হাসান আজিজুল হকের “নামহীন গোত্রহীন” : প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ

চঞ্চল দেবনাথ on

বাঙালি জাতির কাছে ১৯৭১ সালটা ছিল একটি পালাবদলের কাল। এসময় পশ্চিম পাকিস্থানের সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্থানে বাঙালি নিধনের কাজ শুরু করেছিল। বাঙালিরাও ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন মরণ লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল – যা বিশ্ববাসীর কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামে পরিচিত। একসময় বাঙালি যোদ্ধাদের ধরতে না পেরে খান সেনারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী কেউই রক্ষা পায়নি সেই দিনগুলিতে। বহু পিতা-মাতাকে চোখের সামনে নিজের সন্তানের শেষ দশা দেখতে হয়েছিল। দীর্ঘ ন’মাস নৃশংস হত্যা চলার পর পাকিস্থানী সেনারা বাঙালি মুক্তিফৌজদের কাছে হার শিকার করলে পূর্ব পাকিস্থান পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জীবনের বিনিময়ে যারা বাঙালিকে দিয়েছিল স্বাধীনতার স্বাদ, ব্যস্ততম জীবনে মানুষ আজ অচিরেই তাদের ভুলতে বসেছে। তবু শুনতে ভালো লাগে এই ভেবে যে, সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে যেসব বাঙালি সুধীজন আগুনঝড়া সেই দিনগুলির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন তাঁরা নিজের কলমের আঁচড়ে রেখেছেন কিছু কিছু স্মৃতিচিহ্ন। হাসান আজিজুল হক সেরকমই একজন মননশীল স্রষ্টা, যিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অবলম্বনে একের পর এক সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।


বাংলা ছোটগল্পের জগতে হাসান আজিজুল হক এক অতি পরিচিত নাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক আজিজুল হকের জন্ম হয় ১৯৩৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলায়। তাঁর মতো সমাজসচেতন বাস্তববাদী লেখক খুব কমই চোখে পড়ে। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ ও তাদের জীবনকথা, রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের মতো ঘটনাধারা তাঁর গল্পে বারবার আনাগোনা করেছে। ১৯৬০ সালে প্রথম গল্প ‘শকুন’ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কথাকার হিসেবে ‘আগুনপাখি’, ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ প্রভৃতি উপন্যাসের পাশাপাশি ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘রাঢ়-বঙ্গের গল্প’, ‘মা মেয়ের সংসার’-এর মতো আরও বেশকিছু গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলি তিনি লিখেছেন। আর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে খণ্ড-বিখণ্ড তথ্যগুলিকে একান্তভাবে নিজস্ব ধাঁচে কাহিনির রূপ দিয়ে হাসান আজিজুল হক প্রতিটি গ্রন্থের গল্পগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছেন।


আমাদের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯৭৫ সালে। সাতটি গল্পে সমন্বিত মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত গ্রন্থটির গল্পগুলিতে মানুষের বিপর্যয়ের চরম দুর্দশার চিত্রটি অঙ্কন করা হয়েছে, দেখানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্থানী সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত আচরণকে। শুধু তাই নয়, স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করলেও সাধারণ মানুষের হৃদয়যন্ত্রণার যে বিন্দুমাত্র প্রশমন ঘটেনি বরং নানান সমস্যার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জীবনধারণ করাই দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল সেদিকটিও উঠে এসেছে হাসান আজিজুল হকের গল্পে। এজন্য ‘নামহীন গোত্রহীন’ গ্রন্থটির গল্পগুলিকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে –


এক. মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কালপর্বের গল্প –‘ভূষণের একদিন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’।


দুই. মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালপর্বের গল্প – ‘আটক’, ‘ঘরগেরস্থি’, ‘কেউ আসেনি’, ‘ফেরা’।


