মৌখিক ইতিহাস ও পুরাকথায় দক্ষিণ দিনাজপুর (পর্ব – ৫)

ড. সমিত ঘোষ on

moukhik_itihas

  আজ পঞ্চম পর্বের মৌখিক ইতিহাস ও পুরাকথায় জেনে নেবো তপন থানার ভায়োরের  মায়ের থান ও দিনাজপুরের জনপ্রিয় লোকদেবী চামুণ্ডা সম্পর্কে। মায়ের থানের গল্পগাথা ও নিম্নবর্গের মানুষদের (Subaltern People) দ্বারা পূজিত চামুণ্ডা কী ভাবে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করল তা দেখে নিই – 

মায়ের থানঃ 

               তপন থানার ভিকাহারের পশ্চিমে ফকিরপাড়া থেকে একটু দূরে ভায়োরের  মায়ের থান।  অনেকে বলেন ভায়োর কালী। আবার কেউ কেউ বলেন ডাকাত কালী। এখানে একাদশ / দ্বাদশ শতকের একটি দশভুজার মূর্তি আছে। মূর্তিটি সম্পর্কে নানা কথা শোনা যায়।  কেউ বলেন বেলে পাথরের তৈরী দশভূজা দুর্গা মূর্তি। আবার অনেকে বলেন ভৈরবের মূর্তি।

Iconographic Studies -এ এর ব্যাখ্যা মেলা দায়। গ্রামে গঞ্জে আজও অনেক দেবী মূর্তি দেব মূর্তি হিসেবে পূজিত হচ্ছেন। আবার উল্টোটাও হচ্ছে। মন্দির ও মূর্তি নিয়ে তিনটি লোকশ্রুতি  আছে – 

১. একটি জনশ্রুতি কালো পাহাড়ের আক্রমণে এই মন্দির ও মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. আর একটি প্রচলিত গল্পগাথা –  ধাসন বিলের ওপারের গ্রাম শালগাঁও থেকে এই মন্দিরের দেবী রাতারাতি পোতাহারের এখানে উঠে আসেন।

৩. শোনা যায় –  দেবী চৌধুরানী পুনর্ভবা নদী দিয়ে বাংলাদেশের দিকে যাওয়ার সময় এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং এই মন্দিরে পুজো দেন। তবে একথা ঠিক যে অখন্ড দিনাজপুর তথা বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেবী চৌধুরানীর নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

  এই ভাবেই মৌখিক ইতিহাস আঞ্চলিক ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে আছে।

চামুন্ডাঃ 

          দিনাজপুরের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চন্ডী পূজোর বিভিন্ন পদ্ধতি। চণ্ডীর বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। এরই এক রূপ চামুণ্ডা। চামুন্ডার নানা রূপ – ভীষণা,  লোলজিহ্বা, ভয়প্রদা, রক্তচক্ষু। দিনাজপুরের লোকদেবী চামুণ্ডা দারু (কাঠ) নির্মিত। মোখার  মধ্যেই চামুণ্ডার অবস্থান। সমগ্র দিনাজপুর

জুড়েই চামুণ্ডা পূজিত হয়। দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন অংশে বহু শতাব্দী ধরে প্রায় সকল শ্রেণীর হিন্দুদের পূজো পান যেসব দেব-দেবী, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চামুণ্ডা। দেবী শাস্ত্রীয় বলে এই পুজোয় সর্বক্ষেত্রে বর্ণহিন্দু মানুষেরা এগিয়ে আসেন এবং কুলীন ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পৌরহিত্য করেন। তবে অঞ্চল ভেদে ব্যতিক্রম আছে।

                      দিনাজপুরে রয়েছে সপ্ত চণ্ডীর পীঠস্থান। জনশ্রুতি আছে চামুন্ডারা সাত বোন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে পূজিত হয়ে আসছেন। বাংলাদেশের নওগাঁ, মহাদেবপুর সহ অন্যান্য কয়েকটি স্থানে চামুণ্ডা পূজিত হন। বিভাজিত দিনাজপুরের ভাকলা, বটুন, মাধবপুর, কুশমন্ডি, পতিরাম, খাঁপুর, কৃষ্ণগড়, হিলি, শিবরামপুর, তিওর, গুটিন, বালুরঘাট সহ অন্যান্য কিছু জায়গায় চামুণ্ডা পূজিত হন। পুজো উপলক্ষে বলি হয়। কোথাও পায়রা উৎসর্গ করা হয়। লোকক্রীড়া হিসেবে জিভ ও বগল ফোঁড়ানো হয়। রামদা, কুড়ুল নিয়ে ভক্তরা নানা কসরত করে, সঙ্ সেজে নাচ করে। অনেক জায়গায় পুজো উপলক্ষে মেলা বসে। এক সময়ের পুন্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্রভূমি তথা দেবকোটে চামুণ্ডা জাগ্রত লৌকিক দেবী হিসেবে পুজো পেতেন। সেই ধারা আজও আমাদের জীবন সংস্কৃতিতে জড়িয়ে আছে।

ক্রমশ…

*চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


ড. সমিত ঘোষ

শিক্ষক গবেষক সমিত ঘােষ প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইতিহাস চর্চায় রত। ইতিহাসের সঙ্গেই তাঁর দিনযাপন। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে তিনি নানা প্রবন্ধ লিখেছেন। ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল কয়েকটি জার্নালেও তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির জন্য তিনি পেয়েছেন বেশ কিছু সম্মাননা। ২০১৫ সালে মালদা থেকে সংবেদন কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন ‘বিমলা বর্মন স্মৃতি স্মারক' পুরস্কারে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা প্রেস ক্লাবের তরফে পেয়েছেন রাধামােহন মােহান্ত স্মৃতি স্মারক’ সম্মাননা। মুক্তধারা পত্রিকা থেকে পেয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সেরা গবেষক ২০১৯'সম্মাননা। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল "Transformation of the Rural Society of North Bengal from the Permanent Settlement to the Operation Barga with Special Reference to Malda and West Dinajpur (1793-1978) '-এ পর্যন্ত লেখকের পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে— ‘আর্থ-সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গে দক্ষিণ দিনাজপুর (২০০৬), ‘উত্তরবঙ্গের ইতিহাস (২০০৯), “দিনাজপুরের বিপ্লবী আন্দোলন’ (২০১২), ‘দক্ষিণ দিনাজপুরের পুরাকীর্তি,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস’ (২০১৪), 'উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও পুরাকীর্তি' (২০১৯)। 'দক্ষিণ দিনাজপুরের পুরাকীর্তি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস' গ্রন্থটি ২০১৭ সালে টাঙ্গন লােকমঞ্চ পুরষ্কারে ভূষিত হয়। লেখক দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সােসাইটির সম্পাদক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।