বই আলোচনা : মৃতদেহরই হেসে ওঠার সময়

সোহেল ইসলাম on

mritodeheri-hese-othar-somoy
নাম : মৃতদেহরই হেসে ওঠার সময়
পিতা : রঞ্জন আচার্য
জন্ম : ডিসেম্বর , ২০১৯
ওজন : ৪ ফর্মা
গায়ের রঙ : কৃষ্ণের মত নীল
স্থান : পুরুলিয়া
কথা : ৯৩৩২১৩৫৬১৬

সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলছি, একটি বিশেষ ঘোষণা― চায়ের দোকানে কাপ উল্টে, খাওয়ার টেবিল থাপড়ে কিংবা খোশ গল্প দিয়ে বেশিদিন বিপ্লব চালিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবের জন্য যে মাটির দরকার তার খোঁজ করছি আমরা। অতএব বন্ধুরা, হাতে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, কী করবেন, তার নিদান উৎসর্গ কবিতায় দেওয়া আছে, মনযোগ সহকারে পড়ুন, মনে মনে নয়, আরে বাবা মনে মনে নয়, উচ্চারণ করে পড়ুন

” ঝান্ডা আরও শক্ত করে ধর

পরিস্থিতি বাঘ হচ্ছে রোজ

আজ নয় কাল ট্রিগারে চাপ

দিতেই হতে পারে

তখন যেন হাত না কাঁপে তোর”।

সময়টাই যখন রাজনৈতিক, আর আপনিও দেখছি ভালোই রাজনীতি পছন্দ করছেন, তখন তো রাজনৈতিক বই নিয়ে আলোচনা করব, এটাই স্বাভাবিক। শৈশবে ‘ দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান’ পড়েছেন, এবার ‘দৈনন্দিন জীবনে রাজনীতি’ পড়ুন। কেননা,

“বাঙালিই একমাত্র জাতি

বাঘ মারতে যার গুলি বন্দুক লাগে না

মুখই যথেষ্ট”।

তাই এখানে হাত ধরা বা হাত ছাড়ার রাজনীতির কথা বলছি না কিংবা সংসার চালানোর রাজনীতির কথাও না, এখানে জীবন চালানোর রাজনীতির কথা হচ্ছে, আরও সহজ করে বললে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার রাজনীতির কথা হচ্ছে। ও হ্যাঁ, শুরুতেই একটা কথা বলে দিই, কবি কিন্তু সচেতন, এ বই পাঠ শেষে আমিও সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছি বলেই না আপনাকেও সচেতন হতে বলছি। সচেতনতার গুনাগুন বিচারক হতে গেলে আপনাকেও পাঠ করতে হবে ‘মৃতদেহরই হেসে ওঠার সময়’।

এটা খুব সত্যি কথা, আপনি জীবনকে যত বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন, তত বেশি আপনার কবিতা রাজনৈতিক হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গে আমার এবিষয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু অভিনয় করে ভালো থাকার সময় যদি এক হতে না পারি, তাহলে হিংসা, খাদ্যের অভাব, অর্থহীনতা জাঁকিয়ে বসবে আমাদের উপরে। ঠিক এই সময়ে মানুষের দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে আরম্ভ করবে।

“যত দেরী করবে,চেহারা ভেঙে যাবে আরও। মুখ থেকে মুছে যাবে রাগী আর নিষ্পাপ যুবকের ছাপ…”।

‘পরিযায়ী’ শব্দটায় আপত্তি আছে আমার। হয়ত এখানটাতেও আপনার সঙ্গে বিরোধ বাঁধবে। কারা পরিযায়ী, কাদের পরিযায়ী বলব আমরা ? রাষ্ট্র আজ পরিযায়ী ঠিক করে দিচ্ছে, কাল সম্পর্ক ঠিক করবে, পরশু ঠিক করবে, কী করব, কী বলব, কী ভাবে চলব, এত সব মানতে পারবেন তো ? রাষ্ট্রের চোখে যারা পরিযায়ী, তারাই কিন্তু আমার, আপনার আত্মীয়, প্রিয়জন। কত মানুষ এখনও রাস্তায়, বাস স্ট্যান্ডে, প্ল্যাটফর্মে, মর্গে নাকি ঠিক মৃত্যু থেকে আর কিছুটা দূরে জানি না। আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না। জানতে চাইতেও দিচ্ছে না, জানতেও দিচ্ছে না। আপনি আমি শুধু রান্নাঘর, বাথরুম, বারান্দা করছি। খেতে না পাওয়া মুখগুলো যেন চিৎকার করে বলছে —

