সমকামিতা এবং ঝুলে পড়া দুটি মেয়ে

দেবাশিস লাহা on

‘সমকামিতা’ শব্দটি শোনামাত্রই যে আপনাদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া জন্মাবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কেউ ভাববেন, এ নিয়ে তো অনেক লেখা হয়েছে। আবার কেন ? কেউ আবার বলবেন চরম বিকৃত এই যৌনাচার নিয়ে কী না লিখলেই নয় ? আর হিন্দু ধর্মের আর এক বাবা রামদেব তো একে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে মহাজ্ঞানের পরিচয় রেখেছেন। জড়িবুটি দিয়ে তিনি নাকি এই “রোগটি” সারিয়ে দেবেন। কত ডিগ্রির আহাম্মক হলে এই অজ্ঞতার স্বাক্ষর রাখা যায় জানি না।
 ধৈর্য রাখুন বন্ধু। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া আমি এই জাতীয় লেখা লিখি না। কবিতা এবং গল্পেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি। একটু তলিয়ে দেখার জন্যই এই বিষয়টির অবতারণা। একবারও কি ভেবে দেখেছেন সমকামিতার বিরুদ্ধে আপনি এত সরব কেন, অথবা এটিকে এমন ঘৃণার চোখে দেখেন কেন ? এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই আজ কলম তুলে নিলাম। জানিনা কতটা গভীরে যেতে পারব। তবু এই পরিসরে যতটা পারা যায়।
সমকামিতার বিরুদ্ধে যত আইন এবং অনুশাসন তার উৎস অবশ্যই ধর্ম। কোনো ধর্মই এ ব্যাপারে উদার নয়। বাইবেলে তো সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
“Do not lie with a male as one lies with a woman; it is an abomination.” (Leviticus 18:22)
If a man lies with a male as one lies with a woman, the two of them have done an abhorrent thing; they shall be put to death — their blood guilt is upon them (Leviticus 20:13).
অর্থাৎ একজন পুরুষ যদি আর একজন পুরুষের সঙ্গে নারীর মত করে সহবাস করে, তারা উভয়েই চরম ঘৃণ্য একটি কাজ করবে ! মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করাই একমাত্র শাস্তি। আর এই মৃত্যুর দায় অন্য কারও নয়, তাদেরকেই নিতে হবে।
এই বাইবেলকে ভিত্তি করেই ইউরোপের আইনব্যবস্থা গড়ে উঠলেও কালক্রমে তারা অনেক উদার এবং প্রগতিশীল হয়ে উঠেছে। অগ্রগামী পশ্চিমী দেশগুলি তো ইতিমধ্যেই সমকামিতাকে আইনসংগত আখ্যা দিয়ে দরকারি আইন প্রণয়ন করেছে। অথচ আধুনিক মনোবিজ্ঞানের প্রাণপুরুষ সিগমণ্ড ফ্রয়েডও এটিকে রোগ হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৫০/ ৬০ দশকেও এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে এই “রোগের” “চিকিৎসা ” হত। সমকামী পুরুষকে প্রথমে একটি উলঙ্গ পুরুষের ছবি দেখানো হত। তাকানো মাত্র ইলেকট্রিক শক দেওয়া শুরু হত। তারপর বিশেষ কিছু ড্রাগ যার প্রভাবে সে উন্মাদের মত বমি করত। এভাবেই নাকি সমকামিতার প্রতি ঘৃণা জন্মাবে! এই প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকবার চালানোর পর পুরুষটিকে কোনো নারীর সঙ্গে ডেটিং এ পাঠানো হত। বলাই বাহুল্য কোনো লাভ হত না। বরং যৌনতার প্রতিই একটি বিরাগ জন্মাত।
এই জাতীয় অনেক কাণ্ড কীর্তির পর ১৯৭৩ খৃষ্টাব্দে American Psychiatric Association সদস্যদের মতামত নেওয়ার জন্য একটি সভা আহ্বান করে। এই কনভেনশনে ৫৮৫৪ জন বিশেষজ্ঞ জানান যে সমকামিতা কোনো রোগ নয়, একটি অবস্থা মাত্র —এবং সেই মর্মে তাঁরা ভোট দান করেন। অপর পক্ষে ভোট পড়ে [যারা এটিকে রোগ বলেই মানতে চান] ৩৮১০ টি। এর ফলশ্রুতি হিসেবে DSM [Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders ] তালিকা থেকে সমকামিতাকে বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে World Health Organisation থেকে শুরু করে পৃথিবীর সমস্ত স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা এবং সব উন্নত দেশ [ইসলামিক দেশ এবং তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ বাদ দিয়ে] এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ সমকামিতাকে কেউ আর রোগ বলে মানতে চায় না।
Exodus International নামের একটি সংস্থা যাদের কাজই ছিল gay conversion therapy-র মাধ্যমে সমকামীদের তথাকথিত মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা, দীর্ঘদিন আগেই ক্ষমা প্রার্থনা করেছে এবং তাদের কর্মসূচী বাতিল করেছে। কারণ এতে ক্ষতি হচ্ছে। পড়ে দেখুন Exodus এর সভাপতি এলান চেমবার্স সাহেব কি বলছেন —
“I am sorry for the pain and hurt many of you have experienced. I am sorry that some of you spent years working through the shame and guilt you felt when your attractions didn’t change. I am sorry we promoted sexual orientation change efforts and reparative theories about sexual orientation that stigmatized parents. I am sorry that there were times I didn’t stand up to people publicly ‘on my side’ who called you names like sodomite — or worse. I am sorry that I, knowing some of you so well, failed to share publicly that the gay and lesbian people I know were every bit as capable of being amazing parents as the straight people that I know.”
