পাঠক লগ্ন – “মাটি ছুয়ে যা যা মনে হলো”

কৌস্তভ কুন্ডু on

pathok_logno

কত ধরনের পাঠক আছেন। কবিতার নাড়ি ধরে বলেছেন জ্বর ছিল কিনা। আমি ওসবে নেই। আতস কাঁচ নেই আমার,  নেই কবিতাকে সিলিং অথবা ফ্যানে ঝুলিয়ে ময়না তদন্তের হিম্মত। অতএব নাগর দোলার দুলুনিটুকুই প্রিয়। তৃষিত হয়ে যাও, পিপাসা মেটাও। ব্যাস।

প্রতি মূহুর্তে কতো ক্ষত লেগে আছে থাকে। রাগ, অভিমান, হতাশা, বিষণ্ণতায় ছেয়ে থাকে মন। সব শেষে ফিরে যায় কবিতার কাছে, শব্দ প্রলেপ দেয়; শান্ত করে মন।

পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পড়ি, বিশ্বজিৎ লায়েকের “পোড়া নক্ষত্রের কাঙাল”।

উঠে দাঁড়াব বলে/ আজ কি স্বপ্ন লাগবে কারো/ ঘুমন্ত চোখ থেকে খসে পড়া চাউনি নিয়ে/ কোথায় লুকোবে তুমি?

ঠোঁট কামড়ে বলবে/ যাচ্ছে যাক ঝুলে পড়া চাঁদ/ কি দ্বিধায় চুষে নেবে চরিত্র দাগ!”

উঠে দাঁড়াব বলে আরেঠারে উগরে দেবে পরিত্যক্ত সংসার/ চকচক করে উঠবে সোনা নয় এমন কৌতুহল/ কোথাও কি আছে পড়ে/ অমন আত্মমগ্ন বিশ্বাস!

( জীবাশ্ম রাত )

চোখ স্থির হয়ে যায়। ‘চুপচাপ’ মগ্নতা পায়। আরেকবার পড়ি… বারবার। রক্ত আঁকড়ে ধরে শব্দের স্রলাইন। অসুস্থতার নতুন এক মঞ্চ তৈরি হয়। শব্দ ছিনিয়ে নেয় অদৃশ্য কালচক্র; আঙুল হাত দিয়ে ফেলে শব্দব্রহ্ম মরিচিকায়। পড়ি –

পাঁজরে লুকিয়ে নিচ্ছি ঘুম/ বিছানায় আত্মকথা/ ভেতরে বাইরে পৃথিবী/ ভাষার নীরবতা (চিঠি)।

পড়ি। আরও পড়ি। বিছানায় মুক্ত নয়, পড়ে থাকে অসাড় শরীরে বিষসিক্ত মেরুদণ্ড নীল-

শোক ও জলের নিচে আমি কি ঘুমিয়ে থাকব এখন অথবা তোমার কথা ভাবব, স্ক্যানারের 

পারলে ভালবাসো আমি আর প্রাপ্ত বয়স্কে যেতে চাই না, ফিরে কি যাওয়া যাবে বীজের শরীরে 

এখন                                                                            

( ভয় )

অঙ্কুরোদগমের পর বীজ গর্ভহীন হয়ে বাড়ে, তার আর শরীর থাকে না। জন্ম দিতে গিয়ে মাতৃত্বের গুটিকয়েক দিনই সে পায় পূর্ণপ্রাণ, অবশেষে মাটিতে মেলায়। সুতরাং ফেরা যায় না, পরবর্তী ভবিতব্য ছুটে যায় প্রাণঘাতি আগুনের দিকে।

আমার কিছুই দেবার নেই

খা রাক্ষসী খা ছিন্ন ভিন্ন ঘিলু

এত দহন তবুও পুড়ছে না বুক

জ্বলে ওঠ রাক্ষসী আত্মঘাতী আগুন খেলায়

আমার আর কিছুই করার নেই

শোন রাক্ষসী শোন মৃত মানুষের গান

এত আগুন তবুও পুড়ছে না ছাই

ভুলে যা রাক্ষসী তুই মেয়ে মানুষ                            

( মৃত ঘিলুর গান)