” তুমি তো জন্মেই রঙচঙে ছাতা পেয়েছ

লাজলজ্জার মাথা খেয়েছ দেখিয়ে দেখিয়ে

যারা আজ ছাতাহীন

তারা তোমার দোসর হতে পারে না কক্ষনো…”।

দারিদ্র্যতা দেখে দেখে কিংবা তার গল্প শুনে শুনে আপনি আমি অভ্যস্ত। কিন্তু এতগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে চুপ করে দেওয়া দেখতে অভ্যস্ত নই আমরা। আমরা, বাঙালিদের একটা ইতিহাস আছে, লড়াই করার, অন্যায় দেখে চুপ না থাকার। সেটা কেমন যেন মরতে বসেছে। কোনও কিছুতেই আর সে কিছু করে উঠতে পারছে না বাম দিকের লোকগুলো ডান দিকের হয়ে যাচ্ছে, ডান দিকের গুলো বাম দিকের। এরপরও চুপ থাকা মানায় বলুন ? ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে হেঁটে আসা পরিবার গুলোর কাছে ছুটে গিয়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে

” মৃত্যুকে কোনঠাসা করে ঘুরে দাঁড়াও আবার

নিজের কথা বলতে বলতেই

হাজারজন হয়ে উঠো তুমি

লাফ দিয়ে উঠে যাও অনেক উঁচুতে

পাক খেতে খেতে মাটিতে নেমে এসে দেখাও―বেঁচে আছো”।

“কেউ কারও কান্নার মাঝখানে এসে দাঁড়ায় না বেশিক্ষন

হাসির মাঝখানেই দাঁড়াতে চায় সবাই

তোমার দুঃখ তোমার”।

অনেক ভারি ভারি কথা হল, জ্ঞানগম্যি হল। এবার চলুন এই সময়ে নিজেকে সুস্থ রাখার কিছু প্ল্যানিং করা যাক। সারাদিনে কী করব, কী করব না  এসব না ভেবে তারচে চলুন গলা সাধার একটা ফর্দ বানিয়ে ফেলি ―

১. সকালে বিছানা ছাড়ার আগে ―

  “ভাবনার পদ্ধতি অনেক

সবকিছু নির্ভর করছে

তুমি কী ভাবে ভাবছ তার ওপর”

২. বিছানা ছাড়ার পর ―

“যদি রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক থাকে

আমাদের হাতে কেন থাকবে শুধুই পতাকা ?”

৩. বাজারে গিয়ে ―

“মাংসের দোকানে যাই

মুরগির ঝাঁপির দিকে তাকিয়ে ভাবতে চেষ্টা করি

আমার এই দেশ ঝাঁপির থেকে কতগুন বড়ো !”

৪. দুপুরে খাবারের থালার সামনে বসে―

“চাপে পড়ে সত্যিগুলো মিথ্যে হয়ে গেছে

মিথ্যেগুলোই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সত্যের পোশাকে…”

৫. বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে―

” হাত ছেড়ে দিলে চলবে না কমরেড

খেলা ছেড়ে পালালে চলবে না

যতক্ষন শ্বাস আছে―

লড়াই আরও তীব্র লড়াই

এর বাইরে অন্য কোনো পথ নেই আর”

৬. টিভিতে খবর দেখতে দেখতে―

“কঠিন একটা সময় ―

শুয়োরের বাচ্চারা বাঘের ছাল পরে

ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের গলিতে গলিতে”

৭. রাতে খেতে খেতে―

“কান্না পাচ্ছে

রাগে গা গুলোচ্ছে

তবু সোজা হয়ে হাঁটো

এও এক যুদ্ধের কৌশল”

৮. মশারি টাঙাতে টাঙাতে―

” খেলা জমে উঠেছে বেশ

একদল ধর্ম ধর্ম করে নাচছে

অন্যদল তাঁদের ধর্মখোর ধর্মখোর বলে চেঁচাচ্ছে

জাঁতাকলে পড়ে মানুষই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন”

৯. শেষ রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে―

“পিঠে উঠে বসার ইতিহাস জানি না

শুধু জানি পড়ে গেলেই খেয়ে ফেলবে বাঘে

অতএব পড়া চলবে না”


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


সোহেল ইসলাম

জন্মঃ ১৯৮৫ সালের ১লা মে । ২০০১ থেকে লেখা শুরু। প্রথম লেখা ব্যাক্তিগত না পাওয়া থেকে।তারপর দেখেছেন শুধু নিজে নয় হাজার হাজার মানুষ না পাওয়ার পুকুরে গলা জলে ডুবে যাচ্ছে,ডুবে আছে, তাদের কাছে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য লেখা। কবির মতে লিখলে ,না বলা গুলো, না বোঝাতে পারা গুলো বলতে পারেন। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "সবাই প্রতিরোধ শিখুক,প্রতিবাদ শিখুক,নিজের দাবি নিজেরাই জানাতে শিখুক।কেউ কারুর কান্না কেঁদে দেয় না।রাজস্থানের গ্রামে রুদালি ভাড়া পাওয়া যায়,কিন্তু আমাদের রুদালি আমরাই হব।কাউকেই এক ছটাক জমি ছাড়বো না।" প্রিয় কবিঃ রঞ্জন আচার্য, রানা রায়চৌধুরী। প্রিয় বই : সম্পর্ক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - আব্বাচরিত। উত্তর দক্ষিণ , নাটমন্দির , কবিসম্মেলন , কৃত্তিবাস ও ছোট বড় বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।