তাপের ফেরে’

সুকান্ত দে on

taper_fere

বাবারে গরম! তিষ্টোতে দিচ্ছে না মশাই। এই মাত্র সেদিনের কথা। পৌষ সংক্রান্তির কটা দিন আর সরস্বতী পুজোর কটা দিনই যা বাজার গরম ছিল। বাকি সময় আলু, পেঁয়াজ, বেগুন, ঝাঁক বাঁধা পালং শাক, ধনে-পাতা কি সস্তা কি সস্তা! ভাবতেই পারছি না ফটাস করে বেলুন ফাটানোর মতো গরম টা কে নিয়ে এলো। তা মশাই একখানা গরম রেখা দেশের ওপর দিয়ে গ্যাছে যখন গরম না হয়ে উপায় কি? কি দিন ছিল বলুন তো! নলেন গুড়ের গন্ধে মাখা সন্দেশে সন্দেশে মিষ্টির দোকানে মাছিরা মৌমাছি হয়ে যাচ্ছিল। কি বলছেন? আলাদা? না মশাই আর যাই হোক লেপের গরম আর এই গরমে কিছু তফাত তো হবেই। কিন্তু দুটোই গরম কিনা বলুন! ওটা হলো গিয়ে উসুম উসুম গরম আর এটা তেড়ে গরম। আসল গরম তো মশাই অন্যখানে। নীচে। মানে পশ্চাতে উনুন জ্বললে গরম তো হবেই। বুঝলেন না! শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন সাত স্তরের কথা। প্রথম তিন হলো গুহ্য, লিঙ্গ এবং নাভি। আগুনের আভাস নেই উৎস আছে। মন ঘুরে মরছে এই ত্রিকোণে। কথায় বলে শিষ্ণোদর প্রিয় মানুষ। নাভি সেই উদরের অবস্থান বোঝানো। সারাক্ষণ মন পড়ে আছে। যেন তিন বল। তিন দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরছে। মটরশুঁটির কচুরি, সেদ্ধ পিঠে, দুধ পুলি, ভাজা পিঠে, সরু চাকলি, মশাই কি বলবো লিখতে গিয়ে কলম থামছে না তো খাবার সময় কিভাবে থামবে। নোলা। হ্যাঁ মশাই নোলা। লকলক করছে আগুনের শিখার মতো। খেলেন তো খেলেন। হজমের ওষুধও খেলেন কম্বলের নিচে উসুম উসুম চাকুম চুকুম খেলেন আর পরের দিন দুপুর থেকে শুরু হয়ে গেল। কি? বুঝলেন না? যাত্রা। বেডরুম টু বাথরুম আর বাথরুম টু বেডরুম। আমার হয়েছিল মশাই। কাউন্ট করেছি। শেষে স্মার্টফোনে টিক মারছিলাম। ২৪ ঘণ্টায় আঠাশ বার। এখন আপনি শতাংশ কষুন, বার ডায়াগ্রাম পাই চার্ট দেখে বোঝার চেষ্টা করুন আমার কিচ্ছু যায় আসে না। সাতবার পর্যন্ত গুহ্যদ্বার ইলাস্টিসিটি দিয়ে সামলেছিল তারপর আর পারলো না। প্লাস্টিক পেতে শুতে হল। সেই সাথে জ্বালা। বাটা পোস্ত, কাঁচকলা সেদ্ধ এরিস্টোজাইম হয়ে নরফ্লক্সাসিন যেতে যেতে সে দ্রুততম সেঞ্চুরি করার মতো মারকাটারি ব্যাটিং চালালো। তিন দিনের দিন বোঝা গেল কোনও রকমে নার্সিংহোমে যাওয়া আর স্যালাইন নেওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেল এ যাত্রায়। গলা বুক জ্বালা গুহ্যদেশের জ্বালায় রূপান্তরিত হয়ে পরিবর্তিত হল বউ এর বাক্যবাণের জ্বালায়।

——– আচ্ছা লোককে বিয়ে করেছি। সবেতেই বাড়াবাড়ি না করে প্লাস্টিক প্রোটেকশন অব্দি না গেলেই নয়। কি দেখে যে ভীমরতি হয়েছিল আমার কে জানে।

——–সেই টের পেলাম মশাই সংসারের উনুনের ওপর বসে আছি তাই গরম। শীতেও গরম, রেতেও গরম, গরমেও গরম। হাতের তালু চিরে চলে গ্যাছে ভোগ রেখা বাসনা রেখা। আরেকটি নিচ থেকে ওপরের দিকে। মুক্তির রেখা। বাসনা আর ভোগ সমান্তরাল। মেলে না। যত বাসনা তত ভোগ, যত ভোগ ততই বাসনা। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভের মতো। শাস্ত্রকার বলেছেন, উপভোগের মাধ্যমে কামনার নিবৃত্তি হয় না। এতো গেল খেয়ে গরমের কথা। এবার বলি তরল গরমের কথা। এক ব্রাহ্মণ কলকাতার রাস্তায় গান গেয়ে ফেরি করছেন——
কালা এইসা বোতলমে লাল রঙকে মাল
দো আনা পৈসা দেকে পিয়ালামে ঢাল।
ইসমে নেহি দারু
খালি হ্যায় মিঠি ঝাড়ু।।

