বন্দর

ফায়েজ আহমেদ ফায়েজ on

পর্ব — ১

আভ থেকে তেসরা মে ১৮৮২ সালে বেরিয়ে, চীন উপসাগর ঘুরে, ‘নোৎর দাম দে ভঁ’ নামের তিন মাস্তুল ওয়ালা জাহাজটা যখন আবার মার্সেই বন্দরে ভিড়লো তত দিনে সময় গড়িয়ে গেছে চার বছর, তারিখ বলছে আটই আগস্ট, ১৮৮৬। প্রথমে চীনের বন্দর তার উদ্দেশ্য ছিল, সেখানে মাল খালাস করে, সেখান থেকে নতুন ট্রিপ ধরে চলে গিয়েছিলো বুয়েনোস আইরেস শহরে, আবার সেখান থেকে নতুন মাল তুলে নিয়ে গিয়েছিলো ব্রাজিলে।

তার মাঝে কখনও জাহাজ মেরামতির জন্য দাঁড়াতে হয় তো কখনো পালে হাওয়া থাকেনা আবার কখনো ঝড়ের পাল্লায় পড়ে গতিপথ থেকে দূরে ছিটকে যায়, মানে মোদ্দা কথায়, সমুদ্রে যত রকমের বিপত্তি ঘটতে পারে আর কি, এই সব মিলিয়ে সেই জাহাজের ঘরে ফেরা আর হয় না। শেষমেশ, আমেরিকা থেকে টিনের খাবার লোড করে এই এতো দিনে দেশে এসে পৌঁছেছে।

যাত্রা শুরু করার সময়, ক্যাপ্টেন আর ফার্স্ট মেট (সহকারী ক্যাপ্টেন–অনু) ছাড়া আরো চোদ্দ জন নাবিক ছিল , তার মধ্যে আটজন নরমান (ফ্রান্সের নর্মান্দি অঞ্চলের বাসিন্দা, এদের ভাষা ফরাসি ভাষা থেকে একটু আলাদা, অনেকটা হিন্দি আর ভোজপুরীর মতো –অনু) আর ছজন ব্রিটিশ। যখন জাহাজ ফিরলো, দেখা গেল ফিরেছে চারজন নরমান আর পাঁচজন ব্রিটিশ। এক ব্রিটিশ নাবিকের জাহাজেই মৃত্যু হয়েছে, আর চার নরমান বিভিন্ন কারণে নেই, তার জায়গায় এসেছে দু জন মার্কিন, এক নিগ্রো, আর এক নরওয়ের বাসিন্দা, পথিমধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে এরা যোগ দিয়েছে।

জাহাজটা বেশ বড় তাই পাল গুটিয়ে, উত্তাল ঢেউ বাঁচিয়ে এক টাগবোট (এক রকমের ছোট স্টীমার–অনু) দিয়ে টেনে আনা হয়েছে সেটাকে। ‘শ্যাতো দিফ’ পার করে এসেছে যেখানে পাথুরে সমুদ্রে সূর্যের সোনা রোদ পড়ে পাথরগুলোকে সোনালী করে তোলে, আস্তে আস্তে মার্সেই এর প্রাচীন বন্দরে এসে ভিড়েছে। এখানে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে কাঁহা কাঁহা মুল্লুকের জাহাজ আর জাহাজ, ছোট বড়, দ্রুতগামী বা বাষ্পীয় পোত, মানে যত রকমের আকার আকৃতির জাহাজ হয় আর কি, সব জলের উপর ভাসছে। এমনিতেই বন্দরটা খুব বড় কিছু নয়, তারউপর গা ঘেঁসাঘেঁসি করে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ আর তার নিচের গেঁজে ওঠা জল দেখে মনে হচ্ছে যেন জাহাজের আচার বানাচ্ছে কেউ, আর জলটা আসলে জাহাজের রস।

নোৎর দাম দ্য ভঁ এসে শেষমেশ জায়গা পেলো এক ইতালীয় জাহাজ আর এক বিলিতি জাহাজের মাঝখানে। তেনারা একটু একটু সরে গিয়ে এনাকে দাঁড়ানোর জায়গা করে দিলেন। তারপর চুঙ্গি ঘরের আর বন্দরের যত ঝক্কি ঝামেলা পুইয়ে, ক্যাপ্টেন নাবিকদের অনুমতি দিলো শহরে গিয়ে কিছুক্ষন সময় কাটাতে।

