এ লেখার নাম নেই

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় on

e_lekhar_nam_nei

কিছু বছর আগে কোচবিহারে কবি পাপড়ি গুহনিয়োগীর বাড়িতে ওঁদের পত্রিকার নাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম অরুণেশের পত্রিকার নামের কথা। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম ছিল ‘জিরাফ’। সংকেত, ইঙ্গিত ও গূঢ়তাবাহী একটি নাম। এমন একটি প্রাণী জিরাফ, যে বোবা। নখ নেই, ধার নেই, আক্রমণ নেই, গতি নেই, শান্ত। কিন্তু মাথা সবার উপরে। উঁচু। সিস্টেমের ভেতর আপাত নিরীহ হয়ে বসে, সমস্ত নজরদারি টপকে পালটা নজরদারির কথাই যেন ভাবায় জিরাফের ওই উঁচু মাথা। অরুণেশের কথা হলে আমি সবসময়েই ওঁর বিস্ময়কর গল্পগুলোর কথা বলি। ‘পমি আয়নায়’, ‘মদ ও মেয়েমানুষ’, ‘কমরেড কেরুকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘মেয়েরাই বাঁচায়’, এরকম সব আন্তর্জাতিক মানের গল্প লিখেছেন উনি। যে গল্পে পালিশ নেই, এরকম একটা ভাষায় লিখতেন উনি। যেন ধক করে মুখ দিয়ে কলজেটা বেরিয়ে পড়ে রয়েছে এক-একটা গল্পের পাতায়। আমার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে অনেক বড়ো একটা জায়গাজুড়ে ওঁর উপস্থিতি। সেখানে অরুণেশ যা করেছেন তা একমাত্র অরুণেশের পক্ষেই সম্ভব। ‘অরুণেশের অরুণেশগুলো’ নামে আমার একটি গল্প রয়েছে ‘ডি মেজর’ গল্প সংকলনে, যেখানে তিনি শরীরের প্রতিটি অংশ বিছানায় গয়নার মতো খুলে রাখছেন, যুদ্ধের রাতে সৈনিক যেভাবে তাঁবুর ভেতর অস্ত্র পেতে রাখে।

অরুণেশ বলতেন, অর্জুন, তুমি কী তা কাউকে কোনও দিনও জানতে দিবা না। যদি দাও, তাইলে এই চাউটাল মালগুলা একদিন তোমারে কনভিনস করায়া তোমারে দিয়াই বলায়া নিবে যে তোমার মইধ্যে কোনও ট্যালেন্ট নাই। তুমি একটা ভুসি মাল। বাঙ্গি। বাঙ্গি বুঝো? কলকাতার লোকে যারে কয় খরমুজ। নিজের দশ বারোটা চেহারা তৈরি করো। তোমার আসল তুমিটার কেউ য্যান নাগালই না পায়। কেউ ভাববে এইডা তুমি, কেউ ভাববে ওইডা। ক্যামোফ্লেজ করো। তারপর বলতেন, আমি একটা পত্রিকা করতাম, বুঝলা। পত্রিকার নাম ছিল গিয়া জিরাফ। তা, জিরাফ ক্যান? জিরাফের দ্যাখো ভয়েস নাই। বোবা। হে রাষ্ট্র, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, আমার মুখ দিয়া টু শব্দও বাইর হইব না। জিরাফের দাঁত নখ থাবা কিসুই নাই। কিন্তু শির উচ্চ। সিস্টেম আর রাষ্ট্রের এত এত চোখ আর ক্যামেরার মইধ্যেও আমি গোবেচারা ভোলেভালা সাইজা সবার উপরে মাথা রাইখা সিস্টেমের উপরেই নজর চালাইতেসি। আমি যে বোবা। আমার যে নখ দাঁত থাবা নাই। তাই রাষ্ট্র আমারে অত পাত্তা দেয় নাই। আমারে নিয়া গুরুতর চিন্তা করে নাই। ওইডাই আমার প্লাস পয়েন্ট। এইডা ক্যামোফ্লেজিং। এইরকম করতে হইব। এইডা আমি কোথা থেকে শিখছি? সৈন্যদের দ্যাখো। গায়ে জংলা পোশাক। মাথায় জংলা টুপি। ক্যান? টেররিস্টদের দ্যাখো। ফাঁকা ট্রেনের কামরায় একা একটা নিরীহ টিফিন বাক্স পইড়া আছে। দেইখা তোমার দুপুরের খাবারের কথা মনে পড়ব। মায়ের হাতের বানানো লুচি আলুর দম মনে পড়ব। আবার দ্যাখো, একটা ডাবল স্ট্যান্ডওয়ালা সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে কুরিয়ারের প্যাকেট। দেইখা তোমার চিঠির কথা মনে পড়ব। কিন্তু টিফিন কৌটায় লুচিও নাই, কুরিয়ারের প্যাকেটে চিঠিও নাই। কী আছে বলার জইন্য পুরস্কারও নাই। তোমার বাড়ির পাশে নতুন ফ্ল্যাটটায় যে ইয়ং ছেলেটা ভাড়া আসছে কয়েক মাস হইল, তুমি জানো সে সেলস ম্যান। আসলে বোমা বাঁধে। তোমারে বলবে ও? লালনের গান শুনো নাই? আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা।

