিজের বিলাস বৈভবপূর্ণ জীবন যাপন, গ্ল্যামারের আলোয় ঢাকা তথাকথিত স্টারডম কে এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য দায়ী করেন। এক ধরনের অপরাধবোধ ও গ্লানিতে তিনি ধীরে ধীরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং অভিনয় জীবন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। মুম্বই এর বাড়ি বিক্রি করে উত্তর বঙ্গের এক হিল-স্টেশনে চলে আসেন। অপর্ণা মুম্বই এর শোরগোল খুব একটা পছন্দ করতেন না, বারবার ই শেষ জীবন টা নির্জন কোনো পাহাড়ের কোলে কাটাবার কথা বলতেন। সে কথা মাথায় রেখেই এবং নিজেকে লোকচক্ষূর অন্তরালে রাখার জন্য সেই শৈলশহরে এক নতুন জীবন শুরু করেন নিশিথকুমার শিশুপুত্র ইন্দ্রজিৎ কে নিয়ে।

ইন্দ্রজিৎ ওখানেই স্কুলে ভর্তি হয়। জীবন ও তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে, এরকম সময় নিশিথকুমার হঠাৎ করেই এক সাধুর সংস্পর্শে আসেন, স্বামী অন্নেষণানন্দ মহারাজ। স্বামীজি বলতে গেলে তাঁর জীবন কে একরকম বদলে দেন। তাঁর সান্নিধ্যে এসে নিশিথকুমার যেন গ্লানি ভুলে সামনের দিকে তাকাবার একটা দিশা পান। তাঁর বাহ্যিক আচার আচরণে অনেক পরিবর্তন আসে। আমিষ পুরোপুরি ত্যাগ করেন, দিনের অনেক টা সময় প্রাণায়াম, ধ্যান ও হিন্দু ধর্মের উপর লিখিত বই পত্র পড়ে কাটাতেন। শোনা যায় স্বামীজি মহারাজ নাকি তাঁকে বাকি জীবনে কখনো মিথ্যেভাষণ বা সত্যগোপন না করতে উপদেশ দেন। এটা নাকি এক ধরনের পাপস্খালনের প্রক্রিয়া, যেহেতু এক দিক দিয়ে দেখলে নিশিথকুমারের অবৈধ সম্পর্ক ও স্ত্রীর কাছে তা গোপন করাই অপর্ণাদেবীর আত্মহত্যার মূল কারণ।

ধীরে ধীরে নিশিথকুমারের পাপবোধ অনেক লাঘব হয় এবং এক সম্পুর্ণ নতুন মানুষে পরিণত হন তিনি। জানা যায় সত্যি বাকি জীবনে কখনোই মিথ্যে কথা বলেন নি তিনি। ইন্দ্রজিৎ স্কুল, কলেজ পাশ করে যখন কলকাতায় ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হবে, নিশিথকুমার ও কলকাতায় আসবার সিদ্ধান্ত নেন। হয়তো ভিটের টান, একটা বয়সে মানুষ ফিরতে চায়। নিজেদের বসতবাড়ি টার অনেক টা সংস্কার করিয়ে বাপছেলে তে থাকতে শুরু করেন”।

একটানা অনেক টা বলে থামলেন সুরঞ্জন বাবু। এবি ভ্রূ কুচকে কি যেন ভাবছেন। রজত বলে ওঠে,
“এর পরের ঘটনা বোধ হয় আমাদের অনেকটাই জানা, তাই না?”
সমীরণ ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।

“সত্যি মানুষের কত রকম পরিবর্তন হয় তাই ভাবছি, ওই রকম ভোগবিলাস থেকে একেবারে প্রায় সাধকের জীবন” – নন্দিনীর মন্তব্য।
এতক্ষণ চুপচাপ চা খাচ্ছিলেন শিশির বাবু, এবার ঠক করে কাপ টাকে টেবিলে নামিয়ে তেতো স্বরে বললেন,
“সরি, আমার কথা হয়তো আপনাদের একটু বেসুরো শোনাবে। আপনারা সবাই দেখছি নিশিথকুমার কে সাধু-সন্যাসীর আসনে বসিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু আমার যে ক্ষতি ভদ্রলোক করেছেন তাঁর জন্য আমি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবো না”!

আমরা সবাই অবাক হয়ে শিশির বাবুর দিকে তাকালাম, তাঁর আবার কি ক্ষতি করেছেন নিশিথকুমার? গল্পে নতুন টুইস্ট!
“এটা সেই সময়ের কথা যখন নিশিথকুমার কেরিয়ারের মধ্যগগনে। ইন্ডাস্ট্রির হায়েস্ট পেইড অ্যাক্টর। আমি ও কিছু ছবির নির্দেশনা করে মোটামুটি নাম করেছি। আমার বহুদিনের বাসনা ছিল “হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলস” এর ছায়া অবলম্বনে একটা ফিল্ম করব, বলতে পারেন আমার ড্রিম প্রোজেক্ট। খুব যত্ন করে স্ক্রিপ্ট করেছিলাম, প্রধাণ চরিত্রে নিশিথকুমার, ওঁকে অ্যাপ্রোচ করা হলে স্টোরী লাইন শুনে তিনি হ্যাঁ করে দেন। ব্যস্ততম অভিনেতা, ধৈর্য ধরে পুরো স্ক্রিপ্ট পড়ার সময় নেই তাঁর, বোধহয় একের পর এক রোমান্টিক ছবি করে ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে ঊঠেছিলেন তাই অন্যধরনের ছবি শুনেই এক কথায় রাজি হয়ে যান।

মাস ছয়েক পরের ডেট পাওয়া গেল। এদিকে প্রোডিউসার জোগার করতে মুশকিল হচ্ছিল, হিট ছবির ফর্মুলার বাইরে এসে নতুন কিছু ট্রাই করতে ভরসা পাচ্ছিলেন না প্রযোজক রা। বিগ বাজেটের ফিল্ম, কুড়িয়ে বাড়িয়ে কিছু টাকা কোপ্রোডিউসার এর থেকে পাওয়া গেলেও সিংহভাগ অর্থের সংকুলান হচ্ছিল না। অনেক ভেবে আমার যা কিছু ছিল আর অনেকখানি ধার করে নিজেই নির্মাতা নির্দেশক হিসেবে ছবিটা শুরু করে দিলাম। বেশ খানিক টা শুটিং হবার পর ঘটল সেই দূর্ঘটনা। ইন্ডাস্ট্রির কেউ কেউ জানলেও এই ছবির সঙ্গে যুক্ত আমরা কেউ ই জানতাম না, যে নিশিথকুমারের অ্যাকিউট cynophobia আছে। কুকুরের সঙ্গে শুটিং এর প্রথম দিনে আইরিশ উলফহাউন্ড টাকে দেখে প্রায় প্যানিক অ্যাটাক আসে ওনার। আমরা কিছুতেই বলে বোঝাতে পারলাম না যে আইরিশ উলফহাউন্ড অত্যন্ত বাধ্য হয় এবং বিশেষত এই কুকুর টি ওয়েল ট্রেইন্ড। সেট লণ্ডভণ্ড করে সে এক বিতিকিচ্ছিরি সিনক্রিয়েট করলেন উনি। কুকুর টিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর রাগ কমে না। কিছুতেই শুটিং করবেন না তিনি, উল্টে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ভয় দেখিয়ে সেট ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
তখন এতটাই টাকা খরচ হয়ে গেছে যে আমাদের পক্ষে আবার রিকাস্ট করে ছবি শুরু করা সম্ভব ছিলনা। বাধ্য হয়ে ছবি টা ‘শেলফ’ করে দিতে হয় অ্যান্ড
ইভেনচুয়ালি দ্য প্রোজেক্ট ডায়েড। সেই আর্থিক ক্ষতি আমি আর কোনোদিন পুষিয়ে উঠতে পারি নি।”

ভদ্রলোক কে সমবেদনা জানাতে যাব, হঠাৎ দেখি এবির চোখ দুটো জ্বলছে। চাপা স্বরে জিজ্ঞ্যেস করলেন,
“সমীরণ, ছাদে ফুটপ্রিন্ট রিপোর্টে শুধু কি মানুষের ই পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে?”

“আসলে আমি অতটা গুরুত্ত্ব দিই নি স্যার, ভেবেছিলাম প্রতিবেশীদের কারোর বা পাড়ার কোনো কুকুর হয়তো ছাদে উঠে থাকবে তাই আপনাকে আর বলি নি। মানুষ ছাড়া আরেক টি চতুষ্পদের ফুটপ্রিন্টের কথা বলা আছে ওই রিপোর্টে”।

“অশেষ ধন্যবাদ শিশির বাবু, আমাদের এখনই বেরোতে হবে” – কফি টেবিলের তলায় লুকিয়ে হাতের তালুতে একটা ফিস্টপাম্প দিয়ে চোখেমুখের উত্তেজনা টা কে যথাসম্ভব স্বাভাবিক করবার চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ালেন ড. অদ্রীশ বোস।

 

৫.

আমরা নিশিথকুমারের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম, সমীরণের নির্দেশ অনুযায়ী ফুটপ্রিন্টের রিপোর্ট নিয়ে এক্সপার্ট বিমল বাবু হাজির। উনি ব্যাখ্যা করে বললেন, খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল – “কুকুর টা একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে এসে আবার ওই পথে ফিরে গেছে। আপনি যদি বাড়ির মানচিত্র খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন উত্তর দিকে রাস্তা, পূর্ব দিকে কোনো বাড়ি নেই, নীচু দেয়ালে ঘেরা একটা প্লট। দক্ষিণে প্রতিবেশী পাল বাবুর বাড়ি আর দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটি নির্মীয়মাণ বাড়ি। কুকুর টা ঠিক ওই নির্মীয়মাণ বাড়ি টার দিক থেকে এসে আবার ওই দিকে ফিরে গেছে, একদম এক ই পথে, এর বাইরে অন্য কোথাও কোনো পায়ের ছাপ নেই”।

কি ভেবে যেন একটু শিউড়ে উঠে বিমল বাবু বললেন, “ড.বোস, আপনার অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে যেই মুহুর্তে নিশিথকুমার ঠিক ওই ভাঙা রেলিং টার কাছে এসেছেন তখন একটা ওয়েল ট্রেইন্ড কুকুর কে পাঠানো হয়েছে, যে নিঃশব্দে কাজ সেরে আবার দ্রুত ওই পথে ফিরে গেছে। ওহ, মাই গড!”