তখন বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। মার্সেই আলোয় আলোয় একাকার। সময়টা গ্রীষ্মকাল, রান্নায় রসুনের ফোড়নের গন্ধে চারিদিকের হাওয়া ম ম করছে। তার সাথে শহরের যত আওয়াজ সেসব তো আছেই, কথাবার্তা, গাড়িঘোড়া, চাবুকের আওয়াজ(ঘোড়া গাড়ির সহিসের– অনু), হাসিঠাট্টা, মানে কান পাতা দায়।

সবাই আসেনি, দশ জন এসেছিলো ঘুরতে। এতো দিন তো তাদের জমির সাথে কোনো সম্পর্কই ছিল না তাই একটু ধাতস্থ হয়ে নিয়ে, জোড়ায় জোড়ায় ইতস্তত পায়ে ঘুরতে লাগলো , দেখেই বোঝা যায় তারা নতুন জায়গায় একটু অস্বস্তি বোধ করছে।

সেই সমুদ্দুর পর্যন্ত চলে যাওয়া রাস্তাগুলো ধরে, রাস্তায় টাল খেতে খেতে, আশপাশে তাকাতে তাকাতে তারা হেঁটে চললো, আর তাদের পুরুষালি জোয়ান শরীরে জেগে উঠলো আদিম খিদে, যার খাবার তারা গত ছেষট্টি দিন পায়নি। নরমানরাই আগে আগে হাটছিলো, আর ওই লম্বা, গাঁট্টাগোট্টা ছোকরা, নাম সেলেস্তঁ দুক্ল, বরাবরের মতোই তাদের ডাঙার ক্যাপ্টেন হয়ে এবারেও তাদের গাইড করে নিয়ে যাচ্ছিলো। যাওয়ার মতো জায়গাগুলো তার সব চেনা, ঘুপচি গলিগুলো সমেত, আর নাবিকদের মতো হৈহল্লা ঝগড়াঝাঁটি সে করে না, কিন্তু করতে যদি হয়, ডরায় না কাউকেই।

অনেকগুলো পূতিগন্ধময় গলি ঘুরে দেখার পর, খানিক ইতস্তত করে, ফাইনালি সেলেস্তঁ দুক্ল বেছে নিলে সেই গলিটা যেখানে প্রতি দরজার উপর সুন্দর ঝাড়বাতি লাগানো ছিল, সেইসব ঝাড়বাতির কাঁচের উপরে আবার একটা করে ইয়া বড় করে নম্বর লেখা আছে। প্রতিটা বাড়ির ছোট, নিচু দরজার সামনে ঝিয়ের মতো কাপড়চোপড় পরে, চেয়ার নিয়ে, মেয়েরা বসে আছে। সেখানে দিয়ে কেউ পাস করলেই তারা উঠে দাঁড়াচ্ছে তাড়াহুড়ো করে, দু পা সামনে এগিয়ে আসছে, প্রায় রাস্তার মাঝখানে, সেখান দিয়ে আবার একটা নর্দমা বয়ে যাচ্ছে। ফলে লোকের গতি রুদ্ধ হচ্ছে কিন্তু তারা ফুর্তিতেই আছে, বিরক্ত নয়, গান গাইছে, টন্ট করছে, মানে বেশ্যাদের কাছাকাছি এসে তারা মনের আনন্দে আছে বেশ।

