‘ভালো আছি’ – একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ

শুভম ভট্টাচার্য on

নাটকের কথা লিখব বলে যেই ঠিক করেছি, আমার সামনে বারবার দাঁড়িয়ে পড়ছে বিকাশ ভট্টাচার্যের একটা ছবি- ‘আহত পরিবার’। কী আছে ওই ছবিতে? ক্যানভাসের মধ্যভাগে এক পরিবার। শরীর জুড়ে ব্যান্ডেজ। ক্ষতের প্রলেপ। দেখে বোঝাই যায় এরা প্রত্যেকেই আক্রান্ত। কিন্তু মুখের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠতে হল। একী! পরিবারের সবার মুখে মৃদুহাসি এঁকে দিয়েছেন বিকাশ। ফোকাস শিফট করে শরীরের অন্য অংশে যেতেই শিউরে উঠল গা। সামনে দাঁড়ানো শিশুর হাতে পুতুলের বদলে মরার খুলি! মনের মধ্যে তৃতীয় বাস্তবের জন্ম নিতে থাকে। এই সেই পরিবার যারা কাশ্মীরে, ইরাকে, সিরিয়ায়, ছোট আঙ্গারিয়ায়, মায়ানমারে, গৃহযুদ্ধে স্বজনহারা হয়েও, রাষ্ট্রীয় বেয়নেটের মুখে, সুখী হওয়ার অভিনয় করে যান; হ্যাঁ, এই সেই পরিবার যারা শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, সমাজের কাঠামোগত হিংসার শিকার হয়েও, কোনও এক অদৃশ্য ভয়ে, ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে মেনে নেয় – ‘আচ্ছে দিন আনেবালে হ্যায় …..’। পরিবারের সকলের মুখ যেন মানুষের নয়। মুখের আদলে পরাবাস্তবের ছায়া। বোঝা গেল এরা মানুষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত এক শ্রেণি যাদের দিকে প্রচলিত সমাজ চিরকাল চোখ সরিয়ে রেখেছে। আর এভাবেই চিত্রশিল্পের এই অনবদ্য মন্তাজ আমাকে যুক্ত করল–‘বালুরঘাট সমমন’ এর ‘ভালো আছি’ পথনাট্যের সঙ্গে, যার দৃশ্য-দৃশ্যান্তরে ওই ছবির মত বিপরীতধর্মী ইমেজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে – ভালো নেই, আসলে আমরা কেউ ভালো নেই …..। বরং বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবি যেখানে গিয়ে থেমেছে, সেখান থেকেই শুরু এই পথ নাটকের । ছবিতে প্রেক্ষিত তৈরির দায়বদ্ধতা চিত্রশিল্পীর নেই, কিন্তু পথ-নাটকের সেটা অবশ্যকরণীয় – তা সে ভারতীয় গণনাট্য হোক বা সফদার হাসমির জন নাট্য মঞ্চ হোক, হাবিব তনভির-এর নয়া থিয়েটার হোক কিম্বা বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার (সরকারি অনুদানে পুষ্ট এনজিও মার্কা নাট্যদলের কথা আলাদা)। তাই আমরা কেন ভালো নেই, তার উত্তর বা প্রেক্ষিত জানা বা বোঝার দায় শুধু দর্শকের ওপর না চাপিয়ে, অভিনেতারা দর্শকের মাথায় সরাসরি চালান করে দেন বিরোধের বীজ, মগজের কার্ফু উপেক্ষা করে যে বীজ থেকে জন্ম নিতে থাকে নতুন নতুন দ্বন্দ্ব। এভাবেই তারা এ নাটকের অংশ হয়ে যান। কী আছে এই পথ নাটকে? – আছে দাঙ্গার গল্প। সময়কে ওভারল্যাপ করে, বিভিন্ন দশক সমান্তরালভাবে হাঁটতে থাকে। সমরেশ বসু’র ‘আদাব’ গল্পের গায়ে এসে ধাক্কা মারে – গোধরা, মুজাফফরনগর, আসানসোল …..। মূল চরিত্র দুজন – নারায়ণগঞ্জের সুতাকলের কলমজুর আর বুড়িগঙ্গার ওই পাড়ে সুবইডার এক মাঝি। নিজেদের অজান্তে যারা দাঙ্গা পীড়িত অঞ্চলে ঢুকে পড়ে এবং পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে কোরাসরূপী ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে চায়। তারপর প্রাথমিক সন্দেহের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে পাশাপাশি এসে বসে, নিজেদের সুখদুঃখ ভাগ করে নিতে থাকে। গল্পের এই মানবিক চোরাটান-এর সীমা পেরিয়ে নাটক আরও গভীরে প্রবেশ করতে চায়। দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে – ধর্মের জিগির তুলে, দাঙ্গা বাধিয়ে রাষ্ট্র যতই এদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করুক, পেটের লড়াইয়ে, ভুখ কি লড়াই মে হম মজদুর লোগ সব এক হ্যায়। শোষণের যন্ত্রকে আরও মজবুত করতে, বৈষম্যকে ধামাচাপা দিতেই এইসব দাঙ্গা-টাঙ্গার প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রের। চরিত্রদের মতো দর্শকরাও বুঝতে পারে – এ হিংসা সাজানো, এ হিংসা ‘ম্যানুফ্যাকচারড’। ধরা পড়ে যায় কীভাবে সুতাকলের মালিক, মুসলিম জেহাদের তত্ত্ব আরোপ করে হিন্দু মজুরদের উত্তেজিত করতে চায় আর মৌলবি ইমাম কীভাবে সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের পশু রক্ষার নাম করে মুসলিম হত্যার গল্প বলে উস্কানি দিতে থাকে। নাটক কার্যকারণ থেকে ঘটনার দিকে ধাবিত হয়, ঘটনা থেকে কার্যকারণের দিকে নয়। আর এভাবেই এ নাটক আরও বেশি করে সমাজের বিশ্লেষক হয়ে ওঠে।