পীকে শায়েস্তা হোগা শরাবী মাতাল দো আনা পৈসা দেকে পিয়ালামে ঢাল।।

এদিকে বৃটিশ পুলিশ সার্জেন্টরা হকার হান্টিংয়ে বেড়িয়ে যেই হান্টার উঁচিয়ে তেড়ে এসেছে ওমনি হিন্দীভাষী মানুষটি গেয়ে উঠলেন,

Humour, satire, wit are in my publication,
Gentleman! take the bottle for your relaxation
It is ni ce rhyme
There is no vice crime
At your leisure time read it for recreation
Humour, satire, wit are in my publication
The get-up is very nice,
Two annas only price
If you can sacrifice, no fear of lamentation.

বৃটিশ পুলিশ নগ্ন গাত্র পাদুকা বর্জিত টিকিধারীর কাছে এরকম তাৎক্ষণিক গান শুনে হতবাক। আটখানি কপি তারা সংগ্রহ করে নিল। কি ছিল তাতে! মাথা গরম বৃটিশ হকার হান্টারটা নিশ্চই পড়েছিল। সুশিক্ষিত জাত। বইয়ের থেকে একটু কোট করার লোভ সামলাতে পারছি না———-
মদিরামাহাত্ম্যে তিনি লিখেছেন—–

” দেবী! সুরেশ্বরী! বোতল-বাসে
নর্দম কর্দম লিপ্ত শরীরে,
কণ্ঠে পরিহিত যজ্ঞীয় সূত্র
গমনে নানা মতলব গুপ্ত
কভুগত ডানে কভুগত বামে
পতনোত্থানে কত শত রঙ্গে
ক্রমশ-বর্ধিত পানাসক্তি
অর্থ-বিবর্জিত প্রলাপ বাক্য
অপ্রিয় গন্ধে অপ্রিয় বদনে
অবিরল রহিবে পিছনে হটিয়া
তরু-তল-গত কর কতই গৃহস্থে”