আমাদের সবার শিড়দাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। একটা বড়সর চেহারার কুকুর একজন অ্যাকিউট সাইনোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ কে আতংকিত করে মৃত্যুপথে ঠেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। নৃশংস হত্যার ছক। কল্পনায় দেখতে পেলাম কিভাবে ভয়ার্ত অভিনেতা পেছন হঠে পালাতে গিয়ে পাঁচিল ভেঙে পড়ে যাচ্ছেন।

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা পদচিহ্ন দেখে কি বলা যায় কি জাতের কুকুর ছিল ওটা?”
বিমল বাবু জবাব দিলেন, “যদিও এটা আমার এক্সপার্টাইজের মধ্যে পড়ে না, তবে তদন্তে সাহায্য লাগতে পারে বলে আমি একজন বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়েছি। মোস্ট প্রবাবলি ইট’স অ্যান ইংলিশ ম্যস্টিফ”।

নিশিথকুমারের বাড়ি তে ঢুকতে গেলে আবার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে বলে আমরা পালবাবুর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছিলাম। ভেতর থেকে আমাদের দেখতে পায়ে উনি ডাক দিলেন। এবি ইশারায় আগেই বলে দিয়েছিলেন, আমাদের সারমেয় থিওরির ব্যাপারে কোনো আলোচনা যেন পালমশাই এর সামনে না করি। এবি খুব হালকা গল্পের ঢঙে একথা সেকথা বলার পর জিজ্ঞেস করলেন নিশিথকুমারের বাড়ির চারপাশে কারা থাকতেন।
– “ফাঁকা প্লট টা তো গুপ্তা জি নামে এক অবাঙালী ভদ্রলোকের। বহু দিন হল উনি জমি কিনে ফেলে রেখেছেন, কবে বাড়ি বানাবেন কে জানে?”
-“আর ওই দক্ষিণ পশ্চিমের ইনকমপ্লিট বাড়ি টা?”
– “ওহ ওটা? ওটা তো আমার ই আরেকটা প্লট। অনেক প্রোমোটার ফ্ল্যাট তোলার জন্য ঝুলোঝুলি করছিল। আমি বা নিশিথবাবু কেউ ই চাইতাম না মুখের সামনে একটা ফ্ল্যাট উঠে আলোবাতাস ব্লক করে দিক। তাই প্রোমোটাররা আরো জোরাজুরি করার আগে নিজেই বাড়ি বানালাম, দোতলা টা কমপ্লিট হলেই বিক্রি করে দেব”। পালবাবুর জবাবে আমরা সবাই একটু চমকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

এবি জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ওখানে কে যাওয়া আসা করে? মানে সম্ভাব্য খদ্দের রা আসলে কে বাড়ি দেখায়, আপনি নিজেই”?
– “নাহ! এই বয়সে ওসব ঝক্কি পোষায় না মশাই, ব্রোকার কে চাবি দেওয়া আছে, ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপণ দেওয়া থেকে বাড়ি দেখানো সব সেই করে”।
– “তাই? আমার এক আত্মীয় এই অঞ্চলে বাড়ি খুঁজছিল, যদি একবার ব্রোকারের নাম ঠিকানা টা পাওয়া যায়….” – রজতের উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করলাম মনে মনে। স্যার ও দেখলাম একটা চোরা প্রশংসার চাউনি হানলেন।

জানা গেল পালবাবুর রিয়েল এস্টেট ব্রোকার শ্যামল নাথের অফিস এই রাণীকুঠি অঞ্চলেরই কাছাকাছি। অফিসে গিয়ে দেখলাম শ্যামল বাবু নেই, ছোকড়া অ্যাসিস্টেন্ট প্রতাপ টিভি তে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে। ভারত ইংল্যান্ড সফরে গেছে তার ই একটা টি-২০ চলছে। আমি একটা চাপা শ্বাস ফেললাম, আমার অফিসের সিনিয়র শতদল দা গেছে কভার করতে, কবে যে এরা আমাকে বিদেশ সফর গুলো তে পাঠাবে কে জানে? প্রতাপ বোধহয় আমাদের উপস্থিতিতে তার মনঃসংযোগে ব্যঘাত ঘটায় খুব একটা প্রসন্ন হয় নি। বলা বাহুল্য সমীরণ সাদা পোশাকে রয়েছে এবির নির্দেশ অনুযায়ী তাই আলাদা করে সমীহ জাগার কিছু নেই। প্রতাপ আমাদের নর্মাল কাস্টমার হিসেবেই ট্রিট করে।

শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল, “কি চাই? অফিস ফেলে আমি কিন্তু এখন বাড়ি দেখাতে যেতে পারব না”।
মনে হল তাড়াতে পারলে বাঁচে!
এবি সুমধুর স্বরে বললেন, “না না ঠিক আছে, কোথাও যেতে হবে না, এই অঞ্চলের একটা বাড়ির একটু খোঁজখবর চাই। ১৯/সি, মালিকের নাম উমানাথ পাল”।

– “এই ফাইলে কার্পেট এরিয়া, ফ্লোর প্ল্যান সব আছে, দেখে নিন” – ঝটপট একটা ফাইল হাতে ধরিয়ে আবার টিভির দিকে মনোনিবেশ করে প্রতাপ।
– “আরে ইয়ার, ধোনি এটা কি করলি ভাই!” আমাদের দিকে পেছন করেই স্বগতোক্তির ঢঙে চেঁচিয়ে বলে সে।
– “প্রতাপ বাবু দেখছি ক্রিকেটের বেশ সমঝদার লোক” – গলায় আরো একটু মধু ঢেলে বললেন এবি।
বোধহয় একটু খুশি হয়েই আমাদের দিকে ফিরে বলল, “আচ্ছা বলুন তো ডেথ ওভারে কেউ ইশান্ত শর্মা কে বল দেয়?”
এবি সজোরে মাথা নেড়ে জানালেন একেবারেই অনুচিত কাজ হয়েছে এটা!
“আমি ও আপনার বয়সে একেবারে ক্রিকেটের পোকা ছিলাম বুঝলেন” – এবির গলার মিষ্টতা অপরিবর্তিত। মনে হল প্রতাপ আরেকটু খুশি হয়েছে সমমনষ্ক কাউকে পেয়ে!
দুটো ওভারের ফাঁকে আমাদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে সে, “চা খাবেন আপনারা?”
সকাল থেকে বার তিনেক হয়েছে, দুপুর হয়ে গেছে তাই না করতে যাচ্ছিলাম। সবাই কে অবাক করে এবি বললেন, “হ্যাঁ আপত্তি নেই, চা খেতে খেতে ক্রিকেট টা জমে ভালো”।

প্রতাপ হাঁক দিয়ে চা আনালো। এবি চোখের ইশারায় আমাদের বোঝালেন চা এর অছিলায় ‘ডেথ ওভারস’ কাটাতে চান উনি যাতে ইনিংস ব্রেক এ ভালো করে কথা বলা যায়।
আর তিন ওভার পর ইংল্যান্ড এর ব্যাটিং শেষ হল।
“প্রতাপ বাবু আলাপ করে খুশি হবেন, আমার এই ছাত্র টি প্রখ্যাত স্পোর্টস জার্নালিস্ট সৌভিক গুপ্ত, কাগজে ওর লেখা নিশ্চয় পড়েছেন” – আমার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে জানালেন এবি।
প্রতাপ প্রায় লাফ দিয়ে উঠে আমার সাথে করমর্দন করে তার সৌভাগ্যের কথা ব্যক্ত করে। গোটা ইনিংসের বিবরণ তার বিশ্লেষণ সমেত জানিয়ে সাগ্রহে আমার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকে সে। আমি মৃদু হেসে জানালাম, তার রিডিং নির্ভুল। মনে মনে ভাবলাম, দ্রাবিড়ের টেকনিকের এর ভুলচুক আর হরভজনের অ্যাকশনে কোথায় খামতি এটা বোধহয় বাঙালী দর্শকই প্রথম বুঝতে পারে!

এবি আমার দিকে চেয়ে বললেন, “সামনের মাসে আবার নিউজিল্যান্ড আসছে না? তুমি ইডেন টেস্টের একটা পাসের ব্যবস্থা করে দিও না প্রতাপ বাবু কে”। কঠিন কিছুই না আমার পক্ষে, রীতিমত ভাল জায়গার আসন ই জোগাড় করা যাবে।

প্রতাপ প্রায় বিগলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “বলুন স্যার, আপনাদের জন্য কি করতে পারি?”
-“বেশি কিছু নয়, একটা ছোট্ট ইনফরমেশন চাই বাড়ি টা সম্পর্কে। গেল হপ্তার শনিবারে কে কে ওই বাড়ি টা দেখতে এসেছিলেন মনে আছে?”
“দাঁড়ান স্যার খাতা দেখে বলি”।
একটা রেজিস্টারে চোখ বুলিয়ে প্রতাপ জানায়- “সেদিন দুজন এসেছিলেন, সকালে সাড়ে দশটার দিকে প্রদীপ্ত লাহিড়ী আর বেলা ২টো নাগাদ তমোনাশ গুপ্ত”।
এবি একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “বিকেলের দিকে কেউ আসে নি? এই ধরুন চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ”?
একটু ভেবে প্রতাপ জানায়, “হ্যাঁ স্যার মনে পড়েছে, তমোনাশ বাবু আবার সোয়া চারটে নাগাদ ফিরে এসে বলেন ওনার স্ত্রী একবার মোবাইল ক্যামেরায় বাড়ি টা দেখতে চান। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে খুব তাড়াতাড়িই উনি সিদ্ধান্ত নিতে চান। আমি প্রথমে রাজি হই নি, টিভিতে খেলা চলছিল, আর অফিসে আমি একাই ছিলাম। তমোনাশ বাবু বারবার বলেন, খুব জরুরি আজকেই আরেকবার দেখা টা। উনি ই প্রস্তাব দিলেন, আমার অসুবিধে থাকলে যাবার দরকার নেই, চাবি নিয়ে উনি যাবেন আবার ফেরত দিয়ে যাবেন। চেহারা, সাজপোশাক দেখে বেশ বড়লোক মনে হল, তাই আমি ও আর আপত্তি করি নি, তাছাড়া ফাঁকা বাড়িতে কয়েক বস্তা সিমেন্ট আর মার্বেলের স্ল্যাব ছাড়া সরাবার কিছুই নেই। কথামত সাড়ে পাঁচটার একটু পরে উনি চাবি ফেরত দিয়ে যান।”