‘ভূষণের একদিন’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চিত্রটি স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। গল্পের প্রধান চরিত্র ভূষণ। জাত চাষা ভূষণ তার পঞ্চাশ বছরের জীবনে চাষবাস ছাড়া অন্য কিছু করেনি। নিজের ভিটে আর ভিটের সঙ্গে লাগোয়া দশ কাঠা জমি ছাড়া তার আর কোনো সম্বল বলে কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধ যে আসলে কী তা সে জানেই না। অথচ তার ঘরেও সেই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে। তাই ছেলে হরিদাসের বাড়িতে না থেকে ঘুরে বেরানোর অর্থ ভূষণ বুঝতে না পাড়লেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, হরিদাসও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের হাওয়া তরুণ সমাজকে যে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তা এক যুবকের উক্তি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে – “দেশ নিজের করে নাও ভূষণ— স্বাধীন করে নাও। পাকিস্থান আর রাখা যাচ্ছে না।” বাঙালি জাতিকে একজোট হয়ে লড়াই করে স্বাধীনতা যে ছিনিয়ে আনতে হবে তা অপর এক তরুণের উক্তিতে ধরা পড়েছে – “শোনো কাকা, তোমরা ভয় পেলে কোনো কাজই হবে না। তোমাদেরই তো অস্ত্র ধরতে হবে। তোমরাই তো ছ-কোটি মানুষ আছ এদেশে—এই তোমরা যারা চাষি—জমিজমা চাষবাস করো। আমাদের দেশটা শুষে খেয়ে ফেললে শালারা। ভালো ভালো অস্ত্র দিয়ে ঢাকায় খুলনায় সব জায়গায় আমাদের মেরে মেরে শেষ করে দিলে। অস্ত্র না চালালে এখানেও আসবে ব্যাটারা।” বাঙালিদের উপর যে জঘন্য পাশবিক অত্যাচার চলত তার একটা রূপ আলোচ্য বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে। সময় যত এগিয়েছে ভূষণের কাছে সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই হাটে গিয়ে হরিদাসকে চায়ের দোকানে আড্ডা মারতে দেখে অসহ্য রাগে কাঁপতে শুরু করলেও হঠাৎ একটা বোমা ফাটার শব্দ শুনে ভূষণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সে দেখেছে কোনো মানুষের মাথা থেকে, কারো পা থেকে, কারো বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। সমাজের অসহায় যে নারী সন্তানকে মাতৃসুধা পান করাতে ব্যস্ত সে-ও রক্ষা পায়নি খান সেনাদের হাত থেকে। গল্পকার সেই নৃশংসতার ছবিটি ভূষণের চোখ দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন – “ভূষণ দেখল এর মধ্যে চব্বিশ পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে তার কালো কুতকুতে বাচ্চা কোলে তেঁতুলগাছের দিকে এগিয়ে এলো। ঠাস করে একটি শব্দ হল। মেয়েটি বাচ্চার মাথায় হাত রাখে। ভূষণ দেখে মেয়েটির হাত দিয়ে গলগল করে রক্ত আসছে—শেষে রক্ত-মেশানো সাদা মগজ বাচ্চাটার ভাঙা মাথা থেকে এসে মায়ের হাত ভরতি করে দিল। … অমানুষিক তীক্ষ্ম চিৎকার করে ছুড়ে ফেলে দিল বাচ্চাটাকে দুহাতে ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলল তার ময়লা ব্লাউজটাকে। তার দুধে ভরা ফুলে ওঠা স্তন দুটিকে দেখতে পেল ভূষণ। সে সেই বুক দেখিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, মার হারামির পুত, খানকির পুত—এইখানে মার। পরমুহূর্তেই পরিপক্ব শিমুল ফলের মতো একটি স্তন ফেটে চৌচির হয়ে গেল—ছিটকে এসে সে পড়ল তেঁতুলতলায়।” এমনকি হরিদাস ও ভূষণেরও শেষ রক্ষা হয়নি। গল্পকার মুক্তিযুদ্ধের চিত্রটি যেন এই একটিমাত্র গল্পের মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে পাঠক বর্গের সম্মুখে তুলে ধরেছেন।


