ছুনু মিঞার কিসসা : বালুরঘাট সমমনের শারদ অর্ঘ্য

কৌশিকরঞ্জন খাঁ on

নাট্যপ্রেমী মানুষের জন্য বালুরঘাট সমমনের পুজোর নাটক হুমায়ুন আহমেদ এর গল্প অবলম্বনে় নাটক “ছুনু মিঞার কিসসা” প্রথম বার মঞ্চস্থ হলো বালুরঘাট নাট্যতীর্থ মন্মথ মঞ্চে।ছুনু মিঞা এই রাজনৈতিক নাটকটির মুখ্য চরিত্র। চিরাচরিত শোষণের কথা বলা হলেও তার বয়ান ছিল আধুনিক। কিসসায় মূলত গল্প শোনানোর প্রয়াস থাকে। সেই গল্পটাই হয়ে উঠেছে সময়ের রাজনৈতিক ভাষ্য।

তাকে বানানো হয়েছিল ছুনু মিঞা। বানিয়েছিল কে? কায়েমি স্বার্থের মানুষ তাদের ক্ষমতাকে নিশ্চিত করতে লাচার মানুষকে নিজের দাবার বোর বানিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে গাঁয়ের পঞ্চায়েত প্রধান সেই কাজটি করে। ছুনু মিঞা খারাপ নজরে দেখলে অনিষ্ঠ হয় — এই মিথের আশ্রয়ে প্রধান তার শোষণের ষড়যন্ত্র চালিয়ে নিয়ে যায়। তাই গ্রামের পুকুরে বিষ দিয়ে মাছ মারা হলেও তা ছুনু মিঞার নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। কোনো অঘটন ঘটিয়ে তা হয় ছুনু মিঞার নজরের দোষ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামে পঞ্চায়েতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজ সার্ভে করতে আসেন এক কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসার। তিনি ধরে ফেলছিলেন প্রধানের কুকর্ম। অফিসারের উপর হামলা করিয়েও পঞ্চায়েত প্রধান তার জন্য দায়ী করে ছুলু মিঞাকেই। পঞ্চায়েত প্রধান তার যাবতীয় কুকীর্তি এই ছুনু মিঞার ঘারে বন্দুক রেখে করে যায়। প্রপাগান্ডা এমনই জোরালো যে কোন বাচ্চা ছেলেকে ডেকে তার হাতে ছুনু মিঞা খেলার জন্য সাইকেলের বাতিল টায়ার তুলে দিতে চাইলেও ভয়ার্ত মা ছেলের পিঠে কিল দিতে দিতে ছুনু মিঞার নজর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

কিন্তু ছুনু মিঞার এই প্রপাগাণ্ডায় কোনো আপত্তি থাকেনা। কেননা সে এর মধ্যে মিথোজীবীতা খুঁজে পায়। তার এই ‘ খারাপ নজর’ এ ভয় পেয়েই তো গ্রামের সাধারন মানুষ আলুটা মূলোটা সিধে দিয়ে থাকে অনেকটা শনিদেবতাকে তুষ্ট রাখার মতো। এই খারাপ নজরের প্রোপাগান্ডাকে সে তার অন্নের সংস্থানের কাজে লাগায় এবং নির্বোধ চুনু মিঞা এটাকে তার ক্ষমতা হিসেবে উপভোগ করে। কিন্তু ছুনু মিঞার মেধাবী মেয়ে মরিয়মের কাছে ষড়যন্ত্রের চিত্রটা পরিষ্কার ধরা পড়ে। সে জানে যে কোনো রকম অনিষ্ঠ করে প্রধান ছুনু মিঞার খারাপ নজরের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যায়।

নাটকের সমস্ত চরিত্রই বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। শুধু ছুনু মিঞাকে লার্জার দ্যান লাইফ করার একটা খেলা চলে। নাট্যকার নাটকটিকে মূলত মার্কসীয় অর্থনৈতিক শোষণের ফ্রেমে বাঁধতে চেয়েছেন। তাই নাটকের কনটেক্সট এ ধর্মীয় বৈষম্য আসেনি। একজন মুসলমান ধর্মাবলম্বী প্রধান শোষণ করছেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছুনু মিঞাকে। তার দারিদ্র্যর লাচারিকেই প্রধান কাজে লাগান। অর্থাৎ শোষক শোষিততের ক্লাস ক্যারেক্টার একই থাকে ধর্ম সেখানে গৌণ বিষয়। সেই একই কারনে খুব সুচিন্তিত ভাবে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে আজানের ধ্বনি শোনানো হয়নি, নমাজ পড়ানো হয়নি। মেয়েরা পরপুরুষের সামনে কাপড় মাথায় দেয়নি। কেননা নাটকের বিষয় ওটা নয়। বরং লুঙ্গি ডান্স গানটি নাটকের প্রথমে ব্যবহৃত হয়েছে এই সময়টাকে ধরতে। এই ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নাট্যকারকে ভাবতে হবে। তবে চিরাচরিত প্রথা অনুসরণ করে তিনি যে মুসলিম গ্রাম বলেই ব্যাকগ্রাউন্ডে আজান দেননি এ জন্য তার ধন্যবাদ প্রাপ্য। এই ভুলটা তিনি করবেন না কেননা তাহলে প্রথমেই নাটকের মেসেজকে ভুল দিকে পরিচালনা করা হতো।