“ওয়ান্ডারফুল! সমীরণ, রেজিস্টারের ঠিকানা টা নিয়ে কোনো লাভ নেই, ওটা ভুয়ো” বলে ঊঠে দাঁড়ালেন এবি।
প্রতাপ কে কিছুটা হতচকিত অবস্থায় ফেলেই আমরা বেরিয়ে আসি।

বাইরে এসে এবি বললেন, “সবাই বাড়ি তে ফোনে জানিয়ে দাও আজ মিল অফ। আমরা বাইরে খাচ্ছি, কাজ সেরে ফিরতে দেরী হবে”।
নন্দিনী জিজ্ঞেস করে, “এবার কোথায়?”
“গন্তব্য মধ্য-কলকাতা, তবে আগে লাঞ্চ, পেটে ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে”। রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সারতে সারতে সমীরণ জিজ্ঞেস করে, “স্যার, আপনি কি করে শিওর হলেন নাম ঠিকানা টা ভুয়ো। বাড়ি দেখাবার আগে তো আইডেন্টিটি চেক করেছে প্রতাপ”।

“আজকের দিনে শহর কলকাতায় একটা ব্রোকারের চোখে ধুলো দেওয়ার মত জালি আইকার্ড বানানো কোনো ব্যাপার?”
কি মনে করে একটু জোরে হেসে স্যার যোগ করলেন, “তবে লোক টা ইন্টারেস্টিং, কথা নিয়ে খেলতে ভালোবাসে, ছদ্মনামের মাঝে ক্লু রেখে গেছে!”
আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করায় এবি বললেন, “বুঝলে না? ‘নিশিথ’ অর্থাৎ গভীর রাতের হন্তারক হচ্ছে তমোনাশ, যে অন্ধকার কে নাশ করে! আর এসব ক্ষেত্রে পদবি টা ‘গুপ্ত’ রাখা তো ক্লাসিকের পর্যায়ে পড়ে হে!”
আমরা চমৎকৃত হলাম।

খাওয়া শেষে ঘন্টা খানেক পর মধ্যকলকাতার এক জনবহুল এলাকায় পৌঁছন গেল। অবাঙালী পট্টি, বাইরে থেকে আসা নিম্ন মধবিত্ত দের আস্তানা। আমরা এখানে ঠিক কেন এসেছি জানিনা, এবি সাস্পেন্স বজায় রেখেছেন। এক টা বাড়ির সামনে গিয়ে কড়া নাড়লেন উনি। মিনিট খানেক পরেও কেউ বেরিয়ে এল না দেখে উনি বললেন, “অপেক্ষা করতে হবে তবে একটু আড়ালে”। ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর একজন কে আসতে দেখা গেল বাড়ির সামনে, পাঞ্জাবির পকেট থেকে বাড়ির চাবি বের করতে যাবেন অমনি পিছন থেকে এবি ডাকলেন, “চৌহান সাব”।
“জি, আপলোগ?” চমকে ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন শীর্ণকায় রাজস্থানী প্রৌঢ়।

 

 

৬.

সপ্তাহ তিনেক কেটে গেছে, পুলিশ তমোনাশ গুপ্ত কে ট্রেস করতে পারে নি, একজোড়া পায়ের ছাপ ছাড়া তো আর কিছুই নেই। প্রতাপের বর্ণনা অনুযায়ী মাঝারি উচ্চতার বলিষ্ঠ গড়ন, মাথায় টুপি, চোখে সানগ্লাস আর মুখে চাপ দাঁড়ি। এবি শুনে বলেছেন ছবি আঁকিয়ে লাভ নেই, ১০০ পারসেন্ট ছদ্মবেশ ওটা।

সপ্তাহের মাঝখানে ছুটির দিন একটা, সবাই এবির বাড়িতে হাজির নন্দিনী ছাড়া, তার ডিউটি আছে। এবি অধৈর্য্য হয়ে উঠেছেন। ভ্রূকুঞ্চিত অবস্থায় পায়চারি টা আবার শুরু হয়ে গেছে তাঁর। হাঁটা থামিয়ে একবার বললেন,
“কেসটার টুকরো টুকরো সূত্র গুলো জোড়া দিচ্ছি আবার সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কে এই তমোনাশ গুপ্ত? সে যদি সত্যি খুন করে থাকে তার মোটিভ ই বা কি? একজন প্রায় সাধকের জীবন যাপন করা বয়ষ্ক মানুষকে, কে মারতে চাইবে? নাহ,কিছুই মিলছে না”।

আমরা চুপচাপ বসে আছি। এবি নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, “চল তো সুরঞ্জন বাবুর বাড়ি আরেকবার যাই, নিশিথকুমারের অতীত জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কি আমরা মিস করে যাচ্ছি যা আমাদের কোনো হদিশ দিতে পারে?” মোবাইল এ জানাতেই সদাশয় সুরঞ্জন বাবু বললেন, “কিচ্ছু অসুবিধে নেই মশাই, চলে আসুন সদলবলে, আড্ডা দেওয়া যাবে”।

বিলাসবহুল বৈঠকখানায় সাদর আপ্যায়নটাও আজ ভোজনরসিক এবি উপভোগ করতে পারছেন না, প্লেটের দিকে নজর নেই। একটা হতাশা, বিরক্তি, অস্থিরতা যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সুরঞ্জন বাবুর লিভিং এরিয়াটা বিশাল, সিনেমা ও সঙ্গীতপ্রেমী ভদ্রলোক ৫৬ ইঞ্চি অত্যাধুনিক টিভি সেট, হোম থিয়েটার মিলিয়ে বেশ তাক লাগানো ব্যাপার স্যাপার করে ফেলেছেন। শোকেসে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি সিনেমার ঈর্ষনীয় কালেকশন। লাইব্রেরির মত ক্রমানুসারে সাজানো নির্দেশক বা অভিনেতার নাম আনুযায়ী।

এবি বললেন, “আপনি নিশিথকুমারের সহ-অভিনেতা, অভিনেত্রী বা নির্দেশক এদের সম্পর্কে যা কিছু জানেন বলতে থাকুন। কোনো কথা বাদ দেবেন না। তাঁর করা সিনেমার শুটিং এর কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা মনে পড়লে সেটাও জুড়তে ভুলবেন না”।

একটু থেমে, চায়ে একটা চুমুক দিয়ে পুরনো সিনেমার চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া সুরঞ্জনবাবু শুরু করলেন। স্মৃতি থেকে ছবির মত অবিকল একটার পর একটা সিনেমার কথা বলে যাচ্ছেন আর আমরা মোহিত হয়ে শুনছি। গল্প বলার ভঙ্গী টি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক আর ভদ্রলোকের স্মৃতিশক্তি সত্যি অবাক করার মত। এবি চোখ বন্ধ করে একমনে শুনছিলেন। প্রায় আধ ঘন্টা শোনার পর জিজ্ঞেস করলেন,
“আচ্ছা যে অভিনেত্রীর সঙ্গে নিশিথকুমারের এক্স্ট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার ছিল, তার নাম মনে আছে?”

-“সাউথের মেয়ে নাম ছিল, “কাভ্যা”, সে বলিউডে খুব একটা সাফল্য পায় নি, কয়েকটা বি গ্রেড সিনেমায় কাজ করার পর একমাত্র বড় বাজেটের ছবির সুযোগ পেয়েছিল নিশিথকুমারের বিপরীতে। সেই সময়ই তাঁদের দুজনকে ঘিরে নানান মুখরোচক আলোচনা শুরু হয় ইন্ডাস্ট্রি তে। অপর্ণা দেবীর আত্মহত্যার পর যা হয়, স্বাভাবিক ভাবেই কাভ্যার দিকেই সবাই আঙ্গুল তোলে। শান্ত, সাধাসিধে অপর্ণা কে সবাই পছন্দ করতেন ফলে সহমর্মিতা সে দিকেই ছিল এবং আমাদের টিপিক্যাল সামাজিক প্রথা অনুযায়ী ঘর ভাঙার অপরাধে কাভ্যাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তার উপরে ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় স্টার এই ঘটনার পর সিনেমা থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ায় সব নির্দেশকের রোষানলের শিকার হয় সে। শোনা যায় বম্বে তে সে আর কোনো কাজ পায় নি এবং আস্তে আস্তে পুরোপুরি লোকচক্ষূর অন্তরালে চলে যায়। যতদূর জানি তামিল ইন্ডাস্ট্রিতেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি তারপর”।

“হুমম, মনে হয় না এর সাথে নিশিথকুমারের মৃত্যুর কোনো যোগ আছে, এতদিন পর কোনো ধরনের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাওয়া টা খুব অস্বাভাবিক” – বলতে বলতে উঠে গিয়ে এবি শোকেসে সিডি, ডিভিডির কালেকশন টা নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকলেন।

“আচ্ছা ওনাকে তো চেহারায় সাদৃশ্যের জন্য ‘ক্যারি গ্রান্ট অফ দ্য ইস্ট’ বলা হত, তাই না?” – আমাদের দিকে পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন স্যার।
-“হ্যাঁ, তবে শুধু চেহারায় নয় ম্যানারিজমেও মিল ছিল। বলব না যে নিশিথকুমার কপি করতেন, তবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং কিছু জিনিস নিজের স্বাভাবিক অভিনয়ের সঙ্গে অ্যাসিমিলেট করে একটা নিজস্ব স্টাইল তৈরী করেছিলেন”।
রজত জিজ্ঞেস করে, “ক্যারি গ্রান্ট তো হিচককের বেশ ফেবারিট ছিলেন,না”?
উৎসাহিত হয়ে সুরঞ্জনবাবু জবাব দেন, “ওহ, সে আর বলতে? “নটোরিয়াস”, “নর্থ বাই নর্থ ওয়েস্ট”, “টু ক্যাচ আ থিফ” – কি সব ক্লাসিক দিয়েছেন দুজনে মিলে!”
রজত যোগ করে, “জিমি স্টুয়ার্ট ছাড়া বোধ হয় হিচককের সঙ্গে জুটি বাঁধা সব থেকে সফল অভিনেতা তিনিই”।
-“হুম, একদম ঠিক, আপনার দেখছি এদিকে বেশ ইন্টারেস্ট আছে” – তারিফের স্বরে বলেন সুরঞ্জন।

