প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে মড়ক কবলিত দিনাজপুরের অবলুপ্ত দু’টি গ্রাম

কৌশিক বিশ্বাস on

প্রায় দুইশ বছর আগে, ঠিক এমনই একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল অবিভক্ত বাংলা। এক অযাচিত রোগের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল গোটা মনুষ্য সমাজকে। হ্যাঁ, আজকের করোনার মতো তখন সেই রোগটি ছিল স্মলপক্স বা গুটি বসন্ত। ভারত তখন ইংরেজ শাসনাধীন। গুটি গুটি পায়ে শুরু হয়ে রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। কলিকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলিতে যারা পরিচারিকার কাজ করতেন তাদের কিছুক্ষণের জন্য বাড়িতে যেতে দেওয়া হতো, বাদবাকি সময় তাদের নিজবাড়িতে থাকতে দেওয়া নিষেধ ছিল। আরোপিত হয়েছিল সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশিকা। বন্ধ হয়েছিল স্কুল,কলেজ, নীল কারখানা ইত্যাদি। সাহেবদের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল কলকাতায় বিভিন্ন ইউরোপীয় কলোনিতে এই রোগের ছড়িয়ে যাওয়া। প্রথমদিকে সেভাবে এর কোন চিকিৎসা ছিল না। মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। সককার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, কেন এদেশীয়দের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ হলো। বস্তি এলাকার পাঁচ-ছয় জনের মধ্যে দিয়ে এই গুটি বসন্ত প্রথম থাবা বসিয়েছিল। অনুসন্ধান করে নির্দিষ্ট কোন সিধান্তে উপনীত না হয়ে একগুচ্ছ কারণের কথা বলা হয়েছিল। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মলত্যাগ স্থানের অপ্রতুলতা ইত্যাদি। হিন্দু,মুসলমান,নারী,পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকদিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা জানিয়ে রিপোর্ট করতে হতো জেলাশাসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেনদের। গঠিত হয়েছিল “স্মল পক্স কমিশন”। নানা ধর্মের দেশ এই ভারতবর্ষ ; রোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ধর্মের কাঁটা সরকারের কাছে প্রবল বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল। এই রোগে আক্রান্ত হলে গ্রাম, শহর সব জায়গাতে এক বিশেষ ধরনের টিকা বা তিলক লাগানোর প্রথা ছিল। যারা এই টিকা বা তিলক লাগিয়ে দিত তাদের “টিকাদার” বলা হতো। গ্রামীণ বাংলায় শুরু হয়েছিল শীতলা দেবীর পূজার্চনা। শহরের ক্ষেত্রে অসুবিধা নাহলেও গ্রামের ক্ষেত্রে এই টিকার প্রতি কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস মানসিকতা সরকারকে এই রোগ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ভাবিয়ে তুলেছিল। তদকালীন নদীয়া, বেনারস, ও কলিকাতার সংস্কৃত কলেজের পন্ডিতদের মত নেওয়া হয়েছিল। তারা প্রত্যেকেই এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে হিন্দুধর্মের সাথে এই তিলক বা টিকার কোন সম্পর্ক নেই। শাস্ত্রে এই বিষয়ক কোন নির্দেশ বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। সুতরাং হিন্দুশাস্ত্র বহির্ভূত এই প্রথার সাথে ধর্মের কোন যোগসূত্র নেই। এই প্রথায় মানুষ যেন বিশ্বাস না করেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার সাহায্য নেন। যে সমস্ত এলাকায় এই রোগ দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ছিল,সেসমস্ত এলাকা ‘সিল’ করে দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক এমন একটি সময়ে গ্রামীণ বাংলা একটু অন্যরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। শহরের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিসর বিস্তৃত না হবার কারণে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে “মড়ক” লাগা। এই মড়ক লাগার ফলে গ্রামীণ বাংলার বহু মানুষ মনে করতেন যে তাদের গ্রাম “শীতলা” দেবীর রোষের শিকার তাই এই মড়ক আটকাতে তাদের সেই গ্রাম পরিত্যাগ করে নতুন গ্রামে বসতি স্থাপন করতে হবে। গ্রাম ছাড়ার পূর্বে শীতলা দেবীর পূজা দিয়ে গ্রাম ছাড়তে হতো। তাদের একটাই প্রার্থনা ছিল যে, দেবী যেন তাদের রক্ষা করেন এই মড়ক থেকে এবং মড়কের পর তাঁরা আবার নিজগ্রামে যেন ফিরে আসতে পারেন। ঠিক এইসময় বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের দুটি গ্রামের মানুষ নিজগ্রাম ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন পাশের গ্রামে। এই গ্রামদুটি – ১) কুশআউটা এবং ২) শঙ্খিনীপুর। প্রথমটির অবস্থান ছিল কুড়মাইল ও মহদীপুরের মধ্যবর্তী স্থানে আর দ্বিতীয়টি ছিল মালঞ্চা হাইস্কুল ছাড়িয়ে পশ্চিম দিকে। পুরাতন রেকর্ডে এই দুটি গ্রামের নাম থাকলেও বাস্তবে এই দুটি গ্রামের কোন অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় নব্বই উর্ধ্ব লোকেরা এর বিবরণ দিয়েছেন যা এখনো স্থানীয়দের মুখেমুখে মিথে পরিণত হয়েছে। বস্তুত পরবর্তীতে এই দুটি গ্রামের মানুষ পুনরায় ফিরে না আসায় এই দুটি গ্রাম আজ শুধু স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে। পরবর্তীতে এই রোগের ভ্যাকসিন ও চিকিৎসার ফলে মড়ক হারিয়ে জয়ী হয়েছিল মানুষ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে এতগুলি বছর পর আবার গোটা পৃথিবী মারণ রোগের বিরুদ্ধে একজোট । এখন শুধুই যুদ্ধ জয়ের অপেক্ষা!


তথ্যসূত্র :
১) স্মলপক্স কমিশনারের রিপোর্ট, ১৮৫০।
২) ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও সমীক্ষা।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।