আত্মজৈবনিক সংলাপ

রবীন বসু on

( কিশোর পর্ব )


বাদাবন ভেঙে যে শৈশব উঠে এল মাঠের আলে
কাদামাটিজল আর বিষধর কেউটের ফণা
ফড়িংডানা নিয়ে স্থির হয়ে আছে ছোবল

চোখে চোখ বিনিময় লাঠি ও বিষ
দাঁতের আছাড় নিয়ে অবশেষে দংশনের আগে
চকিত কৌশলে সরে গ্যাছে পা

নীলবিষ যত আছে মৃত্তিকা শুষে নেয়
হাতের লাঠির ঘা পড়েও পড়ে না
জলকেটে তিরবেগে উধাও কালোসাপ…

সে গমন শিল্প আঁকে, জলছবি হয়ে আছে
বালকের চোখ ; নির্নিমেষ চেয়ে থাকা
অবাক বিস্ময় নিয়ে নোনানদী ভাঙাপাড় হেঁতালের বন


সে বনে আদিম আলো কাঁটাঝোপ পা ডুবে যাওয়া গদ
ডিঙিনৌকো হাটে যায় বেসপতিবার
বোগড়ার গন্ধ ছিঁড়ে কেওড়াজলে জোয়ার ভাসে

সুত ফেলে টেনে তোলে গেরামের ঝি-বউরা
দু’দাড়া পেল্লাই সমুদ্রের কাঁকড়া
দূরে ভাসে কামট আর ছোট ছোট কুমিরের ছানা

হাতে ঢিল ছুটে যায় অব্যর্থ সে নিশানায়
টঙ টঙ শব্দে বাজে পিঠের খোলস
গোলচোখ ঘুরে যায় কুমিরের বিরক্তির হলদেটে আভা…

মধ্যাহ্নে শান্ত হয় শৈশবের দস্যিপনা
জেগে ওঠে অপরাহ্ণ ধুলো আর গজি গজি খেলা
ভাটির টানে ফেরে মাঝির নৌকো, সন্ধ্যার শান্ত বক


তারপর জ্বলে ওঠে হাজার জোনাকি-আলো
আফিমের নেশায় বুঁদ হয় বাতেধরা শীর্ণা-ঠাকুমা
তবুও গল্প বলে রূপকুমার…দুধকুমার…

পেরিয়ে যায় রাজারাজড়া তেপান্তরের মাঠ
গভীর ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠে দৈত্য-দানো
রুপোকাঠি-সোনাকাঠি স্বপ্নে ভাসে মেঘবরণ রাজকন্যে

তরোয়াল হাতে রাজপুত্র টগবগ টগবগ ছোটে
ঘাস খেতে মাঠে চরে ছোট ঘোড়া
বালক উঠেছে পিঠ, ঘাড়ের কেশর ধরে পেছনে বাড়ি

দে-ছুট দে-ছুট…মাঠের আল ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাস
দুলকি চালে নয় এলোমেলো ছুটছে শাবক
অবশেষে পা ভারি আলে লেগে প্রপাত ধরণীতল


পড়েছিল বালকও বটে, সরস্বতীপুজোয় কুল পাড়া
গাছ ভেঙে কাঁটার ডালে ঝুলন্ত শৈশব
দোল খায় দোল খায় নিচে দ্যাখে পানাভর্তি জল

অবাধ সাঁতারে ভাসে বিষণ্ণ-মধ্যাহ, স্নান তো হয়না শেষ
রেগেমেগে বাবা আসেন হাতে লাঠি
পিঠে তো পড়েছিল ঘা, ঘা পড়ে মনের অন্দরে

আরও আরও দুরন্ত দুপুর-ঘিরে দস্যিপনা শতেক
এ চালের লাউ কাটে তো ওকে ধরে মারে
শামুকের খোলে কাটে অর্ধেক পিঠ

আধো ঘুম আর জাগরণে মায়াবী আলোয় ভাসে
গ্রামদেশ, জোয়ারের জলে নদী ছলো ছলো
পিয়ালীর পাড়ে এসে স্তব্ধ হয় বালকের অসীম আগ্রহ


কে যেন চলেছে হাটে, কে যায় কুটুম বাড়ি বন্ধুতায়
সব মানুষের মন আঁকা হত যদি সহজ সরল
সব সবুজের শেষে অথৈ আনন্দ-ঘিরে বালক-বিস্ময়

তারও তো মন ছোটে অজানায় উদ্দেশ্যহীন
অপার সমুদ্রজল অতলান্ত স্বপ্নের মানিক
দিকে দিকে কত রং কত ছবি ভালোলাগার

মাঠ ভেঙে পাড়ি দেওয়া রাত্রিভোর যাত্রার আসর
ইতিহাস কথা বলে, পৌরাণিক চরিত্র সব
মনের গহনে গাঁথে, গেঁথে যায় সমূল প্রোথিত ইতিবৃত্ত

আকর্ষণ জেগে ওঠে জানার ইচ্ছা প্রবল
কিশোরপাঠ্য বই আর পত্রিকার সান্নিধ্যে সময়
কোথা থেকে কেটে যায় বহমান মুগ্ধ সে প্রতিভাস



রবীন বসু

জন্ম ১৯৫৮ দঃ ২৪ পরগনা। বর্তমানে কলকাতা নিবাসী। অনার্স সহ স্নাতক। ডিপ্লোমা ইন প্রিন্টিং টেকনোলজি। কর্মসূত্রে একটি প্রখ্যাত প্রকাশনা ও মুদ্রণ সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। এখন অবসর। একটি উপন্যাস, দুটি গল্পগ্রন্থ, চারটি সম্পাদিত গ্রন্থ ও পাঁচটি কবিতার বই লেখকের। ২০১৯ কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত কবির পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ "জন্মের প্রবাহিত ঋণ" সমালোচক এবং পাঠকদের প্রভূত প্রশংসা পেয়েছে। কবিতার জন্য ৫ টি ও গল্পের জন্য ৫টি পুরস্কার। সারা জীবনের সাহিত্যকৃতির জন্য পেয়েছেন "টার্মিনাস বই-পার্বণ সম্মাননা ২০১৯ । দৈনিক একদিন, দৈনিক যুগ শঙ্খ, দৈনিক সংবাদ নজর সহ নন্দন, প্রসাদ, কিশোর ভারতী, নবকল্লোল, শুকতারা, তথ্যকেন্দ্র, আরম্ভ, গাঙচিল, কলেজ স্ট্রিট, কথাসাহিত্য প্রভৃতি কাগজে নিয়মিত লেখেন। সম্পাদিত পত্রিকা : অন্বেষণ, নয়।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।