হঠাৎ আমার চোখ পড়ল এবির দিকে। একদৃষ্টি তে তাকিয়ে আছেন শোকেসের দিকে। কিছু একটা ভাবছেন বুঝতে পারলাম, আমাদের কোনো কথাই কানে ঢুকছে না। কিছু আশার আলো কি দেখা যাচ্ছে?
আমাদের দিকে ফিরে খুব শান্ত স্বরে বললেন, “সমীরণ, একবার নিশিথকুমারের বাড়ি চল তো, ইন্দ্রজিতের সাথে কিছু কথা আছে।”
ঘটনার আকস্মিকতায় একটু বিস্মিত হলেও খুব একটা কিছু মনে করলেন না সুরঞ্জনবাবু। বুঝলাম, খামখেয়ালি প্রফেসরের কাজকর্মের সাথে মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে ভদ্রলোক। শুধু বললেন, “আমাকে আপডেট দিতে থাকবেন মশাই, বুঝলেন তো ওই আমিও আর কি জড়িয়ে পড়েছি কেসটার সাথে মনেমনে”।
“শিওর, উইল কিপ ইউ পোস্টেড” – মৃদু হেসে হাত নেড়ে গাড়িতে উঠলেন এবি।
“সমীরণ,তুমি মুখ খুলোনা ওখানে,যা বলার কথাবার্তা আমিই বলব” – যেতে যেতে কেবল একটাই কথা বললেন স্যার। নিমগ্নচিত্তে এখনো কিছু একটা ভেবে চলেছেন, ভাবগতিক দেখে আমরাও আর কথা বাড়ালাম না।

সৌভাগ্যবশতঃ ইন্দ্রজিৎ কে বাড়িতেই পাওয়া গেল। সদলবলে আমাদের ঢুকতে দেখে আবার বারণ করতেই যাচ্ছিল বোধ হয়, এবি তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে হাতজোড় করে খুব অনুনয়ের স্বরে বললেন, “কটা কথা বলেই চলে যাব, ইন্দ্রজিৎ বাবু দয়া করে বাধা দেবেন না।”
ইন্দ্রজিৎ একটু বিস্মিত হলেও আর কিছু বলল না, সোফায় সবাই কে বসতে অনুরোধ করল।

ধন্যবাদ জানিয়ে এবি বললেন, “আমি কিছুটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এই কেসটায় জড়িয়ে পড়েছিলাম কারণ নিশিথকুমার আমাদের সময়ের খুবই জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন এবং আমি তাঁর একজন বড় ভক্ত। স্বাভাবিক ভাবেই কৌতুহল ছিল তাঁর মৃতুরহস্য নিয়ে”।
ইন্দ্রজিৎ তাকিয়ে থাকে, বোধহয় বোঝার চেষ্টা করে কথার গতিপ্রকৃতি কোনদিকে এগোচ্ছে।
“আমরা ঘটনা টা কে নিয়ে বেশ কিছুদিন নাড়াচাড়া করছি, এটা অ্যাক্সিডেন্ট, আত্মহত্যা না মার্ডার সেটা বুঝতে চেয়েছি। প্রথমে খুব সন্দেহজনক কিছু মনে হলেও প্রায় মাসখানেক তদন্তের পর আমরা স্থির সিদ্ধান্তে এসেছি এটা নিছক ই দূর্ঘটনা”। এবি থেমে রুমাল বের করে একটু ঘাম মুছে নিলেন।

আমি চমকে উঠলেও মুখটাকে যতদূর সম্ভব ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করলাম। সমীরণের মুখেও কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। আমরা দুজনেই বোধ হয় প্রস্তুত ছিলাম আকস্মিক কিছু ঘটতে পারে।
“যতদিন না রহস্যের সমাধান হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে আপনাকে শহর ছাড়তে বারণ করা হয়েছিল, সেটাও আমার ই নির্দেশে। আপনার কাজের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল বোধ হয়, তাই আমি নিজে এসেছি আপনাকে এই কথা গুলো জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে, এই কটা কথাই বলবার ছিল”।
ইন্দ্রজিৎ হেসে বলল, “না না স্যার, আপনি সিনিয়র লোক এভাবে বলবেন না, তাছাড়া সমীরণ বাবু তাঁর ডিউটি করেছেন মাত্র, এতে মনে করার কিছু নেই”।
এবি ইঙ্গিতপূর্ণ চোখে সমীরণের দিকে তাকাতে সে বলে, “তাহলে ইন্দ্রজিৎ বাবু আপনার আর শহর ছাড়তে কোন বাধা রইল না, আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে কেস ক্লোজ করে দিচ্ছি|”
উঠতে উঠতে এবি জিজ্ঞেস করলেন, “মুম্বই কবে যাবেন বলে ভাবছেন?”
– “দেখি, টিকিট পেলে কাল পরশুই রওনা হয়ে যাব”
ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা বেরিয়ে আসলাম। গাড়িতে ওঠার সময় খেয়াল করলাম ইন্দ্রজিৎ বাইরে এসে এদিকেই তাকিয়ে আছে। গাড়ি স্টার্ট হতেই আমরা স্যার কে ছেঁকে ধরলাম, “ব্যাপার টা কি হল? এত রহস্যের খাসমহল দেখিয়ে শেষমেষ এই বেরলো? পর্বতের মুষিকপ্রসব?”
মৃদু হেসে বললেন, “খেলার এখনো কয়েক ওভার বাকি আছে হে, এত উতলা হচ্ছ কেন?”
“শোন, তোমরা দুজন এখন বাড়ি যাও, আমি আর সমীরণ কিছু কাজ সেরে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরব। তোমরা তৈরী থেক, আমার ফোনের অপেক্ষায় থেক।

বাড়ি ফিরে লাঞ্চ সেরে টিভি দেখতে দেখতে বিকেলের দিকে একটু চোখটা লেগে এসেছিল। কখন ঘুমিয়েছি জানি না, স্যারের ফোনে ঘুম ভাঙল। এবির বাড়ি পৌঁছতেই আমায় দেখে বললেন, “বাহ! এক ঘুম দিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছ দেখছি, ভাল করেছ, রাত জাগতে কাজে লাগবে”।
– “রাত জাগতে? মানে?”
এবি হেসে বললেন, “অভিসারের মর্ম তুমি আর কি বুঝবে হে নোবেল ব্যাচেলর? একদিন জেগে দেখ। হোপফুলি এ রহস্যের অদ্যই শেষ রজনী”।
কিছুই বুঝলাম না, এর বেশি এখন জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই, ভেঙে বলবেন না অতএব অপেক্ষা করতে হবে। আটটার কিছু পরে সমীরণ এসে খবর দিল,
“সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে”। রজত,নন্দিনী জরুরী কাজে আটকে পড়েছে তাই আজকের নৈশ অভিযানে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ শুধু আমাদের তিনজনের ই।

 

৭.

রাত্রি গভীর, ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হুহু করে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি, সাসপেন্স টা জিইয়ে রেখেছি, দেখা যাক কতদূর সফল হয় আজকের নৈশ অভিযান। সমীরণ মাঝে মাঝে কাউকে ফোনে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে আর স্টেটাস আপডেট নিয়ে নিচ্ছে। রাস্তা দেখে বুঝলাম আমরা যাদবপুর, সন্তোষপুর এলাকায় চলে এসেছি। একটু ভেতরের দিকে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি টা আমাদের নামিয়ে দিল।

এবি বললেন, আমাদের একটু হেঁটে যেতে হবে, শেষ পর্যন্ত গাড়ি তে যাওয়া চলবে না। গাড়িটা লুকিয়ে রাখতে হবে, নইলে শিকার ফস্কে যেতে পারে। এই অঞ্চলটা খুব একটা ঘনবসতিপূর্ণ নয়, একটা বাড়ির কমপাউন্ডের সঙ্গে অন্যটার অনেকটা তফাৎ, গায়ে গায়ে লাগা নয়। মধ্যরাতে শুনশান রাস্তা, চারিদিকের নীরন্ধ্র অন্ধকার সব মিলিয়ে ক্লাইম্যাক্সের আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা একটা দোতলা বাড়ির বাগানে একটা মোটা গাছের আড়ালে গিয়ে বসলাম, সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ; কোথাও আলো জ্বলছেনা, শুধু উপরের তলায় একটা শোবার ঘর থেকে ডিম লাইটের মৃদু আলোর আভাষ দেখা যায়। রঙ-বেরঙের জিরো পাওয়ারের আলো নয়, রেগুলেটর যুক্ত হলুদ বাল্ব ই মনে হচ্ছে। ঘরের পর্দা টা খুবই ফিনফিনে ফলে একটা সিলুয়েট মত আবছা দেখা যাচ্ছে ঘরটা, যদিও নীচ থেকে দেখার ফলে শুধু উপরের অংশটাই আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে মশারি টাঙানো বিছানায় কেউ শুয়ে আছে।

ঘড়ি তে দেখলাম, রাত বারোটা কুড়ি। এবি ইশারায় মোবাইল আলোকিত করতে নিষেধ করলেন। ‘শিকারের’ অপেক্ষায় কতক্ষণ বসে থাকতে হবে জানি না। আমি বললাম, “এক প্যাকেট তাস নিয়ে আসলে অন্তত রংমেলানো বা ফিশ খেলা যেত”। সত্যসন্ধানী গুরু-শিষ্য জুটি আমার দু কাঁধে যুগপৎ ডলানি আর ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে কাজটা একেবারেই অর্বাচীনের মত করে ফেলেছি। এখানে সামান্যতম আওয়াজ করলে শিকার ভেগে যেতে পারে। বুঝলাম স্পর্শ, শ্রবণ, দর্শন ইত্যাদি সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়র প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন ‘নাজুক’ আমাদের এই ‘শিকার’! মহামুশকিলে পড়া গেল, হেঁচকি, হাচি, কাশি সব চেপে রাখতে হবে। ঝোপের মাঝে রুমাল পেতে বসে আছি, মসকুইটো রিপেলেন্ট মেখে ডেঙ্গুর হাত থেকে নাহয় রেহাই পেলাম, কিন্তু সাপ,বিছে পাশ দিয়ে চলে গেলে ঠেকাচ্ছে কে? গল্পের বইয়ে পড়েছি এহেন অবস্থায় কার্বলিক অ্যাসিডের প্রয়োগ অনিবার্য কিন্তু এখন এদের সেটা কে সাজেস্ট করবে?
চুপচাপ নিজের মনে অনেক কথা ভেবে যাচ্ছি। আরো একটা সমস্যা আছে, নিশিথকুমারের মত না হলেও আমার কুকুরের ভয় বেশ ভালো রকমের। রাতবিরেতে রাস্তার কুকুরের খপ্পরে যে পড়েছে সে জানে কতটা বিপদজনক হয় তারা। এই অবস্থায় আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করলে তখন?

