চলে গেলেন কলকাতার যীশু

দেবজিৎ সাহা on

২৫ শে ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যের এক সহজ শব্দের কারিগর চলে গেলেন। চলে গেলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী । পাড়ি দিলেন ফানুসের মত আকাশের কোন এক অজানা দিগন্তে নতুন “নক্ষত্র জয়ের জন্য” ।অমলকন্তি ,কলকাতার যীশু ,সম্ভাবনাময় নিষ্পাপ শিশুরাও দেখল তার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আর  মহৎ কোন অট্টালিকায় বসে খবর নিল সেই উলঙ্গ রাজা । তার মনে আজ একটা প্রশান্তি। মিলিত মৃত্যু কে উপেক্ষা করে  দ্বিমত হওয়ার কথা আর কেউ বলবে না । কে বলবে প্রশ্নের পাথরে নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করতে ? নিজের বুদ্ধিকে  শান দিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার কথা আওড়ানো বুড়ো লোকটা আজ গেল ।কিন্তু সত্যি সত্যি কি সে চলে গেল? না । যার মনের মালঞ্চে বাজে অনন্তকালের মৃদঙ্গ সেই শিল্পীর আনন্দ তো  ত্রি-কালজয়ী নেই তার আদি; নেই তার অন্ত।

বাংলা সাহিত্যের শক্তপোক্ত দুর্গে পা রেখেছিলেন  ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নীল নির্জনে” দিয়ে। এই দুর্গ কে আরো মজবুত করতে কোন ত্রুটি রাখেননি। একে একে লিখে গেলেন “অন্ধকার বারান্দা”(১৯৬১) “নিরক্ত করবী”(১৯৬৫)” কলকাতার যীশু”(১৯৬৯)” উলঙ্গ রাজা “(১৯৭১)”কবিতার বদলে কবিতা “(১৯৭৫)”পাগলা ঘন্টি”(১৯৮১) “সত্য সেলুকাস”- এর মতো আরো অনেক কাব্যগ্রন্থ যেগুলো কালজয়ী  ইমারতেরমত আজও দাঁড়িয়ে আছে। থেমে থাকেননি শুধুমাত্র কবিতার জগতে। রহস্যপ্রেমী বাঙালিকে দিয়ে গেছেন “মুকুন্দপুরের মনসা”(১৯৯১) ,”চশমার আড়ালে”(১৯৯৩),” লকারের চাবি”(১৯৯৫),” কামিনীর কণ্ঠহার”-এর মত ভিন্ন স্বাদের রহস্য কাহিনী। তার সৃষ্ট ভাদুড়ী মশাই কে কি বাঙালি আজও ভুলতে পেরেছে? তার সাহিত্য রস থেকে বঞ্চিত হয়নি কচিকাঁচারাও। শিশুমনের কল্পনাকে প্ররোচনা দিতেই রচনা করলেন “বিবির ছড়া”, “ডাইনোসর” ,”বারো মাসের ছড়া ” ,”মায়ের কাঁথা”,” রাত পাহারার”  মত কবিতাগুচ্ছ।

সাহিত্য জগৎ তার ঝুলিতে ভরে দিল একে একে অনেক পুরস্কার । ১৯৫৮ সালে তাঁকে প্রদান করা হয় “উল্টরথ পুরষ্কার”। ১৯৭০ সালে “তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় স্মৃতি ” পুরস্কারে তাকে পুরষ্কৃত করা হয়। “উলঙ্গ রাজা”- এর জন্য তাঁকে দেওয়া হয় “সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার” এবং ওই একই বছরে তিনি পান “বর্ষ শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার”। ১৯৭৬ – এ তাকে “আনন্দ শিরোমনি ” সম্মানে ভূষিত করা হয় ।১৯৯৯ সালে তাকে প্রদান করা হয় ” স্বর্ণাঞ্চল পুরস্কার”। কথাসাহিত্যের জন্য ২০১০ সালে তাঁকে ” বিদ্যাসাগর পুরষ্কার” প্রদান করা হয়।”মিলিত মৃত্যু”- তে তিনি ঠিকই বলেছিলেন, “চিন্তায় একান্ন বর্তি হয়ে কেউ বাঁচে না” । তাই সাহিত্য ,দেশ, সমাজ ,শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তিনি তার মৌলিক চিন্তা ধারার ছাপ রেখে গেছেন। তার সাথে রেখে গেলেন বাঙালি সাহিত্য সংস্কৃতির এক ভিন্ন অবয়ব।


দেবজিৎ সাহা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভারসিটি থেকে স্নাতক ও গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি থেকে স্নাওকত্তর । সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই লেখা লেখির জগতে প্রবেশ। কলেজ জীবন থেকেই লেখা লেখি শুরু করেন। পেশায় শিক্ষক। এছাড়াও ফটোগ্রাফি তে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।