অফিসার চরিত্রটি খুবই বাস্তবানুগ চরিত্র। তাঁরও সরকারি নিয়ম শৃঙ্খলায় বাঁধা থেকেও একটা অনুভূতিশীল মন আছে।তাই ফোনে স্ত্রীর কাছে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার অন্তঃসারশূন্যতার কথা বলেছেন। ছুনু মিঞার মেয়েকে ভালোবেসে বোন বলেছেন। অর্থ সাহায্য করেছেন। শেষ বিদায়ের সময় ছুনু মিঞাকে তাঁর ফোন নম্বর সম্বলিত কার্ড দিয়েছেন ভবিষ্যতে যোগাযোগ করতে। সরকারি দস্তুর মেনে তাঁর হাত পা বাঁধা। তাই মাঝরাতে মিরাজ নামে এক যুবক এসে পাট্টার কাগজ বিলি না করে প্রধান কুক্ষিগত করে রেখেছে – সে খবর দেয় অফিসারের কাছে। কেননা জমি দখলে থাকলে তার ভোট ব্যাঙ্ক অটুট থাকবে। কিন্তু অফিসার তার অপারগতার কথা বলেন, কেননা তিনি সার্ভেয়ার মাত্র। মিরাজের মুখ দিয়ে ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণের কথা বলানো হয়েছে। ব্যাক গ্রাউন্ডে সাইরেন বেজেছে।মিরাজ সংসদীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী বামপন্থী। সে চায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানের কুকীর্তির বিহিত করুক। তাহলে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে। মিরাজের মনোভাবে এসময়ের বামরাজনীতির পরমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ পেয়েছে।অফিসার সেই নিশ্চয়তা না দিলে তার মনে সংসদীয় রাজনীতি সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। সে সামান্য সময়েই অনুভব করে সংসদীয় রাজনীতি এর সমাধান করতে পারবে না, তাই ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণের কথা বলে।

নাটকে মিরাজ চরিত্র হয়তো বহিরাগত চরিত্র কিংবা নয়।আঞ্চলিক ভাষার সংলাপের চরিত্রগুলোর মধ্যে একমাত্র মিরাজ ও অফিসার চরিত্র পরিশীলিত মান্য চলিতে কথা বলেছে। তার শহুরে সংলাপ সে কথাই বলে। তবে মিরাজ কোনো প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে ওঠেনি। সে পালিয়ে বেড়ায়। প্রধানের দাপটে সে অফিসারকে মাঝরাতে সত্য বলতে আসে কিন্তু সর্বসমক্ষে পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে বলার সাহস দেখাতে পারে নি। এমনকি এই বিষয়টা নিয়ে মিরাজ গ্রামবাসীদেরও প্রধানের কূটবুদ্ধির কথা বোঝাতে পারেনি বা চেষ্টাও করেনি। এটা একটা ব্যর্থতা না এটাই মেসেজ বোঝা যায় নি।

নাটকটিতে সমাজের ইনটেলেকচুয়াল হিসেবে এসেছে মাস্টার চরিত্রটি। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র এসময়কে বয়ান করে। আজকের সমাজেও দেখা যায় বেশ কিছু বিদ্বৎজন এবং মেধাজীবী ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাদের মেধা ক্ষমতাবানের দূরভিসন্ধিকেই সুরক্ষা দিতে তৎপর। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। পঞ্চায়েত প্রধানের তিনিই প্রধান পরামর্শদাতা।

নাট্য নির্দেশনার শৈল্পিক দিক খুব বেশি চোখে পড়েনি, হয়তো পড়বার কথাও নয় কেননা এই নাটকের চালিকাশক্তি এর টেক্সট। মিউজিক আরেকটু ধারালো হলে নাটকটির আবেদন আরও জোরালো হতে পারতো। মঞ্চসজ্জা টেক্সট এর নিরিখে তুলনামূলক দুর্বল মনে হয়েছে।

নাটকটি একটা সমস্যার বয়ান করেছেন খুব বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে — ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগেও কুসংস্কার অশিক্ষার ভারত রয়েই গেছে ভারত নামক রাষ্ট্রের মানচিত্রের আনাচে কানাচে। কিন্তু তা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিতে পারেনি। ছুনু মিঞার মৃত্যুতে শেষ হয়না মানুষকে চশমা পরিয়ে রাখা। শোষক আরেকটি হাতিয়ার তৈরী করে নেয় আরেকজন কে কালো চশমা পরিয়ে। অর্থাৎ শোষণের এই কূটপন্থা চলতেই থাকবে বলে মেনে নেওয়া হয়েছে।



কৌশিকরঞ্জন খাঁ

১৯৭৭ সালে জন্ম। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর । সব রকম গদ্য লিখলেও ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখতে বেশি পচ্ছন্দ করেন। আনন্দবাজার, নন্দন, কথাসাহিত্য, শিলাদিত্য, তথ্যকেন্দ্র, উত্তরভাষা, মোহিনী তে লেখা ছাপা হয়।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।