একটা বড়সড় হাই উঠছিল, প্রাণপণে সেটা চেপে এবির দিকে তাকাতেই সমীরণ প্রায় কানেকানে বলার মত স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “আসছে”!
চমকে বাড়ির মূল দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দুদিকের বাগানের মাঝে মোরাম ঢালা পথে পা টিপে টিপে একজন আসছে। চারিদিকে সাবধানে একবার দেখে নিয়ে সে সন্তর্পণে কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে ঢোকার দরজাটা খুলে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। সর্বাঙ্গ আঁটোসাটো কালো পোশাকে মোড়া, মাথায় হুডি, এই নিকষ অন্ধকারে তাকে একটা প্রেতমূর্তির মতই দেখাচ্ছিল।

শরীরের সমস্ত স্নায়ুপেশী উত্তেজিত হয়ে গেছে, মেরুদণ্ড দিয়েও একটা শীতল স্রোত বইতে শুরু করেছে বুঝলাম। ছায়ামূর্তি ভেতরে ঢুকে বাড়ির আলো জ্বালায়নি। একটা পেন্সিল টর্চের মত সরু আলোর সঞ্চারপথ লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম, একতলার লিভিং থেকে সিঁড়িটা উপরে উঠে গেছে এবং সেই পথ বেয়ে আমাদের ‘শিকার’ দোতলার শোবার ঘরে এসে প্রবেশ করল। ধীরে ধীরে ঘরের মৃদু আলোটা বাড়ল, নীচ থেকে প্রায় দমবন্ধ করে দেখলাম ছায়ামূর্তি দুটো দিকের দড়ি খুলে মশারি টা তুলে একটা বালিশ হাতে নিয়ে ঝুঁকে পড়ছে। বুঝতে আর এক মুহুর্ত বাকি রইল না যে ঘুমন্ত কাউকে শ্বাসরোধ করে মারতে এসেছে সে। বুঝতে পারছি না চোখের সামনে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখেও আমরা নেল-বাইটিং সাসপেন্স উদ্রেককারী সিনেমার দর্শকের মত কেন নির্বাক রয়েছি। আমি ধড়মড় করে উঠে চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম, এবি পাশ থেকে আমার মুখ চেপে বললেন, “ধুর বাবা, দেখই না ক্লাইম্যাক্সে কি হয়”!

কিছুই মাথায় ঢুকলো না, শুধু খেয়াল করলাম সমীরণ আমাদের পাশে নেই। একটা চিতার ক্ষিপ্রতায় সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে বিন্দুমাত্র শব্দ না করে।
উপরে ছায়ামূর্তি তার সমস্ত গায়ের জোর একত্রিত করে বালিশটা চেপে ধরেই পরক্ষণে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মত করে ছিটকে আসলো। নীচ থেকে তার মুখের অভিব্যক্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু শরীরি ভাষায় স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম প্রচণ্ড হতভম্ব, বিভ্রান্ত হয়েছে সে কোনো কারণে। ঘরের এদিক ওদিক তাকিয়ে সে হঠাৎ পর্দা সরিয়ে নীচের দিকে তাকাতেই টর্চের আলো ফেলে আমাদের দেখতে পেল। ফাঁদে পড়েছে বুঝতে পেরেই আমাদের শিকার দ্রুত দরজার দিকে ছুটে পালাতে গেল। এবি আমার কাঁধে একটা চাপড় মেরে ‘কুইক’ বলাতে আমরাও বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। দোতলার দরজার কাছে প্রচণ্ড জোরে একটা ধস্তাধস্তির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

জোরালো একটা হুইসিলের শব্দ শুনে বুঝলাম, আমরা ছাড়াও সমীরণের সাঙ্গপাঙ্গ আশে পাশে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। কয়েকজন দৌড়ে বাড়ির ভেতর চলে এসে সারা বাড়ির আলো জ্বালিয়ে দিল। দীর্ঘদেহী সমীরণ কালোপোশাকে ঢাকা লোকটিকে নিয়ে টেনে হিঁচড়ে লিভিংরউমের সঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসছে। বুঝলাম বলশালী ও দক্ষ মার্শাল আর্টিস্ট ইন্সপেক্টরের পক্ষে ‘শিকার’ কে ঘায়েল করতে খুব একটা ঘাম ঝরাতে হয় নি। আমাদের মুখোমুখি সেই অজ্ঞাতপরিচয় ছায়ামূর্তিকে দাঁড় করাতে দেখলাম, হুডির নীচে একটা পাতলা মাস্ক পড়ে আছে সে। সমীরণ খুব নাটকীয় ভঙ্গিমায় একটানে তার মুখোশ খুলে ফেলল।

 

 

৮.

এবি ঠাণ্ডা গলায় কেটে কেটে বললেন, “মেঘের আড়ালে থেকে অনেক তীর ছুঁড়েছেন ইন্দ্রাজিৎ বাবু, এবার আপনার খেলা সাঙ্গ হল”। হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ইন্দ্রজিৎ, কোনো জবাব দেয় না। একজন সাবইনস্পেকটর আরেকটি হাতকড়া পরানো লোক কে সঙ্গে নিয়ে ঢোকে। সমীরণ এবির দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই যে স্যার, ইনি হলেন আমাদের নাটকের দ্বিতীয় কুশীলব, এই বাড়ির মালিক মিঃ অলোকেশ সেন ওরফে তমোনাশ গুপ্ত, পার্কস্ট্রীটের এক হোটেলে গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন, ওখান থেকেই অ্যারেস্ট করা হয়েছে”।
এবি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন এরকম সময় নীচের তলার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলেন এক রুগ্ন ভদ্রমহিলা, দেখে বোঝা যায় বয়স আন্দাজে চেহারা ভেঙে গেছে দীর্ঘ রোগভোগের ফলে। সমীরণ ফিসফিস করে বলে, “মিসেস ইন্দিরা সেন, অলোকেশ বাবুর স্ত্রী”। ইন্দিরা দেবী সোজা তাঁর স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ালেন, অলোকেশ তাকে দেখে একটাও কথা বললেন না। মাথা নীচু করে সম্ভবত চোখাচোখি টা কে এড়াতে চান।
“আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি” – একরাশ ঘৃণা ঝরে পড়ে ইন্দিরা সেনের গলায়। চোখ দুটো দেখলাম জ্বলছে ক্রোধ ও প্রতিশোধস্পৃহায়।

“ওকে নিয়ে যান আমার সামনে থেকে ইনস্পেক্টর” – বলে ইন্দিরা দেবী আবার নিজের ঘরে ঢুকে যান।
এবি সমীরণ কে বলেন, “আমি আর সৌভিক এখন উঠি বুঝলে, তুমি তোমার রুটিন ডিউটিতে লেগে পড়, কাল কথা হবে”।

সমীরণ একজন কে আমাদের ড্রপ করে আসতে নির্দেশ দেয়। গাড়িতে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, আমি তো নাটকের শেষ অঙ্ক কিছুই বুঝলাম না,
কে এই সেন দম্পতি? তাদের সঙ্গে ইন্দ্রজিতের কি সম্পর্ক? আর কেনই বা সে মিসেস সেন কে খুন করতে চাইবে?”
এবি একটু হেসে জবাব দিলেন, “কোনো সম্পর্ক নেই, ইন্দ্রজিৎ কখনো মিসেস সেন কে দেখেই নি, তাঁকে হত্যা করার কোনো মোটিভ ই নেই”।
আমার মাথা ভোঁভোঁ করতে লাগল, আরো বেশি করে সব গুলিয়ে গেল,
“যা ব্বাবা, এরকম আবার কখনো হয় নাকি? চেনেনা জানেনা, কোনো স্বার্থ নেই তবূও কেউ কাউকে খুন করতে যায় নাকি তাও এরকম আঁটঘাট বেঁধে?”
এবি বললেন, “এটাই তো মজা এই গল্পের, ঠিক যেমনি অলোকেশ সেন ওরফে তমোনাশ গুপ্ত নিশিথকুমার কে চিনতেন না এবং তাঁর মৃত্যুতে ব্যক্তিগত ভাবে সেনমশাইয়ের কোনো লাভ বা লোকসান নেই”!