এমনি একটা বাড়ির ভিতর, দরজা দিয়ে ঢুকে, হলের শেষপ্রান্তে, একটা কালো চামড়ায় ঢাকা লুকানো দরজা খুলে গেল, যেখানে বসে ছিল প্রায় নগ্ন একটা চাষিবাড়ির মেয়ে, তার মোটা মোটা উরু আর হাতগুলো, সস্তা সুতির কাপড় দিয়ে আলগোছে ঢাকা। ছোট্ট যে স্কার্ট মতো সে পরে আছে, সেটা দেখে মনে হচ্ছে যেন ফেটে যাবে, আর তাদের বুকের, কাঁধের, হাতের নরম মাংসগুলো, দেখে মনে হচ্ছে যে ভেলভেটের ফুলগুলো সে পরে আছে, তাতে গোলাপি ছোপ লেগেছে। এক কোনে বসে সে বলে ওঠে, “আরে কাছে তো আয়, হ্যান্ডসম ছোকরা” আর তারপর উঠে গিয়ে জাপ্টে ধরে ঐ দলের একজনকে, মনে হচ্ছে ঠিক যেন মাকড়শা তার থেকে বড় সাইজের কোনো পোকাকে ধরার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পরিশ্রমটাই পুরুষটাকে উত্তেজিত করে তোলে যেন, হালকা একটু প্রতিরোধ করে, সে হেসে চলে যায় সেই মেয়ের সাথে। বাকিরা তখন দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে ভাবছে, তারাও কারুর সাথে যাবে না খিদে আরেকটু বাড়াবে? এই প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে, যখন মেয়েটি সেই পুরুষকে তার ঘরের দোরগোড়ায় এনে ফেলেছে, তখন হঠাৎ দুক্ল বলে ওঠে, “ভিতরে যাবি না মার্সঁ, ওখানে নয়” কারণ দুক্ল এইসব জায়গা হাড়েহাড়ে চেনে।

সেই শুনে লোকটা, দুক্লর আদেশ মেনে, ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়, আর তাদের গোটা গ্রুপটা আবার একজোট হয়। চেঁচিয়ে নোংরা গালিগালাজ করতে থাকে সেই চাষি মেয়ে, আর সেই শুনে অন্যান্য ঘরগুলো থেকে বেরিয়ে আসে পালে পালে মেয়ে, আর ভাঙা গলায় মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ডাকে নাবিকদের দলটাকে, কত রকমের রঙ্গিন স্বপ্ন দেখায়। আগের ওই ঝামেলা, পিছনের রাস্তা থেকে এখনো উড়ে আসা অকথ্য গালিগালাজ যেগুলো শুনে তারা বিরক্ত হয় আর সামনের সারা রাস্তা জুড়ে সমস্ত রকমের ভালোবাসার পসারীদের সুড়সুড়ি দেওয়া আহবান, সব মিলিয়ে তারা আরো উত্তেজিত হয় কিন্তু হাঁটতে থাকে সামনে। কত রকমের লোক দেখে তারা, সৈনিকের দল যারা হাঁটলে পায়ের বুটজুতো ঝনঝন করে আওয়াজ হয়, অন্য নাবিকদের দল, কোনো একাকী সিভিলিয়ান, কোথাও বেসরকারি চাকুরে। কিন্তু তারা হাঁটতে থাকে নোংরা গোলকধাঁধার মতো পরিবেশের মধ্যে দিয়ে, আবর্জনায় চটচটে ফুটপাথ ধরে, যেখানে নর্দমার পচা জল উথলে উঠেছে, আর দেওয়ালের ওপারগুলো মেয়েশরীরে ভরে আছে।

শেষমেশ, দুক্ল মনস্থির করে একটা ওরই মধ্যে সুন্দরমতো বাড়ির সামনে দাঁড়ালো আর সবাইকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলো।

পর্ব — ২

তারপরে যেটা শুরু হলো সেটা পুরো পাক্কা মোচ্ছব। পাক্কা চারটি ঘন্টা ধরে ছজন নাবিক মদ খেয়ে আর প্রেমের মোহে ডুবে রইলো। উড়ে গেল ছমাসের মাইনে।