বেশ কিছু বছর আগে এক দুপুরে অরুণেশের একটি কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎই নীচের ভাবনাগুলো উপলব্ধি করি। কবিতাটির নাম ‘আমি ও ছায়াদি’।

আমি ও ছায়াদি : অ রু ণে শ ঘো ষ

অস্পৃশ্য নদীর জলে একদিন গোধূলিবেলায়
নত হয়ে ধুয়ে নেব খড়গ আমার
তুমি সেইদিন
ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা
বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে?
অথবা পোশাক ছেড়ে ধীরপায়ে নেমে যাবে জলে
আমি খড়গ তুলে নেব, আমি দুঃখ তুলে নেব বুকে
তুমি নগ্ন
তোমার পোশাক আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব
তুমি একা খেলা করো জলে।

১.

একজন প্রকৃত (?) কবি তাঁর নিজের জাত চেনাবার জন্যে একটিমাত্র শব্দকেই যথেষ্ট মনে করেন বোধয়। মাসখানেক আগে, এক দুপুরে এই কবিতাটা পড়ছিলাম। প্রথমবার পড়তে গিয়ে, টের পাচ্ছিলাম কবিতার ভেতরে থাকা অসামান্য চিত্রনাট্যটা। কিন্তু দ্বিতীয়বারে, সে চিত্রনাট্য উধাও। পাঁচ নম্বর লাইন, ঐ নিতান্ত নিরীহ পাঁচ নম্বর লাইন, ‘মুখোমুখি বসিবার’ জীবনানন্দীয় ঘেঁষা উচ্চারণকে পাশ কাটিয়ে তাকে এই কালের অনিশ্চয়তায় এনে ফেললেন অরুণেশ একটিমাত্র প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে ! জীবনানন্দ তো জানতেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার…’। অরুণেশের ‘কাল’ সেই প্রি-অক্যুপায়েড, সেই পূর্ব-জ্ঞান তাঁকে দেয়নি। সংশয় দিয়েছে। ঐ লাইন হয়তো আরো অনেক কবিই লিখে ফেলতে পারেন। ‘সময়ে’র শরিকতার কারণেই লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু ‘একান্তে দাঁড়াবে’-এর পরে প্রশ্নবোধক চিহ? এই একটা চিহ্নই যথেষ্ট কবির বুড়ো আঙুলের ছাপ চিনিয়ে দেওয়ার জন্যে। কেননা, ঐ লাইনে এই চিহ্নটা শুধু সময়ের কারণে প’ড়ে পাওয়া হতে পারে না। এটা কবিকে অর্জন করতে হয়েছে। সময়ের স্তন ছুঁয়ে নাভি ছুঁয়ে। জননেন্দ্রিয়ের গন্ধ শুঁকে।

‘ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা
বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে’

— এইখানে সাধারণ কবি আদেশ সূচক বাক্যই লিখবেন। অরুণেশ অনন্য সংশয়ের সন্ন্যাসী ছিলেন, এই বাক্যকে নিয়ে গেলেন প্রশ্নসূচকে। পেইন্টিঙে ব্যালান্স ব’লে একটা ব্যাপার আছে। কবিতাটার ‘খড়গ’-এর সাথে ‘?’–এর সেই ব্যালান্স, সংকেত ও ইশারা দেখিয়ে আমার মাথায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিলেন অরুণেশ।

২.