[কোনো পাঠকের অসুবিধা হলে নির্দ্বিধায় জানাবেন, বাংলা করে দেব। ]
কিন্তু যা আদৌ কোনো রোগ নয়, একটি যৌন পছন্দ মাত্র, তার প্রতি ধর্মের এত কোপদৃষ্টি কেন ? সমকামীরা কার পাকা ধানে মই দিয়েছিল ? একটি পুরুষ যদি অপর একটি পুরুষের সঙ্গে যৌনাচার করে, অথবা একটি নারী তার মনের মানুষ হিসেবে আর একটি নারীকে বেছে নেয়, তাতে কার কী এল গেল ? তবে ?
একটু ভাবলেই কারণ সামনে আসবে। যে কোনো ধর্মের বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হল ছড়িয়ে পড়া ! গ্রামের পর শহর, শহরের পর দেশ, দেশের পর পৃথিবী—সব কিছুর উপর নিজের শাসন এবং আধিপত্য কায়েম করা। কিভাবে ? সেই আদিকালে তো পারমাণবিক বোমা কিম্বা ইন্টার কনটিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিশাইল ছিল না যে ছোট্ট একটা দেশ [এই যেমন ইজরায়েল] এক কোণে বসে পৃথিবীর অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ অথবা অন্য কোনো প্রভাব বিস্তার করবে । তবে উপায় ? জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা। খৃস্টান ধর্মই বলুন আর ইসলামই বলুন এরা উভয়েই সেমিটিক ধর্ম ! প্রথম থেকেই এদের উদ্দেশ্য ছড়িয়ে পড়া—তাই বাণিজ্য বিস্তারই বলুন, যুদ্ধজয়ই বলুন, খাদ্য সাহায্যই বলুন যেখানেই যে উদ্দেশ্যই যাক, খৃষ্টানরা কখনও বাইবেল সঙ্গে নিতে ভুলত না। আর ইসলাম ? নতুন করে আর নাই বা বললাম। সংখ্যা বাড়িয়ে দেশ দখল করার ক্ষমতা যে কত বাস্তব এবং সফল হতে পারে, তার হাতে গরম প্রমাণ অতীতেও দেখিয়েছে , বর্তমানেও দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতেও দেখাবে।
হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। সমকামিতার বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হওয়ার মূল কারণ একটিই—এই যৌন অভ্যেসটি কোনো উৎপাদন করে না। অর্থাৎ লোকবল তথা জনবলে এর কোনো যোগদান নেই। হ্যাঁ অজ্ঞতাও একটি কারন । কিন্তু মূল কারণ নয়। নিছক অজ্ঞতার বিষয় হলে এত কঠোর অনুশাসনের প্রয়োজন পড়ত না। পৃথিবীর অনেক কিছুই তো আমরা জানি না।
তবে কী দাঁড়াল ? এই ধর্ম তথা ধর্মগ্রন্থগুলি কেবল উৎপাদনশীল যৌনতা অর্থাৎ Productive sex কেই স্বীকৃতি দিয়েছে। যে যৌনতা উৎপাদন বাড়ায় না, সে কোথাও sin , কোথাও হারাম !