গ্রন্থটির নাম গল্প ‘নামহীন গোত্রহীন’। এ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কালপর্বে পাকিস্থানী সৈনিকদের পৈশাচিকতার ভয়াল রূপটি আরও প্রকোটভাবে ধরা পড়েছে। যুদ্ধের ডামাডোলে বাড়ি ছাড়া বহু মানুষ নাম হারিয়ে গোত্র ভুলে কিছু সম্পর্কের টানে নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে আসছিল। গল্পে বর্ণিত নামহীন পথচারী লোকটিও বিকেলের ট্রেন থেকে নেমে প্রাণটি হাতে নিয়ে আঁকাবাঁকা গলিপথে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরছিল। এসময় চোখের সামনে সে দেখেছে খান সৈনিকের ভয়ে সমস্ত রাস্তাঘাটের নিস্তব্ধতার চিত্র, যেখানে আলো জ্বলা তো দূরের কথা দু’পাশের ঘরগুলির বিরাট দরজা পর্যন্ত শক্ত করে বন্ধ করা ছিল – শুধু অন্ধকারের নৈঃশব্দ্য থেকে উঠে আসছিল খট খট শব্দ। মাঝে মাঝে বিজাতীয় কন্ঠে বিকট হাঁক ওঠার শব্দ সে শুনেছে, শুনেছে স্ত্রীলোকের গোঙানির আওয়াজ। জীবননাশের আশঙ্কায় গলিপথে যেতে যেতে সে আট-দশ জন মিলে একজনকে গোল হয়ে ঘিরে থাকতে দেখেছে। এসময় তাদের মধ্যে যে প্রশ্ন-উত্তরের পালা চলছিল গল্পকার সুন্দরভাবে তা গল্পে পরিবেশন করেছেন – “তুমারা ঘর কাঁহা ?’ সে চুপ করে আছে। ‘জয়বাংলা কাঁহা হ্যাঁয় ?’ লোকটা কোনো কথা বলছে না। একজন তার মুখে প্রচণ্ড একটা ঘুসি বসাল। কালো প্যান্ট পরা লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। ‘শালা তুমকো গোলি করেগা’। ‘আভি করো’—উঠে বসে মুখ মুছতে মুছতে সে বলে। ‘তুম মুক্তিফৌজ নেহি হো শালা, বাঙালি কুত্তা ? শালা মুজিবকা পূজারি’। নেহি। ‘তুম হিন্দু নেহি হো ?’ নেহি। ‘লো ভাই, গুলি কর দো’। নেহি, নেহি, গুলি নেহি করেগা—।” কিন্তু লোকটির শেষ রক্ষা হয়নি। চোখের সামনে এসব দৃশ্য দেখে সে মাতালের মতো দুলতে দুলতে শেষ পর্যন্ত একটি একতলা বাড়ির বারান্দায় এসে স্ত্রী মমতা ও ছেলে শোভনকে হাক দিলেও কোনো সাড়া পায়নি। এঘর-ওঘর, রান্নাঘর, বাথরুম কোথাও তাদের না খুঁজে পেয়ে একসময় লোকটি মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করে শোভনের পাঁজরের হাড়, হাতের অস্তি, হাঁটুর লম্বা নলি, শুকনো সাদা খটখটে পায়ের পাতা। দীর্ঘ চুলের রাশ, কোমল কন্ঠাস্থি, ছোটো ছোটো পাঁজরের হাড়, প্রশস্ত নিতম্বের হাড় ও একটি করোটি দেখে লোকটি মমতাকে সনাক্ত করে এবং এরপর দ্বিগুণ উৎসাহে মাটি খুঁড়তে থাকে যেন পৃথিবীর ভেতরের নাড়িভুড়িঁসুদ্ধ সে বের করে আনতে চায়।