এই কবিতার ‘ছায়াদি’কে আমি চিনি না। যিনি বা যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কি জানেন এঁকে? এনাকে আমি চিনি না বলেই চিনে ফেলার বন্দী-ফ্রেমের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু আমি কল্পনা ক’রে নিতে পারছি। ধরা যাক, এই ছায়াদি কোনো মানুষের নামই নয়। অরুণেশ তাঁর নিজের ছায়ার কথাই বলেছেন এখানে। নিজের দ্বিতীয় সত্ত্বার কথা। নিজের অপর লিঙ্গের কথা। তাহলে? তাহলে এই, যে,— হে তুমি আমার দ্বিতীয়/অপর সত্ত্বা, হয় তুমি আমার মুখোমুখি এসে একান্তে দাঁড়াবে, নয়তো পোশাক ছেড়ে নেমে যাবে জলে। এবং যদি জলে নেমে গেলে, তবে তোমায় আমি মুক্তি দিলাম আমার যাবতীয় বন্ধন থেকে। ‘তোমার পোশাক’, যা আসলে আমারই পোশাক, আমার ছায়া হয়ে থাকার শেকল, তা’ ‘আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব’। ‘তুমি একা খেলা করো জলে’। আমি তোমাকে হারানোর ‘দুঃখ তুলে নেব বুকে’। আজীবন যে অস্পৃশ্য জলে সাঁতরেছেন অরুণেশ, সে জলকে এড়িয়ে চলেছে সভ্য নাগরিক। অরুণেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন বেশ্যালয়, শুঁড়িখানায়, মর্গে, মৃতের মুখে বসা মাছির আস্তানায়। বাংলা মদের ঠেকে দেখেছেন অলৌকিক কবিসম্মেলন। স্বাভাবিক, এই জলেই তো অরুণেশ তাঁর খড়্গ ধোবেন। এই জলেই তো ছেড়ে দেওয়া যায় নিজের ছায়াকে। যাও ছায়া, এবারে তুমিও আমার মতো ভেসে বেড়াও, খেলা করো এই অস্পৃশ্য নদীর জলে। আমাকে ছাড়াই, একাই ঘুরে নাও এই নদীতে। তোমার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে ঘোরো। খেলা করো।

প্রশ্ন হয় মনে, অরুণেশ কি চেতনার দ্বৈত-লিঙ্গ সত্ত্বায় বিশ্বাস রাখতেন? যদি রেখে থাকেন, তবে তো এক সত্ত্বা আরেককে ছেড়ে গেলে, কারুরই বাঁচার কথা নয়। এই ধাঁধার উত্তর পেতে অরুণেশের আরেকটি কবিতা দেখা যাক। এতক্ষণ আমি যা লিখলাম, সে-সবকিছুকে নীচের এই চার লাইনেই উনি বলে দিলেন। ‘আমি ও ছায়াদি’ কবিতাটির ২য় পর্বও কি ভাবা যেতে পারে নীচের এই কবিতাটিকে?

নদীতে শরীর স্পর্শ

——————–

সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নদীতে নেমেছ কি শতাব্দীর শূন্য রাত্রীবেলা?
গোপনে গচ্ছিত থাক, মৃত্যু এসে মুছে দিক বিগত জন্মের কুয়াশা,
সেই ভিন্ন এক অনুভূতি, নদী কি চুম্বন করেছে অণ্ডে? নয়, কেউ নয়, একা?
হঠাৎ হয়েছে মনে, পুরুষটি মরে পড়ে আছে, পাশে স্ত্রীলোকের চুল বাঁধা।

৩.