কিন্তু এর ফলে আমরা যে বড় অন্যায় করে বসলাম তাই নয়, ভয়ঙ্কর অবৈজ্ঞানিক একটি সিদ্ধান্ত সমাজের উপর চাপিয়ে দিলাম। সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর এমন ভয়াবহ নিপীড়ন এক কথায় অভূতপূর্ব। কী অদ্ভুত এই স্ববিরোধিতা ! ঈশ্বরের সৃষ্ট [ধর্মের পরিভাষায়] সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণিটি অন্যতম যে কারণে অন্য প্রাণির চেয়ে উত্তম এবং আশির্বাদপ্রাপ্ত সেই কারণটিকেই দমন করার প্রচেষ্টা ! কী সেই কারণ ? Pleasure sex অথবা তৃপ্তির জন্য যৌনতা। অন্য কোনো জীবের যা নেই, একমাত্র মানুষের তা আছে। অন্যান্য প্রাণিরা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয় [জলে জঙ্গলে যাওয়ার দরকার নেই, পাড়ার কুকুর দেখলেই বুঝবেন] এবং সন্তান উৎপাদন করে। সেই সময়টুকু বাদ দিয়ে সারা বছর তাদের কোনো যৌন ক্রিয়াকলাপ ঘটে না। এই যৌনতাই হল উৎপাদনশীল যৌনতা। কিন্তু মানুষ ? এই প্রাণিটি তো নিছক উৎপাদনের জন্য সঙ্গম করে না। তবে তো সব রোম্যান্টিক কবিতা দোলনা অথবা হাগিজ দিয়ে শেষ হত। pleasure sex যখন একটি অনিবার্য সত্য, তবে সমকামীরা কী দোষ করল ? তাঁরাও তো এই pleasure sex –এই বিশ্বাস রাখে। প্রকৃতি তাঁদের এভাবেই গড়েছে। তাছাড়া কেবল মানুষ নয়, জন্তু জানোয়ারের মধ্যেও প্রায় ১৫০০ গোত্রের প্রাণির মধ্যে সমকামিতা লক্ষ করা যায়। আর সমকামীতা মানেই penetrative sex নয়। দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানী পিটার বোয়েকম্যান এ ব্যাপারে কি বলছেন।
“We’re talking about everything from mammals to crabs and worms. The actual number is of course much higher. Among some animals homosexual behaviour is rare, some having sex with the same gender only a part of their life, while other animals, such as the dwarf chimpanzee, homosexuality is practised throughout their lives.”
এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এগিয়ে থাকা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলি যেমন সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড বেশ কিছুদিন আগেই সমকামিতাকে আইনসম্মত করেছে। সেখানে তাঁরা বিবাহ থেকে শুরু করে দত্তক সন্তান গ্রহণও করতে পারেন।
ভারতীয় হিসেবে গর্ব হয় কারণ এদেশেরই একজন মানুষ সুদূর দ্বিতীয় খৃষ্টাব্দে কামসূত্রের মত একটি অবিস্মরণীয় গ্রন্থের জন্ম দিয়েছিলেন। হ্যাঁ বাৎস্যায়নই প্রথম মানুষ যিনি যৌনতাকে productive sex এর অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে pleasure sex এর জানালার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। বুঝিয়ে দেন যৌন আনন্দ লাভ করা কোনো অপরাধ নয়। এটা নাগরিকের অধিকার। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলি যখন তাদের পিউরিটান শেকড় থেকে এক চুলও নড়তে চায় নি, বার বার বলেছে উৎপাদন বিহীন যৌনতা পাপ ! এতে ক্রাইস্ট অথবা আল্লা রুষ্ট হন। আর তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ মহাপাপ, সেই সময় দাঁড়িয়ে এই ঋষি সমকামিতা নিয়ে আলোচনার সাহস দেখিয়েছেন। ভাবতে পারেন ! যদিও তিনি এ নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখান নি, কিন্তু কোনো বিদ্বেষও দেখান নি। পাথর দিয়ে সমকামী হত্যার কথাও বলেন নি। অথচ এই একুশ শতকেও পৃথিবীর দশটি দেশে সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ইয়েমেন, ইরান, মরিতানিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, সুদান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। এসব