এরপর ঘরে ঢুকে বউকে বেধড়ক মার অশ্রাব্য খিস্তি চরিত্রহনন। একেবারে ফুটন্ত লাভা নাকে মাথায়। কোথায় যাবে বাওয়া এই গরম ছেড়ে গা দিয়ে ঘাম গড়াবে তাতেও দূর্গন্ধ অথচ দাদাঠাকুর নামে পরিচিত মানুষটি যাঁর নাম শ্রী শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত বলে উল্লিখিত আছে তাঁকে শীতকালে একজন প্রশ্ন করলো, “আপনার শীত করছে না?” ট্যাঁক থেকে একটা গিনি বের করে উত্তর দিলেন, “না, ট্যাঁকের গরম।” ট্যাঁক বড় বেড়ে জিনিস। গা গরম রাখে। মানুষের ওপর থেকে মানুষ জ্ঞান চলে যায়। শুধু নিজে কত বড় তাই শুনতে চায় অন্যের কাছে। বুঝতে পারছে না সে চলছে নাকি ট্যাঁক চালাচ্ছে। তখন ট্যাঁকের আমি ট্যাঁকের তুমি ট্যাঁক দিয়ে যায় চেনা। বিচিত্র মানুষের মন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, পায়রার ছানার গলা টিপলেই বোঝা যায় ভেতরে দানা গজগজ করছে। আবার নিজের কাপড়চোপড়ের হুঁশ থাকতো না। ন্যাংটা সন্ন্যাসী তোতাপুরী এসেছিলেন বেদান্ত শিক্ষা দিতে। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা মঠের দশনামী সম্প্রদায় ভুক্ত নাগা সন্ন্যাসী। দেখুন মশাই গরম দেখুন। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সদাই এক বেশ। স্বচক্ষে দেখেছি। আমারই শহরে একজন মানুষ ডাকলেন প্রকৃত সাধু দেখবে তো এসো। গেলাম। বুকের নিচ অব্দি কাপড় জড়িয়ে বসে। প্রণাম করতে গিয়ে দেখি পা তো নয় যেন পাথর। জল হাওয়ার ঘর্ষণে পাথর যেমন হয় তেমন। তাঁকেই আবিষ্কার করলাম ট্রেক করে ফেরার পথে বদ্রীনারায়ণে।: ঐ ঠাণ্ডায় সেই একই পোষাক। পায়ে খড়ম। ওনার খালি গা, আমার হলোফেন জ্যাকেট। জানিনা এই উষ্ণতার উৎস কোথায়। শিষ্য শিষ্যার আদিখ্যেতা নেই। একা। চিনতে পারলেন। যাক সে কথা। ভাববেন না মশাই এসব কপচাচ্ছি বলে বিরাট জ্ঞানী। জ্ঞানের গরম হয় মশাই। মানুষে মানুষে ভেদ বুদ্ধি জাগিয়ে তোলে। বশিষ্ঠ এতো বড়ো জ্ঞানী পুত্রশোকে অধীর হয়েছিলেন। লক্ষ্মণ জানতে চাইলেন, “দাদা! ইনিও শোকার্ত! ” রাম বললেন, “ভাই,যার জ্ঞান আছে তার অজ্ঞানও আছে; যার আলোবোধ আছে তার অন্ধকার বোধও আছে; যার ভালো বোধ আছে তার মন্দ বোধও আছে। ভাই তুমি এই দুইয়ের পারে যাও।” জ্ঞান আর অজ্ঞানের পারে যাওয়া। ছোট ছেলেকে রাস্তা পার করানো হয় তারপর অভ্যাস হয়। নিজেই পারে। গরম আদতে ‘অহং বোধ’। ‘আমি আছি’ এই বোধ। আমি টা কোন আমি! চিকিৎসা বলছে বায়ু-পিত্ত-কফ। কেউ বলছে পঞ্চভূতের শরীর। বিজ্ঞান যখন ইলেকট্রন প্রোটন নিউট্রন অব্দি গ্যাছে তখনই বুঝেছে বস্তু আসলে বিশাল ফাঁকায় একটা ছোট্ট বিন্দু। E=mc2 হবার পর তো আর সেই অবস্থাও রইলো না তবু আমি আছি। বন্ধুরা আছে। বন্ধুত্বের গরম আছে। বলেছে, “হেব্বি লেখো তুমি”। ব্যস! বার খেলাম নাকি গরম খেলাম কপচাতে শুরু করলাম। একজন কবির কথা শুনেছিলাম। একরাত্রে হঠাৎ তার গরম বোধ ভ্যানিস। খাতা খোলা, পেন খোলা, লেখা অসমাপ্ত টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। কবি উঠে গেছেন। লিখছি আর ভাবছি এই গরম থেকে কবে পরিত্রাণ। কে টেনে তুলবে নাভি থেকে বুকে যেখানে জ্যোতির দর্শন হয়, সেখান থেকে কণ্ঠে যখন শুধু ঈশ্বরতত্ত্ব ভালো লাগে অন্য কিছু নয়। তারপর ষষ্ঠভূমি কপাল। সেখানে শুধু দর্শন। সামান্য উষ্ণতা বা গরম তখনও আছে। এরপর শিরোদেশ সপ্তমভূমি। ষষ্ঠভূমি অব্দিও খোঁজ। হাইড্রোকোলাইডারে ঈশ্বরকণা। স্ট্রিং থিয়োরি বা এম থিয়োরি। বস্তু প্রায় নাই। ডায়মেনশন দশটা। এরপর সমাধি। আমিও যা তুমিও তাই। বিগ ব্যাং এর সময় সোনা ব্যাং কোলা ব্যাং স্থান কাল কিছুই ছিলো না। সমস্ত প্রকাশিত হলো। তাপের ফেরে জগৎ ফিরলো। এখনও ফিরছে। আর কতোদিন ফিরতে হবে? উপনিষদ বলেছে নিত্য অনিত্য বিচার করে দেখতে। সেটাই মাপদণ্ড। কে বা কি থাকছে আর কি-ই বা থাকছে না। কে ঢেকে রেখেছে। আমার যখন একটি বন্ধু তখন তার বিচারেই আমি। যখন অনেক বন্ধু তখন বহুরকমের বোধ বহু ধরণের বিচার। ছিল এক হলো বহু। বহু দেখতে চাইছে এককে। কিভাবে দেখতে পাবে? ঈশপনিষদে সূর্য থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি। সেখানেই এই প্রাণ বা চেতনা। সূর্যের স্ত্রী তাই সংজ্ঞা। সূর্যের প্রবল তেজ সহ্য করতে পারছে না বলে তারই আরেক রূপ ছায়া। যা লিখছি সমস্তই প্রাপ্ত জ্ঞান। তাই দিয়ে অনুভূতির দরজা খুলতে হবে। ঈশপনিষদের ১৬তম শ্লোকে তাই বলা হচ্ছে ——

পুষন্নেকর্ষে যম সু্র্য্য প্রাজাপত্য
ব্যুহ রশ্মীন্ সমূহ তেজঃ।
যত্তে রূপং কল্যানতমং তত্তে পশ্যামি
যোহসাবসৌ পুরুষঃ সোহহমস্মি।।

—হে পূষন, হে নিঃসঙ্গ পথচারী, হে সর্বনিয়ন্তা, হে প্রজাপতিনন্দন সুর্য্য, অনুগ্রহ করে তোমার কিরণরশ্মি সংবরণ করো। আমি তোমার কল্যানতম রূপটি দেখতে চাই। তোমার মধ্যে সেই পুরুষ রয়েছেন; আমিই সেই পুরুষ।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


সুকান্ত দে

সম্পাদনাঃ ঘোড়সওয়ার, অনর্গল, বর্ণমালা সাহিত্যপত্র। কবিতার বইঃ যাপনের ছায়াপথ(২০১৩) কুরচিফুলের আতসকাচ(২০১৮) যুগ্ম সম্পাদকঃ বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলা কমিটি। আপনাদের পত্রিকার সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।