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় পর্বের আর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘কৃষ্ণপক্ষের একদিন’। গল্পটি শুরুই হয়েছে এভাবে – “দুবার গুলির শব্দ পাওয়া গেল। পাঁচজন ছুটতে ছুটতে শেষে বিলের কিনারায় এসে দাঁড়াল। কেউ কোনো কথা বলে না, কারো দিকে কেউ তাকায় না পর্যন্ত। রাইফেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপায়।” পাকিস্তানী মেশিনগানের সাথে পেরে উঠতে পারবে না ভেবে লুকিয়ে জীবন বাঁচাতে চায় তারা। তাই এদিক-ওদিক চাওয়ার পর তারা নেমে পড়ে একটা বিরাট বিলে। এরপর থেকেই তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে গল্পের কাহিনি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে যে মতিয়ুর খেতমজুর ছিল – এখন খান সেনাদের দমন করার জন্য সে-ও রাইফেল হাতে তুলে নিয়েছে। শহিদ-এর মতো ছাত্র পর্যন্ত কলেজ ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আমাদের আরো অবাক করে দেয় যখন গল্পকার বলেন – “একরামের বয়েস চোদ্দো বছরের বেশি হবে না। স্কুল ছেড়ে দিয়ে এসেছে সে।” জালিমের মতো বহু মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের পিতা-মাতা, নিকট আত্মীয়-পরিজনদের মৃতদেহ শকুনের দ্বারা ছিঁড়ে খাওয়ার দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে হয়েছে। কখনো কখনো গেরিলা বাহিনীদের খুঁজে না পেয়ে খান সেনারা গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আর এসময় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটাছুটি করতে শুরু করলে সেই পাখির ঝাঁকের মতো জনস্রোতের উপর তারা গুলিবর্ষণ শুরু করে দেয়। খান সেনাদের হাত থেকে অসহায় নারীরাও যে রক্ষা পায়নি আজিজুক হক গল্পটিতে বর্ণনার মাধমে বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন – “পুব-দক্ষিণ কোণের দিকে তিনজনে একটি মেয়েমানুষকে ন্যাংটো করছে। তার সরল ঊরু দুটি বেরিয়ে পড়ল, … একটি সৈন্য যখন তাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে খানার মধ্যে ফেলে দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, শিকারের টুটি-কামড়ানো বাঘের মতো সৈন্যটির মাথা নড়তে লাগল, পাগলাটে অমানুষিক হাসি ভেসে এল, তীক্ষ্ম আর্ত চিৎকার সব শব্দ ছাপিয়ে তিরের মতো বাতাস কেটে চলে গেল—।” চোখের সামনে রহমান-জামিল এসব দৃশ্য দেখে জীবন এবং মৃত্যু সম্পর্কে কিছু কিছু কথা অতি দ্রুত ভেবে নিয়েছে। একসময় বিরাট বিলটা সারাদিন পার হয়েছে বটে কিন্তু তারা গ্রামের পরিবর্তে গঞ্জে গিয়ে হাজির হয়। সন্ধ্যার জ্যোৎনায় বিলের কিনারায় বিশেষ করে হোগলা বনের কাছে-দূরে চারজনেই ভীষণ দুর্বল শরীর এলিয়ে দেয়। কিন্তু তাদেরও শেষ রক্ষা হয়নি। খান সেনাদের হাতে ধরা পড়লে একসময় ফাঁকা অন্ধকারময় স্থানে নিয়ে গিয়ে একে একে রহমান, শহিদ ও মতিয়ুরকে হাত দু-এক দূর থেকে গুলি করে মারা হয়। আর দু-হাত দূরে দাঁড়িয়ে জামিলের দিকে রাইফেল তুলছিল যে সৈন্যটি তার তলপেটে প্রচণ্ড একটা লাথি কষিয়ে দ্রুতগতিতে নদীতে গিয়ে ঝাঁপ দেয় সে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলে এমন নিখুঁতভাবে যুদ্ধের থমথমে পরিবেশকে নিজের গল্পে ফুটিয়ে তোলা হাসান আজিজুল হকের পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব ছিল না।