সেই কুঠির সব থেকে ভালো ঘরে তাদের জামাই আদরে বসানো হয়েছিল যেখানে আর পাঁচটা সাধারণ কাস্টমারকে দেওয়া হয়েছিল ছোট ছোট টেবিল আর সেটা দেখে এই নাবিকরা টেরিয়ে টেরিয়ে দেখে বেশ আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলো। তারউপরে একটি মেয়ে, ছোট ছোট রেস্তোরাঁতে যারা গান গায় তাদের মতো ‘খুকি’ সেজে, ঘুরেফিরে তাদের পরিবেশন করছিলো। শেষে তো সে মেয়ে একদম তাদের মাঝখানে বসেই পড়লো। যারাই ভিতরে আসছিলো, বগলে করে আনছিল একটি মেয়ে, তাদের সেই রাতের সঙ্গিনী, কারণ অশ্লীল রুচি তো আর চট করে পাল্টায় না। প্রথমে তিনটে টেবিল জোড়া দিয়ে তারা বসেছিল, তারপর আরো টেবিল জুড়তে হলো কারণ সমসংখ্যক মেয়েও তাদের সাথে যোগ দিলো। তারপর, কাঠের সিঁড়ির উপরে দুজোড়া করে টলোমলো পায়ের আওয়াজ এক এক করে পাওয়া গেল আর তারপর, এই জুটিদারদের লম্বা লাইনটাকে সরু সরু অনেকগুলো কামরা একে একে দরজার পিছনে লুকিয়ে নিল।

হুড়মুড় করে তারা আরেকবার নেমে এলো, আরেকটু মাল খেতে, তারপর উপরে গিয়ে আবার নেমে এলো, আবার এলো।

এবারে নেশা তাদের চড়ে গেছে, শুরু করলো তারা চেঁচামেচি। চোখগুলো নেশায় পুরো লাল, কোলের উপরে বসিয়েছে নিজের নিজের পার্টনারকে, চেঁচিয়ে গান গাইছে, টেবিলে ঘুষি মারছে দড়াম করে, আরো মদ গিলছে গদগদ করে, মানে মানুষের ভিতরের পশু তখন সর্ববাঁধনমুক্ত। আর ঠিক মাঝখানে পা দুটো বেশ ছড়িয়ে বসে আছে সেলেস্তঁ দুক্ল, তার গা ঘেঁষে বসে আছে এক সুন্দরী, তার গালগুলো গোলাপি, আর সেলেস্তঁ তার দিকে মাঝে মাঝে ‘মোহব্বত ভরী নজর’ মেলে চাইছে। তার তখনো বাকিদের মতো অতো নেশা হয়নি, তার মাথায় অন্য কিছু চিন্তাও তখনও ঘুরছে, আর সে তার ভাইবেরাদরগুলোর মতো একদম গোঁয়ারগোবিন্দ নয়, তাই সে চেষ্টা করছে একটু সাধারণ কথাবার্তা কওয়ার। কিন্তু তার নেশা হালকা হলেও হয়েছে,ফলে সে বারবার বলতে গিয়ে খেয়ে হারাচ্ছে, আগের মুহূর্তে কি বলেছে সেটা চেষ্টা করেও মনে করতে পারছে না।

— ক–ক–কতক্ষন, মানে, কবে থেকে তুমি এখানে আছো?

— ছমাস, মেয়েটা উত্তর দেয়।

উত্তর শুনে সেলেস্তঁ খুশি হয়, তার মনে হয়, মেয়েটা বেশ বাধ্য মেয়ে, ভালো শিক্ষা পেয়েছে। তাই সে আবার প্রশ্ন করে, এই জীবন তোমার ভালো লাগে?

মেয়েটা খানিক ইতস্তত করে, তারপর যেন হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, অভ্যাস হয়ে যায়। অন্যান্য রাস্তায় যা চিন্তা আছে সেসব এখানেও আছে, কিন্তু ঝিগিরি করা, বা ঝাড়ুদারনী হওয়ার থেকে এই জীবন ভালো।

সেলেস্তঁ তাকিয়ে দেখে ভালো করে, বেশ খোলামেলা উত্তর পেয়ে সে যেন খুশি হয়। বলে, তুমি এখানকার লোকল মেয়ে নয়, তাই না?

মেয়েটা উত্তর দেয় না, শুধু মাথা নাড়িয়ে না বলে।

— দূর কোথাও থেকে এখানে এসেছো নাকি? সেলেস্তঁ জিজ্ঞাসা করে।

মেয়েটা আবার ঘাড় নাড়ায়, এবারে হ্যাঁ বলে।

— কোত্থেকে এসেছো?

মেয়েটা চিন্তা করে, যেন সে মনে করার চেষ্টা করছে এর উত্তর, তারপর একটু ইতস্তত করে বলে, পেরপিনিয়ঁ থেকে।

সেলেস্তঁ আবার খুশি হয়ে যায়, বলে ওঠে, বেশ বেশ।

তারপর মেয়েটা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করে, বলে, তুমি কি নাবিক?