আমি বোকার মত তাকিয়েছিলাম, এবি কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তাঁর ফোন বেজে উঠল। পাশে বসে পরিস্কার শুনতে পেলাম ওপার থেকে সুরঞ্জনবাবুর গলা, “ও মশাই কেস সলভ তো? আমার তো অ্যাংজাইটি তে ঘুম ই আসছে না”!
এবি হেসে বললেন, “হ্যাঁ, সব ঠিক আছে, আমরা ফিরছি, কাল সন্ধ্যায় চলে আসুন আমার বাড়ি, বাকিদেরও সবাইকে আসতে বলেছি”।

ফোন রেখে দেওয়ার পর আমি আরেকবার জোরাজুরি করতে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বললেন, “উঁহু, আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, কাল তোমাদের সব্বার অফিস আছে, তাই রহস্যের যবনিকা উত্তোলন একেবারে সন্ধ্যা সাতটায় উইথ দ্য ফুল অডিয়েন্স। তুমি এক কাজ কর, আজ রাতে আর বাড়ি গিয়ে কাজ নেই আমার এখানেই থেকে যাও, সকালে সোজা এখান থেকে অফিস চলে যেও”।

আমার এখন যা মানসিক অবস্থা তাতে ব্যাচেলরহুড সম্পর্কিত খোঁচাটোচা আর গায়ে মাখছি না। রহস্যের খাসমহলে ঢুকে ওসব খারাপ লাগার অনেক ঊর্ধে উঠে গিয়েছি। সমানে আকাশপাতাল ভেবে যাচ্ছি কেসটার ব্যাপারে, নিজে থেকে মাথা খাটিয়ে যদি সমাধান বের করতে পারি তাহলে অন্তত এবি কে কিছুটা ইমপ্রেস করা যাবে। কিন্তু ভেবে কোনো কুলকিনারা পাচ্ছি না। আমার অবস্থা দেখে এবির বোধ হয় দয়া হল, ঘুমোতে যাবার আগে বললেন, “আচ্ছা এক লাইনে তোমাকে বলছি, আশা করি পুরোটা বুঝতে পারবে”।
আমার কানেকানে কথাটা বলাতেই বিদ্যুৎচমকের মত মূল ঘটনাটা পরিস্কার হয়ে গেল। গল্পের বাকি অংশটা নাহয় আগামী কাল সবার সঙ্গে শোনা যাবে।

 

————    উপসংহার   ————–

স্থান – ড. অদ্রীশ বোসের বসবার ঘর।
কাল – পরের দিন সন্ধ্যা সাতটা।
পাত্র-পাত্রী – রজত, নন্দিনী, সুরঞ্জনবাবু, শিশির বাবু, ঐন্দ্রিলা ও তার স্বামী মুকেশ, পালমশাই, হাতকড়া পরানো দুই আসামী ইন্দ্রজিৎ চ্যাটার্জী ও অলোকেশ সেন কে নিয়ে ইনস্পেকটর সমীরণ ভৌমিক, কয়েকজন কনস্টেবল, আমাদের পূর্বপরিচিত সেই রঙ্গিন পাগড়িধারী রাজপুত প্রৌঢ়, এবি, মাসিমা ও আমি।
সকলের সামনে প্লেটে রাখা সান্ধ্য জলখাবার ও কফির কাপ, কিন্তু কারোর সেদিকে খুব একটা মনোযোগ নেই, সবাই উদ্গ্রীব হয়ে আছে এবির কাছ থেকে রহস্যভেদের কাহিনী শোনবার জন্য

এবি কফির কাপে চুমুক দিয়ে কিছুটা থিয়েট্রিকাল ঢঙে আমাদের অর্থাৎ তাঁর ভাষায় ‘ফুল অডিয়েন্স’ এর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে করতে শুরু করলেন,
– “এই গল্পটার অনেকগুলো দিক, ঠিক যেমন জট পাকানো সূতোর অনেকগুলো মুখ, কোনটা ধরে টানলে জট খুলবে আর কোনটা ধরে টানলে আরো বেশি জট পাকিয়ে যাবে, তা আগে থেকে বোঝা মুশকিল। কখনো সাবপ্লটগুলো আমাকে বিভ্রান্ত করেছে, আমি ভেবেছি মূল ঘটনার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকবার মনে হয়েছে এই বুঝি সত্যের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি, পরক্ষণেই আবার গহন অন্ধকারে পথ হারিয়েছি।

অনেকের কাছ থেকে পাওয়া টুকরো টুকরো তথ্য আমাকে শেষ পর্যন্ত সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে সাহায্য করেছে। আপাতদৃষ্টি তে হয়ত ঘটনা গুলো তেমন সিগনিফিক্যান্ট বলে মনে হবে না কিন্তু তাদেরকে একে অপরের সাথে জুড়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায়। যাঁরা আমাকে নানান সময় এই গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন গুলো যুগিয়েছেন তাঁরা হলেন – ঐন্দ্রিলা, সুরঞ্জনবাবু, শিশিরবাবু এবং আমার এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ বন্ধু শ্রী অরণাভ তালুকদার। তালুকদার একটা বিশেষ কাজে কলকাতার বাইরে গেছে তাই আজ সে অনুপস্থিত। বাকিদের প্রথমেই একটা বড়সড় ধন্যবাদ দিয়ে নিতে চাই”।

মাসিমা উশখুশ করছিলেন, “তোমার প্রারম্ভিক ভাষণ শেষ করে তাড়াতাড়ি আসল ঘটনায় এস”!
এবি একথাটার সরাসরি জবাব না দিয়ে কফির কাপে আরো দু চুমুক দিয়ে বলে চলেন,
“ইন্দ্রজিতের গল্পটা দিয়েই শুরু করি। তোমরা তার দিক থেকে অর্থাৎ তার মনস্তত্ত্ব দিয়ে পুরো ঘটনাটা বিচার কর। শৈশবে মাতৃহারা হয় একটি ছেলে, সে বড় হবার সাথে সাথে গোপন সত্যটা আবিস্কার করে, তার মার মৃত্যুর জন্য বাবার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক দায়ী। নিজের জন্মদাতা পিতার প্রতি এক ধরনের তীব্র বিদ্বেষ ও ঘৃণা এবং মাতৃস্নেহের অভাব সঙ্গে করে বাড়তে থাকে ইন্দ্রিজিৎ। সেই শৈলশহরে তার খুব বেশি বন্ধু ছিল না যাকে সে মনের কথা খুলে বলতে পারে। তাই একা একাই মনের মধ্যে গুমড়ে থেকে রাগ ও প্রতিশোধস্পৃহা পুষে রাখে সে। চোখের সামনে সে দেখে যে স্বামীজি মহারাজের প্রভাবে বাবার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে তবুও হয়ত মন থেকে পুরোপুরি বিরূপ ভাব টাকে মুছে ফেলতে পারে না ইন্দ্রজিৎ। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় দুজনে কোলকাতায় চলে আসেন নিশিথকুমারের পুরনো বাসভূমিতে।

ইন্দ্রজিৎ জন্মসূত্রে পেয়েছে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার সুতীব্র বাসনা কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সে বাবার মত প্রতিভাবান নয়। অভিনয়ে তার মন নেই, তার প্যাশন হল মিউজিক। অনেক সময় যা হয়, চারপাশের গণ্ডীর মধ্যে ছোটোখাটো সাফল্য পেয়ে নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করে ফেলে কেউ কেউ কিন্তু আসল দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে সেই মুর্খের স্বর্গটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ইন্দ্রজিতের ক্ষেত্রেও তাই ঘটল, কলকাতায় থাকাকালীন বন্ধুবান্ধব মহলে বা ইউনিভার্সিটিতে নিজেদের ব্যান্ডে সুর করে সে বেশ নাম কুড়িয়েছিল। খ্যাতনামা সঙ্গীত পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে মুম্বই পাড়ি জমায়, বছর কয়েক স্ট্রাগলের পর সে বুঝতে পারে এ বড় কঠিন ঠাঁই, অত সহজে সাফল্য এখানে পাওয়া যাবে না। কিছু কিছু ফিল্মে সে কাজ পাচ্ছিল কিন্তু একটাও হিট সে দিতে পারে নি। নিজের সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়ে হতাশায় ডুবে যাচ্ছিল সে, ব্যক্তিগত জীবনেও তার লিভ-ইন পার্টনার তাকে ছেড়ে চলে গেছে। উঠতি গায়িকা যখন বুঝতে পারে এখানে আর কিছুই হবার নয়, কোনো মধু অবশিষ্ট নেই, সেও পাত্তারি গোটায়। কেরিয়ার শেষ করে বিস্মৃতির অতলে প্রায় চলেই যাচ্ছিল সে, এমন সময় তার হাতে চলে আসে এক গোল্ডেন লটারির টিকিট।

কোনোভাবে বাড়ির পুরনো জিনিস ঘাঁটতে ঘাঁটতে ইন্দ্রজিৎ পেয়ে যায় একটি রেকর্ডেড কিন্তু অসমাপ্ত ছবির গানের অ্যালবাম। আমার অনুমান এটি তার মা অপর্ণা দেবীর ব্যক্তিগত কালেকশনে ছিল। সঙ্গীতানুরাগী স্ত্রীর জন্য হয়ত নিশিথকুমার ওটি এনে দিয়েছিলেন এবং খুব সম্ভবত তাঁরই কোনো অসমাপ্ত ছবির জন্য ওই গানগুলো রেকর্ড করা হয়েছিল। কি ঠিক বলছি তো ইন্দ্রজিৎ বাবু?”

ইন্দ্রজিৎ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
“এইখানে আমাদের গল্পের দ্বিতীয় সাবপ্লটের সূত্রপাত। আবার একটু পিছিয়ে শুরু করছি। সত্তর দশকের মাঝামাঝি অর্থাৎ নিশিথকুমারের স্টারডমের শেষের দিকে এক আনকনভেন্শনাল ও প্রতিভাবান সঙ্গীত পরিচালকের আবির্ভাব হয়। জন্মসূত্রে তিনি পেয়েছিলেন এক মিক্সড কালচার, কারণ মা অবিভক্ত পাঞ্জাবের (লাহোর) বাসিন্দা এবং বাবা রাজপুত। রাজস্থানী, পাঞ্জাবী দুই ধরনের ফোকেই আকৃষ্ট হন তিনি ছোটোবেলা থেকেই। দাদু বিখ্যাত কাওয়ালি ও সুফি গায়ক এবং বাল্যকাল থেকেই তালিম পাওয়ায় তিনি যেমন একদিকে হয়ে ওঠেন ভিন্ন ঘরানার গায়কি তে পারদর্শী তেমনি হিন্দি, উর্দু ও পাঞ্জাবী ভাষায় অসামান্য দক্ষতার অধিকারী। সঙ্গীত তাঁর রক্তেই ছিল আর নিজের ইন্টারেস্টে তিনি গান লিখতেও শিখেছিলেন ফলে একইসঙ্গে গীতিকার ও সুরকার হওয়া টা ছিল যেন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা ।

খুব কম বয়সেই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ ও নজর কাড়া সাফল্য। প্রথাগত বলিউড মেলোডির বাইরে কখনো পাঞ্জাবী ফোক, কখনো সুফি কখনো বা রাজস্থানী ঘরানার গানে একের পর এক হিট দিতে থাকেন তিনি। নিশিথকুমারের সাথেও তাঁর আলাপ হয় তখন এবং নিশিথকুমার ও অপর্ণা দেবী দুজনেই তাঁর গানের অনুরাগী হয়ে পড়েন”।
সুরঞ্জন বাবুকে একটু উত্তেজিত দেখায়। কিছু একটা যেন তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে।