দেশে কোন ধর্মের আধিপত্য তা বোঝার জন্য পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। তাই বলে আবার ভাববেন না আমেরিকার সব রাজ্যই সমকামীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালেই আমেরিকার একটি গে নাইট ক্লাবে ভয়ঙ্কর হামলা হয়। ২০১১ খৃষ্টাব্দে এফ বি আই hate crime এর যে তালিকা প্রকাশ করে তার মধ্যে ১৫৭২ জনই সমকামী হওয়ার “অপরাধে” হিংসার টার্গেট হন। আমেরিকাতেও সমকামিতার বিরুদ্ধে বেশ কিছু লবি সক্রিয়। এফ বি আই রিপোর্ট বলছে ঘৃণা জনিত অপরাধের [hate crime] ২০.৮ শতাংশই সমকামীদের উপর আক্রমণ। পরে এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা রাখব।
পাথর দিয়ে হত্যা না করা হলেও বাতসায়নের ভারতেও সমকামীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্টই প্রতিকূল। ব্রিটিশ আমলের Article 377 নামক চরম বৈষম্যমূলক আইনটির মাধ্যমে সমকামিতাকে ফৌজদারি অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং হাস্যকর হলেও এখনও সেই আইনটিই বলবত আছে। ২০০৯ এর ২রা জুলাই দিল্লী হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়ে জানায় যে সমকামিতাকে আর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা যাবে না। বলাই বাহুল্য এতে LGBT (lesbian, Gay, Bisexual, transgender) সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দের প্লাবন দেখা যায়। কিন্তু ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এটিকে আইনসভার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। এই সংবেদনশীল বিষয়ে নাকি সরকারকেই আইন প্রণয়ন করতে হবে। ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের একটি আইনকে নিয়ে এখনও যে হারে জলঘোলা হচ্ছে, এক কথায় অভূতপূর্ব। অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ইত্যাদির পক্ষ থেকে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের ভাবাবেগে আঘাত লাগবে বলে কেন্দ্রীয় সরকার বার বার পিছিয়ে এসেছে। এই ভাবাবেগ কি, কেন এবং কাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যাক অরুণ জেটলি থেকে শুরু করে বর্তমান শাসকদলের অনেকেই আশার আলো দেখিয়েছেন। তবু না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
বলাই বাহুল্য ভারতীয়দের মানসিকতা [বিশেষ করে মেট্রো শহরগুলিতে] অনেকটাই বদলেছে, বদলাচ্ছে। সমকামিতার উপর সাহিত্য চলচ্চিত্র ইত্যাদির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এদেশেও LGBT প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতা শহরেই অনেক সমকামী অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করছেন। সাহায্যের জন্য অনেক সংস্থা ও হেল্পলাইনও রয়েছে। সুতরাং এই আইনটির মৃত্যু এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। মানসিকতা না বদলালে ঋতুপর্ণ ঘোষের মত প্রতিভাধর মানুষের এদেশে কাজ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ত।
সমকামীদের অতি সংখ্যালঘু একটি সম্প্রদায় হিসেবে ভাবা হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলি কিন্তু অন্য কথা বলছে। আমেরিকা থেকে ইউরোপ বিভিন্ন এলাকা এবং মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে সমকামী, উভকামী এবং সার্বিকভাবে LGBT মানুষের সংখ্যা প্রায় দশ শতাংশের কাছাকাছি। ভুলে গেলে চলবে না মুসলিম দেশ এবং মানবগোষ্ঠীকে এর মধ্যে ধরা হয়নি। কারণ তাঁরা এখনও মুক্ত মনে নিজেদের যৌনতা প্রকাশ করতে পারেন না। এছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