— ইয়েস ডার্লিং।

— অনেক দূর থেকে এসেছো বুঝি?

— একদম, কোন কোন সেসব দূরদেশ, বন্দর সব দেখেছি আমি।

— তাহলে তো তুমি গোটা দুনিয়া ঘুরেছো নিশ্চয়ই ?

— একবার নয়, দু দু বার।

মেয়েটি আবার ইতস্তত করলো, যেন ভুলে যাওয়া কিছু মনে করার চেষ্টা করছে সে, তারপর আলাদা, একটু সিরিয়াস সুরে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি ঘুরতে ঘুরতে অনেক জাহাজ দেখেছো নিশ্চয়ই?

— একদম ডার্লিং।

— আচ্ছা, নৎর দাম দে ভঁ নামের কোনো জাহাজ দেখেছো?

দুক্ল হেসে ফেললো, বললো, এই তো আর সপ্তায় দেখেছি।

মেয়েটা যেন সাদা হয়ে গেল, তার গালের গোলাপি সে রং উবে গেল, বললো, সত্যি বলছো তো? একদম সত্যি?

— হ্যাঁ গো, সত্যিই বলছি।

— দিব্যি গেলে বলো, মিথ্যে বলছো না।

— ভগবানের দিব্যি, আমি সত্যি বলছি।

— তাহলে বলো, সেলেস্তঁ দুক্ল কি এখনো সেই জাহাজে আছে?

এইবারে দুক্ল চমকে গেল আর অস্বস্তিতে পড়লো কিন্তু আরো খানিকটা না জেনে সে কিছু বলবে না। বললো, কেন? তুমি কি তাকে চেনো?

মেয়েটাও নিজেকে সামলে নিল যেন, বললো, না না, আমি নয়, আরেকটা মেয়ে আছে, সে তাকে চেনে।

— এই কুঠির কোনো মেয়ে?

— না, কিন্তু পাশেই।

— এই গলির মধ্যেই ? কি রকম মেয়ে ?

— আরে মেয়ে একটা, আমার মতোই মেয়ে।

— এর, এই মেয়েটার, তাকে কি বলার আছে?

— আমার মনে হয় তারা একই গ্রামের।

দুজনেই মাথা নিচু করে একে অপরের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে এখন, মন দিয়ে দেখছে আর বেশ বুঝতে পারছে খুব সিরিয়াস একটা কিছু তাদের মধ্যে ঘটতে চলেছে এবার।

দুক্ল বলে উঠলো, চাইলে আমি তার সাথে সেখানে দেখা করতে পারি, ওই মেয়েটার সাথে।

— তুমি তাকে কি বলবে?

— আমি তাকে বলবো —- আমি তাকে বলবো —-যে আমি সেলেস্তঁ দুক্লকে দেখেছি।

— সে ভালো আছে তো?

— তোমার আমার থেকেও ভালো আছে। জোয়ান ছোকরা, তার কি হবে!

মেয়েটা চুপ করে রইলো, যেন নিজের চিন্তা ভাবনাকে গুছিয়ে নিচ্ছে চট করে, তারপর, আস্তে আস্তে বললো, নৎর দাম দে ভঁ কোথায় গেছে এখন?

— আরে! মার্সেই এসেছে তো!

মেয়েটা এবার দৃশ্যত চমকে উঠলো। বললো, এটা তুমি সত্যি বলছো?

— একদম সত্যি বলছি।

— তুমি দুক্লকে চেনো?

— হ্যাঁ রে বাবা, চিনি চিনি।

মেয়েটি আবার ইতস্তত করলো, তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বললো, বাহ্ ! ভালো, ভালো !

— তোমার তার সাথে কি দরকার?

— শোনো, তাকে বলবে, —- থাক কিছু না।

দুক্ল খানিকক্ষণ তার দিকে খুব অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। শেষমেশ জিজ্ঞাসা করলো, তুমি নিজে তাকে চেনো?

— না।

— তাহলে তোমার তার সাথে কি দরকার?