‘আটক’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ের ঘটনাকে দেখানো হয়েছে, যেখানে পাকিস্থানী সেনাদের পরাজয় ও বাঙালি মুক্তিফৌজদের জয়লাভের মধ্য দিয়ে আনন্দোল্লাসের রূপচিত্র ফুটে উঠেছে। “গতকাল সন্ধে থেকে শুরু হয়েছে সেনাবাহিনীর পিছু হঠা। সারারাত অন্ধকারে কারফিউর মধ্যে ভারী সাঁজোয়া গাড়িগুলো ফিরেছে। গম্ভীর দুমদাম শব্দ করে ফিরেছে বড়ো বড়ো ভ্যানগুলো। প্রথম দিকে হেডলাইট জ্বালানো ছিল…শেষ পর্যন্ত তারা হেডলাইট নিভিয়ে দিয়েছিল; পিছু হঠছিল অন্ধকারের মধ্যে।” ‘ভূষণের একদিন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘কৃষ্ণপক্ষের একদিন’ গল্পে যেখানে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ রেখে দরজা এঁটে ফিসফিস করে কথা বলেছে তারাই আজ প্রবল উচ্ছ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে উড়ন্ত প্লেনগুলোকে দেখে আনন্দে ফেটে পড়েছে। রাস্তায় রাস্তায় জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। পাকিস্থানী সেনাদের সম্পর্কে ভীতটা তাদের কেটে গেছে ইতিমধ্যে। প্লেনগুলো যখন চলে গিয়েও যাচ্ছিল না, বারবার ফিরে আসছিল তখন গল্পের প্রধান চরিত্র অধ্যাপক নাজমুল অন্য দুদিনের থেকে সেদিনের তফাৎটা কিছুটা আন্দাজ করেছিল। তাই সকালে উঠে সেনাদের মুখে কোনো ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধির ছাপ খুঁজে পায়নি সে, অত্যন্ত স্থূল নির্বুদ্ধিতা সেই ঝকমকে চেহারায় যেন সেঁটে ছিল আর ছিল এক ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা। ঘরের জানলা দিয়ে নাজমুল লক্ষ করেছে ঝোপঝাড়ের আশেপাশে অসংখ্য সৈনিকের আত্মগোপন করার দৃশ্য, দেখেছে – “সৈনিকরা পালাচ্ছে। অসম্ভব দ্রুতগতিতে জিপগুলো চলে যাচ্ছে এক একটা চলন্ত জঙ্গলের মতো। প্রত্যেকটি স্বয়ংক্রিয় যানের ওপর চাপানো রয়েছে খেজুর আর নারকেল পাতা। বড়ো বড়ো অশথ বা বটগাছের কাঁচা পাতাশুদ্ধ ডাল এনে চাপানো হয়েছে। যে সমস্ত গাড়ির এসব জোটেনি সেগুলো চাপিয়েছে ফ্যাকাশে সবুজ শ্যাওলা রঙের দড়ির জাল।” যেখানে সৈনিকরা বিষণ্ন ও সন্ত্রস্ত হয়ে বসে রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ ‘বুম-ম-ম’ করে অকল্পনীয় এক বিস্ফোরণের আওয়াজে চারিদিকে চিৎকারের রোল ওঠে। তবে এ বিস্ফোরণ বাঙালিদের উপর নয় – পাটবিহীন এক গুদামে ঘটানো হয়েছিল, যেখানে কিছু পাকিস্থানী সেনা আত্মগোপন করেছিল। যে বাঙালিরা একসময় খান সেনাদের দ্বারা প্রাণনাশের আশঙ্কায় ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে রেখেছিল তারাই আজ পাকিস্থানী সৈনিকদের মৃত লাশগুলো দেখার জন্য ছুটে এসেছে।


যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হলেও শরণার্থী জীবন কাটিয়ে নিজের ভিটেতে ফিরে এসেও সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি, পেয়েছে বুকভরা কান্না আর হতাশা – সেই ঘটনাই বর্ণিত হয়েছে ‘ঘরগেরস্থি’ গল্পে। রামশরণ ও ভানুমতী-র সংসার জীবনে সেরকম দৃশ্যই দেখা গিয়েছে। একবছর পূর্বে যে রামশরণ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল, দেশ স্বাধীন হয়েছে জেনে পাহাড় সমান উল্লাস আর উদ্বেগ নিয়ে কিছু সম্পর্কের টানে বাস্তুভিটেয় ফিরছিল সে। কিন্তু স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ফেরার সময় পথে তার মনে পড়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই কীভাবে দুরশি দূরের বাড়ির ছেলে রশিদ এসে গোয়ালের গোঁজ থেকে দুধেল গাইটিকে খুলে দড়ি ধরে নিয়ে গেল সেই দৃশ্য, ভাত খাওয়া শেষ না হতেই কাঁসার থালা নেবার জন্য কিছু ছেলের দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য। দেশ স্বাধীন হলেও বাড়ির কাছাকাছি আসার পরেও এজন্য তার মন থেকে দুশ্চিন্তা যায়নি –“বাড়িটা কি আছে ?” নিজের ছ’সন্তানের মধ্যে তিনজনকে অনাহারে চোখের সামনে মরতে দেখেছে সে। অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা আর অনশনের জন্য রামশরণের চোখের কোণে কালো রেখার ছাপ পড়লেও সে দূর থেকে কিছু কিছু ঘর-বাড়ি দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু ন’মাস শরণার্থী জীবন কাটিয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তান, সাতসের চাল আর কম্বল সঙ্গে করে গ্রামে পৌঁছেও সে খুঁজে পায়নি নিজের ভিটে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি বাড়ি ও চারিদিকের শুনশান দৃশ্য সে লক্ষ করেছে। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার পর পেটপুরে ভাত খেয়ে ছোটো মেয়ে অরুন্ধতী কোনো সাড়াশব্দ না করে ঘুমের মধ্যে মারা গেলেও অভাবের সংসারে রান্না করা ভাত ফেলে দিতে পারেনি রামশরণ, একটা শানকি টেনে নিয়ে মৃত মেয়ের পাশে বসেই নুন মিশিয়ে গোগ্রাসে সে গিলতে থাকে ভাত। একসময় শেয়ালে টেনে নিয়ে যায় মেয়ের মৃতদেহ। একদিকে দুঃখ অপরদিকে ঘৃণা আর রাগে রামশরণের গলার আওয়াজে চিড় ধরে যায়। তাই সে বলেছে – “স্বাধীন হইছি আমরা…স্বাধীন হইছি তাতে আমার বাপের কী ? আমি তো এই দেহি, গত বছর পরানের ভয়ে পালালাম ইন্ডেয়—নটা মাস শ্যাল কুকুরের মটো কাটিয়ে ফিরে আলাম স্বাধীন দ্যাশে। আবার সেই শ্যাল কুকুরের ব্যাপার।…স্বাধীনটা কী, আঁ ? আমি খাতি পালাম না— ছোওয়াল মিয়ে শুকিয়ে মরে, স্বাধীনটা কোঁয়ানে ? রিলিফের লাইনে দাঁড়াও ফহিরের মতো—।” তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার ব্যাপারে মাঝে মাঝেই রামশরণ সন্দেহ প্রকাশ করে স্ত্রীকে বলেছে – “অ ভানুমতী, আমি বলতিছি কী—স্বাধীন হইছি নাকি হইনি আমি বোঝব কেমন করে ? আগে এট্টা ভিটে ছিল, এখন তাও নেই। আমি স্বাধীনটা কীসি ?” মোটে দিন তিনেকের চাল আছে যা ফুরিয়ে গেলে তাদের ভিক্ষে করেই খেতে হবে। তাই ধোঁয়ার দাগ লাগা ইটগুলো ছিটিয়ে দিয়ে উনুনটাকে ভেঙে রামশরণ স্ত্রী ভানুমতী ও দুই অভাগা সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে পরে কোনো এক অজানা গন্তব্যের খোঁজে।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে বর্ণিত মুক্তিফৌজদের করুণ পরিণতির চিত্র ফুটে উঠেছে ‘কেউ আসেনি’ গল্পে। “যুদ্ধের গাড়িগুলো রাস্তা কাঁপিয়ে ছোটাছুটি করছে, দলে দলে লোক এখন রাস্তায়, চ্যাঁচাচ্ছে, হল্লা করছে, স্লোগান দিচ্ছে। লুঙ্গিপরা, রাইফেল-হাতে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে মাথায় তুলে একটা দল নাচতে শুরু করেছে” – একদিকে যখন এরকম দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তখন অপরদিকে আসফ আলির মতো বহু মুক্তিফৌজকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনতেও দেখা গিয়েছে। গফুর একজন যুদ্ধজয়ী যোদ্ধা হলেও সে আনন্দোৎসবে যোগ দিতে পারেনি। কারণ আসফ আলির খোঁজ নিতে হাসপাতালে এসে গফুর দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে ভ্যানগুলো থেকে মৃত দেহগুলোকে স্ট্রেচারে করে এনে বারান্দার এককোণে স্তুপ করে রাখা হচ্ছিল, দেখেছে কারো কারো মাথা বা পেট থেকে গলগল করে টাটকা রক্ত বেরনোর দৃশ্য। আর সেই মৃত দেহগুলোর মাঝ থেকেই আসফ আলিকে সে ভালো করে চিনে নিতে পেরেছে। আসফ আলির মা তার বিয়ের জন্য মেয়ে ঠিক করে রেখেছিল, তার জীবনেও কত আশা, কত আকাঙ্খা ছিল বউকে নিয়ে সুন্দর সংসার পাতানোর। অথচ সবকিছু ছেড়ে হাসপাতালে শুয়ে থেকে জ্বলজ্বল চোখে গফুরকে সে বলেছে – “আমি কি বাঁচপো ?” কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ না করেই তার মতো বহু ফৌজদের পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। মুক্তিফৌজদের শেষ জীবনদশা দেখানোর জন্য গল্পকার এখানে নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে একেবারে নিংরে দিয়েছেন।