সমকামিতার প্রতি বিরূপতার আর একটি কারণ হল এটি প্রথাগত পরিবারতন্ত্রকে নস্যাৎ করে। বিবাহ এবং সন্তান উৎপাদনের তথাকথিত “মহান” ধূপধুনোকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আর একটি বিকল্প যাপনের কথা বলে বলেই একে এত ভয়। অথচ এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে যতগুলি ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে তার জন্য এই পরিবারতন্ত্রই দায়ী। জনবিস্ফোরণের দায় এই স্বার্থপর পরিবারতন্ত্রকেই নিতে হবে। আর শিশুরাও জানে পরিবেশ দূষণ, বেকারত্ব, খাদ্য সংকট ইত্যাদি সমস্যাগুলি জনসংখ্যা বৃদ্ধিরই অবদান। সাতশ কোটির ভার নিয়ে পৃথিবী ইতিমধ্যেই ধুঁকছে। কৃত্রিম খাদ্যতালিকাটি বেড়েই চলেছে—হাইব্রীড থেকে জেনেটিকালি মডিফায়েড শাক সবজি সব কিছুতেই অম্লান বদনে মেনে নিতে হচ্ছে। অথচ বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনসংখ্যা তথা পরিবার নিয়ন্ত্রণের কোনো ভাবনাই নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃতি নিজেই হয়ত এগিয়ে আসবে। ম্যালথাসের কথা মনে পড়ছে। দুর্ভিক্ষ , বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদির পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রকৃতি আরও দুটি পন্থা প্রথম থেকেই ভেবে রেখেছে। একটি হল নারীদের উৎপাদন ক্ষমতার সময়সীমাকে সীমাবদ্ধ করা, আর অন্যটি অবশ্যই সমকামিতা। পুরুষরা দীর্ঘকাল ধরে [সত্তর বছরেও সত্তর শতাংশ পুরুষ যৌন সক্ষম থাকেন] পিতা হওয়ার ক্ষমতা রাখলেও নারীরা সাধারণত চল্লিশ বছরের মধ্যেই মা হওয়ার ক্ষমতা হারায়। এটি যে কত বড় আশির্বাদ, সামান্য ভাবলেই বুঝতে পারবেন। নইলে এই নীল গ্রহটিতে হয়ত পা রাখার জায়গাও থাকত না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সমকামিতা, যাকে আমরা এতকাল ধরে চরম ঘৃণার চোখে দেখে আসছি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সে-ই একদিন বড় ভূমিকা নেবে। হাবুডুবু খাওয়া পৃথিবীর ভার লাঘব করবে। পরিসংখ্যান বলছে[খেয়াল আপনিও করেছেন] সমকামীদের সংখ্যা বাড়ছে। যে কারণেই হোক। ভবিষ্যতে এই বৃদ্ধির হার তীব্রতর হলে অবাক হব না। আমার কেন জানি মনে হয়, ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যাবে বলেই প্রকৃতি এই অস্ত্রটিকে আগেই বানিয়ে রেখেছে। এই যৌন অভ্যাসটিকেই হয়ত ভবিষ্যতের রাষ্ট্র এবং সমাজ promote এবং cultivate করবে ! কী অবাক হচ্ছেন ! হবেন না। প্রকৃতির মত লীলাময়ী আর কে আছে ?
আপনি কী সমাকামী তথা LGBT মানুষদের নষ্ট এবং অপদার্থ মনে করেন ? তবে মানসিকতা পাল্টান। এই তালিকায় কত মহান, সৃষ্টিশীল এবং প্রতিভাবান মানুষ আছে জানলে চমকে যাবেন। শেক্সপিয়রের কথা তো কম বেশি সবাই জানেন।সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে তিনি উভকামী [bisexual] ছিলেন। আসুন আরও কয়েকজনের নাম দেখে নিই। মহাবীর আলেজান্ডার, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, রালফ উইলডো এমারসন, ওয়াল্ট হুইটম্যান, স্যামুয়েল বাটলার, ওয়ালটার পেটার, পল ভার্লো, ওসকার ওয়াইল্ড, ই এম ফরস্টার, সিজফ্রিড সাসুন, রুপার্ট ব্রুক ইত্যাদি। এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এই মুহূর্তে আমেরিকা থেকে ইউরোপের বিভিন্ন প্রভাবশালী পদে হাজার হাজার সমকামী অধিষ্ঠিত আছেন। আর গ্রীক কবি সাফো ! তাঁর নাম নিশ্চয় শুনেছেন ! মহান এই নারীটি প্রায় ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে লেসবস [lesbos] নামক একটি দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন এই দ্বীপটির নাম থেকেই লেসবিয়ান [Lesbian] শব্দটির উৎপত্তি। যার অর্থ নারী সমকামী।