হঠাৎ করে মেয়েটা উঠে বার কাউন্টারের কাছে গিয়ে, কুঠির মালকিনের কাছ থেকে একটা লেবু নিয়ে, সেটাকে কেটে, তার পুরো রস একটা গ্লাসে নিংড়ে, তাতে খানিকটা জল মিশিয়ে এনে দুক্লকে দিলো। বললো, এটা খেয়ে নাও।

— কিন্তু কেন?

— যাতে মদের নেশা খানিকটা কেটে যায়। তারপর আমি তোমার সাথে কথা বলবো।

বিনা প্রতিবাদে সেটা খেয়ে, হাতের পিছনে মুখ মুছে, দুক্ল বললো, বেশ, এবারে বলো, আমি শুনছি।

— তুমি ওকে বলবে না যে তুমি আমাকে দেখেছো বা এইসব তুমি আমার কাছে শুনেছ, বুঝলে? আগে কসম খেয়ে বলো যে তুমি বলবে না।

বুকে হাত রেখে দুক্ল বললো, ঠিক আছে, আমি প্রমিস করছি আমি এইসব কাউকে বলবো না।

— ভগবানের দিব্যি?

— ভগবানের দিব্যি।

— বেশ তাহলে তুমি ওকে বলবে, ওর বাবা মারা গেছে। ওর বাবা, মা, ভাই তিনজনেই মারা গেছে। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারী মাসে, টাইফয়েড জ্বর হয়েছিল সবাইয়ের। আজ প্রায় সাড়ে তিন বছর হতে চললো।

এবারে দুক্লর মনে হলো ওর সমস্ত শরীর রক্তশূন্য হয়ে গেছে, কোনো জবাব দিয়ে উঠতে পারলো না, ঠোঁটগুলো যেন অবশ হয়ে গেছে। তারপর তার মনে সন্দেহ হলো যে মেয়েটা ভুল বলছে, বললো, তুমি ঠিক জানো ?

— আমি একদম ঠিক জানি।

— তোমাকে কে বলেছে এসব?

মেয়েটা তার কাঁধে হাত রাখলো, গভীর দুটো চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। বললো, কথা দাও এটা তুমি তাকে বলবে না।

— কসম খেয়ে বলছি, বলবো না।

— আমি ওর বোন।

থাকতে না পেরে দুক্লর মুখ দিয়ে নামটা বেরিয়ে গেল, ফ্রঁসোয়াজ?

মেয়েটা অবাক বিস্ময়ে দুক্লর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর একটা গভীর ভয়, একটা চরম আতঙ্কে কেঁপে উঠলো। একটু থেমে ফিসফিস করে, সে আওয়াজ যেন তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না, সে বললো, তুমি! তুমি ! তুমিই তো সেলেস্তঁ !

দুটো শরীর নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে, একে অপরের উপর দৃষ্টি মেলে।

চারপাশে তার ইয়ারবকশিরা তখনও হুল্লোড় করছে, কাঁচের গ্লাসের আওয়াজ হচ্ছে, ঘুষি মারছে কেউ কোথাও, কেউ গোড়ালি ঠুকে নাচের তাল দিচ্ছে, মাঝে মাঝে সস্তা মেয়েদের তীক্ষ্ন গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, আর গান তো আছেই।

মেয়েটা বুঝতে পারলো, দুক্লর মাথাটা ঢলে পড়ছে তার দেহের উপর, লজ্জিত সে, আতঙ্কিত সে ! তার বোন?!

অন্য কেউ শুনে ফেলার ভয়ে, এতো আস্তে যে মেয়েটিও খুব হালকা শুনতে পাচ্ছে, সেই আওয়াজে সে ফিসফিস করে বললো, হায় রে আমার ভাগ্য! বাহ্, কি সুন্দর, কি সুন্দর কাজ করেছি আমি, দেখো সবাই!

এক মুহূর্ত পরে মেয়েটার জবাব আসে, তার চোখের কান্না তার আওয়াজে তখন, বলে, এটা কি আমার দোষ?

হঠাৎ করে দুক্ল বলে ওঠে, কেন? কেন মরলো তারা?

— মরে গেছে তাই।

— বাবা? মা? ভাই? সবাই?