নাটকটি শুরু হয় কোরাসরূপী চরিত্রদের মুখে আমাদের ভালো থাকার (আসলে না-থাকার) ফিরিস্তি দিয়ে। যেমন –

চরিত্র ক – “আমাদের জল-জমি-জঙ্গল আজ সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক সম্পদকে বিদেশী লুঠেরাদের স্বর্গ রাজ্য বানাতে দিই নি আমরা …. সুতরাং বন্ধুগন, বুক ফুলিয়ে, গর্বের সাথে বলুন – আমরা ভালো আছি”।

চরিত্র খ – ফ্লাইওভার, ঝাঁ চকচকে শপিং মল, আইনক্স আর আইপিএলের আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক। কোথাও কোনও অন্ধকার নেই। সুতরাং এ কথা নিশ্চিতভাবে বলাই যায় যে আমরা খুব আনন্দেই আছি…”।

চরিত্র গ – “একদিকে জাতীয় আয় বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে … এমন অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার এ দেশে অন্তত হয় না মশাই। তাই আমরা খুব সুখেই আছি…”।

চরিত্র ঘ –খাওয়া, পড়া, চিকিৎসা এ সবের কোনও অভাব নেই বলেই তো আমরা এখন গরুতে মনোনিবেশ করেছি….”

সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে দৃশ্যের জন্ম হতে থাকে।  দেখা যায়, প্রমোদ–আফিমে মত্ত এ দেশের আত্মবিচ্ছিন্ন যুব সমাজকে। নব্য ভোগবাদী পোশাকে, মুখোশে সজ্জিত এক চরিত্র, অঙ্গ বিকৃতির রূপকে মঞ্চে প্রবেশ করে। কোথায় যেন সংলাপ আর অ্যাকশান–এর মধ্যে সেতু গড়ে ওঠে, ফ্যাসিস্ত প্রপাগন্ডা জ্যান্ত হয়। এই বিকিয়ে যাওয়া সময়ে কখন যেন অশ্রুত সংলাপে, দাঙ্গার মতো এই মানববিরোধী চক্রান্ত ধ্বংস করে দিতে, ‘সমমন’ বলে ওঠে – হল্লা বোল……হল্লা বোল……।

Categories: নাটক

শুভম ভট্টাচার্য

জন্মঃ ১৯৭৫, বালুরঘাট থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন 'উত্তর দক্ষিণ' এর ভাষাকর্মী। লেখালেখিঃ ছোটগল্প, নাটক। প্রথম গল্পগ্রন্থঃ ইবলিশ টিবলিশ। নাটকের বইঃ জরুরী অবস্থা।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।