ভারতীয় অধিকাংশ দার্শনিক মার্গে ‘মৃত্যু’-কে বিয়োগ হিসেবে দেখা হয় না। এটা এই নীল রঙের গ্রহকে একটা বিরাট উপহার বৈকি। যেখানে মৃত্যু একটা যোগ চিহ্ন। এবং মৃত্যুকে একমাত্র যোগচিহ্ন দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব। ধরো, তোমার জীবন থেকে কেউ চলে গেল। ধরো তোমাদের বিচ্ছেদই হয়ে গেল। এটুকু বললে কিন্তু সত্যিই অসম্পূর্ণ বলা। আসলে তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার চলে যাওয়া। তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার না-থাকা। মৃত্যু একটা যোগ চিহ্নই। জীবনের সাথে যোগই তো হল আরেকটা চ্যাপ্টার। আমি যখন চলে যাব, তখন আমার মরে যাওয়া, আমার চলে যাওয়াটাও যোগ হ’ল আমার জীবনে। আরও একটা সংযোজন হল। এই মরে যাওয়া শুনলে আমার মনে পড়ছে অঘ্রাণের অনুভূতিমালা, মনে পড়ছে সেই লাইনগুলো, গাছ মরে গেলে যা পড়ে থাকে তা গাছ। পাখি মরে গেলে যা প’ড়ে থাকে, তা-ও পাখি, মৃত ব’লে অন্য কিছু নয়। একইভাবে মানুষের মন মরে গেলে যা থাকে, তা-ও মন। মৃত্যুর নিয়মে। মনে পড়ছে, রবি ঠাকুর, আষাঢ়। প্রবন্ধ। বস্তু থেকে অবকাশ চলে গেলে তখন তার মৃত্যু। বস্তু যখন যেটুকু, সেটুকু হয়েই থাকে তখন তার মৃত্যু।

৪.

লেখাটা লিখতে লিখতেই মনে এলো, অরুণেশের মৃত্যু। সেও তো জলেই। দক্ষ এক সাঁতারু কিভাবে বাড়ির পুকুরে তলিয়ে যান। রোজ যে পুকুরে তিনি নামেন, একদিন সেই পুকুরেই, সেই জলেই খড়্গ ধুতে নেমে তলিয়ে গেলেন। কোথায়? নিজের ছায়ার কাছেই?

এবারে, পুনরায় পাঠ করা যাক ওপরের কবিতা দু’টি।


অরুণেশ মারা গিয়েছিলেন বাড়ির পুকুরে স্নান করতে নেমে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে বঙ্কিম এ নিয়ে প্রশ্ন করছেন অরুণেশকে। পড়া যাক সেই অংশটিও। প্রাসঙ্গিক বলেই…

“…

রেললাইন পেরিয়ে রিকশা বাঁ দিকের রাস্তায় ওঠে। দু’পাশে একতলা-দোতলা বাড়ি। গাছগাছালি। বঙ্কিম এসব দেখতে দেখতে অরুণেশকে বলেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না তো?’

—‘কন্‌ না’

—‘আপনি তো শুনেছি খুব ভালো সাঁতার জানেন। জলে ডুবলেন কীভাবে—’

—‘দ্যাহেন, আত্মহনন হইতেআসে একডা ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। উইল পাওয়ার আর সেলফ্‌-কন্ট্রোল। যে সন্তরণ জানে না, তার নিজের হাতে তো কিসুই নাই। ডুইবা যাওন তার নিয়তি নির্ধারিত। ভাইসা থাকন তার দ্বারা সম্ভব না। আমি সন্তরণ বিদ্যা জানি। যহন আমার ডুইবা যাওন দরকার তহন সন্তরণ বিদ্যার কৌশল প্রয়োগ না কইরা ডুইবা যাওনের ইচ্ছাশক্তি আমার আছে। মাইনষে খালি ইচ্ছাডারে দ্যাহে। তার পিছনে থাকা শক্তিডারে দ্যাহে না।’

…”



অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্মঃ ১৯৮৫-র জুলাই। লেখক, অনুবাদক। পেশাঃ গণমাধ্যমকর্মী। বর্তমানে উত্তরবঙ্গ সংবাদের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বাস করেন, লেখা একটি বিষ নির্গতকরণ প্রক্রিয়া। না লিখলে বিষক্রিয়ায় মরে যেতে হত। প্রকাশিত গল্প সংকলনঃ ডি মেজর (২০১৬), উপন্যাসঃ বঙ্কিমচন্দ্র (২০১৭), নভেলেটঃ মরণ-অন্তরালে (২০১৮)। ভালোবাসেন বাজার করতে, রাঁধতে এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।