মূহুর্ত বড় অগোছালো, মূহুর্ত বড় চঞ্চল, অস্থির। তৃষিতের দশদিক খোলা, দশদিক রাক্ষসী, হাহাকার। তবুও —

মাটি ছুঁয়ে যা যা মনে হল/ সব মিশে গেছে/  দবারকেশ্বর জলে/ আরো দূরে তুমি কার জন্য/ অপেক্ষা কর আমার অভাব/ ক্রমশ গভীর হচ্ছে কষ্ট/ নেমে আসছে বুকে না পাওয়া যাবতীয় / ধান-দুব্বো।/ তোমাকে শ্রাবণ দিলাম/ রাতের মা-কালি/ তুমি কি ফিরিয়ে দেবে সিগারেট কাউন্টার                                                          

( যা দেবে দাও )

হাহাকার পাতার মত ওড়ে, হাহাকার উড়ে উড়ে পাখি হয়। শব্দের পাখি ডানা ঝাপটিয়ে দেখে, কখনো আকাশে ওড়ে, কখনো বাতাসে ঝরা পাতা-

আমাদের দেহে রাত্রি নামে/ আমাদের দেহে ঝরা পাতা/ শীতের শরীরে লুকিয়েছি ঘুম/ আয়নায় লেগে থাকা ঘাম/ বাহুমূলে উল্কি আঁকা                                                                                                 

( উল্কি)

শব্দের নিজস্ব মায়া আছে। আছে মিলনের বানভাসি ডাক। কবির মদনবানে পাঠকেরও অভিসার জাগে। পাতা ওল্টাই। হেসে ওঠে পাতা, বলে পড়…

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তোমার শহর/ আমাদের অসুখ বিসুখ/ জনশ্রুতি বলে / প্রেম আসলে নদীর জল/ বয়ে যাচ্ছে তোমার জীবন/ ছুঁয়ে দেখো তাকে/ শরীর থেকে বেরিয়ে আসা আশ্রয়                                                        

( আশ্রয়)

নাড়িয়ে নিই শরীর। বলি, এই যে হাত দিয়ে টিপে টিপে দেখো শব্দের অবয়বগুলি। ধ্যান ভাঙে না, কবিতা নদীর মতো কলকল জল বয়ে যায়। দ্রিম দ্রিম মাদলের তান, সবকিছু গাঢ় হয়ে যায়। দ্রবণে কঠিন তরল মিশেও মেশে না যেন, ‘বিচিত্র’ বিচিত্র থেকে যায়।

কোন দৃশ্য থেকে বেরিয়ে কোন দৃশ্যে ঢুকে পড়ব ভাবছি/ পায়ের নিচে অভিকর্ষ বল/ আর নিচে নামব না প্রভু/ অপমান চেটে খাবো/ আলুপোস্ত ডাল মেখে ভাতে/ সুষুম্না-ইড়া-পিঙ্গল/ ব্রহ্মতালু খুলে দেব লোলুপ বস্তুপিণ্ড/ স্বাদু -পরিচর্চা/ বিনিময় চাইছি না/ বলছি/ দুবেলা দুটো অন্ন দিও/ ছেলের মুখে ভাত                                                 

(প্রার্থনা)

মৃত মানুষের মন থাকে না। অবলীলায় চিরে ফেলা যায় এপাশ-ওপাশ। কবিতা এক সমুদ্র ঢেউ – মন্থনে বিষ আছে, আছে অমৃত। কোথাও ভাঙছি না তোমাকে।  বুঝিয়ে বলছি না কিছু। ‘শব্দ’ ব্রহ্ম তুমি। নিজেই নিজের আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠো।  অতএব পড়ছি শুধু; পড়ার এই অবিশ্রান্ত শ্রাবণ —