আর সংসারে চাল বাড়ন্ত জেনেও যুদ্ধ ফেরত এক মুক্তিফৌজের মা ও বউ-এর সঙ্গে আনন্দমুখর সময় কাটানোর ছবি ফুটে উঠেছে ‘ফেরা’ গল্পে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে খান সেনার বন্দুকের গুলির দ্বারা পায়ে আঘাত পেলেও আলেফ প্রাণে বেঁচে যায়। একসময় রাতের অন্ধকারে বাড়ি পৌঁছে মাকে ডাকলেও প্রথমাবস্থায় কোনো সাড়াশব্দ পায়নি সে। কিন্তু কুপি হাতে এক মেয়ে মানুষকে দরজা খুলতে দেখে আলেফ নিজের স্ত্রীকে চিনতে পারে – খেতে দিতে না পারায় যে একসময় তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পেটে একরাশ ক্ষিদে থাকলেও রাতের অন্ধকারে মা ও বউকে পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বন্দুক হাতে নিয়ে অভিনয় করে দেখায় কীভাবে লড়াই করতে হয়। আলেফ ভালো করেই জানে ঘরে রাইফেল থাকলেও অভাব একমুহূর্তের জন্য তার পিছু ছাড়বে না। তাই যার যেখানে যত রাইফেল বা অন্য অস্ত্র আছে তিন দিনের মধ্যে সরকার জমা দিতে বললে – “আলেফ রাইফেল হাতে বাড়ির পেছনে ডোবার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর গায়ে যত জোর আছে সব দিয়ে রাইফেলটা ডোবার মাঝখানে ছুড়ে দেয়” এবং খেতে না পেলেও আবার পালিয়ে যাবে কিনা সেকথা স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে। গল্পের এই ঘটনাধারা আমাদের রীতিমতো বিস্মিত করে।


গল্প বলার এমন বলিষ্ঠ ও গতিশীল ভঙ্গি খুব কম গল্পকারের লেখাতেই দেখা যায়। একেবারে সহজ সরল গদ্যে প্রাঞ্জল ভাষায় আজিজুল হক গল্পগুলির ঘটনাকে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন। আর সাতটি গল্পের এই ঘটনাকে এমনভাবে কার্যকারণ সূত্রে গেঁথে দিয়েছেন যেন মনে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের শিকড় থেকে মনি-মুক্তোর মতো ভয়াল নৃশংসতার ছবি তথা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক চিত্রটি উঠে এসেছে – অনুভবী পাঠক একটু সচেতনভাবে গল্পগুলি পাঠ করলেই তা উপলব্ধি করতে পারবেন। আসলে গল্পকার মুক্তিযুদ্ধের সমসাময়িক সমাজকে যে দৃস্টিভঙ্গিতে দেখেছেন, গ্রন্থটির গল্পগুলিতে ঠিক সেভাবেই তুলে ধরেছেন। আর এজন্যই গল্পে বর্ণিত ভূষণ, রামশরণ, আসফ আলি, আলেফ প্রমুখ মুক্তিফৌজ জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে এবং তারা গল্পের মধ্যে স্বাভাবিক ছন্দে নিজেদের মেলে ধরতে পেরেছে। স্বাভাবিকভাবেই অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধের এক অন্যতম মুখদর্পণ হয়ে উঠেছে।


আকরগ্রন্থ : আজিজুল হক, হাসান – ‘নামহীন গোত্রহীন’, প্রতিভাস, প্রথম প্রতিভাস সংস্করণঃ জানুয়ারি ২০১৪, কলকাতা।



চঞ্চল দেবনাথ

জন্ম- ২৩/০৮/১৯৯৪ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন-এ। বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর। মৌলিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখতেই বেশি পছন্দ করেন। এবং ভালো লাগার বিষয় বাংলা উপন্যাস ও ছোটোগল্প।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।