এবি তাঁর দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে বলে চলেন, “কিন্তু সেই তরুণ সঙ্গীতপরিচালকের ভাগ্যে সুখ বোধহয় বেশিদিন লেখা ছিল না, বছর চারেক কাজ করার পরেই তিনি আক্রান্ত হন এক ছোঁয়াচে রোগে যা ভারতীয় সমাজে অন্তত তখনকার দিনে অভিশাপ হিসেবে গণ্য করা হত। রোগের খবর জানাজানি হতেই ইন্ডাস্ট্রি তাঁর সংস্রব একেবারেই ত্যাগ করে। রাজস্থানে নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে দুর্দশা আরো বেড়ে যায়। অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে ঢাকা গ্রামের মানুষ যে তাঁকে ও তাঁর পরিবার কে একঘরে করবে সেটা আর নতুন কথা কি? হয়ত বিনা চিকিৎসাতে মারাই যেতেন তিনি যদি না নিশিথকুমার নিজের খরচে সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করতেন। নিশিথকুমারের পাঠানো ডাক্তার গ্রামে গিয়ে তাঁর চিকিৎসা করে ধীরে ধীরে তাঁকে সুস্থ করে তুলতে থাকে। সমসাময়িকদের তুলনায় নিশিথকুমার অনেক উদারপন্থী ও আধুনিকমনষ্ক ছিলেন। নির্মাতা, নির্দেশক ও অভিনেতাদের গিল্ডের কাছে গিয়ে অনেক দরখাস্ত করেন কিন্তু কোনো লাভ হয় না, কেউই পরবর্তীকালে সেই গীতিকার সুরকারকে কাজ দিতে চায় না।
একটু থেমে এবি জিজ্ঞেস করলেন, “সুরঞ্জন বাবু, নামটা মনে পড়ছে সেই মিউজিক ডাইরেক্টরের?”

“জেপি, জয়প্রকাশ সিং চৌহান, ইন্ডস্ট্রিতে নামের আদ্যক্ষরেই পরিচিত ছিলেন” – গুলীর বেগে উত্তর আসে, যেন ক্যুইজের প্রতিযোগী সুরঞ্জনবাবু!
“একদম ঠিক, আসুন আপনাদের সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই সেই সময়ের উদীয়মান সুরকার ও গীতিকার মিঃ জেপি চৌহানের”। এবির কথা শেষ হবার সাথে সাথে সকলকে নমষ্কার জানান আমাদের পূর্বপরিচিত শীর্ণকায় প্রৌঢ় রাজপুত।

“এবার বাকি টা কি আপনি বলবেন ইন্দ্রজিৎবাবু?”
ইন্দ্রজিৎ জবাব না দিয়ে ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকে।
“অগত্যা, যাই হোক ফিরে আসি ইন্দ্রজিতের কথায়। জেপির সুরকরা অ্যালবাম হাতে পেয়ে তার ভাগ্য খুলে গেল। তার হাতে থাকা শেষ সিনেমায় ৫টি গান ব্যবহার করে সে, সবকটাই সুপারহিট। ইন্দ্রজিৎ ভাবল যেমন করেই হোক এঁকে খুঁজে বের করতেই হবে। এমনিতেই আজকাল সুফি ও পাঞ্জাবী ফোকবেসড গান বলিউডে ভালোই খাচ্ছে, আর হালফিলের লোকেদের থেকে জেপির করা গান অনেক বেশি উচ্চমানের, প্রচুর ভ্যারিয়েশন আছে।

আমার অনুমান ছলেবলে বাবার কাছ থেকে জেপির গ্রামের ঠিকানা জোগাড় করে ইন্দ্রজিৎ। নিশিথকুমার আজকালকার সিনেমা বা মিউজিক অ্যালবামের কোনো খবর ই রাখতেন না, ফলে কিছু সন্দেহ হয় নি।

রাজস্থানের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে ইন্দ্রজিৎ আবিষ্কার করে যে, চরম অর্থকষ্টে ভুগছে জেপি কিন্তু অভিমানী শিল্পী কখনো বলিউড ইন্ডাস্ট্রির কাছে হাত পাততে চাননি। এত দিনে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেও ভুলেও আর মুম্বই ফিরে যাবার কথা ভাবেন না। গ্রামেই নিজের ছোটো একটা দোকান চালিয়ে কোনো মতে পেট চলে তাঁর। তবে সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টিক্ষমতা তো থেমে থাকে না, অসুস্থ অবস্থায় গৃহবন্দী থাকার সময় থেকে আজ অবধি বাঁধা হয়ে গেছে হাজার হাজার গান। সেই সমুদ্র দেখে তো ইন্দ্রজিৎ দিশেহারা হয়ে পরে। বুঝতে পারে একেবারে সোনার খনি তে এসে পৌঁছেছে সে। সুফি, কাওয়ালি, ফোকবেসড, রাগাশ্রয়ী থেকে কন্টেম্পোরারি – কি নেই সেই ধনভাণ্ডারে?

নামমাত্র সম্মানদক্ষিণা দিয়ে কিছু কিছু করে গান কিনতে থাকে ইন্দ্রজিৎ, ধীরে সুস্থে বাজারে ছাড়তে থাকে নিজের নামে আর ঘুরতে থেকে তার কেরিয়ারের মোড়। একের পর এক ব্লকবাস্টার, ছবির পর ছবির অফার আসতে থাকে, শোকেসে জমা হতে থাকে নানান পুরষ্কার। সব বিগ ব্যানারের প্রোযোজক কাজ করতে চায় ইন্দ্রজিতের কাছে। মজার ব্যাপার এখানে রিলেটিভিটির তত্ব টা খেয়াল কর, ইন্দ্রজিৎ এক একটা ইনস্টলমেন্টের জন্য যে টাকাটা জেপি কে দিচ্ছিল সেটা তার কাছে হাতের ময়লা, তার ফিল্মপ্রতি উপার্জনের দশ শতাংশের ও কম। অন্যদিকে আর্থিক দৈন্যতায় ভোগা জেপির কাছে সেটা বেশ মোটা উপড়ি পাওনা, রীতিমত যাকে বলে ঘরে বসে আয়। দু-পক্ষই খুশি, কারো কোনো অভিযোগ নেই, এভাবে কেটে যায় প্রায় বছর চারেক।

গোল টা বাঁধল যখন ‘হুনর’ ছবির জন্য ইন্দ্রজিৎ ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেল। এতদিন ফিল্মফেয়ার জাতীয় অন্যান্য পুরষ্কার পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এই প্রথম। জেপি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলেন না, “এ মাটির দুনিয়া টাকায় চলে” কথাটা যেমন সত্যি, তেমনি কবি শিল্পী রা টাকা পয়সার ঊর্ধে উঠে প্রধানত যশোলোভী হন এটাও খুব খাঁটি কথা। নিজের সৃষ্টি করা গান অন্য কেউ তার নামে চালিয়ে রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার গ্রহণ করতে হাসতে হাসতে মঞ্চে উঠবে – এটা মেনে নেওয়া সত্যি খুব কঠিন। জেপি বোধকরি ততদিনে উঠে পড়ে লেগে এটাও বুঝতে পেরেছেন আজকের দিনে সফল সঙ্গীত পরিচালকরা কি পরিমাণ উপার্জন করে। সে তুলনায় তিনি যে নগণ্য অর্থটা পান সেটা চিন্তা করে বুঝতে পারেন এক বিশাল প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছেন গত কয়েক বছর ধরে। ইন্দ্রজিৎ তাকে ঠকিয়ে এসেছে। তাঁর পক্ষে নিজেকে সংযত রাখা আর সম্ভব হয় না।

মুম্বই এ এসে জেপি ইন্দ্রজিৎ কে তাঁর ক্ষোভের কথা খুলে বলেন। ইন্দ্রজিৎ ভয় খেয়ে তাঁকে তৎক্ষণাত শান্ত করার জন্য মোটা টাকা দিয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে চায়। তখনকার মত জেপি শান্ত হলেও আবার মাঝে মাঝে হানা দিয়ে ইন্দ্রজিৎ কে ব্ল্যাকমেল করতে থাকেন। ইন্দ্রজিৎ মুম্বই এ তার ডেরা বদল করে জেপি কে ধোঁকা দেবার জন্য, কিন্তু লাভ হয় না, জেপি কলকাতায় চলে আসে এবং ইন্দ্রজিতের বসতভিটে খুঁজে বের করেন।
আমার অনুমান নিশিথকুমারের মৃত্যুর মাসখানেক কি মাসদেড়েক আগে ইন্দ্রজিতের খোঁজে আসা জেপির সঙ্গে প্রয়াত অভিনেতার সাক্ষাৎ হয়। দুজনেই দুজন কে দেখে চমকে ওঠেন। আসল ঘটনা জানতে পেরে ছেলে কে ডেকে এই জালিয়াতির জন্য তীব্র ভর্ৎসনা করেন নিশিথকুমার। প্রেস কনফারেন্স করে সব কথা জানানোর নির্দেশ দেন তিনি, স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দেন স্বামী অণ্বেষণানন্দের নির্দেশ অনুযায়ী সত্য গোপন করা মহাপাপ, সর্বোপরি তাঁর স্নেহভাজন জেপির প্রতি এত বড় অবিচার তিনি কখনোই হতে দেবেন না। তিনি ইন্দ্রজিৎ কে একমাস সময় দেন জেপি কে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।

তখনকার মত ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেও মাথায় বজ্রাঘাত হয় ইন্দ্রজিতের। চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসে, সে বুঝতে পারে গত পাঁচ বছরে গড়ে তোলা তার নাম-যশ, অর্থ, প্রতিষ্ঠা সব এক নিমেষে ছিনিয়ে নেওয়া হবে। রাগে, দুঃখে পাগলের মত হয়ে গিয়ে সে এই পরিস্থিতি থেকে বেরোবার একটা মরিয়া চেষ্টা করতে থাকে।
কি এই পর্যন্ত ঠিক বললাম তো চৌহান সাহাব?” – একটু থামলেন এবি
“জি, বোস দাদা, বিলকুল সহি ফরমায়া আপনে”
– সহমত পোষণ করেন প্রৌঢ়। আমরা সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ দেখতে থাকি। বিগত কয়েকবছরের সবকটা মিউজিকাল হিট, যেগুলো রাতদিন প্যাণ্ডেলে, এফ এম রেডিও তে শুনছি, সেগুলো সবই এই সাধারণ পোশাক পরিহিত জেপি চৌহানের সৃষ্টি ভাবতে অবাক ই লাগে। তাঁর অসামান্য প্রতিভার প্রতি এক ধরণের বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধা জন্মায়। এক ই সঙ্গে ইন্দ্রজিতের প্রতি ঘৃণায় মন টা বিষিয়ে ওঠে।