আয়নার ভেতর দেখি / দুভাগ হয়ে গেছে ঘর/ প্রতিবিম্ব থেকে আঁধার খুলে/ পা থেকে মাথা/ ভাঙা আলো, নীল মোমবাতি/ স্নায়ু থেকে মাথার ঘিলু/ প্রকৃত আমার কি!/ আয়নার ভেতর আমি / এপাশ ওপাশ/ খুঁটে খুঁটে দেখি/ পড়ে আছে ঘর/ শূন্য গেরস্থালি।                                                                                                   

(বিম্ব)

শব্দের দশদিক খোলা। শব্দের অজস্র-সহস্র সব রঙ। একে একে সব খুলে দিয়ে যায়, যাপনের সমস্ত ভেলকি।

যেভাবে স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণকে নাচায়/ গণতন্ত্রে টুথপেষ্ট লাগানোর কৌশল/ তুমি শিখে নিয়েছ/ সেই একত্র সহবাসে/ তরল স্বভাব অই/ পাত্র বদলালে আকার বদলায়/ রঙ নয়

( পরিবর্তন) 

মানুষ বড় একা। মানুষ বড় নিজের। মানুষ কিছুটা মানুষ, কিছুটা লুকোনো শয়তান।

একটা অভাবী মানুষ হেঁটে যাচ্ছে রাস্তায়। তার অসুখের পাশে হাঁটছে উন্মাদ অন্ধকার। অপলক 

দুপুর। বেঁচেবর্তে থাকার আদিম পাসওয়ার্ড। এই দৃশ্যের ভেতর দাহ নেই। পাপ নেই। জল 

নেই। নগ্ন চরাচর।

একটা অভাবী মানুষ দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। তার সামনে এসে দাঁড়াল পরিহাস। কঙ্কাল। কার্বন।  

ক্লান্ত ভাইরাস আর পচনশীল অভিষেক। 

অভাবী মানুষের হেঁটে যাওয়া ও দাঁড়িয়ে পড়ার মাঝখানে ঢুকে পড়লাম আমি অবিচ্ছিন্ন শয়তান। 

(নিজের সঙ্গে নিজের কথা)

জীবন একটা তালগোল পাকানো ভবঘুরে যাযাবর। শব্দ মূহুর্ত লিখে রাখে। মূহুর্ত একটা অবিন্যস্ত ঝড়, কখনো হজম করে কখনো ওগরায়।

বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় বেড়ে উঠছে মফস্বলের আঁধার/ আমাদের নিজস্ব  অসুখ/ মা একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে/ বাবা আজকাল কথা কম বলে/ দাদা যেমন ছিল এখনও তেমন উচ্চবাক/ মুদির দোকান ফেলে খাকি উর্দি পরেছে ভাই/ আর্দ্র-সিক্ত এইসব মানুষের ভিজে যাওয়া হাত/ ভেবেছে পৃথিবী তার মতই ঘুরবে / সূর্যের চারদিকে/ বছরে মাত্র একবার/ মগজে অস্ত্র নেই/ স্বপ্ন রক্তে মাখামাখি/ ঘুম ভেঙ্গে দেখি/ পৃথিবী খুব ভারি হয়ে গেছে/ ঘুরছে না আর                   

 (পরমার্থ) 

‘দাম্পত্য’ অস্থির একটা বিন্দু। কেবল নড়ে নড়ে যায়। যেন জলে ভাসানো প্রিয় চাঁদ। ছোঁয়া গেল, ধরা শুধু অধরায় থেকে যায় যেন। বালির শরীর মাখা সমুদ্র-বিস্তৃত অজস্র গর্জে ওঠা ঢেউ। জটিল, অমিমাংসিত পাটি গণিত।

সময় বসে আছে কচ্ছপের পিঠে/ আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে/ স্যাঁতস্যাঁতে জ্যোৎস্নার ভেতর নিদ্রাহীন/ অবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে, সংসার/ মায়া, সন্তান, অসংখ্য উড়ে আসা কথা/ বিষক্রিয়া/ এইসব কিছুই না/ নক্ষত্র চিনে আমরা ভালবাসতাম/ শরীর/ মন্থন অবশেষে আমাদের মাঝখানে/ জেগে উঠছে অপ্রতিম/ আমাদের রক্তের বীজ। 