চরম সামাজিক বৈষম্য এবং বিরূপতার শিকার এই সব মানুষেরা কী দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছেন তা সহজেই অনুমেয়।গ্রহণযোগ্যতার অভাবে এঁরা অনেকেই প্রথাগত নিয়মে বিয়ে করতে বাধ্য হন এবং একে অপরের জীবন বিষাক্ত করে তোলেন। কিন্তু এ জন্য তাঁদের দায়ী করা যায় না। নিজেদের যৌন পছন্দ লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হওয়া এই মানুষগুলো অনেক সময় আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হন। খবরের কাগজের পাতায় ফুটে ওঠা সেই “মশলাদার” খবরগুলো পড়ে আপনি আমি এখনও মুখ টিপে হাসি ! ছি ! ছি ! দেশে কী ছেলের অভাব ঘটেছিল ! অথবা –যত সব perverted ! কত সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে হেঁটে চলে বেড়াছে ! আর তোরা কিনা ! কেলিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেওয়া উচিত ! কিন্তু কী আশ্চর্য ! তারপরই আপনি আপনার বাঁ হাতি ছেলেটিকে ক্রিকেট খেলাতে নিয়ে যান। বলেন –মন দিয়ে খেল । সৌরভের মত ব্যাটসম্যান হতে হবে। কই একবারও তো ভাবেন না আপনার ছেলেটি perverted ! বেশিরভাগ মানুষ যখন ডান হাতে লিখছে, সে বাঁ হাত ব্যবহার করছে ! সমকামিতা তেমনই একটি অবস্থা মাত্র। এটা কোনো রোগ নয়, বিকৃতি তো দূরের কথা।
আমি জানি একদিন এই অন্যায়ের অবসান ঘটবেই। পৃথিবীর সমস্ত সমকামী তাঁদের অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু ওই দুটি মেয়ে ? মধ্যপ্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরতে বেরিয়ে যাদের ঝুলে থাকা লাশ দেখেছিলাম !ওরা কী ফিরে আসবে ? বৃত্তাকারে জমে ওঠা জটলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা উজ্জ্বল নেইল পালিশ সেই প্রশ্নটাই ছুঁড়ে দিয়েছিল ! সে রাতে ঘুমোতে পারিনি। ভাঙচুর করার ইচ্ছেটা যে কত তীব্র হতে পারে, সেদিনই বুঝেছিলাম। এমন অসহায় আর কখনও বোধ করিনি। আর্টিকেল ৩৭৭ কে বাতিল করার ক্ষমতা ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু কিছু একটা করতেই হবে, নইলে যে মরে যাব ! অগত্যা কলমই তুলে নিলাম ! ঘড়ির কাঁটা তখন চার অতিক্রম করে পাঁচের দিকে হাঁটছে !
আহ মরণ ! /দেবাশিস লাহা
” আয় এক সাথে মরি “–
এই বলে চাঁদ ছুঁয়ে ফেলতেই
জামরুল গাছ ঘেঁষে উড়ে গেল পেঁচা,
ঘাস মুখে থেমে গেল বৃদ্ধ দাঁড়াশ !
কঁকিয়ে উঠল এক দোয়েলের ছানা !
“আহা, বালাইষাট ! মরবি কেন তোরা !
এমন মায়াবী রাত !
শালিকের ঠোঁটে কেমন জোছনা লেগে আছে !
ওই শোন করমচার বনে ঝিঁঝিঁর জলসা এই শুরু হল বুঝি! “
এই বলে ওদের ছুঁয়ে দিল হেমন্তের বাতাস!
টুপ করে নেমে এল এক ফোঁটা হিম,
পা ভিজিয়ে দিল এক নতজানু নদী !
ফিসফিসিয়ে উঠল পাশে হিজলের বন
“ভালবাসি, ভালবাসি তোদের ! “
তাল খেজুরের পাতা, ছুটকি গাঁদার গাছ
রাঙা শিমূলের বন —
কেঁদে উঠল সবাই !
“কোথা যাস তোরা ! আয় ফিরে আয় “
এই বলে ডাঁসা পেয়ারা এক ভূপতিত হল !
“আয় মরি ” বলে তবু হেঁটে গেল ওরা !
বুড়ো অশ্বথের ডালে ঝুলে পড়ল দুই গাছা দড়ি !
তারপর মট মট করে ভেঙে গেল কিছু !
মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে উড়ে এলো শকুন !
” আহ মরণ ! তোদের দরদ দেখে আর পারি নে !
দেখেচ কাণ্ড ! চার হাতের নেল পালিশে এখনও কাঁদছে কেমন মুখপুড়ি চাঁদ ! “

দেবাশিস লাহা

জন্মঃ ১৯৬৯। ইংরাজি সাহিত্যে এম এ।শিক্ষা ও কর্মজীবানের একটা বড় অংশ কেটেছে উত্তরবঙ্গে। পেশা শিক্ষকতা। তার লেখা প্রথম সঙ্কলন 'দ্রৌপদী ও অনান্য গল্প'।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।