— তিনজনেই একই মাসে মরে গেছে, বলেছি তোমায়। আমার কাছে আমার পরনের কাপড়টুকু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। উপরন্তু ধার হয়ে ছিল ডাক্তারের কাছে, ওষুধওয়ালার কাছে, তিনজনের অন্তেষ্টি্র খরচ, শেষে ঘরের ফার্নিচার বেচে টাকা দিতে হয়েছিল আমায়।

তারপর আমি কাজ করতে গেলাম ‘কাশো’ বুড়োর বাড়িতে, তুমি চেনো তো তাকে, সেই প্রতিবন্ধী। তখন আমার বয়স সবে পনেরো হয়েছে, তুমি যখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলে, তখন আমার বয়স চোদ্দোও হয়নি। একদিন তার সাথে আমার ঝামেলা হলো, কম বয়সে জানোই তো লোকের মাথায় গোবর থাকে। তারপর গেলাম এক উকিলের বাড়ি, তার ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করতে। তারপর, তার সাথে জড়িয়ে গেলাম শারীরিক সম্পর্কে। তখন সে আমাকে আভ এনে একটা রুম ভাড়া নিলো, কিন্তু আস্তে আস্তে তার আসা যাওয়া কমে গেল। পুরো তিন দিন আমার পেটে একটা দানাও পড়েনি এমন দিন গেছে তখন। তারপর, কোনো কাজ না পেয়ে, আমি একটা কুঠিতে গেলাম। আর সবাই এর মতোই আমি কত জায়গা দেখেছি, নোংরা জায়গা সব, রঁ, এভর, লিল, বোর্দো, পেরপিনিয়ঁ, নিস্ আর সব শেষে এই মার্সেই (ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর –অনু)।

তার অশ্রু তখন চোখ উপচে, নাক পেরিয়ে, গাল ভিজিয়ে, ঠোঁটে এসে জমছে। বললো, আর আমি ভেবেছিলাম, তুমি মরে গেছো সেলেস্তঁ।

সেলেস্তঁ বললো, আমি তো তোকে চিনতেই পারিনি, এই ছোট খুকি ছিলিস তুই তখন আর এখন কত বড় হয়ে গেছিস, কিন্তু এটা কি করে হয় যে তুইও আমাকে চিনতে পারিসনি?

হাত নেড়ে উদাস ভঙ্গিতে মেয়েটা বললো, আমি রোজ এতো এতো পুরুষ দেখি যে তাদের সবাইকে আমার একই দেখতে লাগে।

দুক্লর দৃষ্টি তখনো বোনের উপর ফিক্সড, যেন একটা খুব কষ্টদায়ক ঘোরের মধ্যে আছে সে, আর তার ভিতরটা ভরে যাচ্ছে এক অব্যক্ত যন্ত্রনায়, তার ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কাঁদতে, যেমন মার খেয়ে বাচ্চারা কাঁদে। তখনও মেয়েটা তার কোলের উপর বসে আছে, তার হাত মেয়েটার পিঠে, আর মেয়েটার দিকে একটানা চেয়ে থাকতে থাকতে, সে ধীরে ধীরে চিনতে পারলো তার অনেকদিন আগে, বহুদূর এক গ্রামে তার ফেলে আসা বোনকে, সেই লোকগুলোর সাথে রেখে আসা যাদেরকে তার বোন মরতে দেখেছে, যখন সে, দুক্ল, জাহাজে চেপে কোথায় কোথায় ঘুরে বেরিয়েছে। তারপর, হঠাৎ করে, তার বাঘের থাবার মতো দুইহাতের মাঝে সেই মুখটা নিয়ে সে চুমু খেতে লাগলো, যেমন করে লোকে নিজের পরম আত্মীয়দের চুমু খায়। তারপর একটা কান্না, পুরুষ মানুষের লুকানো কান্না, উথলে উঠলো তার গলা বেয়ে, সেই চাপা কান্না যা অনেকটা মাতালের হেঁচকির মতো শোনায়।

একটু তোতলাতে তোতলাতে বললো সে, হ্যাঁ, এই তো, তুই ফ্রঁসোয়াজ বটে, আমার ছোট্ট সোনামনি ফ্রঁসোয়াজ….

হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো সে, জঘন্য গালিগালাজ করতে করতে, আর টেবিলে মারলো এক প্রকান্ড ঘুষি, এমন ঘুষি যে গ্লাসগুলো সব ছিটকে পড়ে চুরচুর হয়ে গেল। তারপর টলতে টলতে তিন পা মতো গিয়ে, হাত বাড়িয়ে কি যেন ধরতে গিয়ে, দড়াম করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তারপর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে সে কাঁদতে লাগলো, চিৎকার করতে লাগলো আর হাত পা ছুঁড়তে লাগলো, আর এমন করে গোঙাতে লাগলো যে সবাই দেখে ভাবলো মরণ–কষ্ট হচ্ছে বোধয় তার।

তার দোস্তবন্ধুরা সব তাকে দেখে হাসতে লাগলো, বললো, এক ফোটা নেশা হয়নি ওর শালা।

আরেকজন বললো, ওকে শুইয়ে দেওয়া ভালো, তাহলে যদি কিছু করতে যায় তাহলে আমরা সবাই মিলে ওকে সামলে নিতে পারবো।

পকেটে তার মালকড়ি ছিল ভালোই, তাই মালকিন সহজেই তাকে একটা রুম দিয়ে দিলো। তার ইয়ারবক্শিরা, তারা নিজেরাই এতো মদ খেয়ে আছে যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না, সরু সিঁড়ি বেয়ে তাকে তুলে নিয়ে গেল সেই মেয়ের ঘরে যে এতক্ষন তার সঙ্গে ছিল। সেই মেয়ে খাটের পায়ের দিকে একটা চেয়ারে বসে কাঁদতেই রইলো, ঠিক যেমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে রইলো দুক্ল, সেই ভোর পর্যন্ত।

(গি দ্য মপাসাঁর Le Port গল্পের অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ।

গল্পের সময়কাল ১৮৮০র দশক, পটভূমি ফ্রান্স, সেইটা মনে রেখে পড়লে বুঝতে, অনুভব করতে সুবিধে হয়। ফরাসি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করতে হয়েছে আমায়, তার কারণ দুটি, মপাসাঁর বাক্যবিন্যাস পদ্ধতি এবং বাংলা ও ফরাসির মাঝের দূরত্ব, ইংরিজি থেকে অনুবাদ এতো পরিশ্রমের না। তাই, ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে, ধরিয়ে দিলে উপকার হয়।

এই গল্পটি অনুবাদ করার পিছনে কারণ মপাসাঁর রচনাভঙ্গীর সাথে বাঙালি পাঠকের পরিচয় করানো, যদিও এ কাজ অনেক গুণী ও যোগ্য ব্যক্তি করেছেন আগেও। মপাসাঁকে আধুনিক ছোট গল্পের জনক বলা যায় অনায়াসে, স্বয়ং রবি ঠাকুর মপাসাঁর লেখা পড়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, O Henry তো প্রায় গুরু মেনে লিখেছেন। চেখভ আরেক লেখক যিনি সমসাময়িক হয়েও লিখেছেন মপাসাঁর স্টাইল এ। R K Narayan এর ‘মালগুড়ি ডেজ’ অনেকটা একই ভাবে লেখা। মপাসাঁর উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন মুজতবা আলী সাহেব।

মপাসাঁর গল্পে কোনো বৃহত্তর মেসেজ বা পথনির্দেশ খোঁজা বোকামি, কিন্তু জীবনের ছোট মুহূর্ত শব্দে উনি যে ভাবে এঁকেছেন, তা বিশ্ব সাহিত্যে তুলনারহিত। গল্প পড়ে যদি ভালো লাগে, সে কৃতিত্ব সম্পূর্ণ মপাসাঁর, খারাপ লাগলে সে আমার অনুবাদের দোষ।)



ফায়েজ আহমেদ ফায়েজ

জন্ম ও বাসস্থানঃ বড়তাজপুর, হুগলী। শিক্ষা - স্নাতক। কর্ম জীবন - প্রায় ভবঘুরে। লেখা ছাড়া বিভিন্ন ভাষা শেখা, নির্দিষ্ট কিছু সঙ্গীত, পুরানো জিনিস সংগ্রহে আগ্রহি।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।