   ( অপ্রতিম)

মানুষ-একা মানুষ। মানুষ – বিপরীত মানুষ। মানুষ-প্রিয় মানুষ। মানুষ-মানুষের শরীর। শরীর -শরীরের বীজ। বীজ-বীজের শরীর। সংসার-সংসারের সম্পর্ক। সম্পর্ক-সম্পর্কের জটিলতা। স্বপ্ন -স্বপ্নের হতাশা। হতাশা-হতাশার হাহাকার। বেঁচে থাকা-বেঁচে থাকার লড়াই।  লড়াই-লড়ায়ের রাজনীতি। রাজনীতি- রাজনীতির বিস্ফারণ। 

না, না, আর না। টান মারছে শরীর। বেসামাল হয়ে উঠছে মন। নিতে পারছি না। কালির এই উন্মাদ নাচন। শব্দ খুলে ফেলছে শরীর। নিউক্লিয়াসে বিবস্ত্র হচ্ছে অনু-পরমানু। থামো শব্দ… থামো।

আমি কিছুই চিনতে চাইছি না। তুমি চিনিয়ে দিচ্ছ তলপেট। মোষের শিং। বীজগণিত। লিভ-টুগেদার… 

একদিন আমি বিছানা পত্তর ছেড়ে উড়ে যাবো। কোথাও একটু লেগে থাকবে শরীরের 

ধাতু। ম্যাটিনি শো সিনেমা।

আমি কিছুই খেতে চাইছি না। তুমি খাইয়ে দিচ্ছ পার্কস্ট্রিট। অরাজনৈতিক জল। না ছাপা বইয়ের 

তৃতীয় সংস্করণ।  একদিন আমি জলহীন নৌকায় ভেসে যাবো। কোথাও একটু লেগে থাকবে 

ডিওলিন। রাতের লেবেঞ্চুষ।

আমি কিছুই চাইছি না। দুহাতে পাচ্ছি রোদ, হ্যামলিনের বাঁশি। হাসপাতালে কারা ছেড়ে গেছে 

মাউস…                                                                              

( হিসেব নিকেশ)

তালগোল পাকিয়ে গেল সবকিছু। যেন সোয়েটার থেকে গেলো জটপাকানো। উলের পাহাড়। শব্দ বিড়বিড় করছে। শব্দ উদভ্রান্ত করছে মনের সবকটা জালিকা বিন্যাস। অতএব ” মগজ গুটিয়ে নিলাম।”

কেউ আর বলতে পারছি না ভালো আছি / কী ভাবে ভালো থাকা যায় / আগামীকাল ভালো থাকবো কিনা / গ্রাম-শহর জানে না কেউ 

যে কোন সময় জ্বলে উঠতে পারে / সবক্টা জতুগৃহ করোটি কঙ্কাল/ কেন এই নির্মাণ যুযুধান আশালীন শ্লোক/ বিনির্মাণ হিংসার সকালবেলা/ খুবলে নিচ্ছে রোদ… ষুষুম্নাপিঙ্গল

রাস্তায় রাস্তায় নামছে ভয় আর আবহ শোক/ কেন বলতে পারছি না বেশ তো ভালো আছি/ আরো আরো ভালো থাকব আগামীকাল                                                                                                                                                                  

 ( কেন বলতে পারছি না ভালো আছি)

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


কৌস্তভ কুন্ডু

জন্মঃ মার্চ ১৯৮৬। জন্মস্থানঃ পুরুলিয়া।আত্মপ্রকাশঃ ‘রক্তচাপ ওঠা নামার দু-চার কলম”  পত্রিকা (২০০৭) ।বইঃ ‘ঘুমোতে পারছি না’ (২০১৩), ‘জোকার, খিদে ও অন্যান্য পুতুল’ (২০১৭)।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।