সুরঞ্জনবাবু জিজ্ঞেস করেন, “তা এই তমোনাশ গুপ্ত টি এই গল্পে এসে জুড়লেন কখন”?
এবি মার্বেল কেকের স্লাইসে একটা কামড় মেরে কফিতে আরেকবার চুমুক দিয়ে বললেন, “সে আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ যখন এই মানিক-জোড়ের আলাপ হয়, আমাদের গল্পের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং মোড়। ট্রেনে ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরছিল ইন্দ্রজিৎ, ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেণ্টে একমাত্র সহযাত্রী অলোকেশ সেন ওরফে তমোনাশ গুপ্ত। কি আশ্চর্য্য মিল দুজনের, দুজনেই তাদের পথের কাঁটা সরাতে উদ্গ্রীব কিন্তু সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ইন্দ্রজিতের ক্ষেত্রে তার বাবা আর অলোকেশের কাঁটা তার স্ত্রী ইন্দিরা দেবী। সমীরণ, তুমি তো অলোকেশের জবানবন্দি নিয়েছ থানায়, এঁদের বিস্তারিত বল।”

সমীরণ সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে শুরু করে, “অলোকেশের গল্পটা খুব কমন, চারিপাশে আকছার ঘটছে; ব্যাভিচারী, বহুগামী পুরুষের এক্স্ট্রা-ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার। ফি হপ্তায় খবরের কাগজে এরকম দু একটা খবর পাবেন। সোজা হিসেব, খুন করলে সবার আগে সন্দেহের দৃষ্টি স্বামীর প্রতি পড়বে, তাই যা করতে হবে একদম আঁটঘাট বেঁধে, পাক্কা অ্যালিবাই রেখে। বিরাট বড়লোকের মেয়ে ইন্দিরাদেবী চিররুগ্না, বোধকরি সেই কারণেই স্বামী কে বিবাহিত জীবনের সবটুকু স্বাদ পূর্ণমাত্রায় দেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। স্ত্রীর নজর এড়িয়ে অলোকেশ অন্য নারীর সঙ্গে লিপ্ত, মনে প্রাণে স্ত্রীর মৃতুকামনা করে যাচ্ছে সে। ইন্দিরাদেবীর মৃত্যুতে তার এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। স্ত্রীর বিশাল সম্পত্তির মালিকানা আর গোপন প্রেমিকা কে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে ঘরে এনে তোলা দুটোর পথ ই নিষ্কন্টক হয়।”

এবির দিকে তাকিয়ে বলে, “স্যার অলোকেশ সম্পর্কে আপনার স্টাডি নির্ভুল, দেশ-বিদেশের রহস্যকাহিনী তার ঠোঁটস্থ। পাজল, নিউমেরলজি, সাংকেতিক বাক্যের পাঠোদ্ধার করা, কথার খেলায় সে ওস্তাদ। শুধু নিজের স্ত্রীকে দুনিয়া থেকে সরানোই নয়, সেটাকে একটা ক্লাসিক পারফেক্ট মার্ডারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার রোমান্টিসিজমেও সে মশগুল। ফোনে ইন্দ্রজিৎ আর জেপি সাবের কথা শুনে কিছু একটা আঁচ করে সে, হয়ত বুঝতে পারে ইন্দ্রজিৎ একটা সমস্যায় আছে।
নিজে থেকে যেচে আলাপ করে, জানায় সে তার স্ত্রীর মার্ডার করতে চায়।

ইন্দ্রজিৎ আচমকা এরকম কথোপকথনে কিছুটা ঘাবড়ে যায়, কি বলবে সে ভেবে পায়না। অলোকেশের মধ্যে এক ধরণের সম্মোহনী শক্তি আছে, কথায় ভুলিয়ে সে ঠিক আসল কথা বের করে নেয়।

সে ইন্দ্রজিৎ কে বোঝায় যতই হুঁশিয়ারির সাথে তারা তাদের পথের কাঁটা সরাক না কেন, খুব স্বাভাবিক কারণে সন্দেহভাজনের তালিকায় প্রথমেই তাদের নাম আসবে যেহেতু মোটিভ খুব স্পষ্ট। কনট্রাক্ট কিলার দিয়ে কাজ হাসিল করলেও তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে ঠিকই একদিন না একদিন পুলিশ তাদের কে ধরে ফেলবে।

“তাহলে উপায়?”- ইন্দ্রজিৎ জানতে চায়।
“ধরা যাক যদি এমন কেউ খুন করে যার বিরুদ্ধে সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স থাকলেও কোনোদিন মোটিভ প্রুভ করা যাবে না, তখন?” অলোকেশের জবাব।

” ধরুন যদি আমরা আমাদের খুন টা অদলবদল করে নিই, অর্থাৎ আমি করলাম আপনার বাবার হত্যা আর পরিবর্তে আপনি আমার স্ত্রী কে সরিয়ে দিলেন, Its like we just swap our murders!”
প্ল্যানমাফিক সব চলতে থাকে যার বেশিরভাগ ই অলোকেশের মস্তিষ্কপ্রসূত। নিশিথকুমার কে সরাতে নিজের ওয়েল ট্রেন্ড ম্যাস্টিফ টাকে ব্যবহার করে সে।

পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আছে বুঝে ইন্দ্রজিৎ একদম চেপে বসে থাকে, আটঘাট বেঁধে কাজে নেমেছে তারা, কথাই হয়ে আছে কোনোমতেই তাড়াহুড়ো করা যাবে না।”

শিশিরবাবু জানতে চাইলেন, “আচ্ছা ড.বোস, ঠিক কখন থেকে আপনার ইন্দ্রজিৎ কে সন্দেহ হয়?”

“একদম প্রথম থেকেই, আমি সমীরণ কে দিয়ে ইন্দ্রজিতের ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্ট চেক করিয়েছিলাম। ফ্লাইটের টিকিট টা তার বাবার মৃত্যুর একদিন আগেই কাটা হয়েছিল, তার মানে সে জানত ঘটনা টা ঘটতে চলেছে। কাজটা কাঁচা হয়ে গেছিল ইন্দ্রজিৎ বাবু!”

ইন্দ্রজিৎ জবাব দেয় না। এবি বলে চলেন, “ঐন্দ্রিলা আর তালুকদারের সাহায্যে যখন জেপি কে ট্র‍্যাক করে ফেলি, তখন ইন্দ্রজিতের উদ্দেশ্য টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু হাতে কোনো প্রমাণ নেই, অকুস্থলে সে উপস্থিত ছিল না। এদিকে হায়ার্ড কিলার কুকুর লেলিয়ে ভয় দেখিয়ে মারবে – এটা আমার খুব অ্যাবসার্ড লেগেছিল। তার পক্ষে তো ভোরবেলায় নিশিথকুমার যখন প্রাতঃভ্রমণে যান তখন গুলি করে পালিয়ে যাওয়া অনেক সহজ।

তাহলে? বাকি পড়ে রইল একটাই সম্ভাবনা যে, খুন টা এমন একজন করেছে, আপাতদৃষ্টি তে যার কোনো মোটিভ নেই। তবে খুন টা সে করতে গেল কেন?

এই কেনর উত্তর খুঁজতে গিয়েই সেদিন সুরঞ্জন বাবুর বাড়িতে বিদ্যুৎচমকের মত এই অ্যাংগল টা মাথায় এল। টোপ ফেললাম, ইন্দ্রজিৎ টোপ টা গিলল। ফোন ট্যাপ হয়ে থাকতে পারে এই ভয়ে অলোকেশ আর ইন্দ্রজিৎ কখনো মোবাইলে যোগাযোগ রাখে নি। পুলিশ কেস ক্লোজ করে দিচ্ছে এই আশ্বাস দেওয়ার পরেই সে অলোকেশ কে ফোন করে জানায় “অদ্যই শেষ রজনী”।

তার পরের ঘটনা তো সবাই জানই। ”

এবি থামতে নন্দিনী আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা সৌভিক, তুই ওই ক্লাইম্যাক্স এর সাক্ষী থেকেও কাল রাতে পুরো গল্পটা না শুনে ঘুমোলি কি ভাবে?”

“ওকে তো এক লাইনে বলেই দিয়েছিলাম, সুরঞ্জনবাবুর কালেকশনে আলফ্রেড হিচককের যে সিনেমার নামটা দেখে সেদিন আমার মাথায় এই সম্ভাবনা টা এসেছিল,
“স্ট্রেঞ্জার্স অন এ ট্রেইন!” – মৃদু হেসে আমার হয়ে জবাবটা দিয়ে দিলেন প্রফেসর অদ্রীশ বোস।

 

———–   সমাপ্ত   ———

( মাস্টার অফ মিস্ট্রি স্যার অ্যালফ্রেড হিচককের “স্ট্রেঞ্জার্স অন এ ট্রেইন” এর ছায়া অবলম্বনে )

 


হিল্লোল ভট্টাচার্য

জম্ম ২৪শে ডিসেম্ব, ১৯৮০ মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্নাতক, বর্তমানে ডেনভার, আমেরিকায় প্রজেক্ট ম্যানেজারের পদে কর্মরত। সব ধরণের লেখা লিখলেও রহস্য-রোমাঞ্চ বা থ্রিলারধর্মী লিখতে বেশি পছন্দ করেন। অপদার্থের আদ্যক্ষর, অনুরণন, কল্পবিশ্ব, তিলোত্তমা, গল্পের সময়, আবেক্ষণ পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এবছর বইমেলায় প্রকাশিত প্রথম রহস্যোপন্যাস "অফ্রিয়াজার অভিশাপ"।

1 Comment

faiz · অক্টোবর 6, 2019 at 9:58 অপরাহ্ন

besh laglo stranger